‘চুকনগর গণহত্যা: পাক বর্বরতার ইতিহাস’

Social Share

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী  বাহিনীর হাত থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের উপর নয় মাস ধরে টানা সশস্ত্র আক্রমনের ফলাফল ।

এই সময়ে বাঙালি জনগণের উপর  পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল সেটি ধারাবাহিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এই গণহত্যার বেশিরভাগ অংশই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে লেখা হয়নি, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রীয় প্রকাশিত নথিতেও নেই। ১৯৭১ সালের ২০ শে মে খুলনা জেলার চুকনগরে পাক বাহিনী একটি ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। এই গণহত্যাটি ‘চুকনগর গণহত্যা’ নামে পরিচিত, এটি মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত সবচেয়ে ভয়ংকর গণহত্যার মধ্যে একটি । কমপক্ষে দশ হাজার মানুষ-যার মধ্যে পুরুষ, মহিলা এবং শিশুদের হত্যা করেছিল। ‘চুকনগর শহীদ স্মৃতিসৌধ’ বা ‘চুকনগর মারটাড মেমোরিয়াল’ নামে একটি স্মৃতিসৌধ সেই নৃশংস ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে।

চুকনগর ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার অন্তর্গত একটি ছোট শহর। ১৯৭১ সালের মে মাসের শুরুর দিকে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরে খুলনা অঞ্চলের অনেক মানুষ পাকবাহিনীর আক্রমণের ভয়ে নিজেদের আশ্রয়স্থল থেকে পালিয়ে যায়। যখন তারা জানতে পারে যে এলাকার কুখ্যাত জামায়াতে ইসলামীর নেতা মাওলানা ইউসুফ (১৯৭১ সালের ৫মে) একটি ‘রাজাকার বাহিনী’ গঠন করেছে এবং খুলনা সিটি ও তার আশেপাশের এলাকার লোকদের উপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে, তখন লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মূল রাজাকার শিবিরটি নগরীর টুটপাড়া এলাকায় ছিল, যা স্থানীয়ভাবে ‘ভূতের বাড়ি’ নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালের ১৫ মে নাগাদ, আশেপাশের এলাকা থেকে আগত প্রচুর শরণার্থী চুকনগরে জড়ো হওয়ায় ওই অঞ্চলে পাকিস্তানি হামলার একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তাই তারা সীমান্ত পথে ভারত পালাতে সেখানে একত্রিত হয়েছিল। ধারণা করা হয় যে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর ও গোপালগঞ্জ থেকে প্রায় দশ হাজার লোক সেখানে জড়ো হয়েছিল।

২০শে মে, হাজার হাজার শরণার্থী চুকনগর, পাটখোলা (বর্তমানে ঝাউতলা), মাল্টিয়া এবং ভদ্রা নদীর তীরে আশ্রয় নিয়েছিল। হঠাৎ, দিনের শুরুর দিকে (সকাল দশটায়) সাতক্ষীরা থেকে দুটি ট্রাকে করে সেমি-অটোমেটিক রাইফেল এবং লাইট মেশিনগান দিয়ে সজ্জিত প্রায় ৩০ জন সদস্যের একটি পাকিস্তানি বাহিনী সেখানে পৌঁছে যায়। তারা পাটখোলে অবস্থান নিতে থাকে এবং জড়ো হওয়া বাঙালি শরণার্থীদের দিকে গুলি চালায়। সেনাবাহিনী পরে চুকনগর বাজারের দিকে যেতে থাকে এবং দুপুর ৩ টা অবধি গুলি চালিয়ে যেতে থাকে।পাক বাহিনী তাদের লাইট-মেশিনগান এবং সেমি-অটোমেটিক রাইফেলগুলি থেকে মুহুর্তের মধ্যেই গুলি করে তাদের সেখানে হত্যা করে এবং সমস্ত ধর্মের বাঙালিদের উপর দিবালোকে গুলি চালাতে থাকে। এই হত্যাযজ্ঞ থেকে পালিয়ে যাওয়ার  ব্যর্থ প্রচেষ্টায় অনেকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুবে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি প্রাণবন্ত শহর মৃত্যুর শহরে পরিণত হয়। স্থানীয় লোকজন পরে মৃতদেহগুলি নিষ্পত্তি করার জন্য লাশগুলো নদীতে ফেলে দেয়। যেহেতু পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা সেদিন কয়েক মিনিটে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল তাই এটিকে অবশ্যই বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তম গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

মৃতদেহের উপরে মৃতদেহ ছিল। মৃত বাচ্চাদের তাদের মৃত মায়েদের কোলে পাওয়া গেছে। স্ত্রীরা তাদের প্রিয় স্বামীদের গুলি থেকে রক্ষা করার জন্য জড়িয়ে ধরেছিল। বাবারা তাদের মেয়েদের রক্ষা করার জন্য জড়িয়ে ধরেছিলেন। চোখের পলকের মধ্যে, তারা সকলেই কেবল মৃতদেহ। ভদ্র নদীতে রক্ত প্রবাহিত হয়ে লাশের নদীতে পরিণত হয়েছিল। কয়েক ঘন্টা পরে পাক বাহিনীর গুলি চালিয়ে যাওয়ার পর, তারা বেয়নেট দিয়ে বাকী লোককে হত্যা করে।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ থেকে পাক বাহিনীর গণহত্যা শুরু করার লক্ষ্য ছিল যাতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক শাসন থেকে বাঙ্গালীদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কমানো যায়। নয় মাসের যুদ্ধে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীরা সারা দেশে ৩ মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করেছিল। এ ছাড়া, পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে ২ লক্ষেরও বেশি নারী  নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছিলেন। হাজার হাজার বাড়িঘর লুট করা হয়েছিল এবং পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, গ্রামগুলি বিধ্বস্ত হয়েছিল, ১০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ তাদের জীবন বাঁচাতে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। এত অল্প সময়ে এত সংখ্যক মানুষের মৃত্যু পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন, যে কারণে এটি বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ গণহত্যা হিসাবে বিবেচিত হয়।তবে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত অস্বীকার করে চলেছে যে সেখানে গনহত্যা হয়েছিল এবং তারা এই নৃশংসতার জন্য ক্ষমাও চায়নি। তারা নির্লজ্জভাবে  পাকিস্তান দিবস এবং কাশ্মীরের সংহতি দিবস পালন করে চলেছে।

এখন পাকিস্তানের উচিত ইসলামি চরমপন্থা সমর্থনের আদর্শ থেকে সরে আসা। পাকিস্তানের উচিত ছিল বাংলাদেশের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া- এটি এমন একটি বিষয় যা বাংলাদেশ এবং তার জনগণ বহু দশক ধরে যথাযথভাবে দাবি করেছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তান তার প্রতিবেশীদের সাথে মতবিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ নিতে না পারার কারণেই এই অঞ্চলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইরান পাকিস্তানকে সন্দেহের সাথে দেখছে, আফগানিস্তান পাকিস্তানকে খুব কম বিবেচনায় রেখেছে, জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গিবাদের আশ্রয়দানে পাকিস্তানের ভূমিকা প্রমানিত করে ভারত জনসংযোগ যুদ্ধে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জিতেছে, এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব, দুটি ঐতিহাসিক মিত্র দেশ এখন পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে ভারতের সাথে হাত মিলিয়েছে। এখন তারা  চীনকে এই অঞ্চলের একমাত্র নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসাবে দেখছে এবং সেই ঝুড়িতে পাকিস্তান তার সমস্ত ডিম ফেলেছে। যদিও চীন পাকিস্তানের পক্ষে কৌশলগত মিত্র, তবুও এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সাথে তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে, যে দেশগুলির সাথে পাকিস্তানের খুব ভাল সম্পর্ক রয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে চীনও ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে নতুন দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি।

যখন আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশে পাক সামরিক গণহত্যার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সাহসী এবং অনুকরণীয় যুদ্ধাপরাধের বিচার করেছে তখন এই বছরের মুজিববর্ষ ও আগামী বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ৫০ তম বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে এখনই সময় আন্তর্জাতিক আদালতে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানি আর্মির বিচার চাওয়া। এটি গণহত্যার দিন হিসাবে “চুকনগর গণহত্যা” নামে ইতিহাসে এর স্থানকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে সহায়তা করবে।