চতুর্থবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা, জয় পেলেও সামনে কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

চতুর্থবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা, জয় পেলেও সামনে কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ভিনিউজ ডেস্ক:

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরলেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারুকে পরাজিত করে জয় নিশ্চিত করেছেন ৮০ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক। তবে নির্বাচনে জয় পেলেও নতুন মেয়াদে লুলাকে মোকাবিলা করতে হবে রাজনৈতিক বিভাজন, বিরোধী কংগ্রেস, অর্থনৈতিক চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মতো নানা চ্যালেঞ্জ।

ভোট গণনা শেষে লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারু পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২৪ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ প্রায় ৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন লুলা। প্রথম দফার নির্বাচনে ৪ অক্টোবর ফ্লাভিও বলসোনারুর কাছে পিছিয়ে পড়েছিলেন তিনি। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে নির্বাচনী সমীকরণ পাল্টে দিয়ে লুলার এই প্রত্যাবর্তনকে ব্রাজিলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারু। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় নিজের বাড়ির সামনে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ফলাফলকে ‘অসম্ভব’ ও ‘ব্যাখ্যাতীত’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তিনি। সুপ্রিম কোর্টের ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের নিয়ম পরিবর্তন করা হয়েছে। যদিও বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলা নির্বাচনী আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ৪৪ লাখ ভোটের ব্যবধানে পরাজয়ের পর নির্বাচন বাতিলের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

লুলার রাজনৈতিক উত্থান ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একসময় ধাতুশ্রমিক হিসেবে কাজ করা লুলা ১৯৮৯ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তাঁর প্রথম দুই মেয়াদে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’র মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার কৃতিত্ব পান তিনি। ২০১১ সালে ক্ষমতা ছাড়ার সময় তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল ৮০ শতাংশের বেশি।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে কারাবাস তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে সংকটে ফেলে। ১৮ মাসের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর ২০২১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল হয়। এর ফলে ২০২২ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারুকে পরাজিত করে ক্ষমতায় ফেরেন।

এবারের নির্বাচনে আমাজন বনাঞ্চল সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। লুলার সমর্থকেরা তাঁকে পরিবেশ সুরক্ষার প্রবক্তা হিসেবে দেখেন। তবে আমাজন নদীর মোহনার কাছে সমুদ্রসীমায় তেল অনুসন্ধানের পক্ষে তাঁর অবস্থান পরিবেশবাদীদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। লুলার যুক্তি, তেলের আয় ব্যবহার করেই ব্রাজিলের পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের অর্থায়ন করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নতুন মেয়াদে লুলাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন লাতিন আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব বজায় রাখা এবং চীনের উপস্থিতি সীমিত করতে আগ্রহী। অন্যদিকে লুলাকে চীনঘনিষ্ঠ নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফ্লাভিও বলসোনারু নির্বাচিত হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিপরীতে লুলা স্পষ্ট করে বলেছেন, ব্রাজিল অন্য কোনো দেশের ‘পেছনের আঙিনা’ হয়ে থাকবে না।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন। প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোটার ফ্লাভিওকে সমর্থন করেছেন। পাশাপাশি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক যুগের সবচেয়ে ডানপন্থী কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে লুলাকে। কংগ্রেসে বলসোনারুর লিবারেল পার্টির অগ্রগতি তাঁর নীতিনির্ধারণ ও সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলতে পারে।

নির্বাচনের আগে লুলা বলেছিলেন, ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে আরও ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। কিন্তু ৮১ বছর বয়সে নতুন মেয়াদ শুরু করতে যাওয়া এই নেতার সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে নির্বাচনী বিজয়কে কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনায় রূপ দেওয়া। চতুর্থ মেয়াদ শেষে তাঁর বয়স হবে ৮৫ বছর। ফলে এই মেয়াদ শুধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়ই নয়, ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

-বিবিসি অবলম্বনে

পূর্বের খবরঅক্টোবরের প্রথম ২৪ দিনে দেশে ২১৩ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে
পরবর্তি খবরপোশাক পড়া নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন বলিউড অভিনেত্রী কৃতি স্যানন : দিলেন কড়া জবার
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!