ঘুরে আসুন ঐতিহাসিক স্থান মেহেরপুর

40
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: সবুজ ধানক্ষেত, বন-বনানী, ফলের বাগান আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূতিকাগার অস্থায়ী রাজধানী ও ঐতিহাসিক মুজিবনগর মেহেরপুরে অবস্থিত বলে মেহেরপুর সবার পরিচিত। ভৈরব নদীর পূর্বতীরে এই প্রাচীন শহরটি অনেক পুরনো ইতিহাসের স্বাক্ষর। ষোড়শ শতাব্দীতে মেহের আলী শাহ নামক একজন বুজুর্গ দরবেশ মেহেরপুর শহর স্থাপন করেন বলে কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। এই দরবেশের নামানুসারেরই স্থানটির নাম হয়েছে ‘মেহেরপুর’।


মেহেরপুর জেলার উত্তরে কুষ্টিয়া জেলা, দক্ষিণে চুয়াডাঙ্গা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, পূর্বে কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। এ জেরার আয়তন প্রায় ৭১৬ বর্গকিলোমিটার। ভৈরব আর ইছামতি নদী এই জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে সুজলা শস্যশ্যামল করে তুলেছে। এই সবই মেহেরপুরের অন্যতম আকর্ষণ।
মেহেরপুর জেলার ২টি উপজেলা-মেহেরপুর সদর ও গাংনী। উল্লেখযোগ্য জায়গা হলো- কুতুবপুর, বুড়িপোতা, দরিয়াপুর, মোনাখালী, মোহাজনপুর, বাগওয়ান, ষোলটাকা, ধানধোলা, পিরোজপুর,আমদা, তেঁতুলবাড়িয়া, আমঝুপি প্রভৃতি।
যেখানে থাকবেন : মেহেপুরে রাত যাপন করার জন্য হোটেল গিনি, হোটেল মডার্ন রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন বিভাগের গেস্টহাউস ছাড়াও ডাকবাংলো রয়েছে এই শহরে।


মেহেরপুরে যা যা দেখবেন : মেহেরপুরের ভৈরবনদী তীরে ঘুরে বেড়াতে পারেন। আমবাগানের কাছে বেড়াতে আরো বেশি আনন্দ।
মেহেরপুর হতে ৬ কি.মি. দূরে কাজলা নদীর দক্ষিণে আমঝুপি। এখানে রয়েছে নীলকুঠি। নীলকুঠি দেখার সময় বারবার মনের কোণে এসে ভিড় করবে ইংরেজ আমলের কথা। নীলকুঠিকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে এই এলাকায় জমিদারি প্রতিষ্ঠিত হয়। নীলচাসের প্রধান দফতরকে কানসারণ বলা হতো। কানসারণগুলোর মধ্যে আমঝুপি ছিল অন্যতম। নীল বিদ্রোহের সময় এই কুটির ম্যানেজার পালিয়ে বেঁচে যান। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের আগে মেহেরপুরের এই আমঝুপি কুঠিতে রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে মীল জাফর ও অন্য ষড়যন্ত্রীদের শলাপরামর্শ হয়েছিল। আমঝুপি থেকে পলাশী দূরত্ব বেশি দূরে নয়। আমঝুপি তখন ছিল নদীয়া জেলার অন্তর্গত। পলাশীর যুদ্ধে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় ইংরেজপক্ষ অবলম্বন করেন।


বাংলার ইতিহাসে নীল চাষ ও নীল বিদ্রোহ ঘটনা একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। আমঝুপি এবং এর আশপাশে নীল উৎপাদিত হতো। মেহেরপুর জেলায় ব্রিটিশ আমলে বেশ কয়েকটি নীলকুঠি ছিল। এর মধ্যে আমঝুপি নীলকুঠিই ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একসময় মেহেরপুরের বিভিন্ন স্থানে জমিদারি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ইরেজশাসন প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে খ্রিস্টান মিশনারি ধর্মপ্রচারের ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করে। তাদের সাহায্য-সহযোগিতার দরুন লোকজন কর্মবিমুখ হয়ে পড়লে রাজস্ব বন্ধ করে দেয়া হয়।


পলাশী থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরে বৈদ্যনাথতলা আমবাগান। এক সময় এই জায়গা ছিল নদীয়ায়। দেশভাগের পরে কুষ্টিয়ার অভ্যন্তরে ছির বৈদ্যনাথতলা। মেহেরপুরের কাছে পিঠে বৈদ্যনাথতলা। এখন মুজিবনগর। এই মুজিবনগরকে কেন্দ্র করেই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষায়ী সংগ্রামে এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের বিপ্লবী সরকার সেদিন এই স্থানে কয়েকশ বিদেশি সাংবাদিক ও হাজার হাজার মানুষের সামনে শপথ গ্রহণ করেছিলেন।
একানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ দেখবেন। স্বাধীনতার এক যুগ পর এই মুজিবনগরে ১ কোাটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। স্মৃতিস্তম্ভের কাছেই রয়েছে একটি রেস্টহাউস, সীমান্ত ফাঁড়ি, একটি স্কুল ও একটি পার্ক।
মেহেরপুর থেকে মুজিবনগরের দূরত্ব মাত্র ২-০০ কিলোমিটার। স্কুটার নিয়ে এখানে যেতে পারেন। মুজিবনগর স্মৃতিসৌদ আপনাকে বেশি আকৃষ্ট করবে। ১৯৭১ সালে এই মুজিবনগরই ছিল বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী।

ঐতিহাসিক মুজিনগরকে দেখেও দেখার ইচ্ছে পূরণ হবে না। মনে হবে ‘স্মৃতিসৌধের পাশে যেন জীবনের অনেকগুলো বছর কাটিয়ে আসি…।’ মুজিবনগর আম্রকাননে কালবৈশাখীর গর্জনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে গর্জে উঠেছিল বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। এখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঘোষণা করেছিলেন : ‘বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষ আজ হানাদার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে নিয়োজিত। আমরা আমাদের এই জাতীয় দুর্দিনে বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক মানুষের কাছে সাহায্যপ্রত্যাশী।’ তাই মেহেরপুর ও মুজিবনগর দেখে বারবার সেই একাত্তরের ঘটনায় ফিরে যাবেন।
এই জেলায় আরও রয়েছে বল্লভপুর মিশন, বরকত বিবির মাজার, শেখ ফরিদের দরগাহ, বল্লভপুর শিবমন্দির, স্বামী নিগমানন্দের আশ্রম, ভাইকাড়া নীলকুঠি, সাহার কাঠি নীলকুঠি।