ঘুরে আসুন মহারানী স্বর্ণময়ীর গাইবান্ধা

46
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: গাইবান্ধার পাশে বালাসীঘাট। এর পাশে যমুনা নদী। এই নদী এঁকেবেঁকে ব্রহ্মপুত্র আর যমুনা নদী গাইবান্ধাকে করেছে উর্বরা, করেছে শস্যশ্যামলা। ঘাঘট নদীও বয়ে গেছে গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে। অপরূপ সাজে সজ্জিত এক নয়নলোভা সৌন্দর্যের দেশ গাইবান্ধা। এখানে রয়েছে বিস্তৃত চর। চরের মানুষের জীবন আরো বেশি বৈচিত্র্যময়।
কয়েকদিন ঘুরে দেখার মতো জায়গা এই গাইবান্ধা। সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়িতে গেলে দেখা যায় ঘরে ঘরে হাঁস পালন করা হয়। বর্ষায় বা শরতে যখন এখানের বিলে হাঁসের দল ভেসে বেড়ায়, তখন দৃশ্য মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। ওদিকে গাছপালা, এদিকে গাছপালাÑএরকম দৃশ্য দেখা যায় গোটা গাইবান্ধা এলাকা জুড়ে। দেখতে এতই সুন্দর লাগে যে, প্রকৃতিপ্রেমিকরা একবার গাইবান্ধায় গেলে সহজে ফিরে আসতে চান না। রিকশা নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন আশপাশের এলাকায়।
ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় আসতে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে এখন। পরিবহন ছাড়ে টেকনিক্যাল ও গাবতলী থেকে। রাজশাহী, বগুড়াসহ দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে গাইবান্ধায় যাওয়া যায়। বাহাদুরাবাদ ঘাট হয়ে স্টিমার ও ট্রলার যায় গাইবান্ধার ফুলছড়িঘাটে। এই স্টিমার কিংবা ট্রলারে যাওয়া আরো বেশি আনন্দের। আকাশ আর নদী দেখে দেখে অনেক সবুজ সতেজ করে দিয়ে যাবে।
একদা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ এলাকা বিরাট নগরী ছিল। বিরাট রাজার রাজধানী ছিল। একসময় গাইবান্ধা মহকুমা সদর পাতিলাদহ পরগনার ভবানীগঞ্জে স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে মহকুমা সদর নদীভাঙনের কারণে ভবানীগঞ্জ হতে গাইবান্ধায় স্থান্তরিত করা হয়।
গাইবান্ধায় রয়েছেÑবর্ধনকুঠি, নলডাঙ্গার জমিদারবাড়ি (১২৫৯), রাজা বিরাটের স্থাপনাসমূহের ধ্বংসাবশেষ, মীরের বাগান, শাহ সুলতান গাজীর মসজিদ। এখানের মীরের বাগানে শাহ সুলতান গাজীর মসজিদ অবস্থিত। বামনডাঙ্গার জামিদারবাড়ি, ভরতখালীর কাষ্ঠকালী মন্দির, রাজা বিরাটের স্থাপনাসমূহের ধ্বংসাবেশষ গোবিন্দগঞ্জের প্রাচীন মসজিদ ঘুরে দেখার সময় অতীত যুগে ফিরে যাবেন।
সবুজ শস্যের ভান্ডার হিসেবে খ্যাত গাইবান্ধা জেলা। ইতিহাসখ্যাত রাজা বিরাটের গোচারণভূমি হিসেবে এর নামকরণ করা হয় ‘গাইবান্ধা’। গাইবান্ধার প্রাচীন নাম ভবানীগঞ্জ। নির্জন ভালো লাগার হাতছানি এই গাইবান্ধায় কয়েকদিন থেকেও দেখার সাধ পূরণ হবে না। এই জেলার আকর্ষণীয় জায়গা হলোÑ বালাসীঘাট, বাদিয়াখালী, কামারজানি, ফজলপুর, হরিপুর, হলদিয়া, গজারিয়া, বামনডাঙ্গা।
সবুজে শ্যামলে আচ্ছন্ন গাইবান্ধায় প্রাকৃতিক অফুরান সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়বেন। একদা মহারানী স্বর্ণময়ীর জমিতে এক লাখের ওপর গো-সম্পদ ছিল। তখন বেশি পরিমাণ ঘাস উৎপাদিত হতো। রাখাল গরুর পাল নিয়ে দুর্বাঘাসের ওপর কিংবা কোনো বটবৃক্ষের ডালে বসে থাকত। সেদিনের মতো আজো রাখাল গরুর পাল নিয়ে জমিতে ঘুরে বেড়ায়।
দেখবেন শহরের মধ্যদিয়ে একেঁবেঁকে বয়ে গেছে ঘাঘট নদী। নদীর উপরে ব্রিজ। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে যেদিকে তাকাবেন দেখবেন শুধুই সবুজের সমারোহ। চোখে পৌরসভা ভবন, পৌর পার্ক, দীঘি একই জায়গায়। দীঘির চারদিকে বসার জন্য বেঞ্চ রয়েছে।
গাইবান্ধার প্রধান আকর্ষণ কিন্তু এই পার্কটি। পার্কটি দেখে আপনিও বলবেন : এটি তো স্বপ্নপুরীর মতো আকর্ষণীয়। পার্কে রাতের আলো-আঁধারিতে বেড়াতে দারুণ মজা। আকাশে তারার মেলা দেখে দেখে কল্পনার জাল বুনবেন। মনে হবে ওই দূর আকাশপানে হারিয়ে যাওয়ার কথা।
রিকশা নিয়ে চলে যান বালাসীঘাটের দিকে। এখানে দেখবেন বিশালর যমুনানদী। নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে উত্তরে তাকালে দেখবেন আবছা মেঘের মতো পাহাড়। যমুনানদীতে বেড়ানোর জন্য নৌকাও পানে। এখানের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ফুলগাছ লাগায়। আসলেই গাইবান্ধা শহরটি ছবির মতো।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় যাওয়ার জন্য সড়কপথে বেশ কয়েকটি পরিবহন প্রতিদিন চলে। এসআর পরিবহনে যেতে পারেন। ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় পৌঁছতে প্রায় ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। আন্তঃনগর ট্রেন লালমনি এক্সপ্রেস গাইবান্ধায় যাওয়া যায়। লালমনি এক্সপ্রেস যায় কমলাপুর হয়ে বঙ্গবন্ধু রেলসেতুর রেললাইনের ওপর দিয়ে। এটি রাত ৯২০ মিনিটে ছেড়ে পরদিন সকাল ৬টায় গাইবান্ধায় গিয়ে পেঁৗঁছে।
যেখানে থাকবেন : গাইবান্ধায় রাত যাপন করার জন্য মহিলা কলেজের দক্ষিণে আর রহমান হোটেলকে বেছে নিতে পারেন। আলহাজ বোর্ডিং নিউমার্কেট এলাকায়Ñ একানেও থাকা যাবে। এছাড়া জেলা পরিষদের ডাকাবাংলো, বিভিন্ন সরকারি দফতরের গেস্টহাউস রয়েছে গাইবান্ধায়। এসব জায়গায় অনুমতি নিয়ে থাকা যায়।
বিভিন্ন তথ্য : গাইবান্ধা জেলা ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। উপজেলাগুলো হলোÑ গাইবান্ধা সদর, সাদুল্লাপুর, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ আর পলাশবাড়ি। এ জেলার আয়তন প্রায় ২,১৭৯ বর্গকিলোমিটার। গাইবান্ধার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, আত্রাই, কাটাখালী নদী। গাইবান্ধায় মহুকুমা স্থানান্তরের জন্য মহারানী স্বর্ণময়ী জমিদান করেছিলেন। সেই জমিতে ১৮৭০ সালে মহকুমা সদর আনা হয়। এরপর ধীরে ধীরে গাইবান্ধা শহর গড়ে উঠতে থাকে। ঢাকা হতে সড়কপথে গাইবান্ধার দূরত্ব ৩০১ কি.মি.। রেলপথে দূরত্ব ৩০৭ কি.মি.।