ঘুরে আসুন টাঙ্গন নদীতীরের ঠাকুরগাঁও

77
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: উত্তরবঙ্গের জনপদ ঠাকুরগাঁও। এই শহরের পার্শ্ববর্তী টাঙ্গন নদীর তীরেই ছিল এককালের নায়িকা তৃপ্তি মিত্রের বাড়ি। শৈশবে তিনি টাঙ্গন নদীতে স্নান করেছেন। ১৯৫৭ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে শ্যুটিং করতে এসে তিনি সেই স্মৃতিচারণ করে গিয়েছিলেন।
ঠাকুরগাঁও শহরের সরকারি বালক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন ১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হারানো দিন’ ছবির নায়ক রহমান। সেই স্কুল এখন ঠাকুরগাঁও জেলা স্কুল নামে পরিচিত।
ছোট্ট শহর ঠাকুরগাঁও শহরের চারদিকে রয়েছে সবুজ শ্যামল রূপ। ধানের দেশ, গানের দেশও এই ঠাকুরগাঁও। এখানে গেলে মন হারিয়ে যায়, এ যেন মন হারানোর দেশ।
টাঙ্গন নদীর উপর রয়েছে কয়েকটি ব্রিজ। রিকশা ভাড়া করে ব্রিজ পেরিয়ে যেদিকে যাবেন চোখের সামনে এসে ভিড় করবে বাংলার সবুজ শ্যামল রূপ। যেদিকে তাকাবেন দুচোখ আনন্দে ভরে উঠবে।


বর্তমান ঠাকুরগাঁও শহর থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে আচকা গ্রামে নারায়ণ চক্রবর্তী ও সতীশ চক্রবর্তী নাম দুভাই বাস করতেন। তারা দুজনই ছিলেন প্রভাবশালী। প্রভাব ও প্রতিপত্তির কারণে লোকজন তাদেরকে ঠাকুর এবং তাদের বাড়িকে ঠাকুরবাড়ি বলে সম্বোধন করত। পরে স্থানীয় লোকজন ঠাকুরবাড়ি বলতে থাকে। এভাবেই এই এলাকার নাম হয়ে গেল ঠাকুরগাঁও।
ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও যাওয়ার জন্য কয়েকটি পরিবহন রয়েছে। সকাল ৮টার মধ্যে এবং রাত ৯টার মধ্যে এসব পরিবহন গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে ছেড়ে যায়।
রাত যাপন করার জন্য এই শহরে বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়েল বালিয়াডাঙ্গি, রানীশংকাইল, পীরগঞ্জ, হরিপুর এসব জায়গাও আকর্ষণীয় ও মনোরম।
ঠাকুরগাঁও শহরের দেখবেন শেনুয়া ব্রিজ, রেলস্টেশন, টাঙন ব্রিজ। কহরপাড়া আর নিশ্চিন্তপুরে গেলে নির্জন পরিবেশন পাবেন। এখানে টাঙন নদীতীরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ধরে বসে থাকতে ইচ্ছে হবে। নদীতীরে রয়েছে শিশুগাছ, নিমগাছ, বাঁশবাগান, বালুচর। ফসলের ক্ষেত রয়েছে কহরপাড়ায়। বিচিত্র বর্ণের পাখিও চোখে পড়বে এখানে। কহরপাড়া গ্রামখানি ঠাকুরগাঁওয়ের পাশেই।
সারাদিন কাটাতে পারেন টাঙ্গন নদীতীরবর্তী নিশ্চিন্তপুর গাঁয়ে। এখানে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকবেন নৈসর্গিক দৃশ্যের দিকে। এখানের কাশবন ফুলে ফুলে সাদা। বিমানবন্দর, চিনির কল, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটও ঘুরে দেখুন।
ঠাকুরগাঁওয়ের আরেক আকর্ষণ ‘কুমিল্লা হাঁড়ি পিকনিক কর্নার’। শহরের কাছে পিঠে এই পিকনিক কর্নার। এখানে পুকুরে এখন মাছ চাষ করা হয়। পুকুরপাড়ে বসার বেঞ্চ রয়েছে। ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য খেলনাসহ নানারকম খেলাধুলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। পিকনিক কর্নারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনার মন কেড়ে নেবে। পিকনিক বা বনভোজন করার জন্য কয়েকটি শেড রয়েছে এখানে। আম, কাঁঠাল, নারকেল, বাবলা, মেহগনি, ইউক্যালিপটাসহ প্রায় চার হাজার গাছ দেখবেন পুকুরের আশপাশে। পুরোনো বটগাছ এখানে চোখে পড়বে। এর ছায়াতলে কিছু সময় বসুন।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর গ্রামের ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ির মসজিদটিও দেখার মতো। কারুকার্যময় এ মসজিদবাড়ির মসজিদটিও দেখার মতো। কারুকার্যময় এ মসজিদটি দুইশত বছরের পুরনো। এর স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত সুন্দর। মসজিদটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো চারপাশের সুদৃশ্য মিনার ও তার নকশা। জমিদার আবদুল হালিমের উদ্যোগে ১৭৮০ সালে মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল।
রানীশংকাইল জায়গাটি খুবই আকর্ষণীয়। একদিনের জন্য হলেও রানীশংকাইল যাবেন। এখানের নেকমরদে দেখবেন নেকমরদের মাজার। এই অঞ্চলে যে ক’জন পীর আউলিয়া-দরবেশ ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করেন তাঁদের মধ্যে পীর শাহ নেকমরদ বা হযরত শাহ নাসিরউদ্দিন হায়াদর অন্যতম। তিনি ঠাকুরগাঁও এলাকার সর্বস্তরের মানুষের কাছে নেকমরদ বা নেকমর্দ নামে পরিচিত।
নেকমরদ থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ স্থান গোরকই। গোরকাইতে রয়েছে গোরক্ষনাথ মন্দির ও আশ্রম। রানীশংকাইলে রয়েছে রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি। অনুরূপ আরেক রাজবাড়ি দেখবেন হরিপুরে। এই দুই রাজবাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার প্রাচীন স্থাপত্যকীর্তি।
রানীশংকাইলের ভান্ডারা গ্রামে গেলে দেখবেন খুনিয়া দীঘি। এই দীঘিটি এখন শুধুই ইতিহাস। এখানে একদা নির্ভয়ে প্রাণীকুল নামত তৃষ্ণা নিবারণের জন্য। দীঘিটি ছিল মানুষের পানির উৎস। এখানে বিচরণ করতে মাছ। ঝাঁক বেঁধে আসত পাখি। সেই দীঘি একাত্তর সালে হয়ে উঠল প্রাণহননের এক নির্মম বধ্যভূমি। একাত্তরের বীর শহীদদের স্মরণে এখানে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ।
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রায় বাড়িতে গরু, ছাগল, পালন করা হয়। গো-মাংস উৎপাদনের জন্য এই জায়গা বেশ সমৃদ্ধ।
শহরের একপ্রান্তে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে তাকা বিমানবন্দর ঘুরে দেখুন। ১৯৪০ সালে এই বিমানবন্দর তৎকালীন ব্রিটিম সরকার নির্মাণ করেছিল।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও যাওয়ার জন্য হানিফ পরিবহনকে বেছে নিতে পারেন। ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও পৌঁছাতে প্রায় ৭ ঘণ্টা সময় লাগে।
যেখানে থাকবেন : রাতযাপন করার জন্য ঠাকুরগাঁও শহরের হোটেল সালাম ইন্টারন্যাশনাল রয়েছে। এটি শহরের নর্থ সার্কুলার রোডে অবস্থিত।
অন্যান্য তথ্য : হিমালয়ের হিমশীতল পরশে লালিত উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁও জেলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরূপ। এখানে গিয়ে উত্তর দিগন্তে তাকালেই দেখবেন তুষার মৌলী কাঞ্চনজঙ্ঘার এক বিস্ময়কর সৌন্দর্য। এই জেলার উত্তরে পঞ্চগড় জেলা, দক্ষিণে দিনাজপুর জেলার উত্তরে পঞ্চগড় জেলা, দক্ষিণে দিনাজপুর জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। পূর্বে দিনাজপুর জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য।


ঠাকুরগাঁয়ের আয়তন প্রায় ১,৮০৯ বর্গকিলোমিটার। টাঙ্গন, ঢেপা আর ভুল্লি নদী বয়ে গেছে এই জেলার উপর দিয়ে। উপজেলা ৫টি। এগুলো হলো ঠাকুরগাঁও সদর, রানীশংকাইল, বালিয়াডাঙ্গি, হরিপুর আর পীরগঞ্জ। এই জেলার অভ্যন্তরে রয়েছেÑ রাজা জগেন্দ্রনারায়ণের রাজবাড়ি, রাজা গণেশের রাজবাড়ি, জগদল রাজবাড়ি, বাংলাঘর, সনগাঁও শাহী মসজিদ, সৈয়দ নাসিরউদ্দিনের মাজার, গোবিন্দ জিউ মন্দির, শিবমন্দির (হরিপুর), রামরাই দীঘি, শ্যামরাই মন্দির, ফতেপুর মসজিদ, গোরক্ষণাথের মন্দির ইত্যাদি।