ডিজিটাল বাংলাদেশ: রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দূরদর্শিতার মাইলফলক।

Social Share
আমার ছোটবোনের ছোট মেয়ে আয়রা নার্সারিতে পড়ে। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ। কম্পিউটার ব্যবহার করতে শিখেনি, মায়ের সহযোগীতায় বাসায় বসে কম্পিউটারে অনলাইনে সে ক্লাস করে।
আমার ছোট মেয়ে সাবেকুন বিন্তে হোসেন দশম শ্রেণির ছাত্রী, সকাল আটটায় কম্পিউটার নিয়ে অনলাইনে নিয়মিত ক্লাসে করে। কম্পিউটার-এর ক্যামেরা অন রাখতে হবে, না হয় স্কুল থেকে তাকে ব্লক করে দেওয়া হবে। অর্থ্যাৎ ক্লাসে অনিয়মিত বলে চিহ্নিত হবে।
বিশ্বব্যাপী বিরাজমান করোনা মহামারীর (কোভিড-১৯) সংক্রমণ রোধে গত মার্চ ২০২০ থেকে বাংলা দেশের সকল অফিস-আদালত, ব্যবসা-বানিজ্য ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। করোনার সংক্রমণের প্রকোপ বিবেচনা করে সাধারণ ছুটি কয়েকবার বৃদ্ধি করা হয়েছিল। সম্প্রতি দেশের অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বানিজ্য প্রতিষ্ঠান এর কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ ছুটি এখনও বহাল রয়েছে।
আগস্ট শোকের মাস। বাঙালি জাতির জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায় রয়েছে এ মাসে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ আমরা হারিয়েছি জাতিরপিতাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে বাঙালি জাতি মাসব্যাসী শোক পালন করে। মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিবেচনায় এবারের শোকের মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি আলোচনা সভায় সম্পৃক্ত হয়েছেন।
শোকদিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এসোসিয়েশন আয়োজিত দোয়া ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠানে স্থান সংকুলান বিবেচনায় স্বাস্থ্য বিধিমতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা কাউন্সিল  অডিটরিয়ামে ১০০ জন সদস্যকে উপস্থিত হওয়ার জন্য অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু চাহিদা ও আগ্রহ বিবেচনায় নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৫০০ জনকে এই অনুষ্ঠানে অনলাইনে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল।
সরকারি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারী অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে ‘সঙ্গনিরোধ ছুটি পালন করছেন। এমনি পরিস্থিতিতে ডিজিটাল বাংলাদেশ’এর উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেই চলছে অফিসের দৈনন্দিন কার্যক্রম (এখন প্রায় স্বাভাবিক)।
বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ধ্যান-ধারনা, চিন্তা-ভাবনা ও প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র সন্নিবেশিত করে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা’র সহযোগী অধ্যাপক ড. ডি. এম. ফিরোজ শাহ-র গবেষণামূলক বই ‘বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন’ ২০২০ সালের বই মেলায় প্রকাশিত হয়। বইটি শিক্ষাসচিব (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ) জনাব মো. মাহবুব হোসেনকে উপহার হিসেবে প্রদানের জন্য, বইটির লেখকসহ, শিক্ষামন্ত্রণালয় সচিব মহোদয়ের কক্ষে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী দূরত্ব বজায় রেখে আমরা বসে আছি। সচিব মহোদয় ব্যস্ত। অষ্টম শ্রেণিতে পাঠ্য ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের একটি অধ্যায়ে, বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িত এমন একজন লোকের নাম বারবার উল্লেখ করে ঐ বিতর্কিত লোককে আলোকিত করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। শিক্ষা সচিব মহোদয়, যিনি ছাত্রজীবনে একটি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন, তিনি ইতিহাস বিকৃতির এই ষড়যন্ত্রের কারণ উদঘাটন করার জন্য মাননীয় মন্ত্রী, মন্ত্রনালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের (এনসিটিবি) কর্মকর্তাদের সাথে কম্পিউটার এর পর্দায় জুম/গুগল এ্যপস দিয়ে মিটিং করছেন, পরামর্শ শুনছেন ও মন্ত্রীর প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। মিটিং এর ফাঁকে ফাঁকেই তিনি ভিজিটরের কথা শুনছেন, সমাধান দিচ্ছেন, জরুরি ফাইলে স্বাক্ষরও করছেন। এত কাজের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এর কোনই ব্যাঘাত ঘটছে না। এখানেই ডিজিটাল বাংলাদেশ-এর সফলতা।
মহামারি করোনায় সারা বিশ্ব জুড়ে বেড়েছে প্রযুক্তির গুরুত্ব ও নির্ভরতা। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। সংকটের শুরু থেকেই প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। এ সময়ে অনেক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে প্রযুক্তি যেন বিকল্প মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফলে বৈশ্বিক এই বিপর্যয়ের মধ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তি সৃষ্টিকর্তার এক আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে অনলাইনে পাঠদান থেকে শুরু করে হোম অফিস কিংবা ব্যাংকিং- সবই চলছে যোগাযোগ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে। সেই সাথে খাবার-দাবার অর্ডার, দৈনন্দিন পণ্য ক্রয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ ইত্যাদি সকল কাজেই করোনাকালীন প্রযুক্তির উৎকর্ষতা বেড়েছে।
উপরে উল্লিখিত সকল কার্যক্রম সম্ভব হয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানের মাধ্যমে। একুশ শতকের বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১২ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। যেখানে বলা হয়েছে, ‘২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’এ পরিণত হবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের বছরে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণই ছিল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান বিষয়।
ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণাটি জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ (Knowledge based society)-কে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বলতে বুঝায় ICT (Information and Communication Technology) বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে  e-governance, e-banking, e-commerce, e-learning, e-agriculture, e-health, ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত করে জনগনকে সেবা প্রদান করা। Digital Bangladesh for Good governance, 2010 এ বলা হয়েছে- `The current government’s Digital Bangladesh by 2021 vision proposes to mainstream ICT’s as a pro-poor tool to eradicate poverty, establish good governance, ensure social equity through quality education, healthcare and law enforcement for all, and prepare the people for climate change.’
ডিজিটাল বাংলাদেশ একটি  স্বপ্ন, একটি প্রত্যয় যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত   বিষয়। একটি উন্নত দেশ, সমৃদ্ধ ডিজিটাল সমাজ, একটি ডিজিটাল যুগের জনগোষ্ঠী, রূপান্তরিত উৎপাদন ব্যবস্থা, নতুন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি-সব মিলিয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্নই দেখিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
২০২০ সালের করোনা মহামারীতে প্রমানিত হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পরিকল্পনা ছিল কতটা সূদুর প্রসারী। সারা বিশ্বে করোনা মহামারী মোকাবিলায় করণীয় বিষয়ে বিশ্বনেতাদের সাথে যোগাযোগ, সার্কভুক্ত দেশসমূহে করোনা মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে সার্ক নেতাদের virtual meeting অনুষ্ঠিত হয়েছে। সারাবিশ্বে অর্থনীতি মন্দাভাব দেখা দিলেও প্রযুক্তিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নয়নের ধারা বহাল রাখা হয়েছে। কোভিড-১৯ বা করোনা সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) অনুমান করে বলেছিল: “করোনা প্রতিরোধে লকডাউনের কারণে শুধু শিল্প নয়, কৃষিতেও উৎপাদন কম হবে, ফলে বিশ্বে ৩ কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে।‘ সরকারের সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ায় ডব্লিউএফপি -এর ভবিষ্যত বানী ভুল প্রমাণিত করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘোষণা করেছেন-, “করোনা, বন্যা, যাই হোক না কেন, বাংলাদেশে খাদ্য সংকট হবে না’। তাঁর কথাই এ পর্যন্ত সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
২০০৮ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা, স্বপ্ন ও ঘোষণাকে সমাজের সুশীল নামধারী কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সেদিন কটাক্ষ করেছিল। সমালোচনামুখর সেইসব কুশীলবদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যকে পেছনে ফেলে বিদ্যুতের ঘাটতিকে জয় ও উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরের ফলে বাংলাদেশ আজ নিম্ম মধ্যবিত্ত দেশের তালিকায় জায়গা করে নিতে সমর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিজন নাগরিকের মাথাপিছু  আয় দুই হাজার ডলারের বেশি। তাই আজ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরের সর্বত্র ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবিধাভোগী আপামর মানুষের দৃষ্টিতে দৃশ্যমান হচ্ছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা। দুরদৃষ্টসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক (Visionary Stateman) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ, একুশ শতকে আর স্বপ্ন নয়-এক মোহনীয় বাস্তব।