তালায় অধিকাংশ জলমহাল প্রতারক চক্রের দখলে : সরকারী রাজস্ব ও সম্পত্তি হুমকির মুখে

51
Social Share

বি. এম. জুলফিকার রায়হান, সাতক্ষীরা, তালা প্রতিনিধি: তালা উপজেলার অধিকাংশ সরকারি জলমহাল প্রতারক, ভূমিদস্যু এবং জালিয়াতি চক্রের নিয়ন্ত্রনে চলে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে প্রতারক ও ভূমিদস্যুরা সরকারি জলমহালগুলো দখলে নিলেও কর্তৃপক্ষ তা উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেনা। বর্তমানে অধিকাংশ জলমহালের জমি ভূমিদস্যুরা কৌশলে নামে বে-নামে বন্দোবাস্ত সহ অবৈধ দখলে নিয়ে সেখানে মাছ চাষ ও বসতঘর নির্মান করছে। এছাড়া খালের মধ্যে ১০/১৫ মিটার পর পর নেট-পাটা দিয়ে পানি প্রবাহ বাঁধার সৃষ্টি সহ দেশীয় মাছ অবাধে নিধন করছে। তাদের এসব অবৈধ কাজে অনেকক্ষেত্রে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মচারীরা সহযোগীতা করছে। এরফলে একদিকে সরকারি সম্পত্তির বেদখল, সরকারের রাজস্ব আদায় ব্যহত এবং দরিদ্র বা হতদরিদ্র মৎস্যজীবীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে পানি নিস্কাশন ব্যহত হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
সূত্রে জানাগেছে, তালা উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে শতাধিক খাল ও জলমহাল রয়েছে। এরমধ্যে পানি নিস্কাশনের জন্য অধিকাংশ খাল উন্মুক্ত রাখা হয় এবং প্রায় অর্ধশত জলমহাল সায়রাত মহলভুক্ত করা হয়। এসব জলমহালের মধ্যে ২০ একর উর্দ্ধের জলমহালগুলো সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক’র দপ্তর এবং ভূমি মন্ত্রনালয় থেকে ইজারা দেয়া হয়। আর, ২০ একরের নিচের আয়তনের জলমহালগুলো উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তর থেকে ইজারা দেয়া হয়। জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা- ২০০৯ অনুযায়ী প্রকৃত মৎস্যজীবীদের সমিতি গঠন পূর্বক সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। পরবর্তীতে নিবন্ধিত সমিতির মাধ্যমে মৎস্যজীবীদের জলামহালের ইজারা গ্রহন করতে হবে।
অভিযোগ উঠেছে- জলমহালের ইজারা প্রদান করার পর প্রশাসন জলমহালের তদারকি করতে অনিহা দেখায়। একারনে অনেক মৎস্যজীবী সমিতি জলমহালের ইজারা নিয়ে বিপাকে পড়েন। তালার কলাগাছি গ্রামের চন্দন সরকার জানান, তার সমিতি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক’র দপ্তর থেকে বাঁশতলা খাল জলমহালের ১৪২৭-২৯ বাংলা সালে ৩ বছরের জন্য ইজারা নেন। এজন্য সরকার বাহাদুরকে বিধি মোতাবেক রাজস্ব, আয়কর, ভ্যাট প্রদান সহ অন্যান্য শর্তাবলী পূরন করেন। ডিসি অফিস থেকে তাকে জলমহালের দখল সংক্রান্ত চিঠি প্রদান করলেও তার সমিতি ১ বছরেও জলমহালের দখল পাননি। তিনি বলেন, ৩২ একর আয়তনের জলমহালের প্রায় সব জমি ভূমিদস্যু ও প্রভাবশালী ঘের মালিকদের দখলে রয়েছে। যে কারনে তার সমিতির দরিদ্র সদস্যরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অনুরুপভাবে দোহার গ্রামের গোলাম রাব্বানী জানান, তাদের গলাভাঙ্গা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লি. তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তর থেকে ১৪২৬-২৮ বাংলা সালের জন্য বিল ঘরালির চক জলমহাল ইজারা নেন। কিন্তু অদ্যবদী তার সমিতি সেই জলমহালের দখল পায়নি। ওই জলমহালের প্রায় সব জমি ভূমিদস্যুদের অবৈধ দখলে রয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার বলা সত্বেও কোনও লাভ হয়নি।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অধিন ইজারাভুক্ত জলমহাল রয়েছে প্রায় অর্ধশত। এরমধ্যে অর্ধেক জলমহাল প্রভাবশালী ঘের মালিক, প্রতারক ও ভূমিদস্যু চক্র কৌশলে দখল করে নিয়েছে। অনেকক্ষেত্রে ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলো প্রতারকদের বিভিন্ন ভাবে সহযোগীতা করছে। এমনকি কতিপয় ভূমি কর্মকর্তা জলমহালগুলোর নাম সায়রাত মহল তালিকা থেকে বাদ দিয়ে অবৈধ দখলের সুযোগ করে দিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের আওতায় ভুক্ত সোনাবাঁধাল খাল জলমহাল, তালতলার খাল জলমহাল, শাহাজাতপুর খাল জলমহাল, বলুয়ার টপ জলমহাল, ঘাটের খাল জলমহাল সহ অন্তত ২০টি জলমহাল ইজারা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এসব জলমহাল এখন প্রতারক ও ভূমিদস্যুদের অবৈধ দখলে রয়েছে। ফলে সরকার বাহাদুর বছরে কমপক্ষে অর্ধ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এবং কোটি কোটি টাকার জনগুরুত্বপূর্ন সম্পত্তির বেদখল হচ্ছে।
সূত্র জানিয়েছে, দলুয়া এলাকার গনেশ বর্মন চোরাবাল্লে জলমহাল সহ একাধিক জলমহাল দখল করে রেখে সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব আত্মসাৎ করছে। উপজেলার শাহাপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি নিমাই সরকার হলেও এই সমিতির কর্নধার হিরানন্দ সরকার নামের একজন সরকারি স্কুল শিক্ষক। হিরানন্দ এবং নিমাই সরকার গং ১৪২৬-১৪২৮ বাংলা সালের জন্য তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তর থেকে হরিহরনগর খাল জলমহাল ইজারা গ্রহনের চেষ্টা করেন। এজন্য নিমাই সরকার গং সাতক্ষীরা জেলা সমবায় কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে নিজেরা নিবন্ধন সনদ তৈরি করে ভূয়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি বৈধ করার চষ্টো করেন। বিষয়টি সেসময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাজিয়া আফরীন সহ জলমহাল ইজারা প্রদান কমিটির সদস্যরা ধরে ফেললে প্রতারক নিমাই সানা কৌশলে ইউএনও অফিস থেকে পালিয়ে যান। এবিষয়ে তৎকালিন তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাজিয়া আফরীন প্রতারনার অভিযোগে শাহাপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লি. এর সভাপতি নিমাই সরকার সহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অজ্ঞাত কারনে আজও সেই মামলা দায়ের করেননি। বর্তমানে এলাকার একাধিক সরকারি জলমহাল শাহাপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লি. নামের কথিত ওই সমিতির নেতাদের অবৈধ দখলে রয়েছে।
মাদরা গ্রামের খোবরাখালী জলমহালটি স্থানীয় হোসেন আলী সহ একটি মহল দখল করে রেখেছে। শাহাজাতপুর জলমহালটি স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা আমিনুর রহমান এর দখলে রয়েছে। এছাড়া সোনাবাঁধাল জলমহাল, তালতলার খাল জলমহাল, দৌলতখালী খাল জলমহাল ও ঘাটের খাল জলমহাল সহ এমন ২০/২৫টি জলমহাল বর্তমানে প্রতারক ও ভূমিদস্যুদের অবৈধ দখলে রেখেছে। এসকল জলমহালগুলো উদ্ধার পূর্বক প্রকৃত মৎস্যজীবীদের মাঝে বিধি মোতাবেক ইজারা প্রদানের জন্য দাবী জানিয়েছে মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিগুলোর সদস্যরা।