ঘুরে আসুন মানিক চাঁদের মানিকগঞ্জ

65
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: জনশ্রুতি রয়েছে, মানিক শাহ্ নামে এক সুফী সাধকের নামানুসারে এই জেলার নাম হয়েছে ‘মানিকগঞ্জ’। কেউ কেউ মনে করেন দুর্ধর্ষ পাঠান সরদার মানিক ঢালীর নামানুসারে নাম হয়েছে ‘মানিকগঞ্জ’। আবার অনেকে মনে করেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিশ্বাসঘাতক কর্মচারী মানিক চাঁদের নামানুসারে ইংরেজরা মানিকগঞ্জ নামকরণ করে।


পদ্মা, যমুনা ও ধলেশ্বরী নদী বয়ে গেছে এই জেলার ওপর দিয়ে। মানিকগঞ্জ জেলা ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। উপজেলাগুলো হলো- মানিকগঞ্জ সদর, শিবালয়, সাঁটুরিয়া, ঘিওর, সিঙ্গাইর, হরিরামপুর ও দৌলতপুর। এই জেলার আয়তন প্রায় ১,৩৭৯ বর্গকিলোমিটার। এখানের কৃতী সন্তানরা হলেন- হীরালার সেন, ড. দীনেশচন্দ্র সেন। জাগো হুয়া সাভেরা, এ দেশ তোমার আমার ছবির নায়ক খান আতা ওরফে আনিসের জন্মস্থান ও মানিকগঞ্জে। এই জেলায় আছে রজনী ভবন, শিববাড়ি মন্দির, বাইমাইলের নীলকুঠি, ফোর্ডনগরের দুর্গ, বায়রা নীলকুঠি, দত্ত গুপ্তদের বাসভবন, আনন্দকুঠি ও মন্দির, কাঁঠালগড় দুর্গ, তেওতার নীলকুঠি, ধানপোড়া জমিদারবাড়ি, বালিয়াটির জমিদারবাড়ি, ঘিওর নীলকুঠি।


যেভাবে যাবেন : ঢাকার ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ৫ মিনিট পর পর মানিকগঞ্জের বাস ছাড়ে। প্রেসক্লাবের কাছে পাবে বিআরটিসি’র বাস। এক ঘণ্টা সময় লাগে মানিকগঞ্জ পৌঁছাতে। এছাড়া পাগলা থেকে কয়েক মিনিট পর পর বাস ছেড়ে যায় মানিকগঞ্জের দিকে। ঢাকা থেকে সড়কপথে মানিকগঞ্জের দূরত্ব ৬৮ কিলোমিটার।
যা যা দেখবেন : মানিকগঞ্জে দেখবেন দেবেন্দ্র কলেজ, তেওতা রাজবাড়ি। ধলেশ্বরী নদীর শাখা কালীগঙ্গার ওপারে গেলে শেরশাহ’র আমলের গ্রান্ড রোড দেখে মুগ্ধ হবেন। এখানে রয়েছে বিস্তৃত সবুজ শ্যামল শস্যক্ষেত। ইচ্ছে করলে কালীগঙ্গা নদীতে নৌবিহার করতে পারেন।


মানিকগঞ্জের কাছাকাছি নওয়াধা গ্রামে একটি প্রাচীন মসজিদ দেখতে পারেন। এরই সম্মুখে একটি বিরাট বটগাছ রয়েছে। ভেতরে প্রবেশ করে মসজিদের কারুকার্য দেখে অভিভূত হবেন। এই মসজিদটি দেখার পরে দরগাপাড়ার মাজার শরীফে চলে যান। এটি আপনাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করবে।


মানিকগঞ্জের আশপাশে অবস্থিত, যেমন- ইছামতি নদী-তীরবর্তী মাচান জামে মসজিদ, দানেস্তর শাহ’র মাজার, সিঙ্গাইরের ফোর্ডনগর দুর্গ, যাত্রাপুর কিল্লা, মাচান শাহ রুস্তমের মাজার, চাকী জোড়ার দুর্গ, ঘিওরের কুঠিবাড়ির নীলকুঠি, তেওতার রাজবাড়ি, নবরতœ মঠ, বানিয়াজুরীর শিবমন্দির, কালীসুন্দরী দাতব্য চিকিৎসালয় প্রভৃতি দেখার সময় পুরনো স্মৃতি খুঁজে পাবেন। তখন মনে হবে মানিকগঞ্জ বহু ঐতিহাসিক স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সুয়াপুর গ্রামে গেলে জানবেন, একদা এখানে বাংলা সিনেমার জনক হীরালাল সেন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বোম্বে টকিজের নির্মাতা হিমাংশু রায়ের জন্মও মানিকগঞ্জে। তাঁর স্ত্রী দেবীকারাণী ছিলেন হিন্দি ছবির নায়িকা। দেবিকারিণী অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবি হলো- অচ্ছুৎকন্যা (১৯৩৬), ইজ্জত (১৯৩৭)। ্কদা উন্নত ও বর্ধিষ্ণু শহরের প্রয়োজনীয় সবকিছুই এই মানিকগঞ্জে ছিল যেমন কোর্ট-কাছারির, থানা, স্কুল, মসজিদ, প্রাসাদ, অট্টালিকা, মন্দির, জমিদারাড়ি। এর অনেককিছুই ধলেশ্বরী নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর, হরিণা আর রামকৃষ্ণপুর গ্রামে গেলে সেনযুগের দালান কোঠার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাবেন। জাফরগঞ্জ, গড়পাড়া, মাচাইন, খচনাপুরে দেখবেন সুলতানী আমলের দালানকোঠা। বালিয়াটি ও তেওতা রাজবাড়ি দেখে বেশি মুগ্ধ হবেন। পুরনো দালানকোঠা দেখে এখানের পুকুরপাড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ধরে বসে থাকতে ইচ্ছে হবে। একদা পূজার সময় বালিয়াটি রাজবাড়ি বেড়াতে এসে এই পুকুরঘাটে বসে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাঁশি বাজাতেন। তখন পাশে বসে থাকতেন প্রমীলা। ওই পুকুরের ঘাটলার বসে নজরুল মাছও ধরতেন। তেওতায় নজরুল কয়েকবার পূজার সময় বেড়াতে এসেছিলেন বলে লোকমুখে শুনবেন।