ঘুরে আসুন হিমালয়-কন্যা পঞ্চগড়

576
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হিমালয় কন্যা পঞ্চগড়। এই পঞ্চগড়ের গ্রামে গ্রামে রয়েছে আম, কাঁঠাল আর সুপারির কুঞ্জবন। যেদিকে যাবেন সেদিকে দেখবেন সবুজ-শ্যামলের শোভা। মনে হবে এখানে ‘সোনা ঝরায় আকাশ আর সোনা ফলায় মাটি। আহা আমার সোনার দেশ, এই মাঠের মানুষ মাঠে আর সোনার ফসল কাটে’ গানের এই কথাগুলো।
হিমালয়ের কাছাকাছি বাংলাবান্ধা থেকে বোদা পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত মাইল উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত পঞ্চগড় জেলা। এখানে কয়েকদিন বেড়িয়ে প্রবল আনন্দ পাবেন। তেঁতুলিয়া, বোদা, দেবীগঞ্জ আর আটওয়ারীÑএর যে জায়গায় যাবেন, দেখবেন সবই যেন সবুজ-সবুজ। মন হারানোর এমন শোভা আপনাকে প্রকৃতির কাছে টানবে। পঞ্চগড়ের উত্তরে হিমালয়, বক্ষে রয়েছে মহানন্দা, করতোয়া, চাওয়াই নদী। একদা এই এলাকা ছিল বনভূমি। তখন শিকারিদের পদভারে পঞ্চগড় কম্পিত হতো। পঞ্চগড় সদর থেকে দশ মাইল উত্তরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অবস্থিত।
ঢাকা থেকে পঞ্চগড় যাওয়ার জন্য সড়কপথে দূরপাল্লার পরিবহন রয়েছে। এসব পরিবহন ছাড়ে গাবতলী থেকে। পৌঁছতে সময় লাগে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। রাত যাপন করার জন্য এখানে আবাসিক হোটেল রয়েছে। তাই পঞ্চগড়ে গিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।
প্রথমে গিয়ে পাঁচটি গড় ঘুরে দেখুন। মীরগড়ে একদা মোঘল সেনাপতি মীরজুমলা একটি গড় নির্মাণ করেন। পঞ্চগড় থেকে এর দূরত্ব আড়াই মাইল পশ্চিমে। সেখানে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। কালক্রমে মীরগড় নামে জায়গাটি ইতিহাসে স্থান পায়।
ভিতরগড় গিয়ে দেখবেন এখানে ইট-বিছানো রাস্তাঘাট রয়েছে। একদা এখানে শহর গড়ে উঠেছিল। আজ তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এখানে এখন শুধুই রয়েছে নানান জাতের গাছপালা। এখানে একদা পৃথ্বী নামে এক রাজা বাস করতেন। বহিঃশত্র“র আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য তিনি গড় নির্মাণ করেছিলেন। একটি বিরাট দীঘিও খনন করান তিনি। অবশেষে এক দুর্ধর্ষ জাতির আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপা খুঁজে না পেয়ে তিনি সপরিবারে সেই দীঘিতে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। গড়গুলো এখনও আছে। বিভিন্ন আকৃতির ইট দ্বারা গড়গুলো নির্মিত হয়েছিল।
রাজনগড়ও ঘুরে দেখুন। বখতিয়ার খিলজি পঞ্চগড়ের উপর দিয়ে তিব্বত অভিযান করেছিলেন, সে সময়ে এর নাম ছিল রাজনগড়। করতোয়া নদী আর করতোয়া ব্রিজ ঘুরে দেখুন। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালে দেখবেন, নদী প্রায় শুকিয়ে গেছে। বালু চিকচিক করছে কোথাও কোথাও। যেদিকে তাকাবেন তখন মনে হবে নদীর দুই কূলে সবুজ-শ্যামল রূপ সব যেন উছলে পড়েছে। কখনওবা মনে হবে ‘মহুল ফুলে জেমেছে মৌ, হিজল ডালে ডাহুক ডাকে’ গানের কথা।

মহানন্দ নদীতীরের তেঁতুলিয়া
মহানন্দা নদীর একপাড়ে বাংলাদেশ, অপরদিকে ভারত। তেঁতুলিয়া হলো বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের উপজেলার শহর। তেঁতুলিয়ায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ।
পঞ্চগড় থেকে বেশিদূরে নয় তেঁতুলিয়া। পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়ায় যেতে একঘণ্টা সময় লাগবে। তেঁতুলিয়ার প্রধান আকর্ষণ ডাকবাংলো, মহানন্দা নদী, চা-বাগান, জিরো পয়েন্ট, তেঁতুলগাছ, পাইলট স্কুল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ক্ষেত্রে তেঁতুলিয়ার আলাদা একটি মর্যাদা ও ভূমিকা আছে। বাংলাদেশের মধ্যে এটিই একমাত্র থানা যেটি সবসময়ের জন্য মুক্ত ছিল। কয়েকশত বছর আগে এই জায়গায় ছিল বনাঞ্চল। তখন জীবজন্তু বাস করত।
তেঁতুলিয়া নামের উৎপত্তির সঙ্গে তেঁতুলগাছ জড়িয়ে আছে। প্রজাদের মধ্যে যারা সঠিক সময়ে খাজনা দিতে পারত না তাদেরকে তেঁতুলগাছের গোড়ায় বেঁধে রাখা হতো। আর এই থেকে ‘তেঁতুলিয়া’ নামকরণ হয়েছে। তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলোটির নির্মাণকৌশল অনেকটা মধ্যযুগীয় জমিদারি ভবনের মতো। এখানে চারদিকে নির্জন নিরিবিলি। আরো আছে গাছগাছালি। ডাকবাংলো সংলগ্নে রয়েছে একটি বেদি। এটি স্বাধীনতাযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছিল।
মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত মনোরম অথচ নির্জন তেঁতুলিয়ায় তিন-চার দিন ঘুরে আসতে পারেন। একই সঙ্গে আবছা মেঘের মতো হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘাও দেখা হবে। তেঁতুলিয়ার পরেও আরো ১০ মাইল উত্তরে যেতে পারেন বাংলাবান্ধায়। বাংলাদেশের শেষসীমা বাংলাবান্ধয় বসে শিলিগুলি শহর অস্পষ্টভাবে দেখা যায়। দূরে সড়কের উপর দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে, লোকজন পায়ে হেঁটে চলছে। ওখানে গিয়ে গাড়ি যাচ্ছে, লোকজন পায়ে হেঁটে চলছে। ওখানে গিয়ে দূর থেকে হিমালয়কে স্পষ্টভাবে দেখে আপনি হারিয়ে যাবেন আরেক ভুবনে।
তেঁতুলিয়াকে বলা হয় ‘হিমালয়-দুহিত’। ১৯৮১ সালের উপজেলা ঘোষণা হওয়ার আগে তেঁতুলিয়া ছিল অনুন্নত একটি জনপদ। যোগাযোগ ছিল দুর্গম। সে অবস্থা পরিবর্তন ঘটেছে। উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে তেঁতুলিয়ায়। বৃহত্তর দিনাজপুরের উত্তরে তেঁতুলিয়ায় যাবেন ঠাকুরগাঁও আর পঞ্চগড় হয়ে। আসলেই পঞ্চগড় জেলার অনিন্দ্যসুন্দর এই উপজেলা।
যেখানে থাকবেন : তেঁতুলিয়া রাত যাপন করার জন্য মহানন্দা নদীতীরে ডাকবাংলো রয়েছে। মহানন্দা ডাকবাংলো, ফরেস্ট বাংলো এবং সরকারি অন্যান্য বিভাগের রেস্ট হাউস আছে। অনুমতি নিয়ে এসব স্থানে রাত কাটানো যাবে।
তেঁতুলিয়ার আয়তন ৭৪ বর্গমাইল। মহানন্দা নদীর তীরে টিলার ওপরে ডাকবাংলোটি দেখে অভিভূত হবেন। এর নির্মাণকৌশল অনেকটা মধ্যযুগীয় জমিদারি ভবনের মতোই। এটি বর্ধমানের রাজা ১০০ বছর আগে নির্মাণ করেন। রাজা ্েকানে বিশ্রাম নিয়েছেন বহুদিন। ডাকবাংলো সংলগ্নে দেখবেন একাত্তরের বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত একটি বেদি। দক্ষিণপাশে পিকনিক কর্নার। এখানে রয়েছে উদ্যান, দোলনা, বসার বেঞ্চ।
বনভোজন করতে যারা আগ্রহী তারা তেঁতুলিয়ার পিকনিক কর্নারে যেতে পারেন। পিকনিক করার সুযোগে সর্ব উত্তরের তেঁতুলিয়াও দেখা যাবে। পশ্চিমে মহানন্দা নদীর। সকালে কিংবা বিকেলে মহানন্দা নদীর তীরে টিলার ওপরে বেড়াতে পারেন। খরস্রোতা মহানন্দার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে আপনার। মনে রাখবেন, সূর্যাস্তে এখানে বেড়াতে খুবই আনন্দদায়ক।
তেঁতুলিয়া থেকে ১০ মাইল দূরে করতোয়া নদীর তীরে। ভজনপুর এখানের মাটির খনন করলেই পাওয়া যায় পাথর। ভজনপুর দেখেও মুগ্ধ হবেন।
শালবাহান জায়গাটি খুবই সুন্দর। তেঁতুলিয়ার কাছেপিঠেই শালবাহান। এখানে একটি প্রাচীন পুকুর দেখবেন।
বাংলাবান্ধা আরও সুন্দর। তেঁতুলিয়ার উত্তরে বাংলাদেশের শেষপ্রান্তে এই বাংলাবান্ধা। এখানে দেখবেন বৈকুণ্ঠপুরের জঙ্গল। একদা এখানে দেবী চৌধুরানী এবং ভবানী পাঠকের অবাধ বিচরণক্ষেত্র ছিল।
পঞ্চগড়ের বোদায় দেখবেন উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কীর্তি। বোদেশ্বরী মন্দিরটি বেশি আকৃষ্ট করবে। নির্জন এলাকায় এটি অবস্থিত। ঐতিহাসিক আউলিয়া মাজারেও যাবেন। বোদা থেকে ৮ মাইল পূর্বদিকে করতোয়া ও ঘোড়ামারা নদী সন্নিকটে আউলিয়ার মাজার।
দেবীগঞ্জে যেতে ভুলে যাবেন না কিন্তু। একদা দেবীগঞ্জে ছিল কোচবিহার মহারাজের প্রধান কার্যালয়। এখানকার নীলকুঠিপাড়ায় দেখবেন নীলকরদের আবাসভূমি। স্মৃতিবিজরিত এই জায়গা দেখে অতীতযুগে ফিরে যাবেন।
পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্থানে অজস্র নুড়িপাথর রয়েছে। ভজনপুর থেকেই বেশি পাথর উত্তোলন করা হয়। এসব নুড়িপাথর দিয়ে উৎকৃষ্টমানের কাচ তৈরি করাও সম্ভব।
পঞ্চগড়ের যেদিকে যাবেন সেদিকেই বেড়ানোর মনোরম পরিবেশ পাবেন। ডিসম্বের-জানুয়ারি মাসে মানেই শীত, তাই শীতের সময়ে পঞ্চগড় থেকে ঘুরে আসা মানেই আলাদা এক ধরনের মজা। তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে অস্পষ্টভাবে দেখা মানেই তা হৃদয়ে গেঁথে থাকা। তাই বারবার পঞ্চগড়ে যেতে মন চাইবে।
বিভিন্ন তথ্য : পাঁচ গড়ের সমষ্টি হলো পঞ্চগড়। এ গড়গুলো হলোÑ মীরগড়, রাজনগড়, ভিতরগড়, বোদেশ্বরী গড় আর হোসেন গড়। পঞ্চগড় জেলার ৫টি উপজেলা। এগুলো হলোÑ পঞ্চগড় সদর, বোদা, তেঁতুলিয়া, দেবীগঞ্জ আর আটওয়ারী। পঞ্চগড় জেলার আতন প্রায় ১,৪০৫ বর্গকিলোমিটার। এই জেলায় আছে নয়নী বুরুজ, আটেয়ারী জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, দেবীগঞ্জের, দেবোত্তর স্টেট এবং কাছারিবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ও মন্দির, মির্জাপুর শাহী মসজিদ, মোঘলী কেল্লা, মহারাজার দীঘি, ময়দান দীঘি, বোদা মন্দির, বারো আউলিয়ার মাজার, জগবন্ধু ঠাকুরবাড়ি।
পরিবহনের খোঁজখবর : ঢাকা থেকে পঞ্চগড় যাওয়ার জন্য বসুন্ধরা, কেয়া, কান্তি হানিফ এসব পরিবহন রয়েছে।
হোটেলের খোঁজখবর : রাত যাপন করার জন্য পঞ্চগড়ে বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে, যেমনÑ রাজনগড়, প্রীতম, ইসলাম, হিলটন।
পাঁচটি গড়ের কাহিনী : পঞ্চগড়ের কাছে পিঠে মীরগড়। এখানে মোঘল সেনাপতি মীরজুমলা গড় নির্মাণ করেছিলেন।
ভিতরগড় এলাকায় পৃথ্বী নামে এক রাজা বাস করতেন। বহিঃশত্র“র আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য তিনি গড় নির্মাণ করেছিলেন।
হোসেন দীঘির গড় বর্তমানে ভারতে। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহের নাম। সুলতান হোসেন শাহ আর রাজত্বকালে দীঘি ও গড় নির্মাণ করেছিলেন।
বর্তমানে পঞ্চগড় যেখানে, একদা সে জায়গাটি রাজনগড় হিসেবে খ্যাত ছিল।
পঞ্চগড়ের অন্যান্য কীর্তি : পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় ঐতিহাসিক কীর্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ নয়নী বুরুজ, মোঘলী কেল্লা ভিতর গড়ের গড় ও দুর্গ, রকস মিউজিয়াম। অটেয়ারীতে রয়েছে চারশত বছর আগের পুরনো মসজিদ ও জমিদারবাড়ি। এখানের মির্জাপুরে দেখবেন প্রাচীন আমলের মসজিদ।