জীবনানন্দ দাশ : রঙে-রূপে-বিস্ময়ে

500
জীবনানন্দ দাশ
Social Share

জীবনানন্দ দাশ -পৃথিবী এক আশ্চর্য রঙ-মহল। বিশ্ব প্রকৃতির যে দিকেই চোখ ফেরানো যায় সেদিকেই শুধু রঙের উৎসব। পৃথিবীতে রঙের দুয়ার অবারিত। প্রতিটি মানুষের মাঝেও কোনো না কোনোভাবে ‘রঙ’ সার্বক্ষণিক ক্রিয়াশীল। রঙ এক আকর্ষণীয় শিল্পসত্তার উপকরণ। বলা চলে মানুষের যাপিত জীবনে রঙের অনস্বীকার্য ভূমিকা রয়েছে।

রঙ মানুষের চেতনাকে প্রলুব্ধ করে, আনন্দিত করে, আন্দোলিত করে। রঙের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তাই সুদূরপ্রসারী এবং ইন্দ্রিয়জ। রঙ মানুষের দৃষ্টিগ্রাহ্য ও মননঋদ্ধ মৌল চাহিদার মধ্যে অন্যতম। সৃষ্টির আদি থেকে মানুষ তার পারিপার্শ্বিক ক্রিয়া সাধন; যেমন শুভাশুভ নির্ণয়, সতর্কতা নির্দেশন, শান্তি প্রতিষ্ঠা, ভালোবাসা ও দুঃখ প্রকাশসহ নানাবিধ প্রপঞ্চ প্রকাশের নিমিত্তে রঙের ব্যবহার করে আসছে। শিল্প-সাহিত্যের তুলনায় চিত্রকলায় রঙের আধিক্য বেশি। সুনির্বাচিত রঙ এবং তার পরিমিত প্রয়োগ চিত্রশিল্পকে আরো আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। শিল্পীর ক্যানভাসে রঙ হেসে ওঠে ‘মোনালিসা’ হাসিতে। চিত্রকরের তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসের বেদীতে রঙ প্রাণতা পায়। যে কারণে রঙপিয়াসী রসিক শিল্পবোদ্ধারা রঙের প্রশংসায় সর্বদা মুখর।

কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকগণ তাঁদের সৃষ্টিকর্মে বিভিন্নমুখী রঙের ব্যবহার করে সৃষ্টিকর্মকে করে তুলেছেন বিমূর্ত, কখনো বা মূর্ততার উজ্জ্বল প্রতীক। তেমনিভাবে বিচিত্র রঙের পাদপ্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশ। তিনি বাংলার বিচিত্র রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন একান্ত নিজস্ব দর্পনে। প্রকৃতির রঙ দিয়ে সাজিয়েছেন কাব্যের অমর পঙক্তিমালা।

“চারিদিকে বাংলার ধানী শাড়ি—শাদা শাঁখা—বাংলার ঘাস

 আকন্দ বাসকলতা ঘেরা এক নীল মঠ—আপনার মনে”

                                      (একদিন জলসিড়ি নদীটির/ রূপসী বাংলা)

বাংলার অনুপম নৈসর্গিক সৌন্দর্য শাশ্বতকাল ব্যেপে মুগ্ধ কবিচিত্তে ভাবের উৎসধারাকে বেগবান করেছে। জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার সাহিত্যাকাশে জীবনানন্দ দাশ এমনই এক নির্জন লাজুক কবি, যিনি রঙের বর্ণচ্ছটায় কবিতাকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছেন। প্রকৃতির রূপ, রস, আলো, ছায়ার নির্জনতায় খুঁজেছেন জীবনের অর্থ। বিশ্বসাহিত্যে কবি ওয়ার্ডস ওয়ার্থ এবং কিটস প্রকৃতি চেতনার কবি, কিন্তু এঁদের সঙ্গে বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের চেতনাগত, আঙ্গিক, মাত্রিক এবং মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। কিটস যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য-মাধুর্যে আপ্লুত হয়ে বলেন, ‘A thing of beauty is a joy for ever.’  জীবনানন্দ দাশ সেখানে প্রকৃতিকে খুঁজে পান জীবনের অংশ ও বিচিত্র রঙের ঐশ্বর্যে। একজন কবি তার চারপাশে ব্যপ্ত যাপনের উপকরণাদি যত বেশি তাৎপর্যে কবিতায় রূপান্তরিত করতে পারেন, তিনি তত বেশি ক্লাসিক হয়ে ওঠেন। বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ তেমনি এক কবিসত্তা, যার চেতনার রঙে ক্রিয়াশীল বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের আত্মগত নিবিড় আকুতি।

১. “দেখিব মেয়েলি হাত সকরুণ-শাদা শাঁখা ধূসর বাতাসে

    শঙ্খের মতো কাঁদে; সন্ধ্যায় দাঁড়াল সে পুকুরের ধারে,

    খইরঙা হাঁসটিরে নিয়ে যাবে যেন কোন কাহিনীর দেশে—

    ‘পরণ-কথা’র গন্ধ লেগে আছে যেন তার নরম শরীরে”

                          (তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও/ রূপসী বাংলা)

২. “আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল;

    চারিদিকে পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ।”

                           (শিকার/ বনলতা সেন)

জীবনানন্দ দাশ তাঁর কাব্যগুলোর মধ্যে ‘রূপসী বাংলা’ গ্রন্থের কবিতাগুলোতে রঙের প্রয়োগ বেশি করেছেন। রঙের প্রলেপে অপরূপ চিত্রময়তায় উদ্ভাসিত তাঁর কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে ছড়িয়ে রয়েছে বাঙালির প্রাণের অস্তিত্ব। বাংলার নিজস্ব সম্পদ এই প্রকৃতি জীবনানন্দের চেতনায় মিশে একাকার হয়ে গেছে। কবিতায় রঙের ব্যবহারে তিনি ঈর্ষান্বিত সাফল্যে উড্ডীন।

জীবনানন্দ দাশের কবিতা বেড়ে উঠেছে আত্মগত উপলব্ধির মোড়কে, নির্জনতার অতলান্তিকে। তাঁর কবিতায় আধুনিক চেতনা, জীবন ও সমাজ স্পষ্ট থাকলেও মানব মনস্তত্ত্ব প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি স্বভাবে লাজুক ও আত্মতন্ময়তা, আত্মমগ্নতায় বিভোর থেকে কাব্য রচনা করেছেন। প্রকৃতিজাত রঙ দিয়ে অপরূপ চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতায় বোধের গভীরতা সম্প্রসারিত এবং স্পষ্ট। প্রেম-প্রকৃতি-রঙ একাকার হয়ে বাহ্যজগত থেকে পাঠকের অর্ন্তলোকে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে তাঁর কবিতার একেকটি পঙক্তি।

১. “যার ডাক শুনে রাঙা রৌদ্রেরও চিল আর শালিখের ভিড়

    একদিন ছেড়ে যাবে আম জাম বনে নীল বাংলার তীর,

    যার ডাক শুনে আজ ক্ষেতে ক্ষেতে ঝরিতেছে খই আর মৌরির ধান;

    কবে যে আসিবে মৃত্যু: বাসমতি চালে ভেজা শাদা হাতখান”

                           (আবার আসিব ফিরে/ রূপসী বাংলা)

২. “দেখেছি আকাশে দূরে কড়ির মতে শাদা মেঘের পাহাড়ে

    সূর্যের রাঙা ঘোড়া: পক্ষিরাজের মতো কমলারঙের পাখা ঝাড়ে”

                         (মানুষের ব্যথা আমি/ রূপসী  বাংলা)

বিচিত্র রঙের উপস্থিতি জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে করেছে স্বতন্ত্র-সৌকর্যের অধিকারী। কবির রুচি-মেজাজ, কাব্য নির্মাণের প্রকরণ প্রকৌশল, ব্যক্তিক চেতনা থেকে সামষ্টিক গ্রাহ্যতা, ব্যঞ্জনাময় ভাষার ব্যবহার তাঁর কবিতাকে লাবণ্যময়তা দান করেছে। তিনি কবিতায় ‘শাদা’ রঙের ব্যবহার করেছেন বেশি। রঙকে আশ্রয় করে তিনি উপমার প্রয়োগ করেছেন। যেমন, রাঙা মেঘ, ধানী রঙ, রাঙা ঘোড়া, খয়েরী শালিখ, নীল বাংলার তীর, রাঙা রৌদ্র, শাদা শাঁখা, ধানী শাড়ি, নীল জোছনা, নীল মাছ, হলুদ জোছনা, টিয়ার পালকের মতো সবুজ ইত্যাদি। রঙের সার্থক ব্যবহারে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে অপরূপ চিত্রকল্পময়।

‘যেখানে রূপালি জ্যোৎস্না ভিজিতেছে শরের ভিতর,

যেখানে অনেক মশা বানায়েছে তাহাদের ঘর;

যেখানে সোনালি মাছ খুঁটে-খুঁটে খায়

সেই সব নীল মশা মৌন আকাঙ্ক্ষায়;

নির্জন মাছের রঙে যেইখানে হ’য়ে আছে চুপ

পৃথিবীর একপাশে একাকী নদীর গাঢ় রূপ;

কান্তারের একপাশে যে-নদীর জল

বাবলা হোগলা কাশে শুয়ে-শুয়ে দেখিছে কেবল

বিকেলের লাল মেঘ; নক্ষত্রের রাতের আঁধারে

বিরাট নীলাভ খোঁপা নিয়ে যেন নারী মাথা নাড়ে

পৃথিবীর অন্য নদী; কিন্তু এই নদী

রাঙা মেঘ-হলুদ-হলুদ জ্যোৎস্না; চেয়ে দ্যাখো যদি;

অন্য সব আলো আর অন্ধকার এখানে ফুরালো;

লাল নীল মাছ মেঘ-ম্লান নীল জ্যোৎস্নার আলো

এইখানে; এইখানে মৃণালিনী ঘোষালের শব

ভাসিতেছে চিরদিন: নীল লাল রূপালি নীরব।’

(শব/ মহাপৃথিবী)

কবি বুদ্ধদেব বসু যথার্থ বলেন, ‘তার কাব্য বর্ণনাবহুল, তার বর্ণনা চিত্রবহুল এবং তার চিত্র বর্ণবহুল।’ সুতরাং এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, কাব্যে অপরূপ চিত্রময়তার স্রষ্টা কবি জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতি থেকে দু’হাতে রঙ তুলে এনে কবিতা বিনির্মাণে ব্রতী থেকে বাংলা কবিতাকে করেছেন ঐশ্বর্যমণ্ডিত। তাঁর কবিতা পাঠকের গভীর চেতনালোকে অতলস্পর্শী উচ্চারণ হিসেবে সমুজ্জ্বল। রঙের কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলা সাহিত্যাকাশে অমলিন এবং প্রাসঙ্গিক।