ডয়েসে ভেলে রিপোর্ট : আম্বেদকরের ১৩৫তম জন্মবার্ষিকীতে ভারতে দলিতদের বাস্তবতা

 

 

ভিনিউজ : ড. বি আর আম্বেদকর দারিদ্র্যকে জয় করে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন যুক্তরাজ্যে গিয়ে৷ পরবর্তীতে হয়েছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম আইন ও বিচার মন্ত্রী৷

মুম্বাইয়ে জন্ম নেয়া এই সমাজ সংস্কারক ছিলেন বর্ণপ্রথার কঠোর সমালোচক৷ দলিতদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে দেশব্যাপী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন৷ ১৯৫০ সালে গৃহীত ভারতের সংবিধানের খসড়া তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার৷ সংবিধানে অস্পৃশ্যতাকে বেআইনি ঘোষণা করাতেও অবদান ছিল তার৷

ভারতে তথাকথিত বর্ণপ্রথার সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান দলিতদের৷ দীর্ঘকাল ‘অশুচি’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে তাদের৷ ফলে ব্যাপক সামাজিক বঞ্চনার শিকার হয়েছেন তারা৷ সংবিধানে অস্পৃশ্যতাকে বেআইনি ঘোষণা করা হলেও আধুনিক ভারতে বৈষম্য এখনও বিদ্যমান৷ সাম্প্রতিক সময়েও দেখা গেছে বর্ণভিত্তিক সহিংসতা, বারবার আক্রান্ত হয়েছেন দলিতরা৷

প্রতি বছরের মতো এবারও এপ্রিল এসেছে ‘দলিত ইতিহাসের মাস’ হয়ে৷ এ বছর এ উপলক্ষ্যে ড. বি আর আম্বেদকরের পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের ঊনবিংশ শতাব্দীর বর্ণবাদবিরোধী সংস্কারক জ্যোতিরাও ফুলের স্মৃতির প্রতিও শ্রদ্ধা জানানো হয়৷

ভারতে দলিত সম্প্রদায় আইনিভাবে স্বীকৃত তফসিলি জাতি (এসসি)-র অন্তর্ভুক্ত৷ ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ১৬.৬% দলিত৷ ফলে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে কোটার অধিকার তাদের জন্য সংবিধান-স্বীকৃত৷ তবে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি)-র দলিত গবেষক দক্ষিতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ডয়চে ভেলেকে বলেন, তিনি যে দলিত সমাজ তা খুব অল্প বয়সেই তাকে বুঝিয়ে দেয়৷ বয়স যখন মাত্র ১২, তখনই সহপাঠীরা অনায়াসে তাকে ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে উল্লেখ করতো, ‘‘তখন থেকেই জানি যে, আমি তফসিলি জাতিভুক্ত৷ তবে এর অর্থ কী তা তখন জানতাম না৷”

দক্ষিতা আরো বলেন, ‘‘আসলে জাতিভেদ প্রথা প্রতিদিন আমার চারপাশে ছিল৷” শৈশবের আরেকটি ঘটনার কথা স্মরণ করলেন দক্ষিতা৷ জলের কলসহ সকলের জন্ম উন্মুক্ত জায়গাগুলো ব্যবহারেও তার পরিবারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সীমানা এঁকে দিয়েছিল উচ্চবর্ণের জমিদার৷ সেই সময়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে দক্ষিতা বলেন, ‘‘আমার ছোট ভাইটা তখন একেবারে শিশু৷ ও হামাগুড়ি দিয়ে সেই রেখাটি পার হয়েছিল৷ এ কারণে আমার পরিবারকে অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছিল৷”

দক্ষিতা মনে করেন, সমাজে শিক্ষার হার বাড়লেও, সমাজে কিছুটা পরিবর্তন এলেও এই ধরনের বিষয় একেবারে অদৃশ্য হয়ে যায়নি, সেগুলো কেবল রূপ বদলেছে৷

তার মতে, ‘‘শহরে এবং শিক্ষাঙ্গনে বৈষম্য আরো বেশি প্রচ্ছন্ন৷”

দিল্লির স্বনামধন্য এক কলেজে সহপাঠীরা তার পরীক্ষার ফলাফল দেখছিল৷ ফলাফল দেখতে গিয়ে তার জাতি সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যায় এবং তারপর নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়৷ ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন পাবলিক ল অ্যান্ড জুরিসপ্রুডেন্স-এর অধ্যাপক ও নির্বাহী পরিচালক ড. সুমিত বৌধ মনে করেন, বর্তমান সময়ের অনেক কিছুই ড. বি আর আম্বেদকরকে ‘‘অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করতো৷ তিনি বলেন, ‘‘আসলে সেই সময় এবং বর্তমানের মধ্যেকার ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করা কঠিন

দক্ষিতা বলেন, ভারতের সংবিধান বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও সামাজিক স্তরবিন্যাস ঠিকই সূক্ষ্মভাবে কাজ করে চলেছে৷
তিনি লক্ষ্য করেছেন, অভিজাত প্রতিষ্ঠানগুলোতে জাতিগত বৈষম্য নিয়ে আলোচনা খুব সীমিত পর্যায়ে হয় বা এ বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়৷

সুপরিচিত এই গবেষক জানান, ভারতে পূর্ববর্তী প্রজন্মের তুলনায়, বিশেষ করে শিক্ষার সুযোগ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও এই অগ্রগতিকে বড় মনে করা থেকে সবসময় তিনি বিরত থাকেন৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি বলবো না যে খুব বেশি উন্নতি হয়েছে… বৈষম্য এখনও আছে৷”

ভারতে বর্ণপ্রথা এখন কী অবস্থায় আছে সে সম্পর্কে আরো জানতে হরিয়ানার ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন পাবলিক ল অ্যান্ড জুরিসপ্রুডেন্স-এর অধ্যাপক ও নির্বাহী পরিচালক ড. সুমিত বৌধের সঙ্গে কথা বলেছে ডয়চে ভেলে৷ অধ্যাপক ড. সুমিত বৌধ নিজেও দলিত সম্প্রদায়ের৷ তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল ড. বি আর আম্বেদকর যদি আজকের ভারতকে, বিশেষ করে ভারতে আইন যেভাবে বর্ণপ্রথাকে মোকাবিলা করেছে তা দেখতেন, তাহলে কোন বিষয় নিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি হতাশ হতেন?

ড. সুমিত বৌধ জানান, ‘‘এ নিয়ে বেশি চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ, বি আর আম্বেদকর প্রথম দিকেই তার হতাশা প্রকাশ করেছিলেন, বিশেষত ১৯৫১ সালে (ভারতের) আইনমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করার মাধ্যমে৷”
‘‘সেই মুহূর্তটি অন্তত দুটি দিক থেকে শিক্ষণীয়৷ প্রথমত, তখন যাদের বলা হতো ‘অনগ্রসর শ্রেণি’, তাদের বিষয়ে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তার হতাশা, যা দূর করার বিষয়ে নীতিগত পদক্ষেপ নিতে প্রায় চার দশক লেগেছিল এবং তখনও তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল, যেমনটা মন্ডল কমিশন বাস্তবায়নের পরও দেখা গিয়েছিল৷”

‘‘দ্বিতীয়ত, রূপান্তরমূলক আইন সংস্কারের স্থবিরতা নিয়ে তার হতাশা, বিশেষ করে হিন্দু কোড বিল প্রণয়নে সংসদের ব্যর্থতা৷ এগুলো কিন্তু কোনো কোনো গৌণ বিষয় ছিল না; সামাজিক গণতন্ত্রের মূলে আঘাত হেনেছিল এগুলো৷”

‘‘যদি আমরা সেই ধারাকে এই সময়ের প্রেক্ষাপটে দেখি, তাহলে দেখা যাবে এখনও একই ধরনের নিদর্শন বিদ্যমান – কাঠামোগত সংস্কারে দ্বিধা, রাজনৈতিক সুবিধার নামে সমতা বিধানে বিলম্ব, এবং এমন সব আইনের উদ্ভব- যেমন, বিবাহ নিয়ন্ত্রণ আইন এবং ধর্মীয় মর্যাদার অনুমিত পরিবর্তন (যাকে প্রায়শই ধর্মান্তর বা ‘লাভ জিহাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়)—যেগুলো আম্বেদকরকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করতো৷ আসলে সেই সময় এবং বর্তমানের মধ্যেকার ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করা কঠিন৷”

 

 

পূর্বের খবরবিবিসি প্রতিবেদন : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ক্ষতি ২৭০ বিলিয়ন ডলার
পরবর্তি খবরআনন্দ বাজার প্রতিবেদন : ট্রাম্প ফোন করেছেন’! ৪০ মিনিট ধরে কথা বলার পরে -জানালেন মোদী,