ডিজিটাল কমার্সের অন্তরালে করা যাবে না এমএলএম: টিপু মুনশি

63
Social Share

ডিজিটাল কমার্সের অন্তরালে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম ব্যবসা করা যাবে না। এ প্ল্যাটফর্মের ছত্রছায়ায় যেকোনো ধরনের অবৈধ ব্যবসা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে পরিগণিত হবে বলে হুশিয়ারী দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

মঙ্গলবার (৬ জুলাই) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি ‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা-২০২১’ জারির বিষয়ে অবহিতকরণ সভায় সভাপতির করে বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেছেন, ডিজিটাল ব্যবসায় শুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১’ প্রনয়ন করা হয়েছে। গত ৪ জুলাই তা সরকারের গেজেট আকারে প্রকাশত হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এবং অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে এ ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। এতে মার্কেটপ্লেসে বিক্রয়যোগ্য পণ্য বা সেবার তথ্য প্রদর্শন ও ক্রয়-বিক্রয়, সাধারণ নিয়ম, বিক্রয়ের জন্য উপস্থাপন, পণ্য ডেলিভারি, অগ্রিম পরিশোধিত মূল্য সমন্বয় ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। যা গ্রাহকদের জন্য সহায়ক হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল কমার্সের আওতায় নেশা সামগ্রী, বিস্ফোরক দ্রব্য বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ সামগ্রী বা সেবা ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে না। জুয়া বা অনলাইন বেটিং বা অনলাইন গ্যাম্বলিংয়ের আয়োজন বা অংশগ্রহণ করা যাবে না। ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতীত কোনো ধরনের লটারির আয়োজন করতে পারবে না। মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) বা নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা যাবে না।’

তিনি বলেন, পণ্য বিক্রেতা বা তার সাথে চুক্তিবদ্ধ ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ‘স্টকে নেই’ কথাটি স্পষ্টভাবে পণ্যের পাশে লিপিবদ্ধ করেতে হবে। নিত্যপণ্য ও খাদ্য সামগ্রীর বা সংখ্যায় প্রকাশ করা যায় না এমন পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে স্টকের পরিমানের পরিবর্তে ‘এভেইলেবল ফর ডেলিভারি’ কথাটি লেখা থাকতে হবে। অগ্রিম মূল্য আদায়ের ক্ষেত্রে প্রদর্শিত পণ্য অবশ্যই দেশের ভিতরে ‘রেডি টু শিপ’ পর্যায়ে থাকতে হবে। সম্পূর্ণ মূল্য গ্রহণের পরবর্তি ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ডেলিভারি পারসন বা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করার মত অবস্থায় নেই এমন পণ্যের ক্ষেত্রে পণ্যমূল্যের ১০ শতাংশের বেশি অগ্রিম গ্রহণ করা যাবে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত এসক্রো সার্ভিস এর মাধ্যমে ১০০ ভাগ পর্যন্ত অগ্রিম গ্রহণ করা যাবে। বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শিত পণ্যের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধের পরবর্তি ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পণ্য ডেলিভারিম্যান বা ডেলিভারি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে হবে এবং ক্রেতাকে তা টেলিফোন, ই-মেইল বা এসএমএস এর মাধ্যমে জানাতে হবে।

টিপু মুনশি বলেন, পণ্যের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করা হয়ে থাকলে ক্রেতা ও বিক্রেতা একই শহরে অবস্থান করলে ক্রয়াদেশ গ্রহণের পরবর্তি সর্বোচ্চ পাঁচ দিন এবং ভিন্ন শহরে বা গ্রামে অবস্থিত হলে সর্বোচ্চ দশ দিনের মধ্যে পণ্য ডেলিভারি দিতে হবে। পচনশীল দ্রব্য দ্রুততম সময়ে ডেলিভারি দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ডেলিভারির সময় যাতে পণ্যের কোনো ক্ষতি না হয় সেজন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। যেকোনো ধরনের ঘোষিত ডিসকাউন্ট বিক্রয় কার্যক্রমের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করতে হবে। ক্যাশব্যাক অফার মূল্য পরিশোধের পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর হতে হবে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন পরিষদ এর মহাপরিচালক জনাব বাবলু কুমার সাহা বলেন, ভোক্তাদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন পরিষদ। ইতোমধ্যে আমরা ই-ক্যাবের সাথে যৌথসভা করেছি। এই নির্দেশিকা বাস্তবায়ন এর ক্ষেত্রে সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে। পারষ্পরিক সহযোগিতার এর মাধ্যমে এটি প্রতিপালন করলে এর সুফল সকলের কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন এর চেয়ারম্যান মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, ইতোপূর্বে বিভিন্ন অস্বাভাবিক অফারের ক্ষেত্রেও আমরা একটা নির্দেশনা দিয়েছি। ডিজিটাল কমার্স সেক্টরকে এই নির্দেশনা মেনে চলার জন্য আহবান জানাব। আমরা আশা করি প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত দিয়ে এসোসিয়েশন এবং ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো কমিশনকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।

আয়োজনে বেসিস সভাপতি আলমাস কবীর বলেন, যারা ব্যবসা করছে তাদের কিছুটা স্বাধীনতা দিতে হবে। ব্যবসা পরিচালনা করতে গেলে পাদেরকে মার্কেটিং গেম খেলতেই পারে। আমাদের খেয়াল রাখতে তারা যেন আমাদের আইন না ভাঙ্গে। কারন হাত পা বেধে দিয়ে কাউকে সাতার কাটতে বললে কিন্তু সে পারবে না, তেমনি ব্যবসায়ীরাও আগাতে পারবে না।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে ফেসবুককে কাজে লাগিয়ে হাতের কাজ (হ্যান্ডি ক্রাফট), বাসায় রান্না করে গৃহবধু বা তরুনীরা এফ কমার্স ব্যবসা পরিচালনা শুরু করেছে। এতে করে তারা নিজেরাইঅর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এখনি তাদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা যাবে না। এই ধরণের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রতি নমনীয় হতে এবং ফেসবুক ভিত্তিক ব্যবসার (এফ-কমার্সের) পরিসর বাড়াতে যাতে বানিজ্য মন্ত্রনালয়ের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি।

ই-ক্যাবের সভাপতি শমী কায়সার বলেন বলেন, আমরা ই-ক্যাব থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য ই-ক্যাবের সদস্যদের মতামত সংকলিত করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পেশ করেছি। এখানে যাতে ক্রেতাদের অধিকার রক্ষা পায় এবং বিক্রেতাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় দুটো বিষয় রাখার চেষ্টা করেছি।

ই-ক্যাব সভাপতি এই নির্দেশিকা দ্রুত চূড়ান্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ঠ সকলকে ধন্যবাদ জানান। বাস্তবতার আলোকে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় সংশোধণের জন্য ই-ক্যাব সরকারের সাথে কাজ করবে বলেও জানান তিনি।

ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রেতাদের উৎকন্ঠা এবং সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের কারণে এই নির্দেশিকার প্রাসঙ্গিকতা সামনে চলে এসেছে। এই নীতিমালার প্রস্তাব ই-ক্যাব ৩ বছর আগে প্রস্তাব করলেও বিগত ১ বছর ধরে এটি প্রণয়নের জন্য ই-ক্যাব থেকে পর্যায়ক্রমে সরকারী সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরকে অনুরোধ এবং সহযোগিতা করে আসছে। তারই ফল এই নীতিমালা। এর ফলে বিদ্যমান সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে।

বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক, ডব্লিউটিও সেল ও অতিরিক্ত সচিব হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ ব্যংকের মহাব্যবস্থাপক, সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি, বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এ সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।