ঘুরে আসুন লালমনির সেই লালমনিরহাট

42
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: এক সময়ে লালমনিরহাট ছিল জঙ্গলে আচ্ছন্ন। ব্রিটিশ আমলে এখানের জঙ্গল কেটে বসানো হয়। জঙ্গল কাটতে কাটতে কুলিরা হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে : ‘পেয়েছি। রাজার ধন মণি, লাল মণি।’ খবর ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। লালমনির সন্ধান পাওয়া গেছে। রেলস্টেশন স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে এখানে প্রাণের কল্লোল শুরু হলো, হাজার হাজার লাল বিল্ডিং ও অফিস নির্মিত হলো। সেই থেকে জায়গাটির নাম হয়ে গেল লালমনিরহাট সেই লালমনিরহাট এখন জেলাশহর। নাম লালমনিরহাট হলেও সবুজে সবুজে আচ্ছন্ন এই জায়গা। ঘুরে দেখার মতো সব সৌন্দর্য লালমনিরহাটে খুঁজে পাবেন। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত আর বসন্ত এর যে কোনো সময় লালমনিরহাট গিয়ে প্রবল আনন্দ পাবেন।
‘লালমনিরহাট’ নামকরণের অন্য ইতিহাস আছে। বিপ্লবী কৃষকনেতা নূরুলদিন, ফকির মজনু, শাহর ঘনিষ্ঠ সাথী ধনাঢ্য এক মহিলা, নাম তার লালমনি। তিনি কুলি, মজুর, কৃষকদের সংগঠিত করেন। তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবে নিহত হন। তারই নামে ‘লালমনিরহাট’ হয়েছে।
তিস্তা ও শিঙ্গীমারী নদী বয়ে গেছে এই জেলার ওপর দিয়ে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শেখ ফজলুল করিম, নূরুল দিন, ফজির মনজু শাহ্ এই জেলার কৃতী সন্তান।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, আদিতমারী, কালিগঞ্জ আর হাতীবান্ধা দেখার মতো জায়গা। ধান, পাট, তামাক, ইক্ষু, আলু, মরিচ, বাদাম, আদা এখানে প্রচুর পরিমাণ উৎপন্ন হয়। ক্ষেতে ক্ষেতে ফসলের ভরে থাকে সারাবছর। এখানের পাঠগ্রামের ধরলা নদী থেকে প্রচুর পরিমাণে উত্তোলিত নুড়ি দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয় যাওয়া হয়। উন্নতমানের বালুর কেন্দ্রের জন্য পাটগ্রাম খুবই সম্ভাবনাময় স্থান। শুধু তাই নয়, নুড়িপাথরের কেন্দ্রও হতে পারে এই জায়গায়।
ঢাকা থেকে লালমনিরহাটে যাওয়ার জন্য আন্তঃনগর ট্রেন রয়েছে। সড়কপথে রয়েছে বাস। দেশের অন্য যে কোনো পান্ত হতে লালমনিরহাটে যেতে পারেন।
লালমনিরহাটের কাছেই কালিগঞ্জ উপজেহলার কাঁকিনা গ্রামে কবি শেখ ফজলুল করিমের জন্ম। এই গ্রামে যেতে পারেন। লালমনিরহাট হতে কাঁকিনার দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। চিশতিয় মতাদর্শে বিশ্বাসী ফজলুল করিম ছিলেন একজন উদার হৃদয়ের মানুষ। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বন্ধনের উদ্দেশ্যে তিনি কাঁকিনা থেকে ‘বাসনা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন ১৯০৮ সালে। লালমনিরহাট থেকে কাঁকিনা যাওয়ার পথে পাটগ্রাম সড়কে কবির বাড়ির সামনে একটি স্মৃতিফলক দেখতে পাবেন। ১৯০০ সাল থেকে ১৯৩৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। কিন্তু ‘তৃষ্ণা’ ও ‘পরিত্রাণ’ নামে দুখানা কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন।
কবি শেখ ফজলুল করিমের বাড়ি ঘুরে দেখুন। কবির বাড়িতে তাঁর স্বহস্তে লিখিত ডাইরি, পানি খাবার পিতলের গ্লাস, তিনটি মেডেল, বাঁশের তৈরি কমলসহ কবির ব্যবহার্য অন্যান্য জিনিসপত্র দেখতে পাবেন। কবির বাড়ি দেখার পর তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত কবি শেখ ফজলুল করিম বালিকা বিদ্যালয়টি ঘুরে দেখুন।
লালমনিরহাটে দেখবেন সুবেদার মনসুর খাঁ মসজিদ, হারানো মসজিদ, সিন্দুরমতি পুকুর, হোসেন সরোবর। ঘুরে ঘুরে এসব প্রবল আনন্দ আছে। এসব দর্শনীয় স্থান দেখার পথে দেখবেন সবুজ শ্যামর প্রান্তর। মহেন্দ্রনগর, তিস্তা, মোগলহাট, লোহাখুচি, বড়দরগা, হাড়িভাঙ্গা, রাজাপুর এসব লালমনিরহাট জেলার উল্লেখযোগ্য জায়গা।
লালমনিরহাটের বড় দরগায় দেখবেন হযরত শাহ কবির (রহ.)-এর মাজার। এখানে সিন্দুরমতিতে প্রতিবছর বিরাট মেলা ও মন্দিরে পূজা হয়। ওই সময় হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়। তাই মেলার সময় গেলে খুবই আনন্দ পাবেন।
পাটগ্রাম উপজেলা সীমান্তের কাছাকাছি। এখানন থেকে হিমালয়কে আবচা মেঘের মতো দেখতে পাবেন। পাটেশ্বরী মন্দির এই ‘পাটগ্রাম’। লালমনিরহাট হতে পাটগ্রামের দূরত্ব ৪০ মাইল। একটা সময় গেছে এই পাটগ্রামে ট্রেন ছাড়া অন্য কোনোভাবে যাওয়া যেতে না। এখন লালমনিরহাট থেকে মাত্র আড়াই ঘণ্টায় সড়কপথে বাসে পাটগ্রাম যেতে পারবেন। পাটগ্রামের দহগ্রামে ছিটমহল ও তিনবিঘা করিডোর অবস্থিত। এখানেও যাবেন।
কালিগঞ্জের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদী। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে মুকুন্দ মুরারী ঘোষাল নামক একজন নিষ্ঠাবান সাধকপুরুষ শালগ্রাম বিগ্রহের মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য কোচবিহার রাজ্যের রানীর কাছে একখণ্ড জমি প্রার্থনা করেন। জমি পেয়ে সেখানে তিনি ২টি মন্দির স্থাপন করেন। সেই মন্দির দুটি আজ আর নেই। নেই ্েকানে জমিদারবাড়ি। দেখবেন নতুন দালানকোঠা, হাটবাজার।
হাতীবান্দা জায়গাটি দেখার মতো। একসময় এখানে হাতি বেচাকেনা হতো। কথিত আছে, এসব হাতি কেনার জন্য জমিদাররা এখানে আসতেন।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এশিয়ার বৃহত্তম বিমানঘাটি ছিল লালমনিরহাটে। অবিভক্ত ভারত বাংলার প্রবেশদ্বার আসাম-বাংলা রেলওয়ের সংযোগকেন্দ্রও ছিল লালমনিরহাটে। পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিটিও ঘুরে দেখুন।
বিভিন্ন তথ্য : লালমনিরহাট জেলার উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণে রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলা, পূর্বে কুড়িগ্রাম জেলা এবং পশ্চিমে নীলফামারী জেলা অবস্থিত। ঢাকা থেকে রেলপথে লালমনিরহাটের দূরত্ব ৩৯০ কি.মি.। সড়কপথে দূরত্ব ৪১৬ কি.মি.।
লালমনিরহাট জেলার মোট আয়তন প্রায় ১,২৪২ বর্গকিলোমিটার। তিস্তা আর শিঙ্গীমারী নদী বয়ে গেছে এই জেলার অভ্যন্তর হতে। ৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই জেলা লালমনিরহাট সদর, পাটগ্রাম, আদিতমারী, কালিগঞ্জ ও হাতীবান্ধা।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে লালমনির যাওয়ার জন্য আন্তঃনগর ট্রেন ‘লালমনি এক্সপ্রেস’কে বেছে নিতে পারেন। সময় লাগে ১০ ঘণ্টা। ইচ্ছে করলে হানিফ পরিবহনে যেতে পারেন। সময় লাগে সাড়ে ৭ ঘণ্টা। সকাল সাড়ে ৮টার বাস লালমনিরহাট গিয়ে পৌঁছে বিকালে ৩টায় পরে।
যেখানে থাকবেন : লালমনিরহাটে রাত যাপন করার জন্য রয়েছেÑ নর্থ বেঙ্গল গেস্ট হাউস, হোটেল মাসুদ (থানা রোড), হোটেল ডালিয়া (গোমালা রোড), হোটেল আতিক (সাপটানা রোড।