তীব্র লোডশেডিং, কিছু স্থানে বিদ্যুৎ মিলছে ৫ ঘণ্টা

তীব্র গরমের মধ্যে দেশে ভয়াবহ আকার নিয়েছে লোডশেডিং। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার চিত্র বলছে, অনেক এলাকায় দিনে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে। কোথাও টানা দুই-তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। কিছু এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ ঘণ্টা। কোথাও দিনে ২০-২৫ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে শিশু, বৃদ্ধ ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা। শিক্ষার্থী, অটোরিকশাচালক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিপাকে পড়েছেন। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের লোকসান বাড়ছে। পর্যটনকেন্দ্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

দেশের অন্তত আটটি জেলা ও ১৫টি উপজেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) তথ্যমতে, গতকাল রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৭৩ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৮২১ মেগাওয়াট। এর আগে দুপুর ৩টায় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৮৪ মেগাওয়াট, লোডশেডিং দিতে হয়েছে ২ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট। শনিবার রাত ৩টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৩৫ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করতে হয়েছে ৩ হাজার ১৪ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রধান প্রকৌশলী সমকালকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের ভয়াবহ সংকট শুরুর আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১০০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এখন তা নেমে এসেছে ৭০ কোটি ঘনফুটে। গতকাল বিদ্যুৎ খাতে পেট্রোবাংলা গ্যাস দিয়েছিল ৬৮ কোটি ঘনফুট। তাই চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।

সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থার কথা জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের প্রতিনিধি। সেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদা ৯ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩ মেগাওয়াট। ফলে রাতে ২ ঘণ্টা লোডশেডিং দিয়ে এক ঘণ্টা এবং দিনে ১ ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়াতে প্রায় একই অবস্থা। সেখানে ১৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। দিনে ২০ থেকে ২৫ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ক্ষুব্ধ মানুষ গতকাল সন্ধ্যায় পল্লী বিদ্যুতের সাবস্টেশন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন।

ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুতের আসা-যাওয়া

কয়েকটি এলাকায় লোডশেডিংয়ের সময়ভিত্তিক চিত্র উদ্বেগজনক। যশোরের অভয়নগরে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪ থেকে ১৫ বার বিদ্যুৎ গেছে। রাজবাড়ী শহরে শুধু গতকাল সকাল থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত পাঁচবার বিদ্যুৎ গেছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর আবার এক ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। আর জেলার গোয়ালন্দে দুই ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ না থাকার ঘটনা ঘটেছে।

মুন্সীগঞ্জে গতকাল ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা পরপর সাত দফা লোডশেডিং হয়। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুতে শনিবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ গেছে। এই উপজেলার কোথাও আবার রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত একটানা বিদ্যুৎ ছিল না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে এক ঘণ্টা পরপর এবং গ্রামে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কুয়াকাটায় ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১৫ থেকে ১৬ বার বিদ্যুৎ চলে যায়।

শিল্প ও ব্যবসায় বড় ধাক্কা

বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতির মুখে শিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি লোডশেডিংয়ে উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত। শিল্প মালিকদের দাবি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়ায় প্রতিবার যন্ত্রপাতি পুনরায় চালু করতে সময় নষ্ট হচ্ছে; বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। অনেক কারখানা বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালালেও শতভাগ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর আড়াইহাজার জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার টি এম মেজবাহ উদ্দিন বলেন, কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ চলছে। তাই আপাতত সরবরাহ কম রয়েছে।

পটুয়াখালীর পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁও সংকটে পড়েছে। একাধিক হোটেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দিনে ১৫-১৬ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বেড়েছে; পর্যটকরাও বিরক্ত হয়ে বুকিং বাতিল করছেন।

নাটোর, রাজবাড়ী, বগুড়া, মানিকগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুড়িগ্রামের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের অভাবে করাতকল, ওয়ার্কশপ, চালকল, অনলাইন সেবা ও কম্পিউটারভিত্তিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ইজিবাইক ও অটোরিকশাচালকরা পর্যাপ্ত চার্জ দিতে না পারায় আয় কমে গেছে।

হাসপাতালে বাড়ছে দুর্ভোগ

লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্যসেবাতেও। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর না থাকায় রোগীরা গরমে অস্বস্তিতে আছেন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জেনারেটর দীর্ঘদিন ধরে বিকল। এতে লোডশেডিংয়ের কারণে চিকিৎসা কার্যক্রম মারাত্মক বিঘ্নিত।

দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীরা একই অভিযোগ করেছেন। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট ও বয়স্ক রোগীরা গরমে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন।

শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ

এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। নাটোর, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে একই ধরনের অভিযোগ এসেছে। রাতের সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেককে মোমবাতি বা চার্জলাইটের আলোয় পড়তে হচ্ছে।

তাহিরপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হোসেন আহমদ তৌফিক বলেন, সন্ধ্যা হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে শিশুদের পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে না।
অন্যদিকে আড়াইহাজারের অটোরিকশাচালক মোহসিন মিয়া বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি চার্জ দিতে পারেন না। এক বেলা গাড়ি চালালে আরেক বেলা বসে থাকতে হয়। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎ অর্ধেকেরও কম

বেশির ভাগ বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাই বলছে, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

আড়াইহাজারে ১০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে ৭০-৭৫ মেগাওয়াট। হরিণাকুণ্ডুতে ১২ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ৫-৭ মেগাওয়াট। নাটোরের লালপুরে ২৫ মেগাওয়াটের জায়গায় দেওয়া হচ্ছে ১৪ মেগাওয়াট।

নলছিটিতে ১৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে মিলছে ৬-৭ মেগাওয়াট, অভয়নগরে ৫০ মেগাওয়াটের জায়গায় ৩০-৩৩ মেগাওয়াট এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৪৮ মেগাওয়াটের বিপরীতে মিলছে মাত্র ৯৯ মেগাওয়াট।

বরগুনা, হাকিমপুর, সাটুরিয়া ও হোমনাতেও চাহিদার প্রায় অর্ধেক বা এর চেয়ে কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) মুহাম্মদ সোহরাব আলী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় প্রায় ৬০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তাই লোডশেডিং দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

পূর্বের খবরহঠাৎ বেড়ে গেলো ডলারের দাম, কারণ কী
পরবর্তি খবর১৫ টাকায় ৩০ কেজি চাল পাবেন ৫৫ লাখ কার্ডধারী
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!