জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ৬ দফা

521
Social Share
  • ডাঃ কামরুল হাসান খান:  গত ২৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে তার ১৭তম বাংলায় প্রদত্ত ভাষণে মহামারী করোনা মোকাবেলা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট ৬ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তাঁর এই ভাষণ ছিল তথ্যসমৃদ্ধ, সময়োচিত দিকনির্দেশনামূলক, সুস্পষ্ট এবং দৃঢ়। এ ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির চিত্র বিশ্বের দরবারে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি জাতিসংঘকে ‘ভরসার সর্বোত্তম কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে উল্লেখ করে বিশ্ব নেতাদের এই ক্রান্তিলগ্নে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব ধরনের মতভেদ ভুলে গিয়ে ‘অভিন্ন মানবজাতি’ হিসেবে সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সবার জন্য আবারও এক সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন ইস্যুতে পুনরায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দের জোরালো ভ‚মিকা ও অব্যাহত সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। কোভিড-১৯ মহামারী জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় কার্যকর বৈশ্বিক উদ্যোগের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বৈশ্বিক সংহতি ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর ছয় দফা প্রস্তাব-

১) কোভিড-১৯ টিকা-ৈ কোভিডমুক্ত একটি বিশ্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে কোভিড-১৯ টিকাকে ‘বৈশ্বিক সম্পদ’ হিসেবে বিবেচনা করে সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত ও সাশ্রয়ী মূল্যে টিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। অবিলম্বে টিকা প্রযুক্তি হস্তান্তর টিকার সমতা নিশ্চিত করার একটি উপায় হতে পারে। প্রযুক্তি সহায়তা ও মেধাস্বত্বে ছাড় পেলে বাংলাদেশও ব্যাপক পরিমাণে টিকা তৈরি করতে সক্ষম।

২) জলবায়ু সংক্রান্ত- তিনি বলেন, দ্রæত ব্যবস্থা না নিলে জলবায়ু পরিবর্তনের ধ্বংসাত্মক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। ধনী অথবা দরিদ্র কোন দেশই এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে নিরাপদ নয়। তাই ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, নিঃসরণের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং টেকসই অভিযোজনের জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তির অবাধ হস্তান্তরের আহ্বান জানান। বাংলাদেশ ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা- দশক ২০৩০’-এর কার্যক্রম শুরু করেছে। এ পরিকল্পনায় বাংলাদেশের জন্য জলবায়ুকে ঝুঁকির কারণ নয়, বরং সমৃদ্ধির নিয়ামক হিসেবে পরিণত করার কর্মসূচী গৃহীত হয়েছে।

৩) শিক্ষা সংক্রান্ত- করোনা মহামারীর প্রকোপ থেকে উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহামারীর প্রকোপে শিক্ষাব্যবস্থা চরমভাবে বিপর্যস্ত। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের তথ্য অনুযায়ী করোনাকালে আংশিক বা পুরোপুরি বিদ্যালয় বন্ধের কারণে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোর লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর দূরশিক্ষণে অংশগ্রহণের সক্ষমতা ও প্রযুক্তি না থাকায় ভর্তি, সাক্ষরতার হার ইত্যাদি অর্জন হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি দাবি করেন, ডিজিটাল সরঞ্জামাদি ও সেবা, ইন্টারনেটের সুযোগ-সুবিধার সহজলভ্যতা ও শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করতে হবে। এজন্য জাতিসংঘকে অংশীদারিত্ব ও প্রয়োজনীয় সম্পদ নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান জানান।

৪) স্বল্পোন্নত দেশের টেকসই উন্নয়নে সহযোগীদের সহায়তা- প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব নেতাদের সামনে চতুর্থ দফা প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, কোভিড-১৯ অতিমারীর নজিরবিহীন প্রতিক‚ল পরিস্থিতির মধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছি। এ মহামারী অনেক দেশের উত্তরণের আকাক্সক্ষাকে বিপন্ন করেছে। স্বল্পোন্নত দেশের টেকসই উত্তরণ ত্বরান্বিত করার জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে আমরা প্রণোদনাভিত্তিক উত্তরণ কাঠামো প্রণয়নে আরও সহায়তা প্রত্যাশা করি।

৫) অভিবাসীদের অধিকার- বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বলেন, মহামারীকালে প্রবাসীরা অপরিহার্য কর্মী হিসেবে স্বাস্থ্য ও অন্য জরুরী সেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তারাও সম্মুখ সারির যোদ্ধা। তবুও তাদের অনেকে চাকরিচ্যুতি, বেতন কর্তন, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সামাজিক সেবার সহজলভ্যতার অভাব ও বাধ্যতামূলক প্রত্যাবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই সঙ্কটকালে অভিবাসী গ্রহণকারী দেশগুলোকে অভিবাসীদের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত আচরণ এবং তাদের কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য এবং কল্যাণকে নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান জানান।

৬) রোহিঙ্গা ইস্যু- প্রধানমন্ত্রী তাঁর ষষ্ঠ দফা প্রস্তাবে বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। বাংলাদেশে তাদের সাময়িক অবস্থানকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখতে কিছু সংখ্যক বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিককে আমরা ‘ভাসানচরে’ স্থানান্তর করেছি। আশ্রয় শিবিরে কোভিড-১৯ মহামারীর বিস্তাররোধে টিকা লাভের যোগ্য সবাইকে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সৃষ্টি মিয়ানমারে, সমাধানও রয়েছে মিয়ানমারে। রাখাইন রাজ্যে তাদের মাতৃভ‚মিতে নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই কেবল এ সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান হতে পারে। এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমরা আশা করি, আসিয়ানের নেতৃবৃন্দ বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক ইস্যুতে গৃহীত প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করবেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে গৃহীত সকল কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্নের কথা বলেছেন। বলেছেন আফগানিস্তানের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য দেশটির জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করে যেতে বাংলাদেশ প্রস্তুত। সরকারের সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার কথা বিশ্ব নেতাদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, পারমাণবিক ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্রের সম্পূর্ণ নির্মূলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এ কারণেই বাংলাদেশ ‘পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি’র অন্যতম অনুস্বাক্ষরকারী, যেটি এ বছরের শুরুতে কার্যকর হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী টানা তৃতীয় মেয়াদে গত ১২ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও ব্যাপক সাফল্য অর্জনের চিত্র বিশ্ব নেতাদের সামনে তুলে ধরেন। বাংলাদেশ জিডিপিতে বিশ্বের ৪১তম। গত এক দশকে দারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৫ থেকে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। মাথাপিছু আয় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ সর্বকালের সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭৩ বছর। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যমতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম। ২০১৪ সাল থেকে এ সূচকে বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর চাইতে এগিয়ে আছে।

সফরকালে জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সল্যুশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) দারিদ্র্য দূরীকরণ, পৃথিবীর সুরক্ষা এবং সকলের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণের সর্বজনীন আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের সঠিক পথে অগ্রসরের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’ প্রদান করেছে।

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর আবেগঘন বলিষ্ঠ ভাষণ বিশ্ব নেতৃবৃন্দের ওপর প্রভাব ফেলেছে । বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ৬ দফা অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করে দ্রæত বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেয়া হলে বর্তমান বৈশ্বিক অনেক সমস্যার অবসান হবে। বিশেষ করে করোনা সঙ্কট, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সঙ্কট এবং রোহিঙ্গা সঙ্কট। গোটা বিশ্বের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য এখন প্রয়োজন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সম্মিলিত, আন্তরিক উদ্যোগ, যেটি তাদের দায়িত্বও।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়