জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম রাত

723
Social Share

ড. মোঃ আওলাদ হোসেন:

৩১ জানুয়ারি ২০০৭ গ্রেফতার হওয়ার পর JIC (Joint Interrogation Cell) তে পরবর্তী ৫ রাত ৫ দিন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাখা হয়েছিল। প্রথম রাতে ক্লান্ত শরীর, কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর কিছুতেই বুঝতে পারছি না দিন না রাত। রুমের বাহিরে দেখার কোন সুযোগ নেই। কাঠ দিয়ে ছাওয়া লোহার গ্রিলের দরজা। ভিতরে-বাহিরে যোগাযোগ করার জন্য একজন সাধারণ মানুষের উচ্চতায় মুখ বরাবর গোল একটি জায়গা/ছিদ্র রয়েছে যাতে একটি গোল কাঠের টুকরা দিয়ে ঢাকনা লাগানো হয়েছে।

আগের দিন সকালে টুঙ্গিপাড়া থেকে নাস্তা খেয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম। এরপর আর দানাপানি পেটে পড়েনি। তাছাড়া প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

দরজা ঝাঁকুনি দিতেই গোলাকার কাঠের ঢাকনাটা সরিয়ে একজন বললেন, ‘কি হইছে?‘

প্রত্যুত্তরে বললাম, ‘টয়লেটে যাবো`।

কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে একজন লোক ভিতরে প্রবেশ করলেন, আমাকে নিয়ে গেলেন টয়লেটে। সেখান থেকে ফিরে আবার রুমে। অল্পক্ষণ পরে দরজার নিচ দিয়ে একটি মেলামাইনের প্লেটে একটি তেলে ভাজা ময়দার রুটি ও সামান্য আলু ভাজি প্রবেশ করলো। কে বা কারা প্লেটটি সজোরে ধাক্কা দিয়ে রুমের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছে।

বুঝলাম কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য কেন লিখেছেন, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। গোগ্রাসে খেয়ে নিলাম, সেই লালচে রঙের প্লাস্টিকের বোতলের বাসি পানি অনিচ্ছা সত্ত্বেও কয়েক ঢোক গলাধঃকরণ করতে বাধ্য হলাম। ঘরময় মশার ভ্ন ভ্ন আওয়াজ, উপরে পাওয়ারফুল লাইট, এরই মধ্যে কম্বলমুড়ি দিয়ে অজানা আতঙ্কে স্টিলের খাটে শুয়ে কত কি ভাবছি!

দ্রুত সময় পেরিয়ে গেল। কখন দুপুর হয়েছে টেরই পাই নাই। জোহরের নামাজের সময় হয়েছে। আজানের আওয়াজ কানে আসলো। শোয়া থেকে উঠে খানিকক্ষণ বসে থাকলাম। শুধুই দুশ্চিন্তা! বাসায় ছোট ছোট দুটি মেয়ে নিয়ে স্ত্রী কি করছে, বৃদ্ধা মা না জানি আমার চিন্তায় কত কষ্ট পাচ্ছে ইত্যাদি, ইত্যাদি।

টয়লেটে যাওয়া এক ঝামেলা। তায়াম্মুম করে জোহরের নামাজ আদায় করার পরপরই সকালের ন্যায় দরজার নিচ দিয়ে কিছু খাবারসহ একটি মেলামাইনের প্লেট ঢুকলো। ভাতের উপরে সাজানো রয়েছে এক টুকরো মাছ, সামান্য সবজী। ডাল দিয়ে ভাতগুলো ভিজানো আছে। দুপুরের খাবার শেষ করার পরপরই দরজা খুলে গেল। ভাবলাম খাবারের খালি প্লেটটি ফেরত নিতে হয়তো কেউ এসেছে।

ভুল ভাঙলো সহসাই। আমার ‘ডাক‘ পরেছে। চোখ বেঁধে, হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো হলো। দু’দিক থেকে দু’জন লোক ধরাধরি করে রুমের বাইরে নিয়ে গেল। আমাকে একটি বেঞ্চে বসিয়েছে। কথাবার্তার আওয়াজ শুনে মনে হলো সামনে বেশ কয়েকজন লোক বসে আছে। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর ভদ্রোচিতভাবেই কুশল বিনিময় হলো।

তারপর প্রথমেই আমি জানতে চাইলাম, ‘আমাকে কেন আনা হয়েছে। আমার অপরাধ কি? আমার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কোথাও কোন মামলা নেই। এমনকি আমার বিরুদ্ধে কোনো থানায় একটি জিডিও নেই। আমার জন্মস্থান মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায়, আমি লেখাপড়া করেছি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ এ, ১৯৬৮ সাল থেকে আমার স্থায়ী ঠিকানা ঢাকার কদমতলী থানার জুড়াইনে, ২০০৪ সাল থেকে আমি ধানমন্ডিতে ভাড়া বাসায় বসবাস করি। প্রতিটি থানায় খোঁজ নিন, আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অভিযোগ রয়েছে কিনা? আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কখনো কারও সাথে উচ্চস্বরে কথা বলি না, বা খারাপ ব্যবহার করি না। যদিওবা অবস্থার প্রেক্ষাপটে রাগান্বিত হই, পরক্ষণেই ‘দুঃখিত` বলে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলি`। উল্লেখ্য আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আমার ব্যবহারে কেহ যদি মনে কষ্ট পায় এবং সেই ব্যক্তি যদি ক্ষমা না করে তবে পরকালে পরম করুনাময় মহান আল্লাহও আমাকে ক্ষমা করবেন না। আর সেজন্যই মৃতব্যক্তিকে জানাজা দেওয়ার পূর্বে নিকটাত্মীয়রা মৃতব্যক্তির পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

আমার প্রশ্নের উত্তরে জনৈক ভদ্রলোক বললেন, ‘আমরা জানি আপনার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, জিডিও নেই। আপনি সজ্জ্বন ব্যক্তি। আমরা এটাও জানি ম্যাডাম (মাননীয় নেত্রী শেখ হাসিনা) আপনাকে অনেক বিশ্বাস করে। তবে আমাদের কিছু জিজ্ঞাসাবাদ রয়েছে, আমরা যেভাবে চাইব সেভাবেই উত্তর দিতে হবে। না হয় (আমার হাতে একটা মোটা লাঠি ধরিয়ে বলা হলো), এই লাঠি ভাঙ্গা হবে আপনার শরীরে`। খুব সহজ-সাবলীল ভাষায় কথাগুলো বলছিলেন ভদ্রলোক।

জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো। প্রতিদিন নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের অমানসিক নির্যাতনে অজ্ঞান হয়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হতো। জ্ঞান ফিরে এলে চলতো পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ। এ যেন জ্বলন্ত অনল থেকে হাবিয়া দোজখে চলাচল।

লেখক: ড. মোঃ আওলাদ হোসেন
ভেটেরিনারীয়ান, পরিবেশবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক কর্মী।