জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের রূপকার মুস্তাফা মনোয়ার

62
Social Share

বিশেষ প্রতিনিধি: যার প্রতিটি তুলির ছোঁয়া কথা বলে, শিশু প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে বহু জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের রূপকার হিসেবে যার নাম সবার আগে উঠে আসে তিনি হলেন মুস্তাফা মনোয়ার। চারু ব্যক্তিত্ব, নির্দেশক, সংস্কৃতিমনস্ক এই বিরল ব্যক্তিত্বের পিতা প্রয়াত কবি গোলাম মোস্তফা ও মাতা প্রয়াত জমিলা খাতুন। তিনি ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহে জন্মগ্রহণ করেন। ব্যক্তি জীবনে এক পুত্র ও এক কন্যার জনক।
মুস্তাফা মনোয়ার বর্তমানে জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার-এর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট-এর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার ও পূর্ব পাকিস্তানে চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পেশাগত যোগ্যতা বা প্রশিক্ষণ হিসেবে তিনি ব্রডকাস্টিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, এন এইচ কে জাপান : শিক্ষামূলক টিভি অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও প্রযোজনা কোর্স, বিবিসি লন্ডন, যুক্তরাজ্য: টেলিভিশন প্রযোজনা কৌশল, এন এইচ কে, জাপান, ঊধ্বর্তন অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা কোর্স সম্পন্ন করেন। মুস্তাফা মনেয়ার কর্ম অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বের ক্ষেত্রেও মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। ওয়ার্ল্ড ভিউ ফাউন্ডেশন আয়োজিত শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অ্যানিমেশন অ্যান্ড পাপেট ফর টিভি শীর্ষক সম্মেলনে রিসোর্স পারসন হিসেবে অংশগ্রহণ। ১৯৯১ সালে সিঙ্গাপুরস্থ এশিয়ান মাস কমিউনিকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টার আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরূপে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯২ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় ইউনিসেফ আঞ্চলিক দফতর নেপালে অনুষ্ঠিত মা ও শিশুর উন্নয়ন বিষয়ক সেমিনারে অংশগ্রহণ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্বদান, ১৯৭৬ সালে মস্কোয় অনুষ্ঠিত চলচ্চিত্র উৎসবে নেতৃত্বদান, ১৯৮০ সালে হংকং-এ অনুষ্ঠিত এশিয়ান সাংস্কৃতিক উৎসবে অনুষ্ঠান পরিচালকরূপে অংশগ্রহণ, ১৯৮৬ সালে সিউলে অনুষ্ঠিত এশিয়া গেমসে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের নেতৃদ্বদান, তাসখন্দে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পাপেট সম্মেলনে বাংলাদেশ পাপেট দলের নেতৃত্বদান ও পাপেট শো প্রদর্শন, ১৯৯৮ সালে কলিকাতায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পাপেট ফেস্টিভালে অংশগ্রহণ, ২০০০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহ্যাগেন-এ অনুষ্ঠিত শিশুদের জন্য পাপেট শো ও পাপেট কর্মশিবির পরিচালনার দলনেতা হিসেবে যোগদান, ২০০১ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পাপেট ফেস্টিভালে অংশগ্রহণ ছাড়াও মুস্তাফা মনোয়ার দেশে-বিদেশে অনে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তিনি পাপেট ভিত্তিক বাংলাদেশের পাপেট থিয়েটার ও অ্যানিমেশন শিল্পকলায় আধুনিকতার প্রচলনে অগ্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। টেলিভিশন অনুষ্ঠান প্রযোজনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনুষ্ঠান নির্মাণশৈলীতে মুন্সিয়ানা ও মৌলিকতার স্বাক্ষর রাখেন। এ ক্ষেত্রে সেক্সপীয়রের টেমিং অব দি শ্রু-র বাংলায় অনুবাদিত নাটক ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ এবং কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকবরী’ বিশেষভাবে দর্শকদের মন জয় করে। ১৯৭২ সালে বিটিভি থেকে প্রচারিত শিশু প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে বহুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠান নতুন কুঁড়ির রূপকার, বিশিষ্ট নৃত্য পরিচালনাকারী এবং সঙ্গীত পরিচালক। তাঁর নির্মিত অনুষ্ঠান দেশে এবং বিদেশে উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। স্ত্রী মেরী মনোয়ার সরকারি কলেজের অধ্যাপিকা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। একমাত্র কন্যা নন্দনী মনোয়ার যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থনীতিতে ব্যাচেলর অব সায়েন্স ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ছেলে সাদাত মনোয়ার যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান চালনায় প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স লাভ করেন এবং বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানের পাইলট হিসেবে কর্মরত আছেন।
মেধাবী, গুণী, সৃজনশীল, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার তার শিল্পগুণের জন্য বহুবিধ পুরস্কার ও সম্মান অর্জন করেছেন। মুস্তাফা মনোয়ার চারুকলার ক্ষেত্রে গৌরবময় অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়াও দেশে-বিদেশে বহুবার পুরস্কৃত হয়েছেন। তাঁর উল্লেখােগ্য পুরস্কারগুলোর মধ্যে আছে ১৯৫৭ সালে কলিকাতার একাডেমী অব ফাইন আর্টস আয়োজিত নিখিল ভারত চারু ও কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিকস শাখায় শ্রেষ্ঠ কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ স্বর্ণপদক লাভ, ১৯৫৮ সারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ছাত্র চারুকলা প্রদর্শনীতে তৈলচিত্র ও জলরং শাখয় শ্রেষ্ঠ কর্মের জন্য দুইটি স্বর্ণপদক লাভ, ঢাকায় টেলিভিশন অনুষ্ঠান প্রযোজনার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য সাইট অ্যান্ড সাউন্ড পত্রিকা কর্তৃক স্মারক লাভ, ১৯৯০ সালে টিভি নাটকের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য টেনাশিনাস পদক লাভ, ১৯৯১ সালে ন্যাশনাল রাইটার্স গিল্ড-এর বাংলা নববর্ষ পুরস্কার লাভ, শিশু শিল্পকলা কেন্দ্র কিডস কালচারাল ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম কর্তৃক সম্মাননা পদক ১৯৯৯ লাভ। দৈনিক মুক্তকণ্ঠের আনন্দ ভুবন এবং ফেন্টাসি কিংডম কর্তৃক ২০০৩ সালে লাইভ টাইম অ্যাচিভমেন্ট সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হন, মেরিল প্রথম আলো কর্তৃক নাটক পরিচালনায় বিশেষ সমালোচক পুরস্কার ২০০৩ এ ভূষিত। ইউরো বিনোদন বিচিত্রা অ্যাওয়ার্ড ২০০৩, টেলিভিশন অঙ্গনে অবদানের জন্য ২০০৩ সালে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) কর্তৃক পুরস্কার ২০০৩-এ ভূষিত হন। এছাড়া চিত্রশিল্পী, নাট্য নির্দেশক এবং পাপেট নির্মাণের অবদানের জন্য শিশু কেন্দ্র থেকে ২০০২ সালে সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হন। নাটক পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০২ সালে পদক লাভ করেন। বাকি জীবন তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতে চান।