চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গন্ডামারা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ত্রিমুখী সংঘর্ষে ৫ জন নিহতের নেপথ্যের ঘটনা

48
Social Share

শনিবার সকালে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গন্ডামারা ইউনিয়নে বেসরকারি কোম্পানি ‘এস আলম গ্রুপের’ নির্মাণাধীন ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক অসন্তোষের জের ধরে শ্রমিক-পুলিশ ও এলাকাবাসীর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষে ৫ জন নিহত এবং অন্তত ১২ জন আহত হয়েছে। বাঁশখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আজিজুল ইসলাম বিদ্যুৎকেন্দ্রে সংঘর্ষের কথা নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় আমাদের ছয় পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। জানা যায়, এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি শুরু থেকেই চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সহযোগীতা ও নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে। এলাকাবাসী জানায়, একটি বিদেশী দেশের মদদে শ্রমিক-মালিক ও এলাকাবাসীর মধ্যে মতবিরোধ শুরু থেকেই চলে আসছে। জমি অধিগ্রহনকে কেন্দ্র করে তাদের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত এলাকাবাসী মেনে নিতে পারেনি।

দীর্ঘদিনের ক্ষোপ থেকেই আজকের এই সংঘর্ষ। তাছাড়া আজকের এই ঘটনার জন্য হাত রয়েছে বিদেশী ওই কোম্পানীর।যারা শ্রমিক-মালিক এবং এলাকাবাসীর মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে কয়েকদিন ধরেই বেতন ভাতাসহ বেশ কিছু দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ চলছিলো। শ্রমিকরা তাদের বকেয়া পরিষদের জন্যও দাবি জানিয়ে আসছিলো। এসব নিয়ে আজ তারা সেখানে অবরোধের ডাক দিয়েছিলো। আর শ্রমিকরা সেখানে জমায়েত হলে তখনি প্রকল্পের বিদেশী শ্রমিক ও পুলিশের সাথে স্থানীয় শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপরই পুলিশ এতোপাতারি গুলি চালায়।

প্রসঙ্গত, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে এলাকার জনমত শুরু থেকেই বিভক্ত হয়ে পড়ে। তারা আরো জানান, এর আগেও ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকায় এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গা অধিগ্রহণ নিয়ে স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষের ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছিলেন। ওই সময়ে বেশ কিছুদিন ধরে ওই এলাকায় স্থানীয় এক বিএনপিনেতার নেতৃত্বে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জায়গা অধিগ্রহণ নিয়ে আন্দোলন চলেছিল।

এরপর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতেও কেন্দ্রটি নিয়ে মতবিনিময়সভা চলাকালে সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে শ্রমিক সরবরাহ করে বাইরের কোম্পানি। তাদের সাথে শ্রমিকদের টাকা পয়সা নিয়ে অনেকদিন ধরেই সমস্যা চলছিলো। ঘটনাটি কম্পাউণ্ডের ভেতরে। আমাদের সেখানে প্রবেশও করতে দেয়া হয়না।

পুলিশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-মহাপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, বাঁশখালীর ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের সবাই শ্রমিক। তিনি জানিয়েছেন, গত দুইদিন ধরে শ্রমিকদের কিছু দাবি-দাওয়া নিয়ে সেখানে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কিছু সমাধান হয়েছিল, কিছু সমাধান হয়নি। শনিবার সকালে কিছু উত্তেজিত শ্রমিক সেখানে গিয়ে বিক্ষোভ করতে শুরু করে এবং যানবাহনে ভাংচুর চালায়, অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে তাদের চারপাশ থেকে ঘেরাও করে ফেলে। ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, বেতন-ভাতা নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের বিরোধ চলছিল। সকালে শ্রমিকরা বিক্ষোভের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ সেখানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। চারপাশ থেকে ইটপাটকেল মারা হচ্ছিল। তাদের সামনে পিছনে যাওয়ার মতো কোন অবস্থা ছিল না। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আছে।

চট্টগ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির বলছেন, এলাকাটি এখন পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে ঠিক কতজন মারা গেছে বা আহত হয়েছে সেটি তিনি বলতে পারেননি।

বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শফিউর রহমান মজুমদার বলেন, চারজনকে মৃত অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়। এছাড়া আহত ১২ জনকে আনা হলে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই শিলব্রত বড়ুয়া বলেন, আহতদের একজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। নিহতরা হলেন- আহমদ রেজা (১৮), রনি হোসেন (২২), শুভ (২৪), মোহাম্মদ রাহাত (২২) ও রায়হান (১৮)।নিহত প্রথম চারজনের বাড়ি বড়ঘোনা এলাকায়।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, শ্রমকিদের বেশকিছু দাবি-দাওয়া ছিল। এসব তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দিতে চাচ্ছিল। শনিবার সকালে অসন্তাষ বাড়তে থাকে এবং পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে স্থানীয় লোকজনও জড়িয়ে পড়ে।

বাঁশখালী উপজেলা হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. শওকত হোসেন বলছেন, এ মূহুর্তে চারটি মৃতদেহ আমাদের হাসপাতালে আছে। তারা হাসপাতালে আসার আগেই মারা গেছেন। তাদের শরীরে গুলির চিহ্ন আছে। এর বাইরে আহত আছে আরও ১২ জন।