চীনে জন্মহার নিয়ন্ত্রণ: দম্পতিদের তিনটি পর্যন্ত সন্তান নেবার অনুমতি

47
Social Share

চীন ঘোষণা করেছে সে দেশে দম্পতিরা এখন থেকে তিনটি পর্যন্ত সন্তান নিতে পারবেন। আদমশুমারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে দেশটিতে জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে পড়ে গেছে।

বহু দশক ধরে কঠোরভাবে ‘এক সন্তান নীতি’ অনুসরণের পর ২০১৬ সালে চীন তা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে জানায় সব দম্পতি দুটি সন্তান নিতে পারবেন। কিন্তু এরপরেও চীনে জন্মহার স্থায়ীভাবে বাড়েনি।

শহরগুলোতে সন্তান বড় করার ক্রমবর্ধমান খরচ বহু চীনা দম্পতির জন্য একটা বড় অন্তরায় হিসাবে কাজ করেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে পলিট ব্যুরোর বৈঠকে সর্বসাম্প্রতিক এই পদক্ষেপ অনুমোদন করেছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

শিনহুয়া বলেছে নতুন এই পদক্ষেপ কার্যকর করতে দেশটির জনসংখ্যা কাঠামো উন্নয়নে সহায়তামূলক পদক্ষেপও নেয়া হবে।

জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া কী?

“জন্মসংখ্যা বাড়ানোর চাবিকাঠি যদি জন্ম নিয়ন্ত্রণ নীতি শিথিল করার সাথে সম্পর্কিত হতো, তাহলে বর্তমান দুই-সন্তান নীতি চালু করার পর সেটা কাজ করার কথা ছিল,” রয়টার্স সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন হাও ঝৌ, কমার্সব্যাংকের একজন অর্থনীতিবিদ।

“তিনটি সন্তান কে চায়? তরুণ দম্পতিরা বেশি হলেও দুটির বেশি সন্তানে আগ্রহী নয়। মূল বিষয়টা হল জীবনযাপনের খরচ খুবই বেশি এবং বেঁচে থাকার জন্য চাপও বিশাল।”

চীনে এক নারী শিশুকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটছেন
চীনে গত বছর জন্মেছে এক কোটি ২০ লাখ শিশু। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল এক কোটি ৮০ লাখ

আরেকজন শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ঝিওয়েই ঝাং রয়টার্সকে বলেছেন যে শুরুতে “এর কিছু ইতিবাচক প্রভাব হতে পারে, কিন্তু সেটা বড় কিছু হবে না”।

“সন্তান মানুষ করার খরচ- বিশেষ করে শিক্ষা এবং আবাসনের খরচ- যদি সরকার সফলভাবে কমাতে পারে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে এর ফল পড়তে পারে,” তিনি বলেন।

সামাজিক মাধ্যমে নতুন এই পদক্ষেপ নিয়ে চীনাদের মধ্যে তেমন উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যায়নি।

“তিনটি সন্তান! আমি তো একটা সন্তানও চাই না,” ব্লগিং সাইট ওয়েইবোতে লিখেছেন একজন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী।

“আপনি কি জানেন তরুণ প্রজন্মের বেশির ভাগেরই নিজেদের দেখাশোনা করতে নাভিশ্বাস উঠছে?”

বিবিসিকে বলেছেন বেইজিংয়ের বাসিন্দা এক তরুণী। তার কথায় “আমি নিজের কথা ভাবতে চাই, সন্তান নেয়া ও তাকে বড় করার অনবরত দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়তে চাই না।”

আদমশুমারি কী বলছে?

এ মাসের গোড়ায় আদমশুমারির তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে দেখা যাচ্ছে চীনে গত বছর জন্মেছে এক কোটি ২০ লাখ শিশু। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল এক কোটি ৮০ লাখ- অর্থাৎ জন্মহার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। ১৯৬০এর দশকের পর এটা শিশুজন্মের সর্বনিম্ন হার।

এইআদমশুমারির জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ২০২০-র শেষ দিকে। ৭০ লাখ তথ্য সংগ্রহকারী চীনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে।

কাজেই যে পরিমাণ মানুষ জরিপের আওতায় এসেছে তা বিশাল এবং চীনের জনসংখ্যার এই হিসাব খুবই ব্যাপক মাত্রায় সংগৃহীত তথ্যের ফসল। ভবিষ্যত পরিকল্পনার জন্যও এই হিসাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছিল যে শুমারির ফল প্রকাশ হওয়ার পর চীন পরিবার নিয়ন্ত্রণ নীতি শিথিল করবে।

White space
চীনা নারীর কোলে শিশু বেইজিংয়ের রেল স্টেশনে A
চীনে নতুন ঘোষিত তিন সন্তান নীতিতে রাষ্ট্রীয় মাধ্যমে খুবই উদ্দীপনার সাথে তুরে ধরা হচ্ছে, কিন্তু বহু চীনাই বেশি সন্তান নিতে আগ্রহী নন

রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় হৈচৈ বনাম জনমত

চীনের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়াগুলো “তিন সন্তান নীতি” নিয়ে তুমুল হৈচৈ ফেলে দিয়েছে বলে জানাচ্ছেন চীনা মিডিয়া বিশ্লেষক কেরি অ্যালেন।

সংবাদপত্র পিপলস্ ডেইলি, রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল সিসিটিভি এবং সংবাদ সংস্থা শিনহুয়া তাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে আজ বাচ্চাদের হাসিমুখের নানা কার্টুন ছবি পোস্ট করছে এবং খুব সাড়ম্বরে নতুন নীতির “আগমন” ঘোষণা করছে।

জনপ্রিয় সামাজিক নেটওয়ার্ক সিনা ওয়েইবোতে শীর্ষ আলোচনার বিষয় এই নতুন নীতি। তারা পোস্টিং দিয়ে বলছে নতুন নীতি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ মতামত দিচ্ছে, মন্তব্য করছে লাখ লাখ মানুষ।

তবে সব জনমত কিন্তু উদ্দীপনার নয়।

শিনহুয়ার ইতিবাচক পোস্ট নিয়ে মন্তব্য করেছেন ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষ এবং যারা এই নীতির সমালোচনা করে মন্তব্য করেছেন তাদের পোস্টেই লাইক পড়েছে বেশি।

অনেকেই বেশি সন্তানের চাপ নিতে রাজি নয় বলে মন্তব্য করেছে “এমনিতেই চাপের ঠেলায় আমরা হিমশিম” মন্তব্য করেছেন একজন।

অনেকেই “কর্মক্ষেত্রে সঙ্কটের” কথা তুলে ধরেছেন। মাতৃত্বকালীন বা পিতৃত্বকালীন ছুটি নেবার পর কাজে ফিরে যাওয়ার সমস্যা, মাতৃত্বকালীন এমনকি সাধারণ সুযোগসুবিধার অভাবের কথাও উঠে আসছে সামজিক মাধ্যমে।

চীনা নারী
চীনে অনেক নারী এখন সন্তান পালনের চেয়ে কেরিয়ার তৈরির দিকে বেশি করে ঝুঁকছেন

চীনের শ্রম বাজারও যেভাবে সঙ্কুচিত হয়েছে, তাতে তরুণ চীনাদের এখন অনেক বেশি ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। ওভারটাইম এবং বাড়তি সময়ের কাজ এখন তরুণদের জন্য নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর চীনে মেয়েরা এখন উচ্চ শিক্ষা এবং চাকরিবাকরির দিকে ঝুঁকছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। তারা অল্প বয়সে বিয়ে করে সন্তান নিতে আগের মত আগ্রহী নন।

চীনের আগের নীতি কী ছিল?

এমনকি ২০১৬ সালে যখন চীন বিতর্কিত এক সন্তান নীতির অবসান ঘটিয়ে দম্পতিদের দুটি সন্তান নেবার অনুমতি দেয়, তখন নীতি পরিবর্তনের পর দুবছর জনসংখ্যা বাড়লেও তা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

ইকনমিস্ট ইন্টালিজেন্স ইউনিটের প্রধান অর্থনীতিবিদ মিজ ইউয়ে সু বলছেন: “দুই সন্তান নীতির একটা ইতিবাচক প্রভাব জন্মহারের ওপর পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা ছিল স্বল্প মেয়াদী।”

চীনে জন্মসংখ্যা বৃদ্ধি ঠেকাতে ১৯৭৯ সালে যে এক সন্তান নীতি চালু করা হয়েছিল, দীঘদিন চালু থাকা সেই নীতির প্রভাব দেখা গেছে চীনের জনসংখ্যা কাঠামোয়।

কঠোর সেই নীতি না মানলে জরিমানার বিধান ছিল, আইন অমান্যকারীদের শাস্তি হিসাবে চাকরিচ্যুত করা হতো এবং কখনও কখনও বাধ্যতামূলক গর্ভপাতও কের দেয়া হতো।

ওই আইনের ফলে চীনে নারী পুরুষের সংখ্যায় ভারসাম্যের বিশাল অভাব তৈরি হয়েছে। দেশটিতে এমনতেই ঐতিহাসিকভাবে পুরুষদের প্রাধান্য নারীদের চেয়ে বেশি।

“বিয়ের বাজারে এটা বড়ধরনের সমস্যা তৈরি করেছে, বিশেষ করে যেসব পুরুষ আর্থসামাজিক ভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে তাদের জন্য,” বলছেন সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মু ঝেং।

চীনে বিয়ে করছেন এক দম্পতি
চীনে নারী পুরুষ সংখ্যায় ভারসাম্যের বিশাল অভাব তৈরি হয়েছে। পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় কয়েক লাখ বেশি হয়ে গেছে, ফলে পুরুষদের বিয়ের জন্য নারী পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে

চীন কি তার জন্ম নিয়ন্ত্রণ নীতি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেবে?

চীনে সর্বসাম্প্রতিক এই আদমশুমারির আগে বিশেষজ্ঞরা আঁচ অনুমান করছিলেন যে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তুলে নেয়া হবে। তবে দেখে মনে হচ্ছে চীন এ ব্যাপারে সতর্কতার সাথে এগোতে চাইছে।

কোন কোন বিশেষজ্ঞ বলছেন সে ধরনের পদক্ষেপ “অন্য ধরনের সমস্যার” জন্ম দিতে পারে। তারা ইঙ্গিত করছেন এ ধরনের পদক্ষেপ শহর ও গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি করবে।

বেইজিং এবং শাংহাইয়ের মত বড় এবং ব্যয়বহুল জীবনযাত্রার শহরে নারীরা সন্তান নেবার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবে না বা তেমন উৎসাহ দেখাবে না। কিন্তু জনসংখ্যার লাগাম না টানলে গ্রাম এলাকায় প্রথাগতভাবে নারীদের অনেক সন্তান হবার প্রবণতা বাড়বে। কারণ, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথাগত ভাবে চীনারা বড় পরিবার চায়।

সরকারের নীতি নির্ধারণের সাথে যোগাযোগ আছে এমন একজন বিশেষজ্ঞ বলছেন এর ফলে গ্রামীণ পরিবারগুলোর মধ্যে দারিদ্র ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে।

বিশেষজ্ঞরা আগে এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন যে চীনের জনসংখ্যা কমে গেলে বিশ্বের অন্যান্য দেশে তার বিশাল প্রভাব পড়তে পারে।

উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিজ্ঞানী ড. ই ফুক্সিয়ান বলছেন: “চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে খুব দ্রুত এবং বিশ্বের বহু শিল্প চীনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে চীনের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব হবে চীনের জন্য খুবই নেতিবাচক।”