দুই দশকেও বরিশাল সিটিতে গড়ে ওঠেনি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥

96
দুই দশকেও
Social Share

প্রতিষ্ঠার দুই দশকেও বরিশাল নগরীতে গড়ে ওঠেনি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম চলছে সেই সনাতন পদ্ধতিতেই। নগরীর সড়কের পাশে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা, অসংখ্য খোলা ডাস্টবিনে দিনভর বেশিরভাগই গৃহস্থালির ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।
যানবাহনের চাকায় জড়িয়ে সেই ময়লা ছড়িয়ে পরছে নগরীর সড়কে। দুর্গন্ধ থেকে রেহাই পেতে নগরবাসীকে চলাচল করতে হয় নাক-মুখ চেঁপে। খোলা ট্রাকে বহন করা হয় ময়লা। উন্মুক্তস্থানে ডাম্পিং স্টেশন হওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পরছে পরিবেশ। বৃষ্টি হলে সৃষ্টি হয় দুর্বিষহ পরিস্থিতি। এভাবেই চলছে ২০০২ সালে গঠিত বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ৫৮ বর্গকিলোমিটারের এ সিটিতে প্রায় ছয় লাখ মানুষের বসবাস। নগরীতে প্রতিদিন উৎপন্ন হয় প্রায় ৩০০ টন বর্জ্য। যার একটি অংশ সড়কে জমা হওয়া। বড় সড়কগুলোতে ঝাড়– দিয়ে ময়লা বিভিন্ন জায়গায় জমা করেন সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মীরা। কাজটি চলে রাত নয়টা থেকে পরেরদিন ভোর পর্যন্ত। এসব বর্জ্য সংগ্রহের পর সিটি কর্পোরেশনের ট্রাকে কাউনিয়া পুরানপাড়ার ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে ফেলা হয়। ৩০টি ওয়ার্ডে বিভক্ত এ সিটির বর্জ্য অপসারণে বিসিসির পরিচ্ছন্ন শাখায় স্থায়ী ও অস্থায়ী নিয়োগে রয়েছেন নয় শতাধিক কর্মী। ময়লা পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে সিটি কর্পোরেশনের ১৮টি ট্রাক ও ২২০টি বক্সভ্যান।
সূত্রমতে, নগরীর প্রতিদিনকার বর্জ্য খোলা ট্রাকে নেওয়ায় কিছু আবর্জনা বাতাসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পরে থাকে সড়কে। পুরানপাড়া ডাম্পিং স্টেশনটি জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। উন্মুক্ত ওই ডাম্পিং স্টেশনে বর্জ্য ফেলার কারণে আশপাশের বাসিন্দাদের জীবনও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। পরিবেশবিদরা মনে করছেন, খোলা ডাস্টবিনে আবর্জনা ফেলা, খোলা ট্রাকে পরিবহন ও উন্মুক্তস্থানে ময়লা ফেলার কারণে নগরীর বায়ুদূষণ হচ্ছে।
নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা বলেন, নগরীর অধিকাংশস্থানে ডাস্টবিনের কোনো চিহ্ন নেই। তাই সড়কের পাশে খোলা ডাস্টবিনে (অস্থায়ী) বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। রাস্তার পাশে বর্জ্য পরে থাকায় জনসাধারণের চলাচলে চরম অসুবিধা হচ্ছে। রাতে পরিচ্ছন্নকর্মীরা আবর্জনা সংগ্রহ করে বড় সড়কের পাশে জমা করেন। এরপর খোলা ট্রাকে উন্মুক্ত ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়ার সময় নগরীতে ছড়িয়ে পরছে দুর্গন্ধ।
কাউনিয়া পুরানপাড়ার উন্মুক্ত ডাম্পিং স্টেশনের পাশ্ববর্তী বাসিন্দারা জানান, জনবসতিপূর্ণ এলাকার প্রায় ছয় একর জায়গাজুড়ে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। ২০০৩ সালে ময়লা ফেলার জন্য এ জমিটি অধিগ্রহণ করে সিটি কর্পোরেশন। এরপর ২০০৪ সাল থেকে ৩০টি ওয়ার্ডের ময়লা ফেলা শুরু হলেও আজো গড়ে ওঠেনি আধুনিক ব্যবস্থাপনা। উন্মুক্তভাবে ফেলা বর্জ্য পাশের সাপানিয়া খালের পানিতে গিয়ে মিশছে। সেই খালের পানি কীর্তনখোলায় গিয়ে নদীর পানিও দূষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী রফিকুল আলম বলেন, নগরীর অলিগলি ও সড়কের কমপক্ষে দেড়শ’ স্থানে খোলা ডাস্টবিনে (অস্থায়ী) আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে খোলা ডাস্টবিনে। পরে সেই বর্জ্য খোলা ট্রাকে নেওয়া হচ্ছে উন্মুক্ত ডাম্পিং স্টেশনে। এতে প্রতিদিন নগরীর পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পুরানপাড়ার উন্মুক্ত ডাম্পিং স্টেশনের ধারণক্ষমতা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। সেখানে আধুনিক ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরেছে ডাম্পিং স্টেশনের আশপাশের কয়েক হাজার মানুষ।
পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক লিংকন বায়েন বলেন, সনাতন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আবর্জনামুক্ত নগরী গড়ার তাগিদ দেয়া হলেও তা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের দাগ কেটেছে বলে মনে হয়না।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, নগরীতে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। ময়লা-আবর্জনা যেন নগরবাসীর চোখে না পরে সেজন্য সিটি মেয়র তাদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। সেই লক্ষ্য নিয়ে পরিচ্ছন্নকর্মীরা কাজ করছেন। প্রায় রাতেই নগরীতে ঘুরে ঘুরে মেয়র নিজেই কাজের তদারকি করছেন। তিনি আরও বলেন, একটি সুন্দর ও স্মার্ট নগরী গড়তে সিটি মেয়র নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে তিনি (মেয়র) নানা উদ্যোগও গ্রহণ করেছেন। এরইমধ্যে বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা ময়লা-আবর্জনা রাখার জন্য নগরীর ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে দুটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ১৩টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা বলেন, খোলা ট্রাকে ময়লা-আবর্জনা পরিবহনের অভিযোগ সঠিক নয়; ময়লা পরিবহনের কাজে সিটি কর্পোরেশনের ১৮টি ট্রাকেই ত্রিপল রাখা আছে। পরিবহনের সময় সেই ত্রিপল দিয়ে ময়লা-আবর্জনা ঢেকে নেওয়া হয়। তবে ময়লা-আবর্জনা ভেজা থাকলে ত্রিপল দেওয়া হয়না। এছাড়া নগরীতে খোলা ডাস্টবিনের (অস্থায়ী) পরিবর্তে ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিন স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ ফারুক হোসেন বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পুরো ঢেলে সাজানো হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের মতো বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যেজন্য শহরতলির লামছড়ি এলাকায় ছয় একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হবে। নগরীর সব ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে প্ল্যান্টের মাধ্যমে পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ওই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ২০২১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হয়েছে।