ঘুরে আসুন যমুনা তীর সিরাজগঞ্জ

95
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: শরৎ-হেমন্ত ঋতুতে সিরাজগঞ্জের নদী-নালা পানিতে ভরে থাক। তখন কোথাও কোথাও মনে হয় যেন এক নতুন সমুদ্র। দিগন্তে ভাসতে থাকে সবুজ গ্রামগুলো। সুদীর্ঘ বর্ষায় সিরাজগঞ্জের গাঁওগেলাম যেন দ্বীপপুঞ্জ। তবে পানির গভীরতা বেশি থাকে না। ওদিকে সিরাজগঞ্জের পার্শ্ববর্তী নদী যমুনা যৌবন ফিরে পায়। নদীতীরে বসে পূর্বে তাকালে দেখা যাবে পানি আর পানি।
বেড়ানোর জন্য সুন্দর জায়গা সিরাজগঞ্জ। এর অন্যতম আকর্ষণ সবুজ শ্যামল শোভা। সিরাজগঞ্জের চিরচেনা রূপ হল, এখানে হাওয়ায় কচি কচি ধান গাছ দুলছে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুন্দর বাড়িঘর রয়েছে গাছপালার ছায়াবীতির ফাঁকে ফাঁকে। বারো মাসের তেরো পার্বণ এখনো চলে পাবনার গ্রামে গ্রামে। সিরাজগঞ্জের আশপাশে রয়েছে তাঁতশিল্পের ছড়াছড়ি। মনভোলানো এই সিরাজগঞ্জে গিয়ে তাঁতশিল্পের ছড়াছড়ি। মনভোলানো এই সিরাজগঞ্জে গিয়ে নৌকা নিয়ে যমুনায় হারিয়ে যেতেও মন চাইবে।
সিরাজগঞ্জের আরেক আকর্ষণ বাণীকুঞ্জ। এছাড়া বন-বানী, সিরাজীর মাজার, গণিত সম্রাট যাদব চক্রবর্তীর বাসভবন দেখা মানেই মন-উদাস করা সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন। জয়সাগরও দেখার মতো।
সিরাজগঞ্জের কাছেপিঠে নবগ্রাম। এখানে পুরনো আমলের দুটি মসজিদ দেখবেন। শাহী মসজিদের পাশেই হযরত আবদুল আলী বাবা শাহ শরীফ জিলানীর (রহ.) মাজার।
যমুনা নদীতীরের সিরাজগঞ্জ বহু ইতিহস-ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের মধ্যপ্রান্তে। নদীল ভাঙনের বিলুপ্তির মুখোমুখি হয়েও সিরাজগঞ্জ টিকে আছে। এখানের মানুষের জীবনযাত্রা একটু ভিন্ন। ‘নদীর একূল ভাঙে ওকূল গড়ে এই তো নদীর খেলা’Ñএমন প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবেন সিরাজগঞ্জে গিয়ে। নদীল ভাঙাগড়ার সঙ্গে তার তাল মিলিয়ে চলতে হয় সিরাজগঞ্জবাসীকে। গ্রীষ্মে কী বর্ষায়, কী শরতে সিরাজগঞ্জ অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়ে ওঠে। মনে হবে তখন, এ যেন মেঘলামতির দেশ…।
সব ঋতুতে সিরাজগঞ্জের রূপ থাকে সবুজ শ্যামল। সবুজ শ্যামলিমার দেশ সিরাজগঞ্জের যাবেন কয়েকদিন সময় হাতে নিয়ে। ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ যাওয়র জন্য সরাসরি পরিবহন পানে। সময় লাগে সর্বোচচ ৩ ঘণ্টা। রাত যাপন করার জন্য সিরাজগঞ্জে আবাসিক হোটেল রয়েছে।
সিরাজগঞ্জের যমুনানদীতে যদি বেড়ান তাহলে আরেক সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন। যমুণায় নৌকা নিয়ে বেড়াতে গিযে দারুণ বৈচিত্র্য খুঁজে পাবেন। নৌকা নিয়ে যেদিকে যাবেন ভয়-ভয় লাগবে-ৃদয়ে শিহরণ জাগবে। নদীর উথালপাথাল ঢেউ দেখে হৃদয়মাঝে জেগে উঠবে ‘নদীর কূল নাই কিনার নাইরে আমি কোন্ কূল হতে কোন কূলে যাব কাহারে শুধাইরে’ গানের এই কথাগুলো।
কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিকক, রাজনীতিবিদ, ইসলামিক চিন্তাবিদদের দেশও বলা হয় সিরাজগঞ্জকে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও সিরাজগঞ্জ খুবই সম্ভাবনাময়। তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য ছির একদা, এখনও এখান তাঁতিরা তাঁত বোনে। শাড়ি, লুুঙ্গি, গামাছা, কাপড় তৈরি হয়। শীতলপাটির জন্যও সিরাজগঞ্জের খ্যাতি আছে। তাঁতশিল্প ও শীতলপার্টির ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এই দুই শিল্পের প্রতি আরো বেশি উৎসাহ দেয়া প্রয়োজন, তাহলে সিরাজগঞ্জে ব্যবসা-বাণিজ্যে আরো উৎকর্ষ।
সিরাজগঞ্জের সবুজ শ্যামল রূপ আর যমুনানদী আপনার হৃদয়কে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করবে। সিরাজগঞ্জে গিয়ে বাণীকুঞ্জ দেখুন। এটি সিরাজীবাড়ির ঐতিহ্যবাহী ও স্মৃতিবিজড়িত বৈঠকখানা। একদা এই বাণীকুঞ্জে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এসেছিলেন। জওহর নেহেরু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনসহ ভারতবর্ষের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তির পদচারণায় ধন্য বাণীকুঞ্জ দেখে অভিভুত হয়ে পড়বেন। এখোনেই রয়েছে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর সমাধিসৌধ।
ইসমাইল হোসেন সিরাজগঞ্জ শহরের বাণীকুঞ্জে সিরাজী পরিবারে ১৮৭৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩২ সালে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তিনি মারা যান। কিন্তু রেখে যান অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর। ইসমাইল হোসেন সিরাজী অনেক দুঃসাহিক কাজে মায়ের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পান। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন উপলক্ষে সিরাজগঞ্জে বিরাট সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি বক্তব্য রেখেছিলেন। সিরাজগঞ্জের তুরস্কে গিয়েছিলেনÑ সেখানে তুরস্কের সুলতান তাঁকে ‘গাজী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁকে শাহী পোশাক, মেডেল ও সাজসজ্জাও প্রদান করা হয়েছিল।
সিরাজগঞ্জের আরেক আকর্ষণ এখানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বন-বনানী, নদীর তীর আপনার হৃদয় স্পর্শ করবে। বিকেলে নদীতীরে বেড়াতে পারেন। তখন নদীর ভাঙনের দৃশ্য দেখে উদ্বেলিত হবেন হয়তোবা। সেইক্ষণে হৃদয়ে ভেসে উঠতে পারে ‘সকাল বেলা আমিররে ভাই, সন্ধ্যা ফকির বেলা, সেই নদীর ধারে কোন্ ভরসায় বাঁধলি বাসা সুখের আশায়’ গানের কথাগুলো।
যমুনানদীতে নৌবিহার করে বেশি আনন্দ পাবেন। নৌকায় বসে দুকূলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কাছ থেকে দেখায় বেশ আনন্দ আছে। দেখবেন, কত নৌকা ভেসে যাচ্ছে অজানা দেশে। সারাদিনের জন্য নৌকা ভাড়া খরে বেড়ানোতে দারুণ রোমাঞ্চ রয়েছে।
এখানের গ্রামীণ পথঘটের প্রাকৃতিক দৃশ্য আপনার মন কেড়ে নেবে। রাস্তার দুপাশের আম, কাঁঠাল, শিশু, মেহগণি, বাবলা গাছ থেকে দেখে পথ চলতে গিয়ে বলতে হয় : আমরা আসব বলেই হয়তো সিরাজগঞ্জের প্রকৃতিকর রূপ-অপরূপ সেজে রয়েছে।
অন্যান্য তথ্য : নবাবী আমলে জমিদার সিরাজ চৌধুরী সিরাজগঞ্জ শহরের গোড়াপত্তন করেন। ত৭ার নামানুসারেই যমুনানদীর তীরবর্তী পলিমাটিতে গড়ে ওঠা সিরাজগঞ্জের নামকরণ করা হয়। সিরাজগঞ্জ জেলার উত্তরে বগুড়া জেলা, দক্ষিণে পাবনা জেলা, পূর্বে টাঙ্গাইল ও জামালপুর জেলা এবং যমুনা নদী ও পশ্চিমে নাটোর জেলা অবস্থিত। এ জেলার আয়তন প্রায় ২,৪৯৮ বর্গকিলোমিটার। এই জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা, করতোয়া, বড়াল নদী।
সিরাজগঞ্জ জেলা মোট ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এগুলো হলোÑ সিরাজগঞ্জ সদর, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, চৌহালি, কাজীপুর, কামারখন্দ, তাড়াশ, বেলকুচি ও শাহজাদপুর। এই জেলায় রয়েছেÑ ইলিয়াস ব্রিজ বা লোহের পুল (১৮৯৩, মক্কা আউলিয়া মসজিদ (উল্লাপাড়া), এনায়েতপুর খাজা পীর সাহেবের মসজিদ ও মাজার (চৌহালি), নবরতœ মন্দির, শিবমন্দির, জয়সাগর (রায়গঞ্জ), শ্রীশ্রী মহাপুকুর আখড়া ইত্যাদি।

যখন পড়বে না মোর পায়ের চি‎‎হ্ন এই বাটে
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর না দেখলে রবীন্দ্রনাথকে চেনা অনেকখানি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই শাহজাদপুরে জীবনের কিছু সময় অতিবাহিত করে গেছেন। এখানে কাছারিবাড়িতে বসে বহু কবিতা ও গান লিখেছেন। শাহাজাদপুরের কাছারিবাড়িকে গড়ে তুলেছিলেন সাহিত্যচর্চা কেন্দ্র হিসেবে। রবীন্দ্রনাথের কাছারিবাড়িটি দাড়িয়াপুর বাজারে অবস্থিত। বাড়ির ভেতরে আছে সংগ্রহশালা। পাশেই আরেকটি দোতলা বাড়ি, যার নাম ‘রবীন্দ্র পরিষদ’। সেখানে আছে রবীন্দ্রস্মৃতি মিলনায়তন ও পাঠাগার।
এই শাহাজাদপুরে করতোয়া নদীর তীরে রয়েছে হযরত শাহ মখদুম শাহদ্দৌলার মাজার ও মসজিদ। করতোয়া নদীর ওপারে গ্রামের পর গ্রাম। সব গাঁয়ে রয়েছে তাঁতশিল্প। সবুজের ছোঁয়ায় আচ্ছন্ন শাহজাদপুরে গিয়ে বারবার রবিঠাকুরের কাছারিবাড়িতে ফিরে যেতে মন চাইবে। তখন মনে পড়বে ‘যখন পড়ব না মোর পায়ের চি‎হ্ন এই বাটে, চরবে গুরু খেলবে রাখাল এই নাটে’ গানের কথাগুলো।
বঙ্গবন্ধু সেতু : এটি টাঙ্গাইল জেলা ও সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্যবর্তী যমুনানদীর উপরে অবস্থিত। সড়কপথে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে যেতে ব্র‏হ্মপুত্র নদের ওপর নির্মিত হয়েছে এই বঙ্গবন্ধু সেতু। এটি এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘ সেতু। এর দৈর্ঘ্য ৪.৮ কিলোমিটার। সামনে পিছনে বালুচর, নিচে ঘোলা জলের ছুটে চলা, আর গাড়িতে সেতুর এক একটি স্থান অতিক্রম করতে ভালোই লাগে।
যেখানে রাত কাটাবেন : সিরাজগঞ্জে রাত যাপন করার জন্য বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে, যেমনÑ অনীক হোটেল, হোটেল মণি, পূবালী, মাদারবক্স, আজাদ গেস্টহাউস, হোটেল ভিআইপি, যমুনা হোটেল, শম্পা হোটেল, সুফিয়া গেস্ট হাউস প্রভৃতি।
যেভাবে যাবেন : সিরাজগঞ্জ যাওয়ার জন্য বিআরটিসি পরিবহনকে বেছে নিতে পারেন।