ঘুরে আসুন শেখ ফরিদের ফরিদপুর

59
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: কুমার নদীর তীরে অবস্থিত ফরিদপুর। সবুজ শ্যামলিমায় আচ্ছন্ন ফরিদপুর। কুমার নদী এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে এই ফরিদপুরের মধ্যদিয়ে। এই কুমারপাড়ের একটি জায়গায় নাম সোজান বাদিযার ঘাট। ফরিদপুরের জন্মগ্রহণ করেছেন পল্লী কবি জসীমউদ্দীন, বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী গীতি দত্ত ও সুধীরলাল চক্রবর্তী। ফরিদপুর শহরের পাশেই অম্বিকাপুর। এখানেই রয়েছে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবর। ‘তুমি যে অমর ওগো তুমি যে আমার’ গানখানি গেয়ে গীতা দত্ত অমর কণ্ঠশিল্পী হয়ে রইলেন। তেমনি ‘মুধর আমার মায়ের হাসি’ গানখানি সুধীরলাল চক্রবর্তীতে অমর করে রেখেছে।
ফরিদুরে দেখার আছেÑপল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বাড়িঘর, পারিবারিক গোরস্থান, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি কলেজ, সারদা সুন্দরী কলেজ, রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে কলেজ। শহর ছাড়িয়া একটু গাঁয়ের দিকে এগোলে দেখবেন ছায়ায় ঢাকা মায়ায় মাখা সবুজের প্রান্তর, গাছপালার সমাহার। আর এখানে দাঁড়ালেই শোনা যায় ‘বউ কথা কও’ পাখির ডাক। ‘বউ কথা কও’ শুনে শুনে সবুজ ধানক্ষেত্রের পাশ থেকে এগোলো খুঁজে পাবেন রূপসী বাংলাকে। এক এক সময় মনে হবে এমন সোনালি স্বদেশ, সুন্দর দেশ বুঝি আর কোথাও নেই।
ঢাকা থেকে ফরিদপুর যাওয়ার জন্য সড়কপথে বাস রয়েছে। মাত্র আড়াই ঘণ্টায় ফরিদপুরে পৌঁছা যায়। বাস ছাড়ে ঢাকার গাবতলী থেকে। শহরের ওপর থেকে বয়ে গেছে কুমার নদী। এই নদীর উপর রয়েছে কয়েকটি ব্রিজ। ব্রিজে দাঁড়িয়ে নদীর দু’কূলের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এই জেলায় রয়েছেÑগেরদা মসজিদ, কাতরাইল মসজিদ ও দীঘি, বাসুদেব মন্দির, ফতেহাবাদ টাকশাল, বাইশরশি জমিদারবাড়ি, জেলা জজকোর্ট ভবন।
হযরত শাহ ফরিদের নামানুসারেই ফরিদপুর নামকরণ হয়েছে। এর পূর্বনাম ফতেহাবাদ। এই ফরিদপুরে সর্বপ্রথম নিম্নবর্ণের লোকজন বসতি স্থাপন করেন। ইতিহাস বলে ২৭৩ খ্রিস্টপূর্বে মৌর্যসম্রাট অশোক ফরিদপুরের দক্ষিণাঞ্চলে বৌদ্ধ সংঘরাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গুপ্তযুগে এ-অঞ্চলে রাজাদের দূর্গ ছিল। ১৩৩০ সালের পর থেকে ফরিদপুর মুসলমানদের অধীনে আসে। ইংরেজ আমলে অর্থাৎ ১৮৫০ সালে ফরিদপুরকে জেলার মর্যাদা দেয়া হয়।
ফরিদপুরের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে কুমার নদী। পদ্মা, আড়িয়ালখাঁ আর মধুমতি নদীও রয়েছে। কুমার নদীর বিভিন্ন শাখা গিয়ে মিশেছে পদ্মায়। কুমার নদী ফরিদপুর হয়ে দীর্ঘপথ এঁকেবেঁকে মুকসুদপুরে চলে গেছে। এ নদীর পাড়ে রয়েছে উজানী রাজবাড়ি। কুমার নদীর তীরে দাঁড়ালেই মনে পড়বে ফরিদপুরের মেয়ে এককালের সাড়া-জাগানো কণ্ঠশিল্পী গীতা দত্তের গাওয়া ‘ঐ সুর ভরা দূর নীলিমায়, ঐ তারা ঘেরা স্বপ্নসীমায় সে তো চন্দ্রকলার বাঁকা নয় মোর মন’ কিংবা ‘নদীর বুকে ঢেউয়ের কল্লোল মাতন তুলেছে’ গানের কথাগুলো।
ফরিদপুর শহরের একপ্রান্তে অম্বিকাপুর। এখানে গিয়ে দেখুন পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বাড়িঘর, করবস্থান। এর চারদিকে নানান জাতের গাছগাছালি, বিল-ঝিল। পদ্মানদী বেশি দুরে নয়। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বাড়ির সামনে পারিবারিক বাগান ও কবরস্থান। বেশ কয়েকটি কবর দেখবেন এখানে। মাঝখানে রয়েছে একটি ডালিমগাছ। এর সংলগ্নে কবি জসীমউদ্দীনের কবর। সাজানো গোছানো। কবরস্থানের পরে পেছনে চার ভিটায় চারটি ঘর রয়েছে। তিনদিকে তিনটি টিনের ঘর রয়েছে। সামনের দিকে একটি একতলা দালান।
কবি যে-ঘরে বসে কবিতা লিখতেন সেই ঘরটি এখনও আছে। এটি ঘুরে দেখুন। কাছেই পদ্মানদী। পদ্মার কাছে দাঁড়িয়ে প্রমত্তা পদ্মার কথা বারবার মনে হওয়া স্বাভাবিক। কবির যখন যৌবন তখন এই পদ্মায় ছিল ভরাযৌবন। যৌবনেই তিনি লিখেছিলেন ‘কবর’ কবিতাটি। পল্লীকবির কবর দেখে মনে পড়বেÑ‘এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে, তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে’ কবিতার এই লাইনগুলো। পদ্মানদী বর্ষায় কিছুটা হলেও যৌবন ফিরে পায়। বিল-ঝিল, হাওরে তখন থাকে অথৈ পানি। সব যেন এখানে সবুজ সাজে সজ্জিত। দূরে কাশবন, এ দৃশ্যও দেখার মতো।
প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে অম্বিকাপুরে মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যার নাম ‘জসীম মেলা’। এই মেলায় আলোকসজ্জা করা হয়ে থাকে। পুতুল নাচ, নাগরদোলা, সার্কাস এসব অনুষ্ঠিত হয়।
ফরিদপুরের রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজটি দেখার মতো। চারদিকে গাছাগাছালি, এরই অভ্যন্তরে রাজেন্দ্র কলেজের বিভিন্ন ভবন। ১৯১৮ সালে ২৯ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে প্রথম ক্লাস শুরু হয়, যা আজকের রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের এক অম্লান ইতিহাস।
নৈসর্গিক দৃশ্যে শুধু তাকিয়ে থাকা ফরিদপুরের পথ চলতে গিয়ে শুনবেন বাউলের কণ্ঠে গান। এক এক সময় মনে হবে গ্রামবাংলায় এখনও বুঝি আনন্দের দিন আছে। তাই বারবার ফরিদপুরকে তাকিয়ে দেখতে মন চাইবে। এখানের সবুজের প্রান্তর, রাখালের বাঁশির সুর আপনাকে এতই মুগ্ধ করবে যে, এখানে গিয়ে ফিরে আসতে মন চাইবে না। ফরিদপুর এতই ভালো লাগবে যে, এখানের চিরসবুজ শ্যামল রূপ আপনার হৃদয়ে গেঁথে থাকবে।
ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত ফতেহাবাদ পরগনার জালালপুরে মহাকবি আলাওলের জন্ম, তাই এখানেও যাবেন। কবি আলাওলের জন্ম ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে। ফরিদপুরের ফতেহাবাদে গিয়ে আলাওলের স্মৃতিচি‎হ্ন পাওয়া যায় না এখন আর। তিনি ‘তোহফা’ আর ‘পদ্মাবতী’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। ১৬৭৩ সালে কবি আলাওল মারা যান।
যেভাবে যাবেন : ঢাকার গাবতলী থেকে সরাসরি অনেক পরিবহন রয়েছে ফরিদপুরে যাওয়ার জন্য। এছাড়া বরিশাল, গোপালগঞ্জ অথবা মাদারীপুরগামী বাস ছাড়ে। এর যে-কোনো একটি পরিবহনে উঠলে মাত্র আড়াই ঘণ্টার মধ্যে ফরিদপুর গিয়ে পৌঁছতে পারবেন।
যেখানে রাত কাটাবেন : ফরিদপুর শহরে রাত কাটানোর জন্য বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। যেমনÑ পদ্মা, র‌্যাফেলস ইন, লাক্সারি, জোনাকী, ইউনিক, প্যারাডাইস, সুপার, হোটেল পার্ক প্যালেস।
অন্যান্য তথ্য : পদ্মা-যমুনার দক্ষিণপাশে অবস্থিত নদীবিধৌত ফরিদপুর বদ্বীপীয় সমতল ভূমি দ্বারা গঠিত। ফরিদপুরের অন্য একটি নাম ছিল ‘ফতেহাবাদ’। হোসেন শাহ সর্বপ্রথম এই ফতেহাবাদের শাসনভার গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে কামেল পীর শেখ ফরিদের নামানুসারে এই জেলার নামকরণ করা হয় ‘ফরিদপুর’।
ফরিদপুর জেলা মোট ৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। উপজেলাগুলো হলÑ ফরিদপুর সদর, মধুখালি, সদরপুর, চরভদ্রাসন, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, নগরকান্দা আর আলফাডাঙ্গা। এ জেলার আয়তন প্রায় ২,০৭৩ বর্গকিলোমিটার।
বোয়াল নেই তবু বোয়ালমারী
বোয়ালমারী নামটি শুনে হয়তো অনেকেই বলবেন, ওখানে বুঝি বোয়ালমাছ মারা হচ্ছে, তাই নাম হয়েছে ‘বোয়ালমারী’। আসলে কী তাই! বোয়ালমারী নেমেই একজন পথচারীকে একথা বলতেই তিনি হাসলেন। ‘ভাইসাব বোয়ালমাছই তো দেখি না! আপনি বোয়াল মাছ কোথায় দেখলেন আর কোথাই বা মারা হচ্ছে। ‘বোয়ালমারী বাজারে গিয়েও বোয়ালমাছ দেখলাম না। তবুও নাম বোয়ালমারী। এখানে মধুমতি ও চন্দনা নদীতে একসময় বড় বড় বোয়ালমাছ একটা শিশুকে গিলে খেয়ে ফেলে। এরপর এলাকায় বোয়ালমাছ মেরে ফেলার হিড়িক পড়ে যায়। এভাবেই জায়গার নাম হয়ে গেল ‘বোয়ালমারী’।
দু-তিনদিন সময় হাতে নিয়ে এখানে আসতে পারেন। ফরিদপুর জেলারই এক উপজেলা মোট আয়তন ২৭২,৩৪ বর্গকিলোমিটার। নদী, খাল, বিল, সমতলভূমি এই উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ঘুরে দেখার জন্য আকর্ষণীয় জায়গায়ও এই বোয়ালমারী।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে বোয়ালমারী সরাসরি যায় সাউদিয়া ও জাকের পরিবহন। ভাড়া ১৫০ টাকা। সময় লাগে প্রায় ৪ ঘণ্টা। সকাল ৭টার পরিবহনে উঠলে বোয়ালমারী গিয়ে পৌঁছবেন বেলা সাড়ে ১১টার মধ্যে। ফরিদপুর থেকেও বোয়ালমারীতে যেতে পারেন।
যেখানে থাকবেন : রাত যাপন করার জন্য বোয়ালমারীতে প্রাইভেট হোটেল ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি বিভাগের গেস্টহাউস রয়েছে। আছে ডাকবাংলো।
যা যা দেখবেন : বোয়ালমারী সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে রাজাপুর গ্রামে গেলে দেখবেন নওয়াব আবদুল লতিফের বাড়ি। ইংরেজ আমলে যখন মুসলমান ঘরের ছেলেরা ইংরেজি শিখতে চাইত না তখন আবদুল লতিফ বাঙালি মুসলমানদের ইংরেজিভাষা শিক্ষার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর আহ্বানে মুসলমান ঘরের ছেলেমেয়েরাও ইংরেজিভাষা শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হন। এজন্য ব্রিটিশের পক্ষ থেকে আবদুল লতিফকে ‘নওয়াব’ খেতাব দেয়া হয়। আসল দেশ ছিল তাঁর বাগদাদে। নওয়াব আবদুল লতিফের ধবংশাবশেষ বাড়িটি পুরোনো স্মৃতি নিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। সম্মুখে রয়েছে একটি পুকুর। নওয়াব আবদুল লতিফ তাঁর কৈশোর জীবনের অনেকগুলো দিন এই বাড়িতেই কাটিয়েছেন। নওয়াব আবদুল লতিফের বাড়িটি ঘুর দেখতে পারেনÑদেখতে কোনো বাধা নেই।
বোয়ালমারী সদর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে নদের চাঁদ ঘাট। এই ঘাটে গিয়ে বারবার মনে পড়বে নদের চাঁদের কথা। একদা বাস্তবে তিনি একজন মানুষ ছিলেন। কামরূপ কামাখায় গিয়ে তিনি জাদু শিখে দেশে ফিরে এলে স্ত্রী তাকে বললেন, ‘তুমি জাদু শিখে এসেছ বেশ তো ভালো। জাদু দিয়ে দেখাও তো তুমি অন্য কিছু হয়ে গেছ’ গ্লাসে জাদুর পাখি ছিল। তা দেখিয়ে এবার নদে বললেন, ‘আমি কুমির হয়ে যাবে। এই গ্লাসে যে পানি দেখছ ওটা আমার গায়ে ছিটিয়ে দিলে আমি আবার মানুষ হব। ‘জাদু দিয়ে নদে কুমির হয়ে গেলে স্ত্রী তার স্বামীকে কুমিরের মতো দেখে চিৎকার দিয়ে উঠে দৌড় দিল। দৌড় দেয়ার সময় গ্লাসের পানি পড়ে গিয়ে গ্লাসটি ভেঙে গেল। জাদুর পানি না থাকায় নদে আর মানুষ হতে পারল না। মধুমতি নদীতেই তাকে চিরতরে চয়ে যেতে হলো। নদের মা যেখানে এসে ছেলের সঙ্গে দেখা করতেন সেই জায়গাটি পরবর্তী সময়ে হলে গের নদের চাঁদ ঘাট।
বোয়ালমারীর সাতৈরে গেলে দেখেবন ‘শাহী মসজিদ’, এটিকে বলা হয় অলৌকিক মসজিদ। রাতে আঁধারে নাকি এই মসজিদটি গড়ে উঠেছিলÑ একথাই বিশ্বাস করে এলাকাবাসী।
বোয়ালমারীর ভূষণায় গেলে জমিদারবাড়ি দেখতে পারেন। বিল চাপাদহ আরও আকর্ষণীয়। এক সময় বর্ষাকালে এই বিল সাগরের মতো রূপ নিত। তখন রাজা সীতারাম ওখানে নৌবিহার করার জন্য আসতেন।