ঘুরে আসুন যমুনা ব্রপুত্রের কোলে লালিত জামালপুর

60
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: জামালপুর একটি ঐতিহ্যবাহী পুরোনো জনপদের নাম। জনশ্রুতি রয়েছে ধর্মপ্রচারক হযরত শাহ জামাল (রহ.)-এর নামানুসারে এ জেলার নামকরণ করা হয়।

জামালপুর জেলা ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত জামালপুর সদর, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ,সরিষাবাড়ি, মেলান্দহ, বকশীগঞ্জ আর মাদারগঞ্জ। এ জেলার আয়তন প্রায় ২,০৩২ বর্গকিলোমিটার।
জামালপুর শহরের অন্যতম আকর্ষণ হযরত শাহ জামাল (রহ)-এর মাজার, ব্র‏হ্মপুত্র নদ, চরাঞ্চল, এগ্রিকালচার ফার্ম, চ-া দীঘি। যমুনা, ব্র‏হ্মপুত্র, ঝিনাই, বানার, সুবর্ণখালী, বংশী নদী বয়ে গেছে এই জেলার ওপর দিয়ে। এখানের বংশী নদী হয়ে ব্যবসায়ীদের বিশাল সব বজরা-নৌকা যাতায়াত করত উত্তর-পশ্চিম থেকে পূর্ব-দক্ষিণবঙ্গে। এই যাতায়াতের পথে ব্যবসায়ী সওদাগর জঙ্গলাকীর্ণ এই এলাকার নদীতীরে বজরা থামিয়ে বিশ্রাম নিত। বংশী নদী তীরবর্তী ব্যবসায়ী সওদাগরদের বিশ্রামস্থলটিতে একসময় ছোট একটি গঞ্জ গড়ে ওঠে। হিন্দু সন্ন্যাসীদের আগমনে অঞ্চলটি গঞ্জেরহাট থেকে সন্ন্যাসীগঞ্জ হিসেবে পরিচিত লাভ করে।
মোঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ১৫৪২ থেকে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ইয়েমেন থেকে ইসলামধর্ম প্রচারের জন্য হযরত শাহ জামাল (রহ.) এখানে আসেন। তিনি সন্ন্যাসীগঞ্জে ইসলামধর্ম প্রচার শুরু করেন। এসময় তাঁর ইসলামধর্ম প্রচারে সন্তুষ্ট হয়ে দিল্লীর সম্রাট সিংহজানি মৌজা নামে এই ভূখ-টি তাকে দান করেন। পরবর্তীতে হযরত শাহ জামালের (রহ.) নামানুসারে জামালপুর নামকরণ হয়।
জামালপুর মূলত জমিদার ও তালুকদারপ্রধান এলাকা। জামালপুরের উত্তরে গারো পাহাড়। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনার মনকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করবে।
এই জেলায় রয়েছে শাহ জামালের মাজার, দয়াময়ী মন্দির, জামে মসজিদ, নরপাড়া দুর্গ।

ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন : রেলপথে ট্রেনে ঢাকা থেকে জামালপুর যেতে পারেন। আন্তঃনগর ট্রেন তিস্তা ছাড়ে সকাল ৭-২০ মিনিটে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে। জামালপুর গিয়ে পৌঁছবে দুপুর ১২-৩০ মিনিটে। বাসেও যাওয়া যায় জামালপুর। সময় লাগে প্রায় ৫ ঘণ্টা। বাস ছাড়ে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে।

যা যা দেখবেন : জামালপুর শহরে দেখবেন আশেক মাহমুদ কলেজ, যমুনা সার কারখানা, হযরত শাহ জামালের (রহ.) মাজার শরিফ, দয়াময়ী মন্দির, বিভিন্ন কৃষিখামার, শালবন, পৌর পার্ক। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্র‏হ্মপুত্র নদের শাখা। পড়ন্ত বিকেলে ব্র‏হ্মপুত্র নদে নৌবিহার করতে পারেন।
২ ঘণ্টা সময় হাতে নিয়ে দূরে চরাঞ্চলে বেড়ানো সময় বাংলার সবুজ শ্যামল রূপ খুঁজে পাবেন। চরে নেমে কিছুদূর হেঁটে ঘুরে আসুন। সবুজ গাছগাছালির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কিছুতেই চর থেকে ফিরে আসতে মন চাইবে না। কাশবনও চোখে পড়বে।
জামালপুর শহরের উত্তর-পশ্চিম দিকে শাহ জামালের (রহ.) মাজার অবস্থিত। বাংলার প্রাকৃতিক শোভাসৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে শাহ জামাল (রহ.) ব্র‏হ্মপুত্র নদের পশ্চিমতীরবর্তী জামালপুরে আস্তানা পাতেন এবং খোদার প্রেমে মগ্ন হন। হযরত শাহ জামালের (রহ.) অলৌকিক কার্যাবলি ও ঐশীশক্তির বিষয় জ্ঞাত হয়ে দিল্লির সম্রাট জামালপুরের জমি ও সনদ তাকে উপহার দেন। প্রতিবছর শীতমৌসুমে এই দরগায় বহু ভক্ত এসে উপস্থিত হন এবং তখন মেলা বসে।
গোটা জামালপুর শহরের আশপাশে দেখবেন কৃষি-প্রকল্প। ধানসহ বিভিন্ন শস্য ও সবজিবাগানে আচ্ছাদিত এলাকার জমি। এসব ঘুরেফিরে দেখতেও বেশ আনন্দ আছে। প্রতিটি বাড়ির সামনে আছে বিভিন্ন সবজিবাগান। গাছভরা পেঁপেও চোখে পড়বে। মাছের পুকুরও আছে প্রায় বাড়িতে। এসব দেখে দেখে মনে হবে জামালপুরে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ সফল হয়েছে।
খ্রিস্টান সিমেট্রিও ঘুরে দেখুন। এটি আশেক মাহমুদ কলেজের পাশেই।
সপ্তম শতাব্দীতে জামালপুর অঞ্চল গুপ্ত-শাসন থেকে মুক্ত হয়ে প্রাগজ্যোতিষপুরের অন্তর্গত হয়ে যায়। সেন-বংশের রাজ্য বিস্তারের সময় সেন-রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়। এ অঞ্চলের আদিম অধিবাসী কোচ, হাজং, গারো, রাজবংশী প্রমুখরা কোনো কোনো এলাকা নিজেরাই শাসন করত।

ব্রিটিশ আমলে সন্ন্যাসীদের অন্যতম ঘাঁটি ছিল শাহ জামালের (রহ.) দরগায়। ১৮৪৫ সালে জামালপুরে মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। মহকুমা প্রতিষ্ঠার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল বিদ্রোহী সন্ন্যাসীদের দমন করা।
জামালপুর জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা বকশিগঞ্জের ধানুয়া ইউনিয়নের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যম-িত পাহাড় বনভূমি লাউয়াচাপড়া। লাউয়াচাপড়ার চারপাশে রয়েছে কয়েকটি পাহাড়। সব পাহাড়ই বনাঞ্চলে আচ্ছাদিত। এখানে গিয়ে নৈসর্গিক শোভা খুঁজে পাবেন। বনভূমিগুলো হচ্ছে দিঘলাকোণা, মেঘাদল, পাছ মেঘাদল, সাতনিপাড়া।
লাউয়াচাপড়ায় আছে একটি ডাকবাংলো, এর নাম ‘পাহাড়িকা’। এখানে থাকতে হলে জামালপুর জেলার ডিসির অফিস থেকে অনুমতি নিতে হবে। পাহাড়ের ওপর ২টি পাকা ফেন্সি শেড বা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, ক্রসজ্যাম, ফুটব্রিজ, চৌকিদার শেড রয়েছে। এখানে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে ওঠার ব্যবস্থা আছে। এই পথ ধরে টাওয়ারের কাছে যেতে পারবেন। চোখ-জুড়ানো, মন-ভোলানো এসব সৌন্দর্যে ভরপুর লাউয়াচাপড়া। একটি কৃত্রিম লেকও দেখবেন এখানে। গারো উপজাতিদের বাড়িঘরও আছে লাউয়াচাপড়ায়।


জামালপুরের ব্রহ্মপুত্র নদ পেরিয়ে ওপারে গিয়ে শেরপুরগামী বাস ধরে শেরপুর নামুন। এবার রিকশায় বকশিগঞ্জ বাস্ট্যান্ড এসে গেটলক বাসে করে শ্রীবর্দী উপজেল শহরে নামুন। শ্রীবর্দী থেকে রিকমাযোগে লাউয়াচাপড়া আসুন। ংিবা লোকার বাসেও এখানে আসা যাবে। ‘বনফুল’ নামে একটি ডাকবাংলোও আছে লাউয়াচাপড়ায়। এটি বেসরকরি বিধায় সিট খালি থাকলে থাকতে কোন অসুবিধা হবে না। তবে সরকারি ডাকবাংলো পাহাড়িকায় থাকতে যত বিধিনিষেধ। কেউ কয়েকদিন বেড়ানোর জন্য কিংবা পিকনিক করার জন্য লাউয়াচাপড়াকে বেছে নিতে পারেন। এখানে কয়েকদিন বেড়িয়ে প্রবল আনন্দ পাবেন।
গোটা জামালপুর জেলার সৌন্দর্যের তুলনা হয় না। এখানকার সবুজ শ্যামল ধানক্ষেত, নারকেল-সুপারির বাগান আর কত না সবজির বাগান দেখে দেখে চোখে পড়বে বিচিত্র প্রজাতির পাখি। তখন জামালপুর ছেড়ে আসতে ইচ্ছেই হবে না।
যেখানে থাকবেন : জামালপুরে রাত যাপন করার জন্য রয়েছে বাগদাদিয়া হোটেল (জামে মসজিদ রোড), আল করিম হোটেল (স্টেশন রোড), হোটেল তাজমহল (মতালতলা রোড), হোটেল সজীব (দয়াময়ী রোড), হোটেল জামালপুর (তমালতলা রোড), হোটেল রজনীগন্ধা (তমালতলা রোড), হোটেল শাহ জামাল (মেডিকেল রোড), হোটেল ডায়না প্রভৃতি।

অন্যান্য তথ্য : ঢাকা থেকে রেলপথে জামালপুরের দূরত্ব ১৭৭ কি.মি.। সড়কপথে দূরত্ব ১৮৭ কিলোমিটার। জামালপুর থেকে মেলানন্দহর দূরত্ব ১৭ কি.মি., ইসলামপুর ৩৪ কি.মি. দেওয়ানগঞ্জ ৩৭ কি.মি., সরিষাবাড়ি ২৭ কি.মি, বকশীগঞ্জ ৫০ কি.মি. এবং মাদারগঞ্জ ৩৪ কি.মি.। মাধারগঞ্জে গেলে দেখতে চর এলাকা। এখানে প্রায় বাড়িতে মহিষ পালন করা হয়। মহিষ, রাখাল আর চর এলাকা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না।