তালেবান রাজত্বে বিপন্ন সাংবাদিকতা

335
Social Share

মনজুরুল আহসান বুলবুল:

তারা দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন। তারা বুঝে গিয়েছিলেন এই দেশ আর তাদের নয়। তাদের জন্য অন্ধকার সময় আসছে। তারা পৌঁছেছিলেন কাবুল এয়ারপোর্ট পর্যন্তও। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না । সেখানে তালেবানের চাইতেও বড় শত্রু আই এস-কে’র হামলায় যে শতাধিক মানুষ নিহত হয়; তাদের সঙ্গে লিখা হয় তাদের নাম। এরা হচ্ছেন, রাহা বার্তা সংস্থার রিপোর্টার আলী রেজা আহমাদী এবং জাহান-ই-শেহাত টেলিভিশনের উপস্থাপক নাজমা সাদেকী।

মাসখানেক আগে তালেবান গোষ্ঠী  যখন সারাদেশ ‘জয়’ করে এগোচ্ছিল ; তখন তালেবানের জন্মভূমি  কান্দাহারে  সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের  আলোকচিত্র সাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকী নিহত হন। এ বছর মার্চে জালালাবাদে স্থানীয় রেডিও ও টিভি স্টেশনের সামনে তিনজন নারী সাংবাদিককে  গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের পর ডয়চে ভেলের এক সাংবাদিককে খুঁজতে যায় তালেবরা, না পেয়ে খুন করে তার এক স্বজনকে।

সবশেষ খবর: পানশির অভিযানে তালেবদের টার্গেট হয়ে নিহত হয়েছেন সাংবাদিক ফাহিম দাস্তি। আফগানিস্তানে পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন নানা কারণে। ‘ আফগানিস্তান শাসিত হবে আফগানদের দ্বারাই’  এই ছিল তার অবস্থান।

আফগানিস্তানের দ্বিতীয় পর্যায়ে তালেবান শাসনে কেমন আছে বা কেমন থাকবে গণমাধ্যম  ও সাংবাদিকরা তার কিছুটা চিত্র পাওয়া যায় এই ঘটনাবলী থেকেই।  এই লেখা যখন লিখছি তখনই খবর এলো;  আফগানিস্তানে পাকিস্তান বিরোধী বিক্ষোভ কভার করার সময় ১৪ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে আটক করেছে তালেবান কর্মীরা।

এই চিত্রের জোরালো সমর্থন মিলবে ‘আমাদের রক্ষা করুন’  শিরোনামে আফগান সাংবাদিকদের খোলা চিঠি থেকে। এই খোলা চিঠি পৃথিবীজুড়েই প্রকাশিত হয়েছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংগঠন এবং গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করেন  এমন সংগঠন গুলোর কাছে দেড়শ’ জনেরও বেশি আফগান গণমাধ্যম কর্মী বলছেন,  আমরা আমাদের  জীবন ও আমাদের পরিবারের সদস্যদের রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। এই গুরুত্বপূর্ণ  মুহূর্তে বিশ্বকে আমাদের জীবন এবং পরিবার রক্ষায় ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। বিশ্বকে  অবশ্যই আমাদের কণ্ঠস্বর শুনতে হবে। বিবিসির হয়ে কাজ করেছেন এমন বেশ কয়েকজন আফগান সাংবাদিকও তাদের রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আফগানিস্তানে দৃশ্যত: কোনো স্বাধীন গণমাধ্যমের অস্তিত্ব ছিল না। এ সময় টেলিভিশন, সংগীত এবং সিনেমা নিষিদ্ধ ছিল। নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র গুলো প্রকাশিত হতো, কিন্তু এগুলোতে মানুষের কোন ছবি ছাপানো হতো না।
কুড়ি বছর আগে তালেবানকে  ক্ষমতাচ্যুত করে মার্কিন বাহিনী কাবুলের দখল নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় । এই সময়ে চালু হয় বেসরকারি টেলিভিশন, একাধিক সংবাদ ভিত্তিক চ্যানেলের সম্প্রচার শুরু হয়; এফ এম রেডিও চালু হয়, বিশ্বিবিদ্যালয়গুলো সাংবাদিকতার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা চালু করে, মোবাইল ফোন যোগাযোগের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করে, উন্মুক্ত হয় ডিজিটাল প্রযুক্তি।

সূত্রগুলো জানাচ্ছে : এই বিশ বছরে  ১৭০টিরও বেশি এফএম রেডিও অনুমোদন পায়, কাবুল থেকেই প্রকাশিত হয় ৯ টি সংবাদপত্র,  ৭টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং ৫টি বার্তা সংস্থায় কাজ করেন কয়েক হাজার সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মী। দেশটিতে  প্রায় ৮৬ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, ২২ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে।

কিন্তু  গত ১৫ আগস্ট  তালেবানের হাতে আফগান সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির বদল হলো দ্রুত। তালেবানের আশ্বাস সত্ত্বেও আফগানিস্তানে স্বাধীন গণমাধ্যম সম্ভব হবে না বলে ধারণা  করছেন  সাংবাদিকরা । তাদের এই ধারণা সত্য প্রমাণিত হলো নতুন তালেবান সরকারকে দেখেই; কারণ আগেকার যে তালেবান সরকার গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে দেয়নি, এখনকার নেতৃত্বে তারাই অধিষ্ঠিত।

টোলো নেট ওয়ার্কের একজন প্রাক্তন সাংবাদিক ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেছেন ” আফগানিস্তানের গণমাধ্যমের জন্য একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে”। তিনি বলেন, ” গণমাধ্যম গত ২০ বছরে যে স্বাধীনতা ভোগ করেছিল, তালিবানের অধীনে,তা’ আর থাকছে না। তালিবানের ফিরে আসার পর, আফগান সাংবাদিকদের দুই দশকের অর্জন “রাতারাতি অদৃশ্য হয়ে গেল”।

গত  ২০ বছরে  আফগানিস্তানে গড়ে ওঠা বেসরকারি খাতে গণমাধ্যমের বিকাশে পুরুষ প্রাধান্য থাকলেও নারীদের জায়গা তৈরি হয়েছিল। এই নারী সাংবাদিকদের একজন, পুরস্কার জয়ী সাংবাদিক অনিশা’র আশংকা: তালিবানরা  মুখ বন্ধ করে দেবে সংবাদমাধ্যমের।

কাবুল দখল করার পর প্রথম  সংবাদ সম্মেলনে তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন; মিডিয়া স্বাধীন থাকবে, যদি তারা “ইসলামী নীতি” অনুযায়ী কাজ করে এবং জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে অনুষ্ঠান প্রচার করে। কিন্তু সাংবাদিকতায় ‘ইসলামিক নীতি’ বলতে কী বোঝায়  তা’ স্পষ্ট করা হয়নি। তালেবানের অতীত কর্মকাণ্ড  বলে যে, তারা  মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। তালেবানরা  গণমাধ্যমে কর্মরত মহিলা সাংবাদিকদের কাজে আসা বন্ধ করতে বলেছে, সাংবাদিকদের ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়েছে।  স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বেঁচে থাকার স্বার্থেই তাদের অনুষ্ঠানসূচিতে পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হবে কিনা বলা মুশকিল ।

বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) বলেছে, আফগানিস্তানে সাংবাদিকদের ওপর তালেবান যে হামলা চালাচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে এবং সাংবাদিকদের মুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। সংগঠনটি বলছে, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে যে আফগানিস্তানে কাজ করেন, এমন  সাংবাদিকের বাসায় তল্লাশি চালিয়েছে তালেবানের সদস্যরা। অনেক সাংবাদিক তালেবানের হাত থেকে বাঁচতে লুকিয়ে রয়েছেন।

পশ্চিমা দেশগুলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। তালেবানের বর্তমান মিত্র তালিকায় যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সাথে রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তান। দু:খজনকভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি এসব দেশের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময়ই গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে তালেবান গোষ্ঠী তাদের স্বীকৃতি ও জীবনযাপনের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর সাহায্য পেতে মরিয়া। কাজেই বিশ্বের উচ্চতর সভ্যতার দাবিদার দেশগুলোর এখন চুপ করে থাকার সময় নেই। আফগানিস্তানের সাধারন মানুষকে বাঁচাতে যেমন তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে; তেমনি সেখানে গণমাধ্যম যেন মুক্তভাবে কাজ করতে পারে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

এই মুহূর্তে সবার আগে দরকার; আফগানিস্তানের সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশ্বকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে এখনই। এই বার্তা দিতে হবে: আফগানিস্তানের সাংবাদিকরা একা নয়। জীবন মৃত্যুর মুখে ক্ষণগণনা করছেন আফগানিস্তানের যে সাংবাদিকরা,  তাদের কণ্ঠস্বর বিশ্বকে শুনতেই হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।