ঘুরে আসুন মেঘ পাহাড় হাওর বিলে মনোলোভা নেত্রকোনা

92
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: শীতের সময়ে নেত্রকোনার হাওরে বেড়ানো আলাদা ধরনের একটা মজা। উর্বর পলিমাটির একটি সমৃদ্ধ ভূখ নেত্রকোনা এবং এর আশপাশ এলাকা। এখানকার নদীনালায় প্রচুর মাছ জন্মায়। নেত্রকোনাকে মাছ-ভাতের খনি বলা হয় নেত্রকোনা শহর, মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুরি একই সঙ্গে দেখে আসুন।

কংস, বাউলাই, সোমেশ্বরী, মগরা নদী বয়ে গেেেনত্রকোনার উপর দিয়ে। হাওর-বিল তো আছেই, সর্বত্রই যেন সবুজ-শ্যামল রূপ। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে নেত্রকোনায় যখন যে ঋতুতে যাবেন তখন সেই ঋতুর অপরূপ বৈচিত্র্য খুঁজে পাবেন। নদীর বাঁক নেত্রের কোনের মতো এবং মগরা নদী পরিবেষ্টিত স্থানটি চোখের কোণের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকার কারণে এর নাম হয়েছে নেত্রকোনা। নেত্রকোনার উত্তরে মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়-অরণ্য।

ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে নেত্রকোনাগামী পরিবহন ছাড়ে। রবরব এবং গ্রিণ লাইন পরিবহনে যাওয়া যাবে। কমলাপুর থেকে ছাড়ে বিআরটিসির পরিবহন। যাতায়াতে সময় লাগে সাড়ে তিন ঘণ্টা।
নোত্রকোনায় রাত যাপন করার জন্য সুন্দর সুন্দর আবাসিক হোটেল রয়েছে।

এ জেলায় দেখবেন চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়, হজরত শাহ সুলতান কমরউদ্দিন রুমির (রহ.) মাজার শরীফ, দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়, বেইলি ব্রিজ, আঞ্জুমান স্কুল, মালিনী আখড়া, মগরা ব্রিজ। শহরের একপ্রান্তে রাজবাড়ি এটিও দেখুন। শহর থেকে ৫ মাইল দূরে মদনপুরে গিয়ে হযরত শাহ সুলতান কমরউদ্দিন রুমির (রহ.) মাজার শরিফ একই সুযোগে দেখে নিন। এই জেলায় আছে বোয়াইলবাড়ি দুর্গ, খোঁজার দীঘি, সুসং মহারাজার বাড়ি (দুর্গাপুর), কমলরানীর দীঘি, আটপাড়ার কৃষ্ণপুর বৌদ্ধমঠ।
হাওর এলাকায় গিয়ে সবুজ-শ্যামল বাংলার আসল চিত্র খুঁজে পাবেন। এখানে গেলে মনে হবে কোনো চিত্রকর এসে বুঝি প্রকৃতিকে এমনিভাবে সাজিয়ে দিয়েছে। নেত্রকোনার হাওর এককালে ছিল নদ-নদী। কালক্রমে পলিমাটি সর্বত্র ¯তূপীকৃত হয়ে প্রথমে চর এবং পরে হাওরের সৃষ্টি হয়। একদা এই অঞ্চল মহারাজ এবং জমিদারদের আওতাধীন ছিল। এসব হাওর কেবল বিলাস ও বিনোদনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হত। একদা বর্ষা-মৌসুমে জমিদাররা হাওর এলাকায় মাচান তৈরি করে চাঁদনী রাত্রি যাপন করতেন।
নেত্রকোনা থেকে মোহনগঞ্জ যেতে একঘণ্টা সময় লাগে। খুবই আকর্ষণীয় জায়গা। ভাটি এলাকার আকর্ষণীয় ও মনোরম স্পট মোহনগঞ্জ। প্রতিদিন শত শত মণ মাছ এখান থেকে ট্রেনযোগে ঢাকায় আসে। ভাটি অঞ্চলের প্রবেশপথ হিসেবে মোহনগঞ্জের গুরুত্ব বাড়ে ১৯২৯ সালে রেলপথ স্থাপনের পরপরই। হাওর-বিল ছাড়াও এখানে রয়েছে অরণ্য। এখানে শীতে হাওর শুকিয়ে গিয়ে তেপান্তরের মাঠের মতো রূপ নেয়। বর্ষায় হাওর থাকে সাগরের মতো। তাই বর্ষায় ডিঙ্গাপুতা হাওরে নৌবিহারের সময় দুকূলের দৃশ্য দেখে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকবেন। শীত-বসন্তে পায়ে হেঁটে বেড়ানো যায়। দৃশ্য দেখে দু-চোখ আনন্দে ভরে ওঠে। মাঝেমধ্যে বড় বড় গাছও চোখে পড়বে। বর্ষায় এসব গাছপালা পানির নিচে ডুবে থাকে।

এখানের বেথাম গ্রামের প্রাচীন দুর্গ, শেখেরবাড়ির মসজিদ, দৌলতপুরের মন্দিরটিও দেখে নিন। ১৯২৯ সালে মোহনগঞ্জে থানা স্থাপিত হলে এর গুরুত্ব অনেকাংশে বেড়ে যায়। খাজার দীঘিটিও দেখার মতো। এটি মোহনগঞ্জের বিরামপুরে অবস্থিত। এখানের প্রায় বাড়িতে দেখবেন গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগল আর হাঁস। প্রায় প্রতি বাড়িতেই ২০০ থেকে ৫০০ করে হাঁস পালন করা হয়।
বিভিন্ন তথ্য : নেত্রকোনা জেলা ১০টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। উপজেলাগুলো হল নেত্রকোনা সদর, মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুরি, কেন্দুয়া, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, আটপাড়া, বারহাট্টা ও পূর্বধলা। এ জেলার আয়তন প্রায় ২,৮১০ বর্গকিলোমিটার। কংস, বাউলাই, সোমেশ্বরী আর মগরা নদী বয়ে গেছে নেত্রকোনা জেলার উপর দিয়ে। নেত্রকোনার লেংগুড়া, কুল্লাগোড়া, চ-ীগড়, বোরখপনা, বোসী, চিরাম, আসমা, বকলজোড়া, বিরিশিরি, বকশী বিরামপুর, গাংগলাজুর, চকুয়া, খুনিশ্বর, সিংহের বালা, মৌগাতী, লক্ষ্মীগঞ্জ, কাইটাইল, সান্দিকোনা প্রভৃতি জায়গাও আকর্ষণীয়।

হোটেলের খোঁজখবর : নেত্রকোনায় থাকার জন্য সুন্দর সুন্দর হোটেল রয়েছে। সৌরভ আবাসিক হোটেলে উঠতে পারেন। মগরা নদীর তীরে অবস্থিত তিনতলায় থাকার ব্যবস্থা। ইমরান ইন্টারন্যাশনাল আবাসিক হোটেল নেত্রকোনার ছোটবাজার এলাকায় অবস্থিত। এক রুমে দুজন থাকা যাবে। খাওয়াদাওয়ার জন্য পুরাতন কোর্ট রোডের সুসং রেস্টুরেন্টকে বেছে নিতে পারেন।
মোহনগঞ্জে থাকার জন্য ডাকবাংলো ছাড়াও প্রাইভেট হোটেল রয়েছে। ডাকবাংলোতে একটি রুমে ২টি সিট রয়েছে। প্রাইভেট হোটেল রয়েছে, যেমন – পান্না, শাপলা, পাঠান, তপন প্রভৃতি।
সুসং রাজার দেশে
সুসং দুর্গাপুরকে বলা হয় সুসং রাজার দেশ। সুসং দুর্গাপুরে দেখবেন চোখধাঁধানো প্রাকৃতিক রূপ। এখানে পাহাড়ের গায়ে ঝরঝর অবিরাম করছে পাহাড়ি ঝর্ণা। দৃশ্যের পর দৃশ্য। মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যকে ঢেলে দিয়ে প্রকৃতি অবর্ণনীয় রূপে সাজিয়েছে সুসং দুর্গাপুরকে। এখানে আছে রাজবাড়ি। সোমেশ্বরী নদীতীরে দাঁড়ালে চোখে পড়ে রৌদ্রালোকিত নদী আর দূরের পাহাড়ে ছোট ছোট বাড়িগুলো।

যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে সুসং দুর্গাপুরে যাবেন ময়মনসিংহ হয়ে। সরাসরি বাসেও যাওয়া যায়, আবার ময়মনসিংহে নেমে সেখান থেকে জারিয়া হয়ে যেতে পারেন। সময় লাগবে প্রায় ৫ ঘণ্টা।

যেখানে থাকবেন : রাত কাটানোর জন্য সুসং দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদের ডাকবাংলা রয়েছে। প্রাইভেট হোটেল জবা রয়েছে।
যা যা দেখবেন ও জানবেন : সুসং দুর্গাপুরের প্রধান আকর্ষণ রাজবাড়ি। অতীতের সেই রাজবাড়ির অনেকগুলো ভবন এখন স্কুল, কলেজ এবং সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাজবাড়িতে আছে প্রাচীন আমলের অট্টালিকা, হাতিশালা, জলসাধর, অন্দরমহল, গোসলখানা, দীঘি-মন্দির। দীঘির নাম মিঠাপুকুর ও বড়দীঘি। সুসং রাজাদের কাহিনী, ঘটনা আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে এলাকাবাসীর কাছে। সুসং দুর্গাপুরে রাজাদের রাজত্ব চলে টানা তিনশো বছর। এক সময় বৈশ্য গারো নামের এক পরাক্রমশালী গারো রাজা এ অঞ্চল শাসন করতেন। পাহাড়ের দুই-তৃতীয়াংশ ছিল তার দখলে। সোমনাথ পাঠক সেই সময় বৈশ্য গারোকে পরাস্থ করে দুই-তৃতীয়াংশ ভূমির অংশ নিয়ে সুসং নাম দিয়ে তিনি এ অঞ্চল শাসন করতে থাকেন। সেটা ছিল ১৯৯৪ সালের কথা। সোমনাথ পাঠকই হরেন সুসং রাজাদের আদি পুরুষ এবং সুসং রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তার রাজ্য ছিল ৭০ মাইল লম্বা এবং ৫৬ মাইল প্রস্থ। সে সময় সুসং রাজ্যে যারা বাস করত তারা সবাই ছিল উপজাতি। উপজাতিদের মধ্যে গারোদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই যুগে উপজাতি পুরুষরা নেংটি পরে থাকত। মেয়েরা কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত কাপড় জড়িয়ে রাখত।
সুসং রাজাদের আয়ের উৎস ছিল হাতি বিক্রি থেকে মুনাফা অর্জন। রাজারা দেখা দিয়ে হাতি ধরতেন। এ জন্য সুসং রাজারা প্রথেমে হাজং উপজাতিদের আসাম থেকে নিয়ে আসেন। রাজবাড়ি কমপ্লেক্সে কমলকৃষ্ণের বাড়ি, জগৎকৃষ্ণের বাড়ি, রংমহল, নাটমন্দির দেখতে পাবেন।

রাজবাড়ি দেখার পরে সোমেশ্বরী নদী তীরে পড়ন্ত বিকালে বেড়াতে আসুন। শীতের সময় নদীর অনেকাংশ জুড়ে চর জেগে ওছে। চারদিকে দেখা যায় বালুরাশি। এখানে নদীর দুই তীরে বনময় বেলাভূমি ও আঁকাবাঁকা শোভা দর্শনে হারিয়ে যাবেন স্বপ্নের ভুবনে। উত্তর-পশ্চিমম আর পূর্বাকাশের দিকে যতবার তাকাবেন ততবার পাহাড় অরণ্য চোখে পড়বে।
সোমেশ্বরী নদীর পশ্চিমে শিবগঞ্জ বাজার। এর পরে কালিকাপুর, বাঘমারা, বিজয়পুর। এসব জায়গায় গেলে পাহাড়কে কাছ থেকে দেখা যাবে। বিজয়পুরের পরে নলুয়াপাড়া। এর পরে ভারতয় এলাকা। দুর্গাপুরের পাতাখালীর পরে নদী। এর ওপারে ৩ মাইল দূরে মনোরম বনাঞ্চল, বিস্ময়কর গিরিসঙ্কট ও করাতের মতো খাঁজকাঁটা পাহাড়।
জানা যায়, হাজং সম্প্রদায়ের দুর্গা নামের একজনের এক সময়ে এখানে প্রাধান্য ছিল। তার নামানুসারে দুর্গাপুর হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ব্রিটিম শাসনামলে দুর্গাপুরে থানা স্থাপন করা হয়। বর্তমানে দুর্গাপুরে ইউনিয়নের সংখ্যা ৭টি। গ্রামের সংখ্যা ২১৬টি। সীমান্তবর্তী এই উপজেলা একটি জনপদ। এই জনপদ একদা কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। পাঠান আমল থেকে কোম্পানি আমল এ এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য। কোম্পানি আমলে এ অঞ্চলের কৃষক ও উপজাতিরা কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। একদা এখানকার অভিজাত বংশের লোকদের বন্যমহিষ শিকার করা ছিল শখের বিষয়। প্রায় ঘরেই মহিষের শিং সাজানো দেখতে পারেন।
দুর্গাপুরের নয়নলোভা দৃশ্য আপনাকে বারবার কাছে টেনে নেবে। সঙ্গে ক্যামেরা নিয়ে যাবেন। যেখানে যাবেন সেখানে গিয়েই ছবি তুলতে ইচ্ছে হবে। সুসং দুর্গাপুর দেখতে পুরো ৩ থেকে ৪ দিন লেগে যাবে। এই ভ্রমণে জনপ্রতি দেড় হাজার টাকা খরচ হবে।

মহুয়ার কাহিনী : একদা মহুয়া জৈন্তা পাহাড় থেকে ছুটে নেত্রকোকানার বামনকান্দা গ্রামে এসেছিলেন। সেই বামনকান্দা গ্রাম এখনও আছে। এখানে দেখবেন বেদের দীঘি, ঠাকুরের বাড়ির ভিটা। বামুনকান্দা গ্রাম থেকে কংস নদীর তীরে আসুন। এখানে রক্তিম পুষ্পারণ্যে মহুয়া ও নদের চাঁদ কয়েক মাস বাস করেছিলেন।
নেত্রকোনার দক্ষিণে কেন্দুয়া। এখানে কবি কংসের নিবাসভূমি ছিল। একই সুযোগে দেখে নিন বাঘবার হাওর। এখানে রয়েছে কদম্ববৃক্ষ, মাদার গাছ, কদলী বন, কেয়া ও বকুল ফুলের ছড়াছড়ি।
নেত্রকোণার উত্তরে গেলে অরণ্য দেখবেন। কখনও কখনও এই অরণ্য মেঘালয় থেকে হাতি নেমে আসে।

কমলাকান্দা যাবেন : গারো পাহাড়ের পাদদেশে কলমাকান্দার মনোলোভা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করবে। শীতে সবুজের মাঝে সরষেফুলের হলুদিয়া ও সূর্যরশ্মির আলোকচ্ছটা হয়ে ওঠে একাকার। যতদূর দৃষ্টি যায় মাঠ আর মাঠ। বর্ষায় দিগন্ত জুড়ে চোখে পড়ে শুধু পানি আর পানি। বাংলার প্রকৃত রূপ খুঁজে পাওয়া যাবে এখানে এলে। বর্ষায় মনে হয়, পাহাড়ের পাদদেশে পানির স্বর্গরাজ্য এই কলমাকান্দা। নেত্রকোনা জেলাশহর থেকে ৩০ কিলোমিটার উত্তর এবং মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার উত্তর এবং চেরাপুঞ্জি থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার পশ্চিমে কলমাকান্দা অবস্থিত। নেত্রকোনা হতে এখানে সড়কপথে বাসে যেতে পারবেন। গারো, হাজং, কোচ, রাজবংশী উপজাতীয়রা এখানে বাস করে। কমলা উৎপন্ন হতো এক সময়ে, এই কমলার খ্যাতি থেকে এ জনপদের নাম ঘুরে ফিরে হয়েছে ‘কলমাকান্দা’। শীতের আগমনে শীতপ্রধান এলাকা থেকে অসংখ্য পানি কলমাকান্দায় আশ্রয় নেয় এরা প্রকৃতিকে আরো অপরূফ করে তোলে। কলমাকান্দায় গিয়ে দেখবেন বড় বড় পাহাড়। পাহাড় ও পাহাড়ি নদী দেখে ঝরনার দিকে তাকালে মনে হবে, কলমাকান্দা যেন এক মনোলোভা স্বর্ণরাজ্য। শীত, বর্ষা, শরৎ, বসন্তের যখনই যান না কেন, এখানে বিড়যে প্রবল আনন্দ পাবেন।