জলবায়ু সম্মেলনের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি – অধ্যাপক ডাঃ কামরুল হাসান খান

41
Social Share

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে কপ২৬ সম্মেলনে চুক্তি সম্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী নেতাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্যতম বলে বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিবিসির মতে ‘শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্নদের কণ্ঠস্বর।’ বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়,‘ জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ৪৮ দেশের ফোরামের পক্ষে শেখ হাসিনা কথা বলছেন। তিনি একজন অভিজ্ঞ ও সোজাসাপ্টা কথাবার্তায় বিশ্বাসী রাজনীতিক। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রকৃত অভিজ্ঞতা তিনি কপ২৬ সম্মেলনে তুলে ধরেছেন।’ কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. জেন এ্যালান বিবিসিকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে মানবিক রূপ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো ব্যক্তিত্বরা। ফলে এর ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বনেতারা আরও ভালভাবে জানতে পারছেন।’ তীব্র তাপপ্রবাহ, প্রলয়ঙ্করী বন্যার মতো চরমভাবাপন্ন আবহাওয়াই এখন নতুন বাস্তবতা বলে জানিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। গত ৩১ অক্টোবর স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জলবায়ু সম্মেলনের প্রথম দিন এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানাল সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জলবায়ু প্রতিবেদনে এমন একটি বিশ্বকে তুলে ধরা হয়েছে, যা আমাদের চোখের সামনেই বদলে যাচ্ছে।

২০০২ সাল থেকে পরের ২০ বছরের গড় তাপমাত্রা হিসাব করে প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, পৃথিবীর তাপমাত্রা এবারই প্রথম প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১ ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। আর সমুদ্রপৃষ্ঠ ২০২১ সালে পৌঁছেছে নতুন উচ্চতায়। কপ২৬ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডব্লিউএমও আগাম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বৈশ্বিক উষ্ণতা, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, সমুদ্রের পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। দেখা গেছে, বায়ুম-লে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোয় ২০২১ সালসহ গত সাত বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন কেন হলো? শিল্পায়ন ও জীবাশ্ম জ্বালানির অতি ব্যবহারের ফলে অতিমাত্রায় কার্বন ডাই অক্সাইড এবং মিথেন গাস নির্গমনের কারণে গ্রিন হাউস গাসের ঘনত্ব বেড়ে যায়। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ১. বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২. চরমাভাপন্ন আবহাওয়া ৩. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ৪. উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে গলে যাচ্ছে মেরু অঞ্চল ও হিমবাহের বরফ ৫. বিশ্বে তাপপ্রবাহ ৬. দাবানল ৭. বন্যা ৮. ভূমিধস ৯. বিস্তীর্ণ এলাকায় প্লাবন ১০. স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি ১১. ৬৩ কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতির সম্ভাবনা। পাশাপাশি উজাড় হয়েছে বন এবং ধ্বংস হয়েছে পরিবেশ। বন এবং সমুদ্র মিলে অধিকাংশ কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করে। গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রধান উপাদান হচ্ছে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং মিথেন গ্যাস।

জীবাশ্ম জ্বালানি : প্রাচীনকালে বিভিন্ন প্রাণীর মৃতদেহ, পড়ে যাওয়া গাছের পচন অংশ, যা মাটির তলায় বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থেকে পাললিক শিলা স্তরে থাকায় তাদের প্রস্তরীভূত দেহাবশেষকে জীবাশ্ম বলা হয়। এই সমস্ত জীবাশ্ম থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসসহ কেরোসিন, পেট্রোলিয়াম প্রভৃতি আহরণ করা হয়। এগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি বলে। নবায়নযোগ্য শক্তি বা রিনিউয়েবল এনার্জি হলো এমন শক্তির উৎস যা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পুনরায় ব্যবহার করা যায় এবং এর ফলে শক্তির উৎসটি নিঃশেষ হয়ে যায় না। বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস যেমনÑ সূর্যের আলো ও তাপ, বায়ুপ্রবাহ, জলপ্রবাহ, জৈবশক্তি (জৈবভর), ভূ-তাপ, সমুদ্র তরঙ্গ, সমুদ্র-তাপ, জোয়ার-ভাটা, শহুরে আবর্জনা, হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল ইত্যাদি নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে করণীয়- বন রক্ষা করতে হবে, কার্বন এবং মিথেন গ্যাস নিঃসরণ কমাতে হবে। এছাড়া বৈশ্বিক তাপমাত্রার বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রীতে সীমিত রাখতে হবে। বন্ধ করতে হবে কয়লার ব্যবহার। বন উজাড় বন্ধ করে নতুন বনায়ন করতে হবে। তেল-গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে ব্যবহার করতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। পূর্বাভাস ব্যবস্থা, জলবায়ু সহিষ্ণু অবকাঠামো, শুষ্ক এলাকায় চাষাবাদ এবং পানি ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগর মাধ্যমে বাবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উল্লেখিত কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন পর্যাপ্ত তহবিল। দায়ী উন্নত দেশগুলো প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদান করতে হবে। জাতীয়ভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা (এনডিসি) নির্ধারণ এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

জাতিসংঘের উদ্যোগে ও যুক্তরাজ্যের আয়োজনে ৩১ অক্টোবর স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে শুরু হওয়া এবারের জলবায়ু সম্মেলন ১২ নবেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু ১৩ নবেম্বর রাতে শেষ হয়। ১ নবেম্বর থেকে শুরু হয় বিশ্বনেতাদের মূল আলোচনাপর্ব। ১২০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং মোট দুই শতাধিক দেশের প্রায় ৫০ হাজার প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, রাজনীতিক, পরিবেশবিদ, জলবায়ু রক্ষা আন্দোলনের কর্মী, মধ্যস্থতাকারী ও জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা। মূল অধিবেশনে ভাষণে সিভিএফ এবং ভি২০ (দ্য ভালনারেবল২০)-এর সভাপতি শেখ হাসিনা চারটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রথম প্রস্তাবে তিনি ধনী দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর জোর দেন। দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয় দেশগুলোর উচিত অভিযোজন এবং প্রশমনের মধ্যে ৫০:৫০ ভারসাম্য রেখে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। তৃতীয় প্রস্তাবে বলেন, উন্নত দেশগুলোর উচিত সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে সাশ্রয়ী মূল্যে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেয়া এবং সিভিএফ দেশগুলোর উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনা করা। চতুর্থ ও চূড়ান্ত প্রস্তাবে তিনি বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাংন, বন্যা এবং খরার কারণে বাস্তুচ্যুত জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য বিশ্বব্যাপী দায়বদ্ধতা ভাগ করে নেয়াসহ লোকসান ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অবশ্যই সমাধান করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন- বিশ্বব্যাপী নির্গমনের শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশেরও কম অবদান রাখা সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ২০০৯ সালে ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড’ প্রতিষ্ঠা করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত সাত বছরে বাংলাদেশে জলবায়ু সম্পর্কিত ব্যয় দ্বিগুণ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় তার সরকার যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে আমরা জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা প্রস্তুত করছি। সম্প্রতি আমরা একটি উচ্চাকাক্সক্ষী এবং যুগোপযোগী এনডিসি জমা দিয়েছি।

বাংলাদেশে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিস্তৃত সৌরশক্তি কার্যক্রম। ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৪০ শতাংশ জ্বালানি থাকবে। ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র্র বাতিল করা হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। এটি জলবায়ুর ঝুঁকি থেকে টেকসই ও জলবায়ু সমৃদ্ধির পথে যাত্রা। ইতোমধ্যে সরকার বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে- দেশের এনডিসি আপডেট, ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশী বিনিয়োগে ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র বাতিল এবং ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বাংলাদেশের শক্তির ৪০ শতাংশ নেয়া। এছাড়া বাংলাদেশ এ বছর তিন কোটি চারা রোপণ করছে।

সিভিএফের চেয়ারপার্সন শেখ হাসিনা সিভিএফ এবং কমনওয়েলথের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতার জন্য ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করেন। স্কটিশ পার্লামেন্টের কমিটি কক্ষে বৈশ্বিক জলবায়ু সমৃদ্ধিতে বাংলাদেশের দর্শন শীর্ষক সভায় ভাষণে তিনি বলেন, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাংন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা ও খরার মতো প্রাকৃতিক ঘটনায় প্রভাবিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত অভিবাসীদের দায়িত্ব বিশ্বকে অবশ্যই ভাগ করে নিতে হবে। ক্ষতির বিষয়টি অবশ্যই সঠিকভাবে সমাধান করতে হবে। ‘এ্যাকশন এ্যান্ড সলিডারিটি দ্য ক্রিটিক্যাল ডিকেড’ শীর্ষক শীর্ষনেতাদের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অর্থ ও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে বৈশ্বিক অভিযোজন কার্যক্রম কার্যকর হচ্ছে না। এটি মোকাবেলা করার জন্য উন্নত দেশগুলোকে অবশ্যই তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। ১০০ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু অর্থায়নের অংশ হিসেবে অভিযোজন এবং প্রশমনের জন্য ৫০:৫০ বরাদ্দ দিতে হবে।

শুরু থেকে আশা করা হচ্ছিল, ধনী দেশগুলোর আরাম-আয়েশের কারণে কার্বন নিঃসরণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ঝড়, বন্যা, খরার প্রভাব কাটিয়ে ওঠা এবং উপকূলীয় জীবনে অভিযোজন ঘটনানোর জন্য তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুত অর্থ পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবে। যে খসড়া চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি হয়েছে তাতে বিষয়টি সেভাবে নেই। এই অর্থ পাওয়ার বিষয়টি কপ২৭ সম্মেলনে আলোচনার জন্য রেখে দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী ধনী দেশগুলো বছরে যে ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করতে চেয়েছিল তা ২০২৩ সালের আগে পাওয়া যাবে না বলে সম্মেলন থেকে পরিষ্কার বার্তা পাওয়া গেছে। এ অর্থ পেতে ২০২৫ সাল পর্যন্তও লেগে যেতে পারে। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর নেতা ও আদিবাসী প্রতিনিধিরা শুক্রবার স্লোগান দিয়ে সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন। সেইসঙ্গে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এরই মধ্যে কপ২৬-কে ব্যর্থ আখ্যা দিয়ে বিশ্বনেতাদের কঠোর সমালোচনা করেছে।

কপ২৬ সম্মেলনের সভাপতি যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী অলোক শর্মা একটি বহুপক্ষীয় কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রকাশিত খসড়া চুক্তিকে ‘ভারসাম্যমূলক’ অভিহিত করেছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘সবকিছু সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে এটি এমন কিছু যা সামগ্রিকভাবে সবার উদ্দেশ্যকে এগিয়ে নেবে।’ এবারের জলবায়ু সম্মেলন অনেক বেশি প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা কিছু প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাসের মধ্যেই আটকা পড়ে যাচ্ছে। তবে এবার কয়েকটি পদক্ষেপ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন।

জলবায়ু সম্মেলনের ঘোষণা বা চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো- এসব শর্ত ভাংলে কোন দেশকে শাস্তি পেতে হবে না। এই চুক্তি পালন নির্ভর করবে সরকারগুলোর ইচ্ছার ওপর। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিশ্রুতি করায় সরকারগুলো এক ধরনের রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থাকবে। সেইসঙ্গে জলবায়ু তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিশ্রুতিগুলো মেনে চলতে হবে। যে কারণে কিছু সাফল্য আসবে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ধনী দেশগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ দ্বিগুণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে তৃতীয় খসড়ায়। আরও যে বিষয়গুলোকে সম্মেলনে সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রীর নিচে রাখতে আগামী দশকজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের যৌথ ঘোষণা, ২০৩০ সালের মধ্যে বন ধ্বংস বন্ধ করা নিয়ে ১০০টি দেশের নেতার ঘোষণা, ২০৩০ সালের মধ্যে মিথেন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমাতে ১০০টি দেশের ঘোষণা এবং কয়লার ব্যবহার বন্ধে ৪০টি দেশের ঘোষণা।

চুক্তি ঘোষণার পরই এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছেন বিশ্বনেতা ও পরিবেশবাদীরা। দুপক্ষ দুই মেরুতে অবস্থান করছে। এক পক্ষের অভিযোগ, কপ২৬ সম্মেলন থেকে বিশ্ববাসীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তবে ধনী দেশগুলোর নেতা ও মধ্যস্থতাকারীরা একে বিশ্বকে বাঁচানোর নতুন যাত্রা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে দেড় ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে রাখতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার সর্বসম্মত প্রতিশ্রুতিকে গ্লাসগো জলবায়ু চুক্তির বড় সাফল্য দেখানো হচ্ছে। এবারই প্রথম কয়লার ব্যবহার ধীরে ধীরে হ্রাস করার বিষয়টি চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে। প্যারিস চুক্তিতে এটি ছিল না। চুক্তিতে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন কমাতে কি কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা জানিয়ে প্রতি বছর সব দেশকে বিস্তারিত পরিকল্পনা জাতিসংঘকে জানাতে হবে। আগে যেখানে পাঁচ বছর অন্তর এই পরিকল্পনা প্রকাশ করা হতো, সেখানে এটি এক বছর অন্তর করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেশি জোর দেয়া হয়েছে।

সম্মেলনে অংশ নেয়া ২০০টি দেশের প্রতিনিধিদের বেশিরভাগই অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন। চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় অলোক শর্মাই বলেছেন, এটি একটি ভঙ্গুর চুক্তি হয়েছে। তবে এই ব্যর্থতার জন্য তিনি ভারত ও চীনকে দুষেছেন। কয়লার ব্যবহার হ্রাস নিয়ে দুই দেশকে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বলেছেন তিনি। এরপরও গ্লাসগো জলবায়ু চুক্তিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ‘ঐতিহাসিক পথনির্দেশক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন কপ২৬ সম্মেলনের আয়োজক দেশ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তবে তিনি এও স্বীকার করেছেন, এখনও অনেক কাজ করা বাকি রয়েছে। জনসনের সুরেই কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি। তিনি এই চুক্তিকে নতুন দিনের পথ চলার নির্দেশক হিসেবে বর্ণনা করে একে ঐতিহাসিক অর্জন বলে অভিহিত করেছেন।

জলবায়ু চুক্তি নিয়ে কিছুটা আশার আলো অনেক নেতার মুখে উচ্চারিত হলেও পরিবেশবিদ ও জলবায়ু রক্ষা আন্দোলনের কর্মীরা একেবারেই হতাশ। জলবায়ু সম্মেলনকে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিবেশ বিষয়ক এনজিও নিয়ে গড়ে ওঠা সবচেয়ে বড় জোট ‘কপ২৬ কোয়ালিশন’ গ্লাসগো চুক্তিকে উন্নত দেশের নেতাদের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়ার নজির বলে বর্ণনা করেছে। কারণ, এই চুক্তি দরিদ্র দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার পথ দেখায়নি। তহবিলের নিশ্চয়তা দেয়নি। জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা টুনবার্গ এই চুক্তিকে ‘ভুয়া’ বলে বর্ণনা করে বিশ্বনেতাদের সঠিক পথে আনতে তরুণ সমাজকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই বলেছেন, বিশ্বনেতারা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। দ্বীপ দেশগুলোর জোট বলেছে, তারা খুবই হতাশ। এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে দেশে দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস চুক্তিকে স্বাগত জানালেও তিনি একে খুবই অপ্রতুল পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা জলবায়ু বিপর্যয়ের দুয়ারে কড়া নাড়াচ্ছি। এখনই জরুরীভিত্তিতে উত্তরণের জন্য কাজ করতে হবে।

প্রায় দুই সপ্তাহের আলোচনার পর অসন্তোষ থাকলেও শেষ মুহূর্তে মতৈক্য হয়েছে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর। চুক্তিতে প্রায় ২০০টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দেয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। জিইয়ে রেখেছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দ্রুত কমিয়ে আনার প্রত্যাশা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আজ গোটা বিশ্ব হুমকির মধ্যে। কপ২৬-এ কিছুটা অগ্রগতি হলেও পর্যাপ্ত নয়। যে চুক্তি হয়েছে সেটি বাস্তবায়নে সকল দেশ এগিয়ে আসবে, বিশেষ করে দায়ী ধনী দেশগুলো। কপ২৭-এর দিকে তাকিয়ে থাকল বিশ্ববাসী, যেখানে আরও সমঝোতা, সহযোগিতা এবং কার্যকরী উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসবে শিল্পোন্নত দেশগুলো। ক্রমান্বয়ে মুক্ত হবে আমাদের প্রিয় পৃথিবী উষ্ণতা, বন্যা, প্লাবন, খরা, বন ধ্বংস থেকে। অনাগত শিশু যেন বুক ভরে নিতে পারে নির্মল বিশুদ্ধ বাতাস।

 

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়