ঘুরে আসুন রাজা নরসিংহের নরসিংদী

347
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নরসিংদীর অবস্থান একটি উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। নরসিংদী নামকরণ নিয়ে অনেক ঐতিহাসিক বিভিন্ন অভিমত দিয়েছেন। জানা যায়, সোনারগাঁও ভূখ-ের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ধনপদসিংহ নামক জনৈক হিন্দু জমিদারি প্রতিষ্ঠা করে ‘রাজা’ খেতাব লাভ করেন। রাজা ধনপদসিংহের একমাত্র পুত্র নরসিংহ শীতলক্ষ্যা নদীর তিন মাইল পূর্বে প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে মহেশ্বরদী পরগনায় নগর নরসিংপুর নামে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করে বসবাস করতে থাকেন। পরবর্তীতে রাজা নরসিংহের নাম থেকে নরসিংদী নামকরণ করা হয়।


এ জেলায় কৃতী সন্তান হলেন কবি শামসুর রাহমান। তাঁর পৈতৃক নিবাস নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে। ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর কবির জন্ম। মৃত্যু ২০০৬ সালে।
মেঘনা, শীতলক্ষ্যা নদী বয়ে গেছে নরসিংদী জেলার ওপর দিয়ে। ৬টি উপজেলা নিয়ে গঠিত নরসিংদী জেলা। উপজেলাগুলো হলো নরসিংদী সদর, মনোহরী, বেলাবো, রায়পুরা, শিবপুর ও পলাশ। এ জেলার আয়তন প্রায় ১,১৪১ বর্গকিলোমিটার। নরসিংদীর উল্লেখযোগ্য জায়গা ছিল চরমান্দালিয়া, লেবুতলা, দুলালপুর, নারায়ণপুর, মহেশপুর, বাঁশগাড়ি, মির্জারচর রদিঘলদী, মাধবদী, পাইকারচর।
নরসিংদীর মেঘনা নদীতে নৌকা নিয়ে বেড়াতে দারুণ আনন্দ। সারাদিনের জন্য মেঘনায় ঘুরে বেড়িয়ে দুকূলের নয়নলোভা দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হবেন।


সোনাইমুড়ির টেক : এখানে আছে লালমাটির পাহাড় ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ঢাকা থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে সিলেট মহাসড়ক সংলগ্ন সবুজের ছায়াঘেরা অপরূপ সৌন্দর্যমন্ডিত ৭টি পাহাড় রয়েছে এখানে। পাহাড়ের মাঝ থেকে বয়ে গেছে সিজনালি হ্রদ। এই হ্রদে এখন সবুজ ফসলের সমারোহ। বিপুল বনজসম্পদ রয়েছে সোনাইমুড়ির টেকে। এখানে পার্ক ও পিকনিক স্পট দেখবেন। পাহাড়শীর্ষে দেখবেন একটি বাংলো।


নরসিংদী রেলস্টেশনের পশ্চিমপাশে তরোয়া দরগাহ। এখানে যাবেন। এরই একটু দূরে বাউল মেলা হয়। ঐতিহ্যবাহী এই মেলা মোঘল আমল থেকে হয়ে আসছে। পারুলিয়ায় দেখবেন দরদাহ ও মসজিদ। শিবপুরের কুমারদিতে শাহ মনসুরের দরগাহ। এটিও ঘুরে দেখুন। উয়ারী-বটেশ্বর আঠারো লাখ বছরের পুরনো প্লে-ইস্টোমিন যুগের মধুপুর গড়ের বন্যামুক্ত উঁচুভূমিতে গড়ে ওঠা এক মনোরম জায়গা।

উয়ারী-বটেশ্বর
এই দুই জায়গা একদা নাকি ছিল রাজধানী। প্রাচীন আমলেই গড়ে উঠেছিল উয়ারী-বটেশ্বর। যুদ্ধরাজ বম্বেট শক্তিমান গ্রিকবীর আলেকজান্ডার যে জাতির ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন সে জাতির বসবাস ছিল এই দুই গ্রামেই। সেই জাতির নাম গঙ্গারিডি। নরসিংদীতেই ছিল তাদের বসবাস।
উয়ারী-বটেশ্বরে আড়াই হাজার বছরের প্রত্ননিদর্শন আবিষ্কারের কাহিনী একটি জনপদের অস্তিত্বের কথা প্রমাণ করে দেয়। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী উয়ারী দুর্গনগরীকেই এই জনপদের রাজধানী মনে করেন। এখানে পাওয়া গেছে প্রাচীন দুর্গনগরী, বন্দর, রাস্তা, পার্শ্বরাস্তা, পোড়ামাটির ফলক, পাথরের পুঁতি, মুদ্রাভান্ডারসহ উপমহাদেশের প্রাচীনতম রৌপ্যমুদ্রা যা নরসিংদী জেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে বেলাব উপজেলার আমলার ইউনিয়নে উয়ারী-বটেশ্বরে অবস্থিত। উয়ারী-বটেশ্বরে পাওয়া গেছে স্বল্প মূল্যবান পাথরের গুটিকা, কাচের গুটিকা, রৌপ্যমুদ্রা, উচ্চমাত্রায় টিনমিশ্রিত ব্রোঞ্জ নির্মিত নবযুক্ত পাত্র। উত্তরভারতীয় মসৃণ কালো মৃৎপাত্র প্রভৃতি নিদর্শনগুলোকে প্রতœতাত্ত্বিকরা খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ অব্দ থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম শতক পর্যন্ত সীমায় অস্থায়ী জাদুঘর প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকা অথবা সিলেট থেকে সড়ক পথে রওনা দিলে আপনি মরজাল বাসস্ট্যান্ডে নেমে যাবেন। মরজাল থেকে ৪ কি. মি. দূরে উয়ারী-বটেশ্বর। এ পথে রিকশা নিয়ে আসা যাবে।


মনোহরদী উপজেলা সদর থেকে কয়েক মাইল দূরে গেলে বনাঞ্চল দেখতে পাবেন। এখানে বানরসহ নানান জাতের বন্যপ্রার্থী বসবস। এছাড়া রঘুনাথ মন্দির ঘুরে দেখুন। এটি খুবই আকর্ষণীয়।


নরসিংদী যেভাবে যাবেন : ঢাকার ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে বিআরটিসি’র পরিবহন ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর পর নরসিংদীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। ঢাকা থেকে নরসিংদীর দূরত্ব ৫৪ কিলোমিটার। এছাড়া গুলিস্তান এলাকা থেকেও বিভিন্ন পরিবহন ৫ মিনিট পর পর নরসিংদী যাচ্ছে।
যেখানে থাকবেন : নরসিংদীতে রাত যাপন করার জন্য রয়েছে হোটেল আজিজ, নিউ গ্রিন হোটেল, হোটেল রিয়াজ, হোটেল আরাম, হোটেল নিরালা প্রভৃতি।