ঘুরে আসুন পৌরাণিক কাহিনীর দেশ দিনাজপুর

92
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: পৌরাণিক কাহিনীর দেশ হিসেবে ইতিহাসখ্যাত জেলা দিনাজপুর। দিনাজপুরকে ‘সবুজ শস্যের ভান্ডার’ বলা হয়। খনিজসম্পদের ক্ষেত্রেও এখানে উদঘাটিত হয়েছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। পুনর্ভবা নদীতীরে অবস্থিত দিনাজপুরের নাম হয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি দানুজ রায়ের নামানুষারে। আবার অনেক মনে করেন রাজা দানুজ মর্দন দেবের নাম থেকেই দিনাজপুর নাম হয়েছে।
দিনাজপুরে রয়েছে ঐতিহাসিক কীর্তির ছড়াছড়ি, তাই কয়েকদিন সময় হাতে নিয়ে দিনাজপুর থেকে বেড়িয়ে আসুন। এই জেলায় আছে কান্তজীল মন্দির, রাজবাড়ী, রামসাগর, চেহেলগাজী ও গোরা শহীদের মাজার, সিংহদুয়ার প্রাসাদ, সীতার কুঠরী, বারদুয়ারী, নয়াবাদ মসজিদ, চোরাগাছ মসজিদ।
দিনাজপুর জেলার জেলার আয়তন প্রায় ৩,৪৩৮ বর্গকিলোমিটার। যমুনা, করতোয়া, আত্রাই আর পুনর্ভবা নদী হয়ে গেছে এই জেলার অভ্যন্তর থেকে। উপজেলা মোট ১৩টি। এগুলো হলোÑদিনাজপুর সদর, ঘোড়াঘাট, কাহারোল, বিরল, খানসামা, পার্বতীপুর, হাকিমপুর, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, বোচাগঞ্জ, বীরগঞ্জ, ফুলবাড়ি ও চিরির বন্দর।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে দিনাজপুর যাবেন সড়কপথে বাসে। এজন্য হানিফ, এসআর, কেয়া, শ্যামলী পরিবহনকে নিতে পারছেন। আন্তঃনগর ট্রেন একতা এবং দ্রুতযানে দিনাজপুর যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগে। ট্রেন ছাড়ে কমলাপুর থেকে।
যেখানে থাকবেন : দিনাজপুর শহরে রাত যাপন করার জন্য পর্যটন মোটেলকে বেছে নিতে পারেন। প্রাইভেট হোটেল রয়েছে বেশ কয়কটি, যেমনÑ কণিকা, আল রশিদ, নবীনা, ডায়মন্ড, নিউ হোটেল, রেহানা প্রভৃতি।
দিনাজপুরে যা যা দেখবেন : দিনাজপুর শহরে দর্শনীয় কীর্তি যা যা আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ রাজবাড়ী, রামসাগর, চেহেলগাজীর মাজার ও মসজিদ, ঈদগাহ, শিশুপার্ক, জেলা পরিষদ ভবন, সুখসাগর, পুনর্ভবা নদী, কাঞ্চন ব্রিজ, কড়াই বিল প্রভৃতি।
দিনাজপুর শহরের উত্তরদিকে দিনাজপুর সরকারি কলেজ। এরই উত্তরে চেহেলগাজীর মাজার ও মসজিদ এবং ঈদগাহ। মাজার ঘুরে দেখার সময় জানবেন, ৪০ জন বীরযোদ্ধার কবর রয়েছে এখানে। মাজার লাগোয়া পশ্চিমদিকে একটি ছোট মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আছে। এটি ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করা হয়েছিল। এখানের ঈদগাহ দেয়ালের গঠনপ্রণালী দেখে মনে হবে এটি মোঘল আমলে তৈরি হয়েছিল।
চেহেলগাজীর মাজার থেকে প্রায় ২০০ গজ উত্তরে একটি বিরাট ঢিবি আছে। এটির আয়তন প্রায় এক একর। ঢিবিতে প্রচুর ইট পাওয়া যায়। খুব সম্ভব এটি হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের কোনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ।
দিনাজপুর শহরেই রয়েছে রাজবাড়ি। সুদীর্ঘ তিন শতাধিককাল স্থায়ী রাজবংশে অনধিক ১১ জন রাজা রাজত্ব করে গেছেন। তাদেরর অমর কীর্তির রাজবাড়ি এখনও আছে। এখানে গিয়ে সিংহদুয়ার, মন্দির, অন্দরমহল, জয়সাগর, দুর্গাসাগর দেখুন। জানা যায়, শুকদেব ছিলেন দিনাজপুর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। এই রাজবাড়ির ১১ জন রাজা হলেনÑ শুকদেব, রামদেব, জয়দেব, প্রাণনাথ, রামনাথ, বৈদ্যনাথ, রাধানাথ, গোবিন্দনাথ, তারকানাথ, গিরিজানাথ ও জগদীশনাথ। রাজা প্রাণনাশের আমলে তৈরি হয় রাজবাড়ির প্রধান অট্টালিকা রানীমহল ও আয়নামহল। এ দুটি এখনও আছেÑ ঘুরে ঘুরে দেখুন।
রাজবাড়ির পাশে সুখসাগরÑএখানেও বেড়াবেন। পাশেই রয়েছে শালবান। সুখসাগরের তীরে ঘণ্টা পর ঘণ্টা ধরে বসে সুখ খুঁজে পাবেন।
রাজা প্রাণনাথের চেয়েও স্মরণীয় কাজ করে খ্যাতিমান হন রাজা রামনাথ। বাংলার স্থাপত্যশ্রেষ্ঠ কান্তজীর মন্দির ও বিশাল দীঘি ‘রামসাগর’ তাঁর শ্রেষ্ঠতম কীর্তি। দিনাজপুর শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে রামসাগর। এখানে গিয়ে দেখবেন চারদিকে সবুজ প্রান্তর, মধ্যখানে পাহাড়ের মতো ধূসরবর্ণ ছোট মাটির টিলার পাড়। এখানে গিয়ে প্রাকৃতিক শোভা ও সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন। ইচ্ছে হবে সারাদিন এখানে কাটিয়ে আসতে। রাজা রামনাথ এটি খনন করেছিলেন বলে নাম হয়েছে রামসাগর।

সাগরবেলায় ঢেউ করে কানাকানি
অনেকেই দিনাজপুর বেড়াতে গিয়ে কান্তজীর মন্দির, রাজবাড়ি দেখে চলে আসেন। পুরনো এক বন্ধু একবার বল, ‘সাগর দেখবে না? সাগর নয়, তবুও এর নাম রামসাগর।’ এটি প্রকৃত সাগরের মতোই অথৈ অতল, মৌন, শান্ত ও সুগভল বলেই বলা হয় ‘রামসাগর’। যারা একটি দিন একান্তে নিরিবিলি কাটাতে চান তারা রামসাগর কম্পাউন্ডে একবারের জন্য হলেও চলে আসুন। এই সাগরতীরে বসে মনে পড়ব সজনীকান্তের লেখা ‘ঐ যে হোথায় সাগরবেলায় ঢেউ করে কানাকানি, ভেঙে ভেঙে যায় মুছে যায় বারে বারে…’ গানের কথাগুলো।
যেজন্য রামসাগরে আসবেন : রামসাগর কম্পাউন্ডে টিলার উপরে একটি সুন্দর মনোরম ডাকবাংলো রয়েছে। এখানে রাত যাপন করার ব্যবস্থা হলেই চাঁদনি রাতে রামসাগরকে দেখে দেখে স্বপ্নজগতে ফিরে যাবেন। তখন নিজেকে নিজের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যাবে। এর সর্বত্র সুবজের ছোঁয়া। এখানে একবার এলে কী যেন এক মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বেন। চিরশ্যামল, বিচিত্র তরুলতা ও ফল-মূল-শোভিত এর বন-প্রান্তর, তা দেখে দেখে যেন দেখাও শেষ হয় না।
অবস্থান ও আয়তন : দিনাজপুরের তাজপুর গ্রামে রামসাগর। এই দীঘির মোট আয়তন হল ১৬২৮১২০ বর্গফুট অর্থাৎ ৫৪২৭০৭ বর্গগজ। এটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা।
অতীত কথা : দিনাজপুরের বিখ্যাত রাজা রামনাথ কর্র্তৃক রামসাগর দীঘি খনন হয় ১৭৫০ থেকে ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। জানা যায়, তার আমলে বৃষ্টিপাতের অভাবে প্রকৃতি মলিন হয়ে পড়ে। ক্ষেতের শস্য মরে যেতে থাকে। খাদ্য ও পানীয় জলের অভাবে নির্ঘাত মহোদ্দেশ্যপ্রাণোদিত হয়ে এই বিশাল দিঘি খনন করান। ফলে প্রচন্ড খরায় আকণ্ঠ তৃষিত মানুষের পানীয় জলের অভাব মেটে।
দীঘিপাড়ে যা দেখবেন : রামসাগর দেখেও যেন দেখা শেষ হবে না। সবুজ গাছগাছালি দেখার পরে রামসাগরের উত্তরদিকে পাড়ভূমির বহিরাংশে একটি মন্দির দেখবেন। এটি এখন অর্ধভগ্ন ও জীর্ণ অবস্থায় আছে। এটি নাকি ছিল দেবমন্দির। অতীত কীর্তি দেখতে আগ্রহী হলে এটিও কাছ গিয়ে দেখুন। দিঘি খনন সমাপ্ত হওয়ার পরপরই এট নির্মিত হয়েছিল।
যেখানে থাকবেন : রামসাগরতীরে টিলার উপরের ডাকবাংলোতে থাকার সুযোগ না হলে দিনাজপুরের শহরের হোটেল কনিকা, ডায়মন্ড, নিউ হোটেলের যে কোনো একটিতে উঠতে পরেন। ইচ্ছে করলে পর্যটনের মোটেলেও থাকতে পারেন।

দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে
কান্তজীর মন্দিরর যিনি একবার যান তারই কিন্তু ভালো লেগে যায়। এ রকম অপরূপ সৌন্দর্যময় মন্দির বাংলাদেশে খুব কম সহজেই দেখা যায়। এ নিয়ে কান্তজীর মন্দিরটি দেখার জন্য একুশবার ওখানে গিয়েছি। দিনাজপুর শহর থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে ঢেপা নদীর ওপারে কান্তনগর গ্রাম। এখানেই কান্তজীর মন্দির। অনেকেই বলেন কান্তজীর মন্দিরটি উপমহাদেশের মন্দির-স্থাপত্যেল একটি অপূর্ব নিদর্শন। আর তা না হলে গুজরাট থেকে আগত পর্যটক ভদ্রলোকটি বারবার কান্তজীর মন্দিরের কথা জানতে চাইতেন না। ভারতের কোচবিহার শহরে গিয়েও ওখানকার মানুষের মুখে কান্তজীর মন্দিরের প্রশংসা শুনছি। অপরূপ ঝলমলে এই মন্দিরটি প্রথম দেখি স্বাধীনতার কয়েক বছর পরে। দিনাজপুরের নামকরা অ্যাডভোকেট তখন আমানুল্লাহ সরকার। উনি তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাকেও নিয়ে এলেন দিনাজপুরের প্রধান আকর্ষণ কান্তজীর মন্দির দেখাতে (১৯৭৬ সাল)। তখন ভাদ্র মাস। ঢেপা নদীর ঐ সময় ভরা যৌবন। ভরা ভাদরে আমরা নদীতে নৌকায় উঠে ওপারে পৌছলাম বিকেল সাড়ে ৪টায়। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে তবুও কান্তজীর মন্দির দেখব বলে কেমন জানি উৎফ্ল্লু ছিলাম সেই দিনটিতে। আহা মন্দিরটি প্রথম দেকায় এত অভিভূত হলাম যে, হৃদয়ে তখন জেগে উঠলো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গানের কয়েকটি লাইনÑ ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপে বাহির হলে জননী, ওগো মা তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে…।’ কান্তজীর মন্দিরের কথা মনে হলে এখনও গানের এই কথাগুলি বারবার হৃদয়ে জেগে ওঠে।
কান্তজীর মন্দিরটি নির্মিত হয় ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে। মন্দিরের নির্মাণকারী মহারাজ প্রাণনাথ মন্দিরটি নির্মাণের জন্য একটি শান্ত, নির্জন ও নদীবিধৌত এলাকা বেছে নিয়েছিলেন। নির্মিতিতে এর ধাপ রয়েছে তিনটি। এটি দেখতে ঠিক রথের মতো। শুধুই ইট ও পাথরের কণা দিয়ে কান্তজীর মন্দির নির্মিত হয়েছে। মন্দিরের দরজা কাঠের তৈরি। এর দেয়ালে খচিত হয়েছে ছোট ছোট ভাস্কর্যের প্রতিচ্ছবি। প্রতিভর এখানে অনুষ্ঠিত হয় রাসলীলা। একবার রাসলীলায় এখানে গিয়ে এতটা মুগ্ধ হলাম যে, তখন মনে হয়েছিল আগে তো এরকম উৎসব আর কখনও দেখিনি। রাসলীলায় রাস পূর্ণিমার রাতে রাধামাধব শ্রীকৃষ্ণ ও রাধিকার যুগলমূতিৃ মন্দির থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বের করে এনে মন্দিরের আড়াই হাজার গজ দূরে অবস্থিত রাসমঞ্চের উপর ঝুলনে ঝুলিয়ে দেয়া হয় প্রেমলীলার জন্য। এ দৃশ্য দেখে দুনয়ন যেন এক আনন্দের পরশ খুঁজে পেয়েছিল সেদিন।
যিনি একবার এই মন্দির দর্শনে আসেন তিনিই হয়তোবা অবিভূত হয়ে পড়েন। দেখেছি, রামায়ণ মহাভারতের প্রায় সবকটি প্রধান কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে মন্দিরের গায়ে। সেই সঙ্গে রয়েছে শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন কাহিনী ও পৌরণিক কাহিনী। দিনাজপুরের জমিদার মহারাজা প্রাণনাথ রায় এই মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র মহারাজ রামনাথ রায় এই মন্দির তৈরির কাজ শেষ করেন ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে।
কান্তজীর মন্দিরের দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে সমসাময়িককালের নয়াবাদ মসজিদও দেখার মতো। এটিও ঐতিহাসিকভাবে প্রসিদ্ধ, তাই নয়াবাদ মসজিদ দেখে আসুন একই সুযোগে।
দিনাজপুর জেলা সদর থেকে ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বিরামপুরে যাবেন। এখান থেকে ৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ‘সীতাকোট’। এই ঐতিহাসিক কীর্তিও ঘুরে দেখুন। সীতাকোর্ট এদেশের প্রাচীনতম বিহার। এটি দেখতে গিয়ে জানবেন, এই বিহার খুব সম্ভব পঞ্চম বা ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দে গুপ্ত আমলে নির্মিত হয়েছিল।
বিরামপুরে গিয়ে আরো দেখুন ঐতিহাসিক কীর্তি, যেমনÑ ডাঙ্গা দীঘি, আলতা দীঘি, গড়ের পাড়ের গড়, মীর্জাপুর মন্ডপ। বিরামপুরের মীর্জাপুর গ্রামে মোঘল সাম্রাজ্যের আগে এক হিন্দুরাজা বহু অর্থ ব্যয় করে যে মন্দির নির্মাণ করেন, এটিই হলো মীর্জাপুর মন্ডপ।
দিনাজপুরের কাছে বীরগঞ্জ। এখানে যেতে পারেন। বিশ্বরোরে ধার ঘেঁষে শালবন-ঘেরা পাখির গুঞ্জনে মুখরিত শস্য-শ্যামল স্নিগ্ধ জনপদের নাম বীরগঞ্জ। এই বীরগঞ্জে জিন্দাপীর, কালীর মেলা ও বুড়া খাঁ পীরের মেলার জন্য খ্যাত হয়ে আছে। এখানেরর শিংড়া শালবনে বেড়াতে পারেন। পিকনিক স্পটও রয়েছে শিংড়া শালবনে। পুরো একটি দিন হাতে নিয়ে এখানে গেলে ভালো হয়। কড়াইবিল দেখতে হলে দিনাজপুর শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বিরল উপজেলায় যাবেন।

স্বপ্নময় স্বপ্নপুরী
স্বপ্নপুরীতে সারাদিনের জন্য বেড়াতে পারেন। ‘স্বপ্নপুরী’ জায়গাটি দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ থাানায় অবস্থিত। পরিবারের সদস্যরা মিলে এখানে গেলে বেশি ভালো হয়। তবে বন্ধুবান্ধব একত্রে কয়েকজন যেতে পারেন। শীত মৌসুমে শুধু নয়, অন্যান্য মৌসুমেও গিয়ে এখানে বনভোজন করা যাবে। প্রায় তিনশো একর এলাকাজুড়ে এই স্বপ্নপুরী। বর্ষাকালে এখানের হ্রদে নৌবিহার করায় দারুণ আনন্দ।
কৃত্রিম লেকও আছে। ময়ূরপঙ্খী ভাড়া নিয় লেকে বেড়াতে দারুণ আনন্দ। দিনাজপুর শহর থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরে উপজেলা শহর নবাবগঞ্জের খালিপুর মৌজায় এই স্বপ্নপুরী। দিনাজপুর থেকে সড়কপথে বাসে স্বপ্নপুরী যেতে দেড়ঘণ্টা সময় লাগবে। এখানে দেখবেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিধারী ভাস্কর্য বিজয়পতাকা, নানারকম পশুর মডেল, লতাবৃক্ষের রচিত তোরণ ঝাউবীথি-পামবৃক্ষ। ইচ্ছে করলে একটি রাত স্বপ্নপুরীতে কাটাতে পারেন।
দিনাজপুর থেকে বাসে কিংবা কোস্টারে প্রথমে যাবেন ফুলবাড়ী। সময় লাগবে প্রায় একঘণ্টা এরপরে আবার অন্য বাসে উঠে স্বপ্নপুরীতে যাবেন। ফুলবাড়ী থেকে স্বপ্নপুরীর দূরত্ব ১২ কিলামিটার। কোস্টার যাবে আফতাবগঞ্জ হাট হযে।ে
কোথায় থাকবেন : দিনাজপুরের স্বপ্নপুরী দেখতে হলে আপনাকে দিনাজপুরেই অবস্থান করতে হবে। রেলস্টেশন সংলগ্নে অবস্থিত কণিকা হোটেল, আল রশীদ, নবীনা, রেহানা, নিউ হোটেল-এর যে কোনো একটিতে উঠতে পারেন।
কী কী দেখতে : স্বপ্নপুরীতে গিয়ে দেখবেন দেশি-বিদেশি গাছগাছালি ও ফুলের সমারোহ। গোলাপ ও রজনীগন্ধা ফুলবাগানে বেড়াতে পারেন। চিড়িখানায় দেখবেন হরিণ ও বানর। কৃত্রিম হ্রদে নৌবিহার করতে পারেন। জনপ্রতি ১০ টাকায় কিছু সময়ে জন্য হ্রদে বেড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। স্বপ্নপুরীতে আরো দেখবেনÑ কৃত্রিম পাহাড়, বাঁশঝাড়, শালবাগান, তালগাছের সারি। শালবনের মাঝ থেকে চলতে গেলে অসল দুপুরে শুনবেন ঘুঘুর ডাক। পাতাবাহার গাছ দেখবেন।
রাস্তার দুধারে পিকনিক কর্নার রয়েছে কয়েকটি। রান্নাবান্না ওখানেই করা যায়। বেড়ানোর জন্য কিংবা বসার জন্য পাবেন প্রশস্ত এলাকা। চা-নাস্তা খাওয়ার জন্য ছোট রেস্টুরেন্ট পাবেন লেকের পাড়ে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামের মূর্তি রয়েছে স্বপ্নপুরীতে। ঝিনুকের দোকানে আছে। এখান থেকে ঝিনুকের মালা কিনতে পারবেন।
কৃত্রিম পাহাড় : এই পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে আরো মুগ্ধ হবেন। এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে ইচ্ছে হবে। সারাদিন স্বপ্নপুরী এলাকায় ঘুরে প্রচুর আনন্দ পাবেন। সন্ধ্যার আগেই চলে আসুন। ইচ্ছে করলে এখানে রাত্রি যাপন করতে পারেন। এখানে কয়েকটি রেস্টহাউস রয়েছে।
ফুলবাড়ি দেখে আসুন : স্বপ্নপুরী দেখার পরে এবার ফুলবাড়ী আসুন। এখানে দেখবেন প্রাচীন দীঘি, পুষ্করিণী। এখানের বিলে নৌবহিার করা যাবে। নৌকাতে বেড়ানোর সময় দেখবেন, দলবেঁধে ছেলেরা এখানে মাছ ধরছে। মনে হবে এ যেন কোনো ছবির দৃশ্য।
ঘোড়াঘাট : দিনাজপুর শহর থেকে সড়কপথে বাসে এখানে আসতে প্রায় ২ ঘণ্টা সময় লাগবে। ঘোড়াঘাটে দেখবেন দুর্গ। এই দুর্গ দীর্ঘ ১ মাইল লম্বা। দুর্গের ভেতরে মোঘল আমলে তৈরি একটি মসজিদ দেখতে পাবেন। খুব সম্ভব মসজিদটি সম্রাট শাহজাহানের আমলে তৈরি হয়েছিল। এছাড়াও এখানে দেখবেন দরিয়া বোখারীর মাজার, কাজী বদর-উদ-দীনের মসজিদ, মাজার ও বসতবাটি। দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ৬০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বদিকে এই ঘোড়াঘাট। এখান থেকে ৫ মাইল পশ্চিমে চোরাগাছা গ্রামে গিয়ে ঐতিহাসিক সুরা মসজিদ দেখুন। সুরা মসজিদ তৈরির কায়দা-কানুন দেখে অনেকেই মনে করেন, এটি সম্ভবত হোসেন শাহের আমলে তৈরি করা হয়েছিল।
অন্যান্য তথ্য : দিনাজপুর জেলার অভ্যন্তরে আর যেসব ঐতিহাসিক কীর্তি রয়েছে তাহলোÑ গড়বাড়ি রাজাদের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, মহেষপুর, চিরির বন্দরের বারদুয়ারী, পার্বতীপুরের কিচক রাজার গড়, হীরাজিরার ভিটা, দেওলের গড় প্রভৃতি। দিনাজপুরের নাফানগর, আটগাঁও, শহরগ্রাম, ছাতাইল, বিজোড়া, রানীপুকুর, ধর্মপুর, শেখপুরা, আশকরপুর, ধামইর, রামচন্দ্রপুর, নাজপাড়া, মন্মথপুর, শিবনগর, বিনোদনগর, পুঁটিমারা, ভাদুরিয়া, হিলি, হাকিমপুর, কাতলা, আবদুলপুর মাতনালা, খামারবাড়ি, মুকুন্দপুর প্রভৃতিও উল্লেখযোগ্য জায়গা। দিনাজপুরের কৃতী সন্তান হলেনÑ মহান স্বাধীনতার সনদ-পাঠক অধ্যাপক ইউসুফ আলী, হাজী দানেশ।