ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

Social Share

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ঢাকা সফর করেন। সেই সময় থেকে একটা বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি, আর তা হলো চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের একটি গোষ্ঠী ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বিনষ্ট করার বহুমুখী সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে ভারতের ভিতর থেকেও কেউ কেউ তাল দিচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলার ঢাকা সফর, করোনা ভ্যাকসিন বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে নেবে এবং আরও কিছু ইস্যুকে সামনে এনে ওই একই গোষ্ঠী কর্তৃক সেই পুরনো চেষ্টার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। এর পেছনে তাদের হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে তারা প্রচারণার সূক্ষ্মতার চাদরে আড়াল করার চেষ্টা করে। চীন-বাংলাদেশের মধ্যে যা কিছু হয় সেটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে ভারতের জনগণ ও সংশ্লিষ্টদের মনে হতে পারে এই বোধ হয় বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, ভারত-বাংলাদেশের বিশেষ সম্পর্ক বোধ হয় আর থাকছে না, ইত্যাদি। বাংলাদেশ থেকে এরকম প্রচারণা যারা করছেন তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বোঝা যায়। কিন্তু ভারতের ভিতর থেকে এ ধরনের প্রচারণার কারণ বুঝতে পারি না। ভারত বিশাল গণতান্ত্রিক দেশ এবং উঠতি বড় শক্তি। তাদের আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পরিধি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিচরণ ভূমিও অনেক বড়। ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতরে যারা কাজ করেন তাদের আকার যেমন বড়, তেমনি রয়েছে অনেক বড় সুশীল সমাজ। সেখানে ভিন্নমত অবশ্যম্ভাবী। বাংলাদেশেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, ভিন্নমত থাকতে হবে। কিন্তু হীন উদ্দেশ্যমূলক কিছু কাম্য নয়। কিন্তু সব পেরিয়ে গত ১০-১১ বছরের লিগেসি পেরিয়ে যদি উদাহরণ হয় তাহলে বলতে হবে দুই দেশের প্রজ্ঞাময় ও পরিপক্ব নেতৃত্বের পদক্ষেপে পারস্পরিক সুসম্পর্কের অপরিহার্যতা প্রমাণিত হয়েছে। সম্পর্কের এই অবিচ্ছেদ্যতায় দুই দেশই বিশালভাবে লাভবান হয়েছে, যার ফিরিস্তি এখন অনেক বড়। প্রাচীন চাইনিজ পন্ডিত শনজু বলেছেন, আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অপরিহার্য মৌলিক জায়গাগুলোতে যখন বোঝাপড়া সুদৃঢ় ও অটল থাকে তখন অন্য কোনো ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলে অথবা সমঝোতা না হলেও সেগুলো দুই দেশের সুসম্পর্ককে টলাতে পারে না। তাই ভারত-বাংলাদেশের অপরিহার্য মৌলিক জায়গাগুলোর ওপর একটু চোখ বুলিয়ে নিই। প্রথমে বাংলাদেশের কথায় আসি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১, প্রায় ২৪ বছর বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ ছিল। পুরো সময়টাজুড়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সব কিছু ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। যদিও জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ। ভারতের মতো গণতন্ত্র থাকলে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা চলে আসবে পূর্ব-পাকিস্তানের হাতে। তাই পাকিস্তানি শাসকবর্গ শুরুতেই গণতন্ত্রকে চিরদিনের জন্য সম্পূর্ণ কবর দিয়ে দেয়। তারপর অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে শোষণ, নির্যাতন ও চরম বৈষম্যের সঙ্গে তারা পূর্ব-পাকিস্তানের সম্পদ লুণ্ঠন করতে থাকে। এ কাজ অবাধে করার জন্য পাকিস্তানিরা সামরিক বাহিনী ও ধর্মের আশ্রয় নেয়। ধর্মীয় উত্তেজনা ও ভারত-বিদ্বেষ সব মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য যত পথ ও পন্থা আছে তার সবকিছুই তারা ব্যবহার করে। ইসলাম ধর্ম ও পাকিস্তানকে তারা সমার্থক করে ফেলে। বৈষম্য, শোষণ, অন্যায়, অত্যাচার, লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে হয়ে দাঁড়ায় ইসলাম ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলা। পাকিস্তানের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়ায় হিন্দু ভারতের কাছ থেকে কাশ্মীরকে ছিনিয়ে আনতে হবে এবং দিল্লিতে ইসলামের বিজয় নিশান উড়াতে হবে। তার জন্য পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে থাকতে হবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে। সুতরাং পাকিস্তান মিলিটারি ও মোল্লাদের মধ্যে একটা চরম সুবিধাবাদী আঁতাত তৈরি হয়, যে কথা হুসেন হাক্কানি তার লিখিত- ‘পাকিস্তান বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি’ গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। মিলিটারি-মোল্লাদের উল্লিখিত আঁতাতের সঙ্গে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব-পাকিস্তানের সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদের বড় অংশ একটা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এবং জনগণের মধ্যে থেকেও একটা লঘিষ্ঠ অংশ ধর্মীয় উত্তেজনায় মেতে ওঠে। এরা পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষ হয়েও নিজ দেশের মানুষের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে। ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা এবং শোষণ, বৈষম্য, লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে যখনই বাঙালিরা সোচ্চার হয়েছে, আন্দোলন, সংগ্রাম করতে চেয়েছে তখনই সম্মিলিতভাবে উল্লিখিত গোষ্ঠীগুলো প্রপাগান্ডা চালিয়েছে এই বলে যে, এরা মুসলমান নয়, ইসলামের শত্রু এবং হিন্দু ভারতের দালাল, পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে চায়। তাদের কথার মধ্যে মানুষের ভাগ্য উন্ন্য়নের কোনো বিষয় থাকত না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই সর্বপ্রথম এবং একমাত্র নেতা যিনি উপলব্ধি করেন বৃহত্তর জনগণের ভাগ্য উন্নয়ন করতে হলে রাষ্ট্রকে উদার গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক রাষ্ট্র হতে হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বুঝলেন পাকিস্তানে এটা আর সম্ভব নয়। তাই তিনি ষাটের দশকের শুরুতে সিদ্ধান্ত নিলেন দেশ স্বাধীন হলে তার মৌলিক দর্শন হবে উদার গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, যাতে এদেশের মানুষকে যেন আর কোনোদিন উপরোক্ত অভিশাপের মধ্যে পড়তে না হয়। এবার ভারতের কথা একটু বলে নিতে হবে। ভারত ভাগের বাস্তবতা মেনে নিয়ে মহাত্মা গান্ধী ও জওহর লাল নেহরু উপলব্ধি করেন, প্রায় দুইশ বছরের ব্রিটিশ শোষণের শিকার বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশকে দরিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে উদার গণতান্ত্রিক ধর্ম-বর্ণ বিদ্বেষমুক্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং তার সঙ্গে ভারত-পাকিস্তানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান একান্ত প্রয়োজন। তাই নেহরু থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ভারতের সব সরকারপ্রধান পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে এক্সট্রা মাইল হেঁটেছেন। কিন্তু সব সময়ই তার ফল উল্টো হয়েছে। কারণ, এর জন্য প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পাকিস্তান নেই। মোল্লা-মিলিটারির আঁতাত পাকিস্তানকে কখনোই সেই রকম রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ফিরে যেতে দেবে না, কারণ তাহলে মিলিটারি আর মোল্লাদের কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তাতে পাকিস্তানের বৃহত্তর জনগণের কী দশা হয়েছে, সেটি বোঝার জন্য এখন পাকিস্তানের সার্বিক চিত্রটির দিকে তাকালেই উপলব্ধি করা যায়। অন্যদিকে তারা পারমাণবিক অস্ত্রসহ বিশাল সেনাবাহিনী পুষছে। ১৯৪৮, ১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালের তিনটি যুদ্ধেরই প্রেক্ষাপট পাকিস্তান তৈরি করেছে এবং তারাই প্রথম যুদ্ধ শুরু করেছে। সুতরাং পাকিস্তান সাতচল্লিশের চেতনা ও মোল্লা-মিলিটারির প্রাধান্যের জায়গা থেকে অদূর ভবিষ্যতে বের হওয়া এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফিরে আসি বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা-দর্শনের কথায়। ষাটের দশকের শুরুতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের সহযোগিতার বিষয়ে জওহর লাল নেহরুকে চিঠি লেখেন এবং তারপর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার হওয়ার আগেই লন্ডনে বসে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বোঝাপড়া করে সব চূড়ান্ত করে ফেলেন। যার সবকিছুর প্রত্যক্ষ প্রমাণ ও প্রতিফলন একাত্তর সালে দেখা গেছে। ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু দুজনেই উপলব্ধি করেছেন এবং সম্মত হয়েছেন বাংলাদেশ স্বাধীন হলে উভয় দেশ যদি উদার গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, আধুনিক দর্শনের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় থাকে তাহলে দুই দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন যেমন সম্ভব হবে, তেমনি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় থাকবে এবং উপরন্তু সেটি আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশ আলোচ্য দর্শনের রাষ্ট্র হলে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্যে ভারত বিশাল সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনসহ সার্বিকভাবে ভারতের ভৌগোলিক অখ-তার ওপর পাকিস্তানের কারণে যে হুমকি রয়েছে তারও অবসান ঘটবে। বাংলাদেশের সহায়তায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর উন্নয়নের পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামল পর্যন্ত ভারতের এ লক্ষ্য অর্জিত হয় এবং বহাল থাকে, যার উল্লেখ পাওয়া যায় ‘র’-এর সাবেক উপপ্রধান বি. রমনের লেখা ‘দ্য কাউবয়েজ অব র’ গ্রন্থের ৩৭ পৃষ্ঠায়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে উদার গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থার জায়গা থেকে সরিয়ে এনে পাকিস্তানি আদর্শের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নিয়ে যায়। তারপর ১৫ বছর দুই সামরিক শাসক, ১৯৯১-১৯৯৬ সালে বিএনপি এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে জামায়াত-বিএনপি শাসনামলে ওইসব জায়গায় ভারতের জন্য কতখানি অস্বস্তিকর ছিল তা এখন ভারত-বাংলাদেশের সবাই জানেন। ভারতের অনেকই তখন আফসোস করেছেন, পূর্বে এক পাকিস্তান থেকে ভারতের পূর্ব-পশ্চিমে এখন দুই পাকিস্তান। সেই সময়গুলোতে বাংলাদেশে আবার চরম ধর্মীয় উত্তেজনা ফিরে আসে এবং মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের এজেন্ডা পাকিস্তানের মতো মুখ থুবড়ে পড়ে। হুসেন হাক্কানি ‘পাকিস্তান বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি’ গ্রন্থের ৯৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৭১ সালের অব্যবহিত পর জুলফিকার আলি ভুট্টো এক আমেরিকান ডেলিগেশনের কাছে বলেছিলেন, মিসেস ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করে এ অঞ্চলে আরও অনেক বাংলাদেশ সৃষ্টির পথকে খুলে দিয়েছেন। পাকিস্তান এখনো এ জায়গায় বহাল আছে, যার বহু প্রমাণ অহরহই দেখা যায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবার সেই মূলে ফেরার চেষ্টার মধ্য দিয়ে আদর্শ ও দর্শনগত জায়গায় দুই দেশ আবার এক জায়গায় এসেছে বলেই বিগত ১০-১১ বছরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু জীবন ফিরে পায়নি উচ্চতার নতুন মাত্রায় উঠেছে। তাতে দুই দেশই যেভাবে লাভবান হয়েছে তার তালিকা কম লম্বা নয়। সুতরাং প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্রের মৌলিক রাষ্ট্র দর্শন ও জাতীয় স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের জায়গা যদি ঠিক থাকে তাহলে উভয় দেশ ও দেশের মানুষ কী রকম উপকৃত হয় বিশ্বের কাছে তার উদাহরণ এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। সুতরাং লেখার শুরুতে যেমনটি বলেছি মৌলিক জায়গা অক্ষুণœ থাকলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কোনো কোনো ইস্যুতে দুই দেশের মতপার্থক্য এবং ভিন্ন অবস্থান থাকলেও তাতে সম্পর্কের কোনো হেরফের হয় না। বাংলাদেশ যদি দারিদ্র্যমুক্ত হয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ হয় তাহলে উগ্রবাদ ও ধর্মান্ধতার কবলে আর বাংলাদেশ পড়বে না। তাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, রাজনীতি স্থিতিশীল হবে এবং ভারতের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি সৃষ্টি করবে না, যেটি বিগত সময়ে দেখা গেছে। দরিদ্রতাই বড় শত্রু। সুতরাং বাংলাদেশের দারিদ্র্যমুক্তকরণ লক্ষ্য অর্জন করার জন্যই ভারতসহ চীন, জাপান, ইউরোপ ও আমেরিকার বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, সহযোগিতা ও সমর্থন আবশ্যক। চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্ব প্রতিযোগিতা আছে। তারপরও আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় চীন-ভারত, দুই দেশের কেউ কি বলতে পারে তাদের পারস্পরিক সহাবস্থান অপরিহার্য নয়। সুতরাং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি, বিনিয়োগ বা সংযোগ কোনোটাই ভারত-বাংলাদেশের বিশেষ সম্পর্কের অন্তরায় হতে পারে না। এ বাস্তবতা দুই দেশের প্রাজ্ঞজনরাই বোঝেন। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে কীভাবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না পাকিস্তান তাদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে, একাত্তরের ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতিপূরণ এবং একাত্তরে রাষ্ট্রের গচ্ছিত সম্পদের ন্যায্য হিস্যা পরিশোধ না করছে। কিন্তু ওয়ার্কিং রিলেশন রয়েছে, তাই মাঝে মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা হতেই পারে। তাতে কিন্তু চিড়া ভিজবে না। অন্যদিকে সম্প্রতি এই করোনার বাধা নিষেধের মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলার ঢাকায় ছুটে আসা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক প্রমাণ করে দুই দেশ পরস্পরকে কতখানি গুরুত্ব দেয়। এটা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি ও অলীক গল্প তৈরির সুযোগ নেই। শুধু করোনার ভ্যাকসিন বিষয়ে আলোচনার জন্য শ্রিংলার ঢাকায় আসার প্রয়োজন নেই। হতে পারে এটা সুন্দর একটা কভার আপ। নিশ্চয়ই অর্থনৈতিক স্ট্র্যাটেজিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়াদি হয়তো ছিল, যার সবকিছু প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ নেই। আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে সব যুগে, সব দেশে কোনো কোনো ক্ষেত্রে টানাপড়েন থাকে এটা নতুন ঘটনা নয়। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের একাধিক সাবেক হাইকমিশনার মন্তব্য করেছেন, গত ১০ বছরে সম্পর্কের ঐতিহাসিক সম্প্রসারণই শুধু ঘটেনি, নতুন নতুন ক্ষেত্রে তা আরও প্রশস্ত হয়েছে। এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে সহযোগিতা হচ্ছে না। সুতরাং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। তাই দুই দেশের স্বার্থেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখনো অবিচ্ছেদ্য আছে এবং থাকতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

[email protected]