দুর্ভাগা রোহিঙ্গা জাতি সংকটে বাংলাদেশ

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

Social Share

২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট রোজ রবিবার। দুপুর গড়িয়ে বেলা ২টা বাজে। মিয়ানমারে আরাকান বা রাখাইন রাজ্যে গাছপালায় ঘেরা ছোট গ্রাম ছুটপাইন। কয়েকশ রোহিঙ্গা প্রজাতির মানবকুলের বাস। দুই দিন আগে আশপাশের কয়েকটি গ্রামে যা ঘটেছে তার জেরে ছুটপাইনের স্বল্প সংখ্যক রোহিঙ্গা পরিবার ভয়ে কম্পমান, জড়োসড়ো হয়ে আছে। কখন কী হয়ে যায়। বাপ-দাদার চৌদ্দপুরুষের ভিটামাটি না ছাড়ার শেষ আশায় ভয়ার্ত মনে এক বেলা খায় তো আরেক বেলা না খেয়ে দিন-রাত পার করছে। দিনের বেলায় সবাই বাড়িতে থাকলেও রাতের বেলায় বনে-জঙ্গলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু সেদিন কপাল মন্দ, বিধির বিধান না হয় খ-ন। রাতের বেলায় পুরুষরা জেগে থাকে বিধায় দিনের বেলায় তারা একটু ঘুমিয়ে নেয়। ২৭ আগস্ট বেলা ২টা বাজতেই ভাঙা বেড়ার ছিদ্র দিয়ে ঘরের মহিলারা দেখতে পায় একটু দূরে মিয়ানমারের সেনাসদস্যরা গ্রামটিকে ঘিরে ফেলেছে। ভয়ে অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। কী হবে- পালানোর সব পথ বন্ধ। সব দিক সেনারা রাইফেল তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। বেলা ২টা থেকে পরবর্তী চার ঘণ্টা সৈন্যরা প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি ঘরে ঘরে তল্লাশি চালায়। প্রথমে পুরুষদের টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে আসে সৈন্যরা। নাবালক অবুঝ ছেলেমেয়ে এবং মা, বোন ও স্ত্রীর সামনে যুবক থেকে বৃদ্ধ সব পুরুষ সদস্যকে গুলি করে হত্যা করে। সব মহিলাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মাটিতে ফেলে দেয়। তারপর অপেক্ষমাণ গু-া বাহিনী মহিলাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সব শেষ হয়ে গেলে মহিলাদেরও হত্যা করা হয়। প্রতিটি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একদল সৈন্য আবার কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গাকে পার্শ্ববর্তী প্রাথমিক স্কুলে এনে জড়ো করে। তারপর প্রত্যেকের মুখ-হাত বেঁধে গুলি করে হত্যা করে। কয়েকজন পুরুষ-মহিলা ভাগ্যবান ছিল। আগুনের ধোঁয়ার আড়ালে তারা দূরে একটা পচা দুর্গন্ধময় পুকুরে বড় বড় কচুরিপানার মধ্যে নিজেদের কয়েক ঘণ্টা লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। রাত হতেই অন্ধকারের মধ্যে জীবন বাঁচাতে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে। এরকমই একটা হৃদয়বিদারক ও চরম অমানবিক গণহত্যার চিত্র পাওয়া যায় ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটা বইয়ের দুই ও তিন পৃষ্ঠায়। বইটির শিরোনাম- ‘মিয়ানমারস এনেমি উইদিন’। লেখকের নাম ফ্রান্সিস ওয়েড, ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাংবাদিক। তিনি ২০০৯ সাল থেকে মিয়ানমারের ওপর কাজ করছেন। ৪১৯ পৃষ্ঠার বইজুড়ে আছে দুর্ভাগা রোহিঙ্গা জাতির করুণ ইতিহাস, মিয়ানমারের মিলিটারি শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিসহ জাতিগত যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাতের বিভীষিকাময় বর্ণনা। ফ্রান্সিসের বর্ণনায় দেখা যায়, এমন করুণ মানবতা নিধনের ঘটনা ২০১৭ সালে হঠাৎ করে ঘটেনি। এর পিছনে বিরাট বড় প্রেক্ষাপট রয়েছে, যার শুরু ১৪০৬ সালে। সে বছর বার্মিজ রাজা মেঙ শো ওয়াই বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে রাজা নরমিখলাকে বিতাড়িত করে আরাকান দখল নেয়। দখলদারিত্ব বজায় ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আরাকানের মূল অধিবাসী রোহিঙ্গা ও রাখাইন, দুই সম্প্রদায়ের ওপরই বার্মিজ সেনাবাহিনী হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। বাংলার সুলতান জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ালে রাজা নরমিখলা বার্মিজদের বিতাড়িত করে ১৪৩০ সালে আরাকান রাজ্য উদ্ধার করেন। নরমিখলার সেনারা পাল্টা প্রতিশোধ নিতে বহিরাগত বার্মিজদের ওপর নিধনযজ্ঞ চালায়। ১৭৮৪ সালে বার্মিজ রাজা বোধপয়া বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে আরাকান পুনর্দখল করে। এবারও তারা বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালায়। একই সময়ে এবার সঙ্গে করে নিয়ে আসা কয়েক হাজার বার্মিজ পরিবারকে চির স্থায়ীভাবে আরাকানে বসবাসের সুযোগ-সুবিধা করে দেয়। আরাকানের স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মের রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষকে ধর্মের বুলি এবং প্রলোভন ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে দলে ভিড়িয়ে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়। ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতিকে কাজে লাগায়। তারপর থেকে চলছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং প্রায়শই সেটি সশস্ত্র বিদ্রোহ ও পাল্টা দমন-পীড়নে রূপ নিয়েছে। পথিমধ্যে ব্রিটিশ কর্তৃক বার্মা

দখল, ঔপনিবেশিক শাসন, ১৯৪২ সালে জাপান কর্তৃক বার্মা দখল, ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে স্বাধীনতা প্রাপ্তি ইত্যাদি ঘটনাবলিতে রোহিঙ্গা ও বার্মিজ শাসক গোষ্ঠী সব সময়ই পরস্পরের বিপরীত দিকে থেকেছে। ১৯৭৮ সালে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা সেনাবাহিনী কর্তৃক উৎখাত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে এতদিনের মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটে নতুন মাত্রা যোগ হয়। ১৯৯১ সালে আবারও একই ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মিয়ানমার একটা অংশকে ফেরত নিলেও আরেকটি অংশ কক্সবাজারে থেকে যায়। এরপর প্রতি বছর কিছু কিছু রোহিঙ্গা পরিবার কক্সবাজারে চলে আসতে থাকে। এক সময় তাদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ হয়ে যায়। এই যে একটা বড় সংখ্যক উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা অত্যাচার, নির্যাতনের ক্ষোভ নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ কক্সবাজারে বসবাসের সুযোগে সেখানে তারা কী করছে-না করছে তার কোনো খবর ও নিয়ন্ত্রণ পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশের কোনো সরকারই যথাযথভাবে করেনি। তারা নিজেদের মতো করে থাকার সুযোগ পেয়েছে। ২০১৭ সালের আগে তাদের নিবন্ধনের আওতায়ও আনা হয়নি। ২০১৭ সালের আগে পথিমধ্যে সমস্যাটি জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠার পিছনে অনেক ঘটনাই ঘটেছে, যার সব কিছুই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গেছে। বহু বিদেশি পক্ষ এসে এর মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে। ২০১২ সাল থেকে পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে, যেটি ২০১৬ সালে এসে আরও খারাপ হয়। ২০১৭ সালে শুধু প্রতিবেশী হওয়ার জন্য কী করে বাংলাদেশ সংকটের সবচেয়ে বড় ভিকটিম রাষ্ট্রে পরিণত হলো তার সঠিক কারণ জানা যায় না। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে সমস্যা স্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমার সরকার জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করে। অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে কমিশন এত দীর্ঘদিনের একটা সংকটের সমাধানের পথ বাতলিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে। বাংলাদেশ এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সবাই বলেছে, কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট সত্যিকার অর্থেই গ্রহণযোগ্য একটা সমাধানের ম্যাগনাকার্টা। মিয়ানমার এই কমিশন গঠন ও রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাহলে এই কমিশনের রিপোর্ট ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে উৎপত্তি হওয়া জঙ্গি সংগঠন আরসা আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি; এআরএসএ কেন ওই রাতেই মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আগ বাড়িয়ে বিশাল আক্রমণ শুরু করল এবং কেনই বা মিয়ানমার সেনাবাহিনী মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এত বড় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাল। দুই পক্ষের আক্রমণ প্রতি আক্রমণ অত্যন্ত রহস্যজনক। কারণ এর ফলে তো সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট ব্যাকবার্নারে চলে গেল। আরসা ও সেনাবাহিনীর পাল্টাপাল্টি আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ এবং তার পরিণতি সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায় মিয়ানমারের নাগরিক থান্ট মিন্টউ কর্তৃক লিখিত দ্য হিডেন হিস্টরি অব বার্মা গ্রন্থে। থান্ট মিন্টউ জাতিসংঘের আরেক সাবেক মহাসচিব উ-থান্টের নাতি। ক্যামব্রিজ কলেজে লেখাপড়া শেষে এখন আমেরিকায় বসবাস। থান্ট মিন্টের প্রায় তিনশ পৃষ্ঠার বইটি পড়ে আমার কাছে মনে হয়েছে তিনি নির্মোহ থাকার চেষ্টা করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে উক্ত বই থেকে আরসা ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অপারেশনের একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র এখানে তুলে ধরছি। ব্রাসেল ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুসারে সৌদি আরবে বসবাসরত এবং পাকিস্তান বা আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি নামক ব্যক্তি ২০১২ সালে আরসা গঠন করে। আতাউল্লাহর বাবা পাকিস্তানে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং মা পাকিস্তানি। আরসার প্রথম অ্যাকশন দেখা যায় ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর। সেদিন তারা রাখাইনে একটা পুলিশ পোস্টে আক্রমণ চালিয়ে তিন পুলিশকে হত্যা করে। পাল্টা সেনাবাহিনী ব্যাপকহারে ক্লেনজিং বা আরসা বিতাড়ন অপারেশন চালায়। তখন প্রায় ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজার চলে আসে। ২০১৭ সালে জুলাইয়ের ৩ তারিখে ঢাকা ট্রিবিউনে প্রবীর কুমার সরকারের এক লেখায় জানা যায়, পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা এবং বাংলাদেশের আনসার আল ইসলাম আহ্বান জানায় বাংলাদেশের মুসলিম যুবকরা যেন আরসাতে যোগদান করে। থান্ট মিন্ট কর্তৃক লিখিত বইয়ের ২৩৭-২৩৮ পৃষ্ঠার বর্ণনা অনুযায়ী ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট ভোররাতে আরসা বাহিনী ৩০টি পুলিশ পোস্টের ওপর একসঙ্গে আক্রমণ চালায়। তাতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শত শত রোহিঙ্গা যোগ দেয়। ১০ পুলিশ নিহত হয়। আরসার একটি দল পার্শ্ববর্তী হিন্দু অধ্যুষিত একটা গ্রামে আক্রমণ চালায়। ৪৬ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে ধরে নিয়ে যায় এবং বাকি ওই গ্রামের যাকেই পেয়েছে সবাইকে হত্যা করে। ধরে নেওয়াদের আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন ও বার্মিজ সম্প্রদায় অধ্যুষিত সব গ্রাম এক এক করে পুড়িয়ে দিতে আরসার কমান্ডার তার বাহিনীকে নির্দেশ দেয়। উল্লিখিত তথ্য দুটি ২০১৮ সালের ১০ মে ও ২৭ জুন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। থান্ট মিন্ট লিখেছেন, আরসা বাহিনীর এই আক্রমণের বিপরীতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া ছিল মার্সিলেস, ভয়ঙ্কর ও বীভৎস। সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন অফিসারের রেডিও বার্তা থেকে জানা যায়, হুকুম ছিল সব রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রাম পুড়িয়ে ধূলিসাৎ করে দিতে হবে এবং সন্দেহভাজন সবাইকে হত্যা করতে হবে। ফলে গণহত্যা, জাতিগত নিধন, ধর্ষণসহ এমন কোনো অমানবিক ঘটনা নেই যা সেদিন ঘটেনি। সশস্ত্র বাহিনী প্রধান মিন অঙ্গ হ্লাইং বলেছেন, তারা ১৯৪২ সালের অসমাপ্ত কাজকে এখন সম্পন্ন করবেন, অর্থাৎ রোহিঙ্গামুক্ত আরাকান গড়বেন। সুতরাং ১৪০৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাবলির পর্যালোচনায় দেখা যায়, রোহিঙ্গা সম্প্রদায় রাজনৈতিক পন্থায় অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে অথবা রাজনীতিকে প্রধান পন্থা হিসেবে না নিয়ে বিদেশি শক্তি ও চক্রের দুরভিসন্ধিতে পা দিয়ে ধর্মীয় আবরণে সংঘর্ষের পথকে বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা নিজেদের রাষ্ট্র ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে সংঘাত-সংঘর্ষ জিইয়ে রেখে রোহিঙ্গাদের ওপর দোষ চাপিয়ে এমনভাবে প্রত্যাঘাত করেছে, যা মানবতার সব সীমা লঙ্ঘন করেছে। মাঝখানে পড়ে বাংলাদেশ আজ মানবতা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আবশ্যিক এ দুটি জায়গা একই সঙ্গে রক্ষা করার চেষ্টায় ক্রমশই জটিল সংকটের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। সংকট সমাধানের পথে মিয়ানমার সরকার আর রোহিঙ্গা এই দুটি পক্ষের বাইরে অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে আরও দুই জায়গা থেকে। প্রথমত, সৌদি আরব ও পাকিস্তানে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস থাকায় ওই দুটি রাষ্ট্র, বিশেষ করে পাকিস্তানের দুরভিসন্ধিতে রোহিঙ্গারা দারুণভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চীন, আমেরিকা, ভারতের ভূ-রাজনৈতিক এবং স্ট্যাটেজিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব-প্রতিযোগিতায় পারস্পরিক বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে জাতিসংঘ বিকল হয়ে থাকছে। সংগত কারণেই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে নেই। ভাসানচরে স্থানান্তরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেও রোহিঙ্গাদের সেখানে নেওয়া যায়নি। ১১ লাখ রোহিঙ্গার কক্সবাজারে অবস্থান এবং প্রতি বছরই তাতে নতুন মুখ যোগ হয়ে ম্যালথাসের সূত্র মতে কয়েক বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। সুতরাং রোহিঙ্গারা যদি কক্সবাজারে এখন যেভাবে আছে সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করে তাহলে সেটি আমাদের রাষ্ট্রীয় ভৌগোলিক অখ-তার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করবে কিনা তা জরুরি ভিত্তিতে ভাবা প্রয়োজন। এমনটি না হয় যে, আজ রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমার যে নিরাপত্তার হুমকির কথা বলছে, সেটি একদিন আমাদেরও বলতে হয়।

কক্সবাজার বাংলাদেশের স্ট্যাটেজিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। কথায় আছে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান। ১৯৭৮ থেকে ২০১৬-২০১৭ সালের আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে যদি স্ট্যাটেজিক গুরুত্বের জায়গা থেকে হ্যান্ডেল করা হতো, তাহলে মিয়ানমার এই সংকটটি আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারত না।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

[email protected]