ঘুরে আসুন নোয়াখালী

1206
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: ‘হাট বাজার নদী খাল/সুপারি নারিকেল তাল/ভাঙা গড়া চোরাবালি/নাম তার নোয়াখালী…।’ নোয়খালী গেলে এই কথা শোনা যায় এখানকার লোকজনের মুখে। পুরনো নোয়াখালীর জেলা সদর বসেছে মাইজদীতে। নোয়াখালীর দক্ষিণে গেলে দেখবেন মেঘনা নদী আর এরপরেই বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগরের অথৈ বুকে ভাসছে হাতিয়া দ্বীপ আর নিঝুম দ্বীপ।
নোয়াখালীর পুরাতন শহর মাইজদী। নোয়াখালী নামের উৎপত্তি হয় ১৬৬০ সালের দিকে। তখন আওরঙ্গজেব ছিলেন দিল্লির সম্রাট। সেকালে ডাকাতিয়া নদীর বন্যায় ঘন ঘন প্লাবিত হতো ভুলুয়ার উত্তর এবং পূর্বাঞ্চল। বন্যার হাত থেকে এখানকার কৃষি-অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য কুমিল্লার ফৌজদারের তত্ত্বাবধানে ডাকাতিয়া থেকে রামগঞ্জ-সোনাইমুড়ি-চৌমুহনীর মধ্যদিয়ে একটি নতুন খাল কেটে বন্যার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হলো বঙ্গোপসাগরের মেঘনা ও ফেনী নদীর সঙ্গমস্থলে। মোঘর ইঞ্জিনিয়াররা এর আগেও এ অঞ্চলে খনন করেছিলেন বেশ কয়েকটি সেচ খাল। কিন্তু এই সুদীর্ঘ নতুন খালটি খননের পর ভুলুয়া ভুখ-ের নতুন নাম হলো ‘নোয়াখালী’ অর্থাৎ নতুন খালের দেশ। নতুন শব্দের স্থানীয় লোকজ নাম হলো ‘নোয়া’। এখানকার লোকেরা নতুন বাড়িকে বলে ‘নোয়াবাড়ি’, নতুন কাপড়কে বলে ‘নোয়া কাপড়’, নতুন বউকে বলে ‘নোয়া বউ’, নতুন জামাইকে বলে ‘নোয়া জামাই’। মোঘলযুগে কাটা নতুন খালই এভাবে লোকমুখে ‘নোয়াখাল’, পরে এ থেকে হয়ে যায় ‘নোয়াখালী’।
নোয়াখালী এখন মাইজদী শহরে বসেছে। এর দক্ষিণ দিক দিয়ে মেঘনানদী প্রবাহিত হয়েছে। রুপালি ইলিশে ভরা মেঘনানদী। সারাবছর এই জেলায় প্রচুর পরিমাণে ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। মেঘনা, ডাকাতিয়া, ফেনী নদী বয়ে গেছে এই জেলার ওপর দিয়ে।
নোয়াখালীর প্রাচীন নাম ছিল ‘ভুলুয়া’। এখন আর এর নাম কেউ বলে না। এক সময় ভুলুয়া নামে একটি বন্দর ছিল। এর উত্তরে ছিল ভুলুয়ার বিশাল রাজবাড়ি, ভুলুয়ার দীঘি, রাজাদের দুর্গ। এর সবকিছুই একসময় গ্রাস করেছে এককালের প্রমত্তা মেঘনা আর বঙ্গোপসাগর।
নোয়াখালী জেলা মোট ১০টি উপজেলা দিয়ে গঠিত। উপজেলাগুলো হলো- নোয়াখালী সদর (মাইজদী), বেগমগঞ্জ, সুধারাম, কবিরহাট, হাতিয়া, কোম্পানিগঞ্জ, চাটখিল, সেবাগ, সুবর্ণচর, সোনাইমুড়ি।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে মাইজদী যাওয়ার জন্য আন্তঃনগর ট্রেন উপকূল রয়েছে। এটি সকাল ৬টায় ছাড়ে, মাইজদীতে পৌঁছে দুপুর ২টায়। বুধবার দিন উপকূল বন্ধ থাকে সড়কপথে বাসে গেলে পালকি, বিলাস পরবহনকে বেছে নিন। রাতের ট্রেনেও যাওয়া যাবে। রাতে নোয়াখালী এক্সপ্রেস।
যেখানে থাকবেন : মাইজদীতে রাত যাপন করার জন্য বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে, যেমন-কাকলী, লক্ষ্মী, রয়াল, হোটেল আল ফারহান, হোটেল রাফতান, হোটেল আল মোরশেদ, পূর্বালী বোর্ডিং। এ জেলার আয়তন প্রায় ৩,৬০১ বর্গকিলোমিটার।
মাইজদীতে দেখবেন খ্রিস্টান গির্জা, জেলা জামে মসজিদ, শহরআলী মাস্টার দীঘি, মাইনুর, ইঞ্জিনিয়ার ওবায়েদউল্লাহ উচ্চবিদ্যালয়, কোর্টদীঘি, কোর্ট ভবন, পীর কামেল মহিউদ্দিন হুজুরের মাজার শরীফ, ঘোড়দৌড়ের মাঠ, বড় বড় দীঘি ইত্যাদি।
অনিন্দ্যসুন্দর নোয়াখালীর সর্বত্রই রয়েছে বাগবাচিগা। রয়েছে ফলফলাদিরর রকমারি বাগান। দেখবেন বড় বড় প্রশস্ত রাস্তা। রাস্তার দুপাশে ঝাউয়ের সারি। নারকেল গাছও দেখবেন। নারকেল গাছ উঠেছে আকাশের দিকে, তখন মনে হবে অপূর্ব এক নৈসর্গিক সৌন্দর্য ভরা এই নোয়খালী।
একদা নোয়াখালীতে ছিল জেলাশহর। তা ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তীতে জেলাশহর মাইজদীতে স্থানান্তর করা হয়। নতুন নতুন দালানকোঠা দেখবেন এখানে।
একদা নোয়াখালীর ঐতিহ্য গড়ে ওঠে গ্রিক, পর্তুগিজ, আরবীয়, ইংরেজ সভ্যতার মিশ্রণে। সেই ঐতিহ্যের বিভিন্ন কীর্তি নোয়াখালীর বিভিন্ন স্থানে এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। সবকিছু মনে হবে অবিকল ছবির মতো। এখানে এতই ফলের প্রাচুর্য ছিল যে, একদা মহিলারা ডাবের পানি দিয়ে পা ধুতেন।
গির্জায় প্রবেশ করে বেশ আনন্দ পাবেন। এর বাইরে সবুজ ঘাস, লম্বা ঝাউগাছ। এ যেন ঘন সবুজ দেশ। দীঘির পাড়ে পড়ন্ত বিকেলে বসে থাকতে বেশ আনন্দ রয়েছে। লোকালয়ের বাইরে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বেশ ভালো লাগবে।
চালখিল : মাইজদী থেকে এখানে যাবেন সড়কপথে বাসে। চাটখিলের ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে জয়াগ গ্রামে ‘গান্ধী’ আশ্রম’ অবস্থিত। ১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর মহাত্মা গান্ধী চৌমুহনীতে আসেন। এখান থেকে পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি গান্ধীজি জয়াগ গ্রামে এসে পৌঁছেন। জয়াগ গ্রামের কৃতী সন্তান হেমন্তকুমার মোহন তাঁর জমিদারির অংশবিশেষ মহাত্মা গান্ধীকে দান করেন। এখানেই তনি প্রতিষ্ঠিত করেন ‘গান্ধী আশ্রম’। এটি দেখার আগে জয়াগ বাজারে দেখবেন দুটি ঐতিহাসিক মঠ। গান্ধী আশ্রমের প্রার্থনাকক্ষে ঢুকে আপনিও বলবেন, ‘ঈশ্বর আল্লা তেরের নাম। সবকো সম্মতি দে ভগবান’। প্রার্থনাকক্ষে গান্ধীজির একটি তৈলচিত্রও দেখবেন। জয়াগ গ্রামে আরো দেখবেন দেবেন্দ্র মদনমোহন মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
বেগমগঞ্জ : বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী শহরের সামান্য দক্ষিণে গেলে দেখবেন ইতিহাসখ্যাত চৌমুহনী রামঠাকুরের আশ্রম। বেগমগঞ্জ উপজেলাধীন বজরা গ্রামে দিল্লির শাহী মসজিদের অনুকরণে নির্মিত বজরা শাহী মসজিদ দেখবেন। বজরা শাহী জামে মসজিদ মোঘল সাম্রাজ্যের স্মৃতি বহন করে চলেছে। দিল্লির মোঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ আমানউল্লাহ খান ও সানাউল্লাহ খান নামক ভ্রাতৃদ্বয়কে জমিদারি হিসেবে ওমরাবাদ বজরা অঞ্চল দান করেন। পরবর্তীতে জমিদার আমানউল্লাহ তাঁর বাড়ির সামনে ৩০ একর জমির ওপর উঁচুপাড়যুক্ত একটি দীঘি খনন করেন।
দীঘি দেখার পর বজরা শাহী মসজিদ ঘুরে দেখুন। এটি মোঘল স্থাপত্যের নিদর্শন। মসজিদটি তৈরির ১৭৭ বছর পর ১৯০৯ সালে একবাল মেরামত করা হয়। এ মসজিদটি ১৭৩৩ সালে নির্মিত হয়। নোয়াখালী জেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার উত্তরে মসজিদটি অবস্থিত। এর গম্বুজগুলো খুবই আকর্ষণীয়। সুদৃশ্য মার্বেল পাথর দ্বারা গম্বুজগুলো খুবই আকর্ষণীয়। সুদৃশ্য মার্বেল পাথর দ্বারা গম্বুজগুলো সুশোভিত করা। মসজিদ প্রবেশের জন্য ৩টি ধনুকাকৃতির প্রবেশপথ রয়েছে। এ প্রবেশ পথের ওপর আছে অসংখ্য গম্বুজ।
সুধারাম : নোয়াখালীর সুধারাম উপজেলার অভ্যন্তরে রয়েছে চরবাগারদোনা ও চরমজিদ। এখানে সাম্পানের দাঁড়টানা শব্দ আর জাহাজের হুইসেল মিলে একাকার হয়ে কর্মপ্রেরণা জোগায় সাধারণ মানুষেরা। এখানে দেখাবেন প্রমত্তা মেঘনা নদী, বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে আর এর মাঝ থেকে জেলেরা তুলে আনে রুপালি ইলিশ এ দৃশ্য দেখে অভিভূত হবেন। এখানেরর সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। মেঘনা নদীর পাশে আরো দেখবেন সারি সারি বাবলা, কেওড়া, গজারির গাছ। এসব গাছপালা এখানে বিশাল বনছায়া সৃষ্টি করেছে।

হাতিয়া দ্বীপ
নোয়াখালীর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুকে হাতিয়া দ্বীপ। এটি এখন উপজেলা শহর। মাইজদী থেকে বাসে সোনাপুর এসে আবার বাস ধরে মেঘনানদীর ঘাটে আসুন। চরজব্বার থেকে সি-ট্রাকে হাতিয়া দ্বীপে যাবেন। হাতিয়াঘাট থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ওছখালিতে শহর গড়ে উঠেছে। এটিই হাতিয়া উপজেলা শহর। এখানে গিয়ে দেখবেন মেঘনা নদী।
হাতিয়া দ্বীপে কয়েকদিন বেড়াতে পারেন। বঙ্গোপসাগরকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছে পূরণ করতে হলে আপনাকে হাতিয়া যেতে হবে। অতল সাগরের মাঝে হাতিয়া দ্বীপ ভাসছে।
ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় লঞ্চ ছেড়ে যায় হাতিয়া দ্বীপে। এটি সকাল ১০টায় হাতিয়ায় গিয়ে পৌঁছে। হাতিয়া এসে পৌঁছে হাতিয়া এসে পৌঁছে। হাতিয়া এসে পৌঁছে তখন স্বস্তি অনুভব করবেন।
রাত যাপন করার জন্য হাতিয়ায় কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। ২ জন থাকা যায় এমন রুমের ভাড়া ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। সরকারি রেস্টহাউস ও ডাকবাংলোতে থাকতে পারেন।
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হাতিয়ায় রয়েছে অফুরন্ত সৌন্দর্য। এখানে বঙ্গোপসাগরের তীরে বেড়াতে পারেন। সমুদ্রসৈকতে দেখবেন শামুক, ঝিনুক আর পাথরের ছড়াছড়ি। জেলেদের নৌকো দেখে অবাক হবেন। নৌকো অনেক দূর গভীর সমুদ্রে চলে যায়। জেলেরা সমুদ্র থেকে মাছ ধরে ফিরে আসে। ঘরে ঘরে দেখবেন গরু, মহিষ। লবণের স্তূপও রয়েছে এই হাতিয়ায়।
জেলেদের পাড়ায় গিয়ে দেখবেন চিংড়ি, ইলিশ, ভেটকি, রূপচান্দা, লট্টা, ফ্যাসা প্রভৃতি মাছ শুকনো হচ্ছে।
এখানে স্কুল, কলেজ, ছবিঘর, মসজিদ, কোর্ট-কাছারি ঘুরেফিরে দেখুন।
বাবলাগাছ এক লাইনে লাগানো দেখে আরো বেশি মুগ্ধ হবেন। জানবেন বাবলা গাছ আর ভেড়িবাঁধ আজ হাতিয়ারকে রক্ষা করছে বঙ্গোপসাগরের হাত থেকে।
এককালে হাতিয়া দ্বীপ পর্তুগিজ জলদস্যুদের অবসর বিনোদনকেন্দ্র ছিল। ধীরে ধীরে এখানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। ভাঙাগড়ার মধ্যদিয়েই হাতিয়া সুন্দর পরিচ্ছন্ন একটি থানা শহর হিসেবে আজ প্রতিষ্ঠিত। জানা যায়, সাগর উপকূলবর্তী এই দ্বীপ দীর্ঘদিন বন-জঙ্গলে আচ্ছন্ন থাকায় শুধু পশুপাখির রাজত্ব ছিল এখানে। বাঘ, হরিণ, ভল্লুক-এর পাশাপাশি হাতিও এসেছিল। এই বাক্যের উর্দু পরিভাষায় কোনো এক অজানা মুখে ‘হাতি বি আয়া’ কথাটি অপভ্রংশ বাংলায় ‘হাতিয়া’ রূপ লাভ করে।
দেখবেন, এখানকার মানুষ লাঙ্গল আর গরু নিয়ে জমিতে যাচ্ছে। তখন কারো মুখে শুনবেন, ‘বাজান চল্ যাই চল্ মাঠে লাঙ্গল বাইতে…’। সবুজ-শ্যামল শস্যক্ষেত দেখে আরো বেশি মুগ্ধ হবেন। এক এক সময় মনে হবে, সবুজের আদিগন্ত সাগর যেন এখানে এসে উছলে পড়েছে। বড় বড় দীঘিও দেখবেন হাতিয়ায়। কুমোরদের পাড়া ঘুরে দেখায় আছে আরো আনন্দ। এক লাইনে সাজানো মাটির বাসন, থালা, পুতুল, কলস, ঘটি আরো কত কী।
হাতিয়ার সুখচর, নলটিয়া, দাসেরহাট, চেংগার চর, রায়, চরকৈলাস, চরতামার উদ্দিন, মাইজছড়া, সাগরিয়া, সোনাদিয়া, চরকিং জাহাজমারা প্রভৃতি জায়গা ঘুরে দেখুন।
এখানে প্রায় সব বাড়িতে দেখবেন পানগাছ। পানপাতায় আবৃত হয়ে আছে অনেক বাড়ির বাগান। এরা পানচাষ করেই জীবিকা নির্বাহী করে থাকে। প্রতিবছরই বঙ্গোপসাগরের তীব্র স্রোতে হাতিয়া দ্বীপ ভাঙছে। এ কারণে জমির মালিকরা জমি হারাচ্ছে। আবার নতুন চর জেগে ওঠায় অনেকে গরু, মহিষ, ছাগল নিয়ে সেকানে বাড়িঘর করে নতুনভাবে বসতি স্থাপন করছে। এ জন্য এখানে মানুষের মুখে মুখে ফেরে : নদীর একূল ভাঙে ওকূল গড়ে এই তো নদীর খেলা।
চরাঞ্চলে পায়ে হেঁটে বেড়াতে গিয়ে দেখবেন বালু আর বালু।
হাতিয়ার মহিষের দই ও ঘি এর তুলনা হয় না, ফিরতি পথে ঘি নিয়ে আসতে পারেন।

নিঝুম দ্বীপ
এখানে আছে ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণ। গরু, ছাগল, মহিষ ঘুরে বেড়ায় এখানকার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে। বনাঞ্চলও আছে। অথৈ বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে আপনাকে নিঝুম দ্বীপে যেতে হবে। শীত-বসন্তে সাগর আরো শান্ত থাকে। তাই যেতে ভয় লাগার কথা নয়।
ঢাকা থেকে ট্রেনে মাইজদী যাবেন। মাইজদী থেকে বাসে সোনাপুর হয়ে চরজব্বার চলে যান। নোয়াখালী থেকে চরমজিদ যেতে পারেন। তারপর ট্রলারে হাতিয়ার কূল ধরে তমরদ্দি পৌঁছাবেন। এখানে জোয়ার শুরু হলে ট্রলার ছাড়া হয়। এরপর জাহাজমারা হয়ে নিঝুম দ্বীপে যেতে পারেন ঐ একই ট্রলারে। চরজব্বার থেকে সীট্রাককে হাতিয়া হয়ে নিঝুম দ্বীপে যেতে পারেন। এজন্য সীট্রাক উঠে হাতিয়া নেমে এরপর বাসে যাবেন জাহাজমারা। এই জাহাজমারা থেকে নিঝুম দ্বীপে যাওয়ার জন্য ট্রলার রয়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থা খুবই কষ্টকর, সময়সাপেক্ষ। দুর্গম পথও বলা যায়। তবুও ভ্রমণ করে আনন্দ পাবেন। একত্রে ২ জন গেলে ভালো হয়। গল্প করে দুজন যাওয়ার দারুণ আনন্দ।
হরিণ আর সবুজের সমারোহ এই দ্বীপ জুড়ে। ভ্রমণপথে অনেক আশা আর উৎসাহ নিয়ে যাওয়া সে এক দারুণ রোমাঞ্চকর বৈকি।
রাত্রিযাপন করার জন্য এখানে ডাকবাংলো রয়েছে। আরো আছে আশ্রয়কেন্দ্র। এখানে দেখবেন বঙ্গোপসাগরের উতাল তরঙ্গ, বিশাল এলাকা জুড়ে বানঞ্চল। বনের আশপাশে বেড়াতে গিয়ে হরিণের ঝাঁক দেখে স্বপ্নের রাজ্যে ফিরে যাবেন। কত বিচিত্র ধরনের গাছ এখানে, আছে সহস্র পাখিদের মেলা! এসব কিছু আপনাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করবে।
চরগুলোর পাশ দিয়ে যেদিকে যাবেন দেখবেন গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া। এখানকার অধিবাসীদের অনেকেরর আদি বাড়ি হাতিয়াতে। বনবিভাগের বনাঞ্চলে বেড়াতে দারুণ আনন্দ। ডাকবাংলো রয়েছে এখানে।
নিঝুম দ্বীপে ফসলের ক্ষেত চোখে পড়বে। জানা যায়, এই দ্বীপে বর্তমানে ১২ হাজার লোক বাস করে। এদের মধ্যে শতকরা ৮৫% জনই জীবিকানির্বাহ করে সাগরের মাছ ধরে। মার্চ-এপ্রিল গেলেও মাছ ধরা দেখতে পাবেন। ইচ্ছে করলে জেলেদের সঙ্গে খাতির জমিয়ে সাগর থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেন। এ এক থ্রিল। বলা যায়, একধরনের আনন্দ।
যদিও অফুরন্ত আনন্দ, তবুও কিন্তু ভয়ও আছে অনেক। কখন যে সাগরে উত্তাল হয়ে ওঠে তা বলা যায় না। ঢেউয়ে নৌকা যখন দুলবে তখন ভয়ে বুকটাও কেঁপে উঠবে। যদি সাহস কম থকে তবে নৌকায় উঠে সাগর পাড়ি দেবেন না।
সবচেয়ে মজা হয়, সমুদ্রের কাছাকাছি কোনো জায়গায় বসলে। নীরব নিস্তব্ধ সর্বত্রই। ঢেউ এসে মাটির সঙ্গে হোঁচট খাচ্ছে। তাকিয়ে থাকবেন আকাশপানে। গাছগাছালির উপর দেখবেন নাম না জানা পাখির দর। ওদের ডাকে মুগ্ধ হবেন। নানা রঙের অতিথি পাখি দেখে ওদের কিছু ছুটে যেতে মন চাইবে। নিঝুম দ্বীপে গেলে এমনটিই হয়।
নিঝুম দ্বীপের একসময় নাম ছিল চরওসমান। দ্বীপের বয়স বহু বছর হলেও এখানে নিবিড়ভাবে মানুষের বসতি গড়ে ওঠে ৪০ বছর হলেও এখানে নিবিড়ভাবে মানুষের বসতি গড়ে ওঠে ৪০ বছর আগে থেকে। তার আগে এখানে ছিল শুধু বুনো মহিষ আর পাখিদের বিচরণ। হাতিয়া, নোয়াখালী, জাহাজমারা কিংবা অন্য কোনো অঞ্চলের আশ্রয় নিত এরা। প্রচুর ঘাস খেয়ে মহিষগুলো বিরাট আর মোটতাজা হয়ে উঠত। পরে এভাবেই ক্রমে ক্রম এরা বংশ বিস্তার করতে থাকে। কয়েক বছরের মধ্যে মোষসম্পদে ভরপুর হয়ে ওঠে নিঝুম দ্বীপ।
সুন্দরবন থেকে স্রোতের টানে যেসব গাছের বীজ এখানে এসেছে তা পরবর্তীতে চারা জন্মেছে। এবং তা থেকে বড় বড় গাছ হয়েছে। গাছ থেকে বীজ নিচে পড়ে কিংাব পাখিরা একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় বীজ নিয়ে গেছে, যার কারণে একদিন নিঝুম দ্বীপ ঘন সবুজ বনাঞ্চলে সমুদ্র হয়ে ওঠে।
নিঝুম দ্বীপে কোনো যানবাহন দেখবেন না। দেখবেন সবুজ গাছগাছালির মাঝ থেকে পায়েহাঁটা মাটির পথ চলে গেছে। হয়তো সেখানে কোনো রাখাল ছেলের ঠোঁটে পাতার বাঁশির সুর শুনতে পাবেন। এতই সুন্দর এতই মনোরম এই জায়গা যে, বারবার এখানের সবুজ দুর্বাঘাসের উপর বসে থাকতে ইচ্ছে হবে।
এখানে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো, আশ্রয়কেন্দ্র, মসজিদ, স্কুল আর বাজার দেখতে পাবেন।
নিঝুম দ্বীপের বাজারে দুধ, দই, মধু পাবেন। এমনি খাঁটি দই আর কোথাও পাবেন বলে মনে হয় না। মহিষের দই খেতে আসলেই দারুণ তৃপ্তি। নিঝুম দ্বীপে গিয়ে তা অনুভব করতে পারবেন।
নিঝুম দ্বীপ হাতিয়ার জাহাজমারা ইউনিয়নের অধীনে। এ দ্বীপে ৬ হাজার একর জমিতে চাষাবাদ য়। এখানে কোনো গাড়ি নেই। নেই গাড়ির কালো ধোঁয়া। তাই যে কদিন নিঝুম দ্বীপে থাকবেন বড়ই ভালো লাগবে। ডাকবাংলোতে রাত্রিযাপন করলে চাঁদনি রাতে পুকুরপাড়ে বসে থাকতে ইচ্ছে হবে। স্বচ্ছ পানিতে গোসল করেও আনন্দ পাবেন। মনে হবে, কতদিন কত যুগ যেন এরূপ দেখিনি। এখানের পরিবেশ, নির্জন নিস্তব্ধ। নেই কোনো কোলাহল, তবুও খারাপ লাগার কথা নয়।
দুজন একত্রে গেলে কদিন এক ভিন্নজগতে বাস করবেন। তিন থেকে চার দিন নিঝুম দ্বীপে বেড়াতে জনপ্রতি কম করে হলেও প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ হবে। এখানকার সবুজ বনবনানী, হরিণ আর পাখির ঝাঁক দেখে প্রবর আনন্দ নিয়েই ফিরবেন। কিছুতেই ভোলা যাবে না নিঝুম দ্বীপের সৈসর্গিক দৃশ্যের কথা।
নিঝুম দ্বীপ হতিয়ার একটি অংশ। এই দ্বীপে মেঘনার মোহনায় বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত। নিঝুম দ্বীপ একেবারে বিচ্ছিন্ন সবকিছু থেকে। রাত যাপন করার জন্য এখানে ডাবাংলো এবং নিজুম রিসোর্ট রয়েছে। নিঝুম দ্বীপে নেমেই চলে যেতে ইচ্ছে হবে দক্ষিণে সমুদ্র দেখতে। ১৯৬০ সালের দিকে জেলেরা এই দ্বীপে প্রথম বসতি স্থাপন শুরু করে। কেওড়াগাছের ছড়াছড়ি রয়েছে, বিশাল এলাকা জুড়ে এখন বনভূমি এখানে। এসে দুচোখ এক মায়াবী মোহে আবিষ্ট হয়ে পড়বে। অপূর্ব সুন্দর এই সবুজ বনাঞ্চল।