জঙ্গিবাদ দমনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সাফল্য : ড. মিল্টন বিশ্বাস

22
Social Share

চলতি মাসে ঢাকাস্থ সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দু’টি গুরুত্ব পূর্ণ মামলার রায় ঘোষিত হওয়ায় জঙ্গিবাদের মূল-উৎপাটনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান কামালের আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

১০ ফেব্রুয়ারি(২০২১) জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যায় সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকসহ আট জঙ্গি সদস্যের ফাঁসির রায় হয়েছে।২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর অর্থাৎ প্রায় ছয় বছর আগে কুপিয়ে হত্যার মামলাটি সুষ্ঠু তদন্ত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা হয়।দণ্ডিতদের মধ্যে জিয়া ও আকরাম পলাতক। বাকিরা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছে। তারা সবাই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্য বলে পুলিশের ভাষ্য। অন্যদিকে ১৬ ফেব্রুয়ারি (২০২১) বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যার মামলায় সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হক ওরফে জিয়াসহ পাঁচ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড এবং উগ্রপন্থি ব্লগার শফিউর রহমান ফারাবীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বইমেলা থেকে ফেরার পথে ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন অভিজিৎ। এ ঘটনায় দণ্ডিত সবাই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হত্যাকারী জঙ্গি সদস্যরা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু। এজন্য জঙ্গিবাদ দমনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাঁধে চাপটা বেশি।উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছিলেন, সেনাবাহিনীতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার পর পালিয়ে জঙ্গিনেতার খাতায় নাম লেখানো সৈয়দ জিয়াউল হকের গতিবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে। ‘মাস্টারমাইন্ড’ জিয়ার অনুসারীদের প্রায় সকলকে ধরা হয়েছে। জিয়াও ধরা পড়বে বলে তিনি মনে করেন।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে তিন বছর অতিবাহিত হওয়ায় সেসময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, ‘চ্যালেঞ্জ অনেক। হঠাৎ হঠাৎ নানান ধরনের ষড়যন্ত্র হয়। কারণ বাংলাদেশে ষড়যন্ত্রের অভাব নেই। আমাদের সেই ষড়যন্ত্র আজকে নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে যে জায়গায় নিয়ে গেছেন। তাতে ষড়যন্ত্র করবে না, এমন চিন্তাই আমরা করি না। ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলেই দায়িত্ব পালনে চ্যালেঞ্জ অনেক।

২.

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দক্ষ পরিচালনার পুরস্কার হিসেবেই ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই আসাদুজ্জামান খানকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যোগ্যতা, দূরদর্শিতা আর সঠিক নেতৃত্বগুণের জন্য আজ তিনি সফল মন্ত্রীদের একজন। দেশ পরিচালনায় শেখ হাসিনাকে যারা সর্বাঙ্গীনভাবে যোগ্যতার সঙ্গে সহায়তা করে আসছেন তাদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্যতম। দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের মাধ্যমে তিনি বর্তমানে বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম এবং গুরুতত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয় হল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়টিকে সফলতার সঙ্গে পরিচালনায় অনবদ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন মাননীয় মন্ত্রী জননেতা আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করা মান্যবর মন্ত্রী বর্তমানে ঢাকা মহানগর (উত্তর) আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদে একজন সাংসদ নির্বাচিত হন এবং ১২ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনেও তিনি বিপুল ভোটে জয়ী মন্ত্রীত্ব বজায় রাখেন।তাঁর দেশ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং দক্ষতা ও যোগ্যতার তুলনা নেই। তাঁর নেতৃত্বে এখন পর্যন্ত সুনামের সঙ্গে দেশ পরিচালনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে।

বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে (২০০৯-২০১৩) জঙ্গিবাদ দমনে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সকল ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁরই গৃহীত কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ জঙ্গিমুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনার দেখানো পথ এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মত জঙ্গিবাদের রসাতলে পতিত না হয় যেন, সেই প্রত্যয় নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর এর পরিচালনায় যে মানুষটির অসামান্য অবদান তিনি হলেন আসাদুজ্জামান খান কামাল। মন্ত্রী মহোদয় আসাদুজ্জামান খান কামালের লক্ষ ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট। কারণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানবসম্পদ ও জীবনের নিরাপত্তা প্রদান, উদ্ধার অভিযান বা তৎপরতা, অপরাধদমন, অপরাধী শনাক্তকরণ, জল ও স্থল সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান রোধ, প্রবাস ও অভিবাসন সম্পর্কিত নীতিমালা বা চুক্তি প্রণয়ন, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধ, মাদকদ্রব্য চোরাচালান রোধ, মানবপাচার রোধ ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম বৃহৎ মন্ত্রণালয় হিসেবে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। নাগরিকের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর, সুখী ও শান্তিপূর্ণ আবাসভূমি নির্মাণের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিরলস ও বদ্ধপরিকর।

৩.

লেখাবাহুল্য যে, শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের শক্তিশালী মন্ত্রণালয়ের একজন যোগ্য কর্ণধার হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়নের মাধ্যমে বিগত সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করেছেন আসাদুজ্জামান খান। দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়নের প্রধান কারণ, ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক শিল্পমন্ত্রীকে আহবায়ক করে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটির সভা প্রতি ২ মাস অন্তর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৩ জন মন্ত্রী/ প্রতিমন্ত্রীসহ সারাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে এ কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে (২০০৯-২০১৩) জঙ্গিবাদ দমনে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিসহ উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম গ্রহণ ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে সভাপতি করে ১৭ (সতের) সদস্যের জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ এবং প্রতিকার কমিটি গঠন করা হয়।  তাঁর নেতৃত্বেই আইন-শৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) (সংশোধন) আইন ২০১৪ (আইনটির মেয়াদ ৫ বছর বৃদ্ধি) করা হয়। মোবাইল কোর্ট (সংশোধন) আইন ও বিধিমালা প্রক্রিয়াধীন আছে। সন্ত্রাস বিরোধী আইন-এর বিধিমালা ২০১৪ প্রণীত হয়েছে।

বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আমলেই ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ‘জননিরাপত্তা’ ও ‘সুরক্ষা সেবা বিভাগ’- এই দুই নামে ভাগ করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। ‘জননিরাপত্তা’ বিভাগের অধীনে রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা  বাহিনী, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, তদন্ত সংস্থা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিআরসি)। ‘সুরক্ষা সেবা’ বিভাগের অধীনে আছে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, কারা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩শ ৩ জন জনবল ছিল। বর্তমানে তা ২ লাখ ৫ হাজারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৮ সালে নারী পুলিশ সদস্য ছিল মাত্র ২৫২০ জন। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ৭৬৭ জন। পুলিশবাহিনীতে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ৫০ হাজার পদ সৃজনের নীতিগত সিদ্ধান্তের পর পর্যায়ক্রমে ৫০ হাজার পদ সৃষ্টির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়াও পুলিশ পরিদর্শক পদকে ২য় শ্রেণি থেকে ১ম শ্রেণিতে এবং উপ-পুলিশ পরিদর্শককে ৩য় থেকে ২য় শ্রেণিতে উন্নীতকরণ করা হয়েছে, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবদান। পুলিশের নতুন নতুন উইং সৃষ্টি হয়েছে। যেমন, এ বাহিনীতে শিল্পাঞ্চল পুলিশ, টুরিস্ট পুলিশ, নৌপুলিশ, পিবিআই, এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ, ৩০টি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার এসপিবিএনসহ মোট ১০টি নতুন ইউনিট তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ পুলিশের কর্মরত থাকার ব্যাপারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মন্ত্রী মহোদয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ৭টি ফর্মড পুলিশ ইউনিটে ১২১১ জন পুলিশ সদস্য কর্মরত আছেন। এরমধ্যে ১৬০ জন নারী সদস্য। নতুন ২টি র‌্যাব ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়েছে। র‌্যাবের জন্য একাধিক হেলিকপ্টার ক্রয় করা হয়েছে। পুলিশের জন্যও ২টি হেলিকপ্টার টিওএন্ডইতে অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্রয় সম্পন্ন হয়েছে।

বর্তমান মন্ত্রীর আমলেই পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) এলআইসি শাখা গঠন করা হয়। বিশেষ অপরাধ তদন্তের জন্য গঠন করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ডিএমপি-এর কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের অভিযানে আসে একের পর এক সাফল্য। নব্য জেএমবি’র শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার কিংবা নিহত হয়। আলোচিত মামলাগুলোর তদন্তও সফলভাবে শেষ করেছে পুলিশ। এতে কমেছে জঙ্গি তৎপরতা। একইসঙ্গে সংঘবদ্ধ অপরাধ, হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই ও দস্যুতার হারও কমেছে অনেকখানি। বিশেষত বন ও জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অন্যতম অবদান যা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। অন্যদিকে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাজকে গতিশীল করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। বর্তমান সরকারের এক সংসদ অধিবেশনে ৫ গ্রামের বেশি ইয়াবা পাওয়া গেলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮’ পাস করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ এবং অধিদপ্তরকে ৩টি পিকআপ, দুটি মাইক্রোবাস, ২৯ ধরনের যন্ত্রপাতি ও ১৫০টি কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়েছে। প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প ২০১৯ সালের মধ্যে শেষ হয়েছে।দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্থা ‘কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কৈকা) ও বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

৪.

২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গি দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যকর পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করায় জঙ্গি দমনে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ আজ ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ইতিবাচক ভূমিকা ও অবদান গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। কারণ বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা রোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সবসময়ই তৎপর রেখেছেন তিনি। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হওয়ার পর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দৃষ্টান্ত রয়েছে জঙ্গিসদস্যকে গ্রেপ্তারের। ধরার পর বিচারে ফাঁসি হয়েছে কয়েকজন দুর্ধর্ষ জঙ্গি সদস্যদের। জঙ্গিদের অনলাইন তৎপরতা রোধে এখন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে নিশ্চিন্তে কাজ করাচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি ফেসবুক, গুগলসহ বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্ম এবং স্মার্টফোন অ্যাপ নির্মাতাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সখ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যাতে প্রয়োজন হলে দ্রুত সাইবার ক্রাইমের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া যায়। আসলে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে এলিট ফোর্স র‌্যাব, বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াটসহ পুলিশের সকল ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থাকে জঙ্গিবিরোধী অভিযান ও কার্যক্রম জোরদার করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।’ এদেশের মানুষ ধর্মীয় উগ্রবাদিতা ও তাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত জঙ্গিবাদকে ঘৃণা করে। দেশের অগ্রগতি ও নিরাপত্তার জন্য সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বড় ধরনের অন্তরায়। এই অন্তরায় দূর করার জন্য গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ‘পুলিশ’ ও ‘র‌্যাব’ বাহিনীর সফল অভিযানে শীর্ষ স্থানীয় জঙ্গি নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গ্রেপ্তার ও নিহত হয় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলা-বারুদ উদ্ধার করা হয়। ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান হামলার পর এ পর্যন্ত যতগুলো অপারেশন পরিচালিত হয়েছে তার সবগুলো থেকেই জঙ্গিগোষ্ঠী আঘাত হানার পূর্বে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে জঙ্গি আস্তানাসমূহ গুড়িয়ে দিয়েছে। জঙ্গি দমনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ফলে বর্তমানে জঙ্গি তৎপরতা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে এবং জঙ্গি দমনে এ সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। উপরন্তু জনগণের নিরাপত্তা এবং দেশের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর উদ্যোগে ‘কতিপয় বিষয়ে জঙ্গিবাদীদের অপব্যাখ্যা এবং পবিত্র কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা’ শীর্ষক প্রকাশিত পুস্তিকা এখন সকলের হাতে। অন্যদিকে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বিবেচিত হওয়ায় ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় ২০২০ সাল পর্যন্ত ৭টি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জঙ্গিবাদ এবং জঙ্গিবাদের অর্থায়নে জড়িতদের কার্যকরভাবে দমনের লক্ষ্যে সরকার সন্ত্রাস বিরোধী আইন-২০০৯ (সংশোধনী-২০১৩) এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ প্রণয়ন করেছে। সরকারের আন্তরিকতা এবং গৃহীত নানা পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তি শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। জনগণের প্রত্যাশা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ দমনে মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশনা অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য, জঙ্গি হিসেবে এযাবৎ যতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের অধিকাংশই ৪টি সংগঠনের। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলো হচ্ছে: জেএমবি, নব্য জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ওরফে আনসার আল ইসলাম ও হিযবুত তাহরির। জেএমবি গঠিত হয়েছে জামায়াতের প্রাক্তন সদস্যদের নিয়ে। আল-কায়েদার অনুসারী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে শিবিরের মানুষ। হিযবুত তাহরিরের সঙ্গে সরাসরি জামায়াতের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া না গেলেও দল দুটির মধ্যে মতাদর্শগত মিল রয়েছে; এরা ওয়াহাবী ধারার জিহাদি। গবেষকরা জানিয়েছেন, বিদেশি অর্থ ছাড়াও জামায়াতী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মুনাফার ৪০ হাজার কোটি টাকা প্রতি বছর বিনিয়োগ হচ্ছে জঙ্গি চাষাবাদে। এদের নিষিদ্ধ করে নির্মূল করা হলে বন্ধ হবে জঙ্গিবাদ। আর জঙ্গিবাদের বিলোপের মাধ্যমে নিশ্চিত হবেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বিজয়।

দেশব্যাপী ২০২০ সালের মধ্যে পরিচালিত অনেকগুলো অভিযানের মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদ দমনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সাফল্য দেখিয়েছেন যা পূর্ববর্তী বছরের মতো সরকার ও জনগণের কাছে সুনাম অর্জন করেছে। এসময় তারা চাঞ্চল্যকর অপরাধে জড়িত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনেছেন। তবে ২০১৬ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৬টির বেশি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানো হয়। এতে ৪৬ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। তাদের ৩৫ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী জঙ্গি। এছাড়া বাকি ৫ জন শিশু। ২০১৬ সালের ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’, ‘অপারেশন স্টোর্ম-২৬’, ‘অপারেশন হিট স্ট্রং ২৭’, ‘অপারেশন রূপনগর’, ‘অপারেশন আজিমপুর’, ‘স্পেইট-এইট’, ‘অপারেশন শরতের তুফান’, ‘অপারেশন হারিনাল’, ‘অপারেশন গাজীরাস্ট’, ‘অপারেশন কাপমারা’, ‘অপারেশন রিপল ২৪’ প্রভৃতি জঙ্গিবাদ বিরোধী অপারেশনে মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশনা ছিল। ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা ছিল নব্য জেএমবির। র‌্যাবসহ পুলিশের যৌথ টিমের অভিযানে (আগস্ট বাইট) সেই পরিকল্পনা নসাৎ করে দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অদূরে পশ্চিম নাখালপাড়া এলাকায় জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় র‌্যাব। সেখানে অভিযানে তিন জেএমবি সদস্য নিহত হয়। উদ্ধার করা হয় গ্রেনেড, বিস্ফোরক ও অস্ত্র। এর পরও ২০১৮ থেকে ২০২০ এর মধ্যে দেশের ভেতর জঙ্গি তৎপরতা ও তার বিরুদ্ধে অভিযানের আরো তথ্য রয়েছে।

অর্থাৎ জঙ্গি সদস্যরা এখনও নানা কৌশলে সক্রিয়। এমন বাস্তবতায় জঙ্গিরা আইনের আশ্রয় নিয়ে জামিনে মুক্ত হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। একথা সত্য দীর্ঘ নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্নেষণ, প্রযুক্তিগত ও স্থানীয় তদন্তের পর জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতারকৃত জঙ্গি সদস্যদের তথ্যের ভিত্তিতেও গ্রেফতার হয় অনেক জঙ্গি। এরপরও তাদের অনেকে জামিনে বের হয়ে আবারও একই কাজে যুক্ত হচ্ছে। এতে জঙ্গি কার্যক্রম পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছে না। জামিন পাওয়া সবাই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। আর এসব জঙ্গির জামিনে উদ্বিগ্ন আমরা সাধারণ জনগণ।

৫.

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম থেকেই জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আপোসহীন অবস্থানে রয়েছেন এবং নিরলসভাবে কাজ করছেন। তাঁর নির্দেশনা ও কর্ম তৎপরতার কারণেই সারাদেশে একযোগে বোমা বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন সময়ে নাশকতা সৃষ্টিকারী জঙ্গি সংগঠনসমূহের শীর্ষ সারির নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্নস্তরের নেতা কর্মীদেরকেও গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা সম্ভবপর হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে কারো কারো মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে, কেউ কেউ বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করেছে এবং বেশকিছু মামলা এখনো বিচারাধীন। তবে, যে সকল জঙ্গি এখনো আত্মগোপন করে আছে তাদের তৎপরতা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। পুলিশ ও র‌্যাবের কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযানের ফলে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেতা কর্মীরা পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে বার বার ব্যর্থ হয়েছে এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে আটক হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের ‘আর অ্যান্ড ডি সেল’একটি গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান। এটি র‌্যাব কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন অপারেশন, অপরাধ ও অপরাধী চক্র, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ, চরমপন্থী জঙ্গিবাদ, ইভটিজিং, এসিড-সন্ত্রাসসহ সমসাময়িক ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণাকার্য পরিচালনা ও গবেষণাপত্র তৈরির কাজ করে আসছে। র‌্যাব সদর দপ্তরে অবস্থিত এ সেলটি মহাপরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন এবং চরমপন্থী দলের উত্থান, সাংগঠনিক কার্যক্রম, গতিপ্রকৃতি ও বিস্তার ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে এ সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে চরমপন্থী ও জঙ্গি দমনে র‌্যাবের করণীয় দিকগুলো এ সেলের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। (সূত্র : ওয়েবসাইট) অর্থাৎ র‌্যাবের আছে জঙ্গিবিরোধী আলাদা ইউনিট। আর সেখানে জঙ্গিদের তথ্য সংগ্রহ, জঙ্গিবিরোধী অভিযান এবং তদন্ত চলে। তারা যৌথ অভিযানেও অংশ নেন। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারির হামলার পর গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সহায়তায় একের পর এক জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে জঙ্গিসদস্যদের নির্মূল করা হচ্ছে। এসব অভিযানের কারণে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে জনজীবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ফিরে এসেছে।

তবে জঙ্গিবাদ উত্থানের কিছু কারণ রয়েছে সেগুলো বন্ধ না হলে জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল হবে না। অন্যদিকে মনে রাখা দরকার জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর যে সাফল্য, যে অর্জন, সেটা অকল্পনীয়। বিশ্বের বহু দেশ এটা করতে পারেনি। ১৭ কোটি মানুষের দেশে জঙ্গিসদস্য এবং তাদের আস্তানা খুঁজে বের করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মেধাবী ও চৌকস অফিসাররা যে অপারেশনগুলো করছেন, তা বিরল ঘটনা। তাদের কাজের প্রধান উৎসাহদাতা হলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি।

লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস,  ইউজিসি পোস্ট ডক ফেলো এবং বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, [email protected]