‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’

276
Social Share

এস এম সামছুল আরেফিন

সংগ্রাম যেখানে শেষ যুদ্ধ সেখানে শুরু। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এমনি একটি ধারায় প্রবাহিত। ৪৮, ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭০ বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মাইল ফলক। ’৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র অধ্যায়। চুড়ান্ত এই যুদ্ধে নেমেছিল বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ। ছাত্র, কৃষক, জনতার সাথে সমন্বিত হয়েছিল সেনাবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার এবং সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ। ২৫ মার্চ ’৭১: দিনপঞ্জির এই তারিখ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসাবে চিহ্নিত। স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চের রাত একটি চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের সীমারেখা অতিক্রম করে। সেদিন বঙ্গবন্ধুর একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সমগ্র বাঙালি জাতিকে মুক্তির লক্ষ্যে অস্ত্র তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। শুরু হয়েছিল একটি জনযুদ্ধ।

স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ মার্চ ’৭১ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক সংসদ অধিবেশন মুলতবি ঘোষণার পর থেকে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারা পরিবর্তিত  হতে থাকে। বাংলার জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত সদস্যবৃন্দ এইসময় স্ব-শাসনের আন্দোলনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। একই সময়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তে পূর্ব বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোয় পাকিস্তান সরকারের সকল নির্দেশ অকার্যকর হয়। সরকারি আধা-সরকারি দপ্তরের সকল কর্মকর্তা কর্মচারীগণ আওয়ামী লীগের দলীয় নির্দেশনা পালন শুরু করে। এই সময়ের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত এবং জাতীয় মিলিশিয়া গঠনের মত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার এই আকাঙ্খা দিন দিন প্রবলতর হয়ে দানা বাঁধতে থাকে।

১৯৭০ এর নির্বাচন ছিল বাঙালির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একটি গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুক্তির লক্ষ্যে ভোট দিয়েছিল তাদের মনোনীত রাজনৈতিক দলকে। এই নির্বাচনী ম্যান্ডেটে একটি কথা উল্লিখিত ছিল “বাংলার মানুষের ন্যায্য অধিকার, অন্যথায় স্বাধীনতা”। ১৯৬৬ সালের স্বায়ত্তশাসনের ৬ দফার রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং ১৯৬৯ সালের ১১ দফা ভিত্তিক গড়ে ওঠা পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন বাংলার মানুষের স্বাধীনতার চেতনাকে জাগ্রত করে। রাজনৈতিক আন্দোলনের ভাষায় “স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে” উচ্চারিত হলেও বৃহত্তর যুবসমাজের স্লোগান ছিল “তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা। পিন্ডি না ঢাকা- ঢাকা, ঢাকা”। “বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর”। অতএব ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই সময় থেকেই স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা পাশাপাশি অবস্থান নিয়ে একই সাথে এগিয়ে চলতে থাকে। ১৯৭০ এর নির্বাচনের ফলাফল বাংলার জনগণের এই সুপ্ত আকাঙ্খাকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। এক কথায় বলা যায়, ভাষাভিত্তিক একটি জনগোষ্ঠী স্ব-শাসনের বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মত শক্তি অর্জন করে।

১ মার্চ ’৭১ সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সংসদ অধিবেশন স্থগিতের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠে বাংলার জনপদ। “ইয়াহিয়ার সিদ্ধান্ত মানি না-মানব না” এই ধ্বনিতে বাংলার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতে থাকে। ২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে হরতাল পালিত হয়। ৩ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রলীগ আয়োজিত সভায় বাংলাদেশের প্রস্তাবিত পতাকা প্রদর্শন এবং পরিবেশিত হয় প্রস্তাবিত জাতীয় সংগীত। ৭ মার্চ ’৭১ বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। বলা যায় বাঙালি জাতির জীবনে এটি একটি স্মরণীয় মুহুর্ত। এইদিনে পাকিস্তান সামরিক শাসকের রক্তিম চক্ষু উপেক্ষা করে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে তাঁর নীতি নির্ধারণী বক্তব্য উপস্থাপন করেন। অতি স্বল্প সময়ের এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা যুদ্ধের দিনসমূহের করণীয় বিষয়গুলি সম্বন্ধে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর সেই নির্দেশে অস্ত্র হাতে তুলে নেয় বাংলার আপামর জনগণ। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

৪৮ থেকে ৭১ একটি দীর্ঘ সময়। ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা স্বায়ত্তশাসনের অধিকারের আন্দোলন পরিবর্তিত হয়ে রূপ নেয় এক সশস্ত্র আন্দোলনে তথা মুক্তিযুদ্ধে। বাঙালি জাতির এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ভাষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। ’৭১ এর ৯ মাসের এক সশস্ত্র অধ্যায়ের মধ্যদিয়ে সমগ্র বাঙ্গালি জাতির মধ্যে জেগে ওঠে একটি সংগ্রামী চেতনা। আর এই চেতনার ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠবে আগামী দিনের স্ব-নির্ভর বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আপামর জনগণের এই চিন্তা-চেতনাকে মূল্যায়ন করে যুদ্ধকালীন সময়ে জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, “As we win the war, we must prepare to win the peace. The edifice of ‘Golden Bengal’ must be laid on the ruins left by a cruel war, and every one of her sons and daughters must take part in the exhilarating and humbling task of reconstruction and development. The revolution began by the Bangabandhu will end only when his ideals of democracy, socialism and secularism are fully realised”.

– বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক গবেষক