নিবিড় তদারকি অব্যাহত রাখুন

421
Social Share

ডা. কামরুল হাসান খান: দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশে করোনার টিকা সংগ্রহ করে এর প্রয়োগ কার্যক্রম প্রায় উৎসবে রূপ নিয়েছে। এ জন্য সবার আগে সরকারকে অভিনন্দন জানাতে হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও কূটনৈতিক তৎপরতারই সুফল হচ্ছে এই চিত্র। বিগত এক সপ্তাহে সারাদেশে করোনার টিকা গ্রহীতার সংখ্যা ৯ লাখ ছাড়িয়েছে। লক্ষণীয়, টিকা নিতে আগ্রহীর সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের দেশে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে শঙ্কা-বিভ্রান্তি ছিল। অপপ্রচারও কম ছড়ানো হয়নি। অপরাজনীতিও কম হয়নি। শেষ পর্যন্ত মানুষ এসব আমলে রাখেনি এবং করোনা দুর্যোগ থেকে মুক্তির লড়াইয়ে তা আশার আলোও বটে। করোনার টিকাদান কর্মসূচির মতো এতবড় কর্মযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করতে হলে সরকারের কঠোর দৃষ্টি জরুরি। কারণ করোনাকালে আমরা লক্ষ্য করেছি, অসাধু-দুর্নীতিবাজরা নানা রকম অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছিল।

গত ২৭ জানুয়ারি ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পরীক্ষামূলক পর্যায় শেষ হওয়ার পর গত ৭ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে একযোগে গণটিকাদান শুরু হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত যারা টিকা নিয়েছেন তার বেশিরভাগই সমাজের উচ্চ ও মধ্য শ্রেণির মানুষ। এর নিচের পর্যায়ের মানুষ এখনও টিকার নাগাল পাননি। কারণ, নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় গ্রামের বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সংযুক্তি এখনও সেভাবে ঘটেনি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেউ কেউ নিবন্ধন করে তাদের টিকা গ্রহণের নির্ধারিত তারিখ জানার আগেই অন্য কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নিয়েছেন- এমন কিছু অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে হয়তো এমনটি ঘটেছে। তবে সরকার নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও সহজ করার পাশাপাশি টিকা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা আরও সুচারু করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা সময়োপযোগী। আমরা যেন এটা ভুলে না যাই, বিশ্বব্যাপী এই দুর্যোগের মাঝেও আমাদের অবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলক ভালো লক্ষ্য করা গেছে এবং এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তা-কর্মপরিকল্পনার সুফল দেশের মানুষ ভোগ করেছে। সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম, অর্থনৈতিক প্রণোদনাসহ নানা জরুরি কর্মসূচি তারই চিন্তাপ্রসূত।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ে দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা প্রায় এক বছর ধরে অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা করেছি। করোনার টিকাপ্রাপ্তি নিয়ে নানারকম সংশয় থাকলেও অনেক উন্নত দেশের আগেই তা সংগ্রহ করে গণহারে প্রয়োগও শুরু করতে পেরেছি। এটি নিঃসন্দেহে অনেক বড় অর্জন। এত দ্রুততম সময়ে যেহেতু বিশ্বে আর কোনো টিকা এর আগে আসেনি, সেহেতু এর কার্যকারিতা বা সুফল সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে বলাটাও বেশ কঠিন ছিল। এই মহামারি মোকাবিলায় বিশ্ব এখন পর্যন্ত যা কিছু করেছে, সবই জরুরি ভিত্তিতে। প্রায় এক বছরের মাথায় এখন প্রায় সারাবিশ্ব এই টিকা আবিস্কারের পর ব্যাপক আশান্বিত। টিকা উৎপাদনের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত রয়েছে কয়েকটি দেশের নাম। তারপরও জনমনে প্রশ্ন ছিল- আমরা টিকা কবে পাব? এই ঔৎসুক্যের সমাধান সূত্রও মিলেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি প্রচেষ্টায়। এর পাশাপাশি বলতে হয়, ভারতের সঙ্গে যে আমাদের বন্ধুত্ব পরীক্ষিত- এর প্রমাণ ফের মিলেছে টিকা উৎপাদনকারী বড় প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত টিকার জন্য তাদের সঙ্গে চুক্তি করে। করোনায় বিপর্যস্ত ভারত তাদের সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমরা আশা করছি, সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ীই আমরা টিকা পাব।

সরকার আরও উৎস থেকে টিকা সংগ্রহের যে উদ্যোগ নিয়েছে, সে ক্ষেত্রেও সুবার্তা মিলছে। আমরা বড় ধরনের দুর্যোগের মধ্যে নেই বটে, কিন্তু গত একদিন আগ পর্যন্ত যারা করোনার পরীক্ষা করতে গেছেন তাদের মধ্যে অনেকেই করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। কাজেই করোনা সন্দেহের মধ্যে এখনও উল্লেখযোগ্য একটা অংশ রয়ে গেছে। সরকার ৬০ লাখ মানুষকে দুই মাসের মধ্যে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছিল। কিন্তু এ সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। টিকার দ্বিতীয় চালান আসার কথা ২৫ ফেব্রুয়ারি। যদি ৬০ লাখ মানুষকে পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টিকা দিয়ে দেওয়া যেত তাহলে আরও বেশি স্বস্তি বোধ করতে পারতাম। আগে ৮ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহণের কথা ছিল। এর সময়সীমাও এখন কমে এসেছে। একদিকে যেমন টিকা গ্রহীতার সংখ্যা উল্লিখিত সময়ে কমানো হয়েছে, অন্যদিকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহণের সময়ও অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই ছক অনুযায়ী যদি টিকা কার্যক্রম চালানো যায়, তাহলে যে অংশের মধ্যে এ ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হবে, তাতেও সংক্রমণের সংখ্যা হ্রাস পাবে।

বিদ্যমান পরিস্থিতি পর্যালোচনাক্রমে বলতে পারি, মার্চের মধ্যেই আমরা হয়তো নিরাপদ অবস্থানে চলে যেতে পারব। এখন সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সবাইকে জোর দিতে হবে টিকা গ্রহণকারী হিসেবে উপযুক্তদের নিবন্ধন কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যাপারে। মানুষের মধ্যে যে টিকা নিয়ে ভয় বা বিভ্রান্তি ছিল, তা যেহেতু কাটানো অনেকটাই সম্ভব হয়েছে, সেহেতু নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে এটুকু বলতে পারি, টিকার কারণে মৃত্যুর আশঙ্কা নেই। এমন ঘটনা ঘটেওনি। বাংলাদেশ দুরারোগ্য অনেক ব্যাধি নির্মূলে সক্ষম হয়েছে সফলভাবে টিকাদান কর্মসূচি সম্পন্ন করে। বিশ্বের অনেক দেশই তা পারেনি। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ সফলতার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সম্মাননা ‘ভ্যাকসিন হিরো’ উপাধি পেয়েছেন।

শুধু টিকা গ্রহণের জন্য নিবন্ধন করার ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো বিষয়ে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আমাদের স্বভাবগত এক ধরনের অনাগ্রহ রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ হলো সংশ্নিষ্ট সবার সক্রিয় তৎপরতা। কোনো কোনো দেশে ইতোমধ্যে করোনার চরিত্রগত রূপ পরিবর্তনের কথা আমরা জেনেছি। এ ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। নতুন করে নতুন রূপে আক্রান্ত কোনো দেশ থেকে কেউ যাতে না আসতে পারেন, এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থাপনা জরুরি। অতীতে এ ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটেছে বলেই আমরা ঝুঁকির মুখে পড়েছিলাম। রূপান্তরিত করোনাভাইরাসের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সজাগ সতর্কতা এবং প্রয়োজনমতো ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। সব ধরনের ঝুঁকিমুক্ত থাকতে ব্যবস্থাপনাগত কোনো ত্রুটি যাতে ফের দেখা না দেয়, তা নিশ্চিত করতেই হবে। আমাদের সামনে কিন্তু এখনও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আমরা কতজনকে টিকার আওতায় আনতে পারব। কারণ, আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে করোনা নিয়ে যে উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে, জীবনযাপনে অনিবার্য নিয়মনীতি উপেক্ষার মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে, তা বিস্ময়কর। মনে রাখা উচিত, টিকা নেওয়া মানেই কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত হয়ে যাওয়া নয়। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না।

পুরো কার্যক্রম বাস্তবায়নে নিবিড় তদারকি দরকার। সরকারের এত বড় সাফল্য যাতে কারও কারও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ভেস্তে না যায়; এও এক বড় চ্যালেঞ্জ। করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে আমরা নানা রকম অনিয়ম-দুর্নীতি দেখেছি। তবে আশার কথা হলো, সরকার এসব ব্যাপারে কোনো ছাড় দেয়নি। স্বেচ্ছাচারী, দুর্নীতিবাজ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী এসব ব্যাপারে এখনও সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন। টিকাদানকেন্দ্রে জনচাপ ক্রমাগত বাড়বে। এ জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে জনবল বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো রকম প্রতিবন্ধকতার মুখে না পড়ে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ না নিতে পারলে প্রথম ডোজের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই স্বাস্থ্য বিভাগ, অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়সহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে করণীয় সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রস্তুত থাকতে হবে। ব্যবস্থাপনাগত যেসব ঘাটতি বা ত্রুটি রয়েছে তা দূর করতে সময়ক্ষেপণ করা চলবে না। অনেক কিছুই ত্রুটিমুক্ত করা গেছে। কিন্তু সম্পূর্ণভাবে ত্রুটিমুক্ত করা যায়নি- এও অসত্য নয়। এ জন্যই সর্বাবস্থায় এ ক্ষেত্রে মনিটরিং সেল শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। তাদের কাজ হবে কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুততার সঙ্গে এর নিরসন করা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্যবিভ্রাটের ঘটনাও ঘটছে। সংবাদমাধ্যমকে আরও সম্পৃক্ত করে সঠিক তথ্য যাতে মানুষের সামনে উপস্থাপিত হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি খাতে টিকা আমদানির কথা কেউ কেউ বলছেন। প্রয়োজনের নিরিখে তা ভাবা যেতে পারে। তবে নিয়ন্ত্রণের নাটাই সম্পূর্ণ সরকারের হাতে রাখতে হবে। যদি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় টিকা আমদানি করতেই হয় তাহলে অবশ্যই সরকারের দৃষ্টি রাখতে হবে, একে কেন্দ্র করে কেউ যাতে বাণিজ্যের দরজা খুলে না বসেন।

অধ্যাপক; সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়