ঘুরে আসুন চমচম, শাড়ি, আর গজারি বন টাঙ্গাইলের গর্বের ধন

78
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: নদীর চর, খাল-বিল, গজারি বন, টাঙ্গাইল শাড়ি এই হলো টাঙ্গাইল জেলার গর্বের ধন। টাঙ্গাইল নামকরণ নিয়ে নানা জনের নানা মত রয়েছে। মোকলা সম্প্রদায় নামে একটি গোষ্ঠী বাস করত এই এলাকায়। এই মোকলা সম্প্রদায়ের সর্দার বা মোল্লাদেরকে বলা হতো টাঙ্গাই। পর্যায়ক্রমে এদের নামানুষারে জেলার নাম হয়েছে টাঙ্গাইল। ‘টাঙ্গাইলের ইতিহাস, গ্রন্থে আছে : উঁচু টান আইল থেকে টাঙ্গাইলের নামকরণ হয়েছে।
টাঙ্গাইল জেলা ১১টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। উপজেলাগুলো হলো টাঙ্গাইল সদর, মধুপুর, মির্জাপুর, গোপালপুর, ভুয়াপুর, নাগরপুর, সখিপুর, কালিহাতি, ঘাটাইল, বাসাইল ও দেলদুয়ার। এ জেলার আয়তন প্রায় ৩,৪১৪ বর্গকিলোমিটার। যমুনা ও বংশী নদী বয়ে গেছে এই জেলার ওপর দিয়ে। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত টাঙ্গাইল ছিল মহকুমা, এরপর জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
যে পরিবহনে যাবেন : ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড হতে টাঙ্গাইলের পরিবহন ছাড়ে। ধলেশ্বরী পরিবহনে গেলে ভালো হয়। ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে টাঙ্গাইল পৌঁছাতে। অন্তঃনগর ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেস কিংবা সিল্ক সিটিতে টাঙ্গাইল যাওয়া যায়।
টাঙ্গাইলের প্রত্ন সম্পদ : টাঙ্গাইল জেলার উল্লেখযোগ্য প্রত্ন সম্পদ হলো আটিয়া মসজিদ (১৬০৮), সাগরদীঘি, গুপ্ত বৃন্দাবন, ইছামতির দীঘি, নাগপুর দীঘি, খামারপাড়া মসজিদ (গোপালপুর), ধনবাড়ি মসজিদ (১৬৮৫), নওয়াববাড়ি (ধনবাড়ি), করটিয়া জমিদারবাড়ি, দেলদুয়ার জমিদারবাড়ি।

যেখানে থাকবেন : রাত্রি যাপন করার জন্য টাঙ্গাইল রয়েছে হোটেল পলাশ, হোটেল সাগর।

যা যা দেখবেন : টাঙ্গাইল জেলা সদর থেকে ৬-৭ কিলোমিটার দূরে আটিয়া মসজিদ। এটি দেশের প্রাচীনতম মসজিদগুলোর মধ্যে একটি। ১৬০৮ সালে বায়েজিদ খান পন্নীর পুত্র সায়িদ খান পন্নী এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এই মসজিদের ছবি ১০ টাকার নোটে রয়েছে। এখানে যাবেন রিকশায়। আটিয়া মসজিদ লৌহজং নদীর পাড়ে অবস্থিত। আটিয়া মসজিদকে কেন্দ্র করে প্রায় ২ কিলোমিটার জুড়ে অনেক প্রাচীন কীর্তির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এই মসজিদের কাছে রয়েছে। এই মসজিদের কাছে রয়েছে। এই মসজিদের কাছে রয়েছে শাহ বাবা আদম কাশ্মীরীর মাজার।
শাহ বাবা আদম কাশ্মীরী টাঙ্গাইলের আটিয়ায় একটি স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। আবার অনেকে মনে করেন, বাবা আদম কাশ্মীরী আটিয়ায় এসেছিলেন ধর্মপ্রচারের জন্য, পরে তাকে আটিয়ার পরগনাদার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। শাহ জামান ছিলেন বাবা আদম কাশ্মীরীর ভাগ্নে। এই শাহ জামান ছিলেন কাগমারী পরগনার শাসক। এরপরে তার পুত্র এনায়েতউল্লাহ শাসন হন এবং তিনি। মক্কায় হজে গিয়ে মারা গেলে জমিদারের পূর্বপুরুষেরা আবার চাঙা দিয়ে ওঠেন। এভাবেই আবার প্রতিষ্ঠিত হয় সন্তোষ জমিদারি।
আজকের জেলাশহর টাঙ্গাইলে তখনো থানা স্থাপিত হয়নি। প্রথমে থানা ছিল আটিয়াতে। ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে আটিয়া থেকে সন্তোষ জমিদারির মধ্যে থানা চলে আসে। এরপরে সন্তোষের কাগমারীতে পরবর্তীকালে লৌহজং নদী শুকিয়ে গেলে কাগমারী বন্দর নষ্ট হয়ে যায়। আর ওদিকে টাঙ্গাইলের প্রসারতা বেড়ে গেল। ১৯০৫ সালে টাঙ্গাইলকে মহকুমায় উন্নীত করে ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। টাঙ্গাইল শহর থেকে ২ মাইল দূরে সন্তোষ জমিদারীবাড়ি যাবেন সড়কপথে রিকশায়। যাতায়াত পথে কাগমারী মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজটি দেখে নিন। সন্তোষ জমিদারবাড়িটি এক বিরাট দীঘির পাশে অবস্থিত। অপরূপ কারুকার্যখচিত জমিদারবাড়িটি খুবই আকর্ষণীয়। টাঙ্গাইল হতে ১ মাইল দূরের জাদুঘর পিসি সরকারের বাড়িটিও দেখুন একই সুযোগে। এর কিছুদূরে একটি পাকা সমাধির ধ্বংসাবশেষ আছে। অনেক বলেন, এটি সুলতানের কবর। কেউ কেউ বলেছেন, বাংলার সুলতান হোসেন শাহর কনিষ্ঠ পুত্র সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের কবর এটি।
টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলায় যেতে পারেন। এখানে দেখবেন একটি পাকা মসজিদের ধ্বংসাবশেষ ও ১৯টি বাঁধানো কবরের ধ্বংসাবশেষ। প্রাচীন একটি পুকুর আছে এখানে, এর আয়তন এক একরের বেশি। পূর্বদিকে অবস্থিত এই পুকুরসহ ৫ একর ৪৪ শতাংশ জমি শাহ আলাউল হকের মসজিদবাড়ি হিসেবে ব্রিটিশ রেকর্ডে উল্লিখিত রয়েছে। এখানে জঙ্গলাকীর্ণ উঁচু ঢিবিতে ২টি পাকা কবর আছে যার একটি দরবেশ শাহ আলাউল হকের।
খামারপাড়া গ্রামের উত্তরে যে প্রাচীন জলাশয় আছে এটিও দেখুন। এই জলাশয়কে জালাল মামুদের দীঘি বলা হয়। দীঘিটি সুলতান জালালউদ্দিন আহমেদ শাহর আমলে হয়েছিল বলেই এই নাম।

মধুপুরে যাবেন : এই উপজেলায় গেলে বনাঞ্চল দেখতে পাবেন। শালবন দেখে মুগ্ধ। হবেন। এখানের গড় ও অরণ্য দেখার মতো। মধুপুর উপজেলা সদর হতে প্রায় ৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ব্রাহ্মণবাড়ি গ্রামে একটি প্রাচীন মসজিদ আছে যাকে আইলা জোলার মসজিদ বলে। এটি ঘুরে দেখুন। এখানে নাকি এক সময়ে সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরত শাহর আমলের মুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল।
মধুপুর উপজেলা সদর থেকে ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে নরিল্লা নামে প্রাচীন গ্রাম আছে। এখানে অতীত দিনের দালানকোঠার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাবেন। একসময়ে এখানে প্রাচীন নগরী ছিল।
মধুপুরের ধনবাড়ি মসজিদও দেখার মতো। এটি প্রাচীন আমলের কীর্তি। একসময় ধনপাতি সিংহ নামে এক নৃপতি রাজত্ব করতেন বলেই এর নাম ধনবাড়ি হয়েছে। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলের মুঘল সেনপতি ইস্কান্দার খান ও তার ভাই মনোয়ার খান এ স্থানের জমিদার ছিলেন। তাদের নির্মিত মসজিদটি ছাড়াও এই দুই ভাইয়ের কবর দেখতে পাবেন ধনবাড়িতে।
টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ি ছোট্ট একটি শহর হলেও এখানে দু-তিন দিন বেড়াতে পারেন। ধনবাড়িকে কেউবা নবাবী শহরও বলেন। এখানে গেলে দেখা হবে নবাবী আমলের স্থাপত্য কীর্তি।

যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে মহানগর অথবা বিনিময় পরিবহনে উঠে ধনবাড়িতে আসা যায়। পরিবহন ছাড়ে ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে। ঢাকা থেকে মাত্র ১৫০ কি.মি. দূরে ঢাকা জামালপুর হাইওয়ের পাশেই ধনবাড়ি। ঢাকা থেকে পৌঁছতে প্রায় ৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। অর্থাৎ সকাল ৮টার বাসে উঠলে দুপুর ১২টায় পৌঁছে যাবেন ধনবাড়িতে।

যা যা দেখবেন : ধনবাড়ির প্রধান আকর্ষণ নওয়াব বাড়ি। এখানকার ঝলমলে আকর্ষণীয় স্থাপত্যগুলোর মধ্যে রয়েছে নওয়াব মসজিদ, নানারকম ফুলের বাগান। আরও রয়েছে নওয়াবদের অন্দরমহল। নওয়াব প্যালেসটি বারবার দেখেও যেন দেখা শেষ হবে না। এখানে ঢুকেই জানতে ইচ্ছে হবে, এই বাড়ির অতীত কাহিনী সম্পর্কে নানা কথা। এই বিশাল আকৃতির ভবনটি ছিল এককালের দরবার হল। এখানের প্রতিটি কক্ষেই আছে অতীতের ঐতিহ্য বহনকারী আসবাবপত্র। এছাড়াও দেখবেন বিশাল ডাইনিং হল। নওয়াব মিউজিয়াম বসেছে এখানে। লাইব্রেরি এবং বেশকিছু বেডরুম আছে। লাইব্রেরিতে দেখবেন নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর গ্রন্থসমূহ যেমন- ঈদুল আজহা, মৌলুদ শরীফ (১৯০৩), ভারনাকুলার এডুকেশন ইন বেঙ্গল (১৯০০) প্রভৃতি।
নওয়াব প্যালেস দেখা শেষ করে আসুন বাগানে। ফুলবাগানে বেড়াতে গিয়ে রঙবেরঙের ফুল দেখে আপনিও কী যেন এক আনন্দের পরশ খুঁজে পাবেন। নওয়াব শাহী মসজিদটিও দেখার মতো। মসজিদটির পাশে একটি কক্ষে রয়েছে নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর মাজার। এখানে বিরতিহীন ২৪ ঘণ্টা কোরআন তেলওয়াত হচ্ছে ১৯২৯ সাল থেকে। নওয়াববাড়ির কম্পাউন্ডে বিশাল একটি দীঘি রয়েছে। নওয়াব বাড়ি কম্পান্ডে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। এসব দেখায়ও আনন্দ রয়েছে। ধনবাড়ির নওয়াব বাড়ি কীর্তিগুলো স্মরণ করিয়া দেবে নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর কথা। সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯২৯ সালে নিজ জমিদারী এলাকা এই ধনবাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন।

যেখানে থাকবেন : রাতযান করার জন্য ধনবাড়ির নওয়াব আলী হাসান আলী রয়েল রিসোর্টে সুন্দর সুন্দর রুম রয়েছে। রুম অগ্রিম করা যায় ঢাকার নওয়াব আলী রয়েল রিসোর্ট থেকে। ঠিকানা : লাইট হাউস গ্রুপ, বিএসআরএস ভবন (৬ষ্ঠতলা), ১২ কারওয়ান বাজার, ঢাকা।
টাঙ্গাইলের পাহাড়ি এলাকায় দেখবেন সাগরদীঘি। এখানেই ছিল গুপ্ত বৃন্দাবন যা শ্রেীচৈতন্যদেবের সমসাময়িক বৈষ্ণবভক্ত মাধবাচার্য সংস্কার করেছিলেন। সাগরদীঘি গুপ্ত বৃন্দাবন এক বিস্ময়কর স্থান।
ঘাটাইল উপজেলা সদরের পূর্বদিকে অবস্থিত ধলাপাড়া। ধলাপাড়া যাওয়ার পথে ডানপাশে বিস্তৃত শালবন আর বামপাশে রয়েছ পাহাড়ের লাল চূড়া। ধলাপাড়া হতে ১০ মাইল পূর্বে সাগরদীঘি অবস্থিত। জনশ্রুতি আছে, এক সময় এখানে রাজধানী ছিল। পঞ্চদশ শতকে পালরাজাদের একজনের নাম ছিল সাগররাজা বা সাগর পাল। তিনি ছিলেন খুব প্রতাপশালী রাজা। সাগররাজ কর্তৃক প্রকান্ড দীঘিটি খনন করা হয়েছিল বলেই নাম হয়েছে ‘সাগরদীঘি’।
সাগরদীঘি দেখার পরে গুপ্ত বৃন্দাবনে আসুন। এটি সাগরদীঘি থেকে ২ মাইল দূরে অবস্থিত। এছাড়াও ঘুরেফিরে দেখে নিন ইন্দুপালের বাড়ি, তার তীর্থ দীঘি, ইছামতি দীঘি, সুতালির দীঘি, সন্ধানপুরের দীঘিসহ অন্যান্য কীর্তি।
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার জমিদারবাড়ি, করটিয়া জমিদারবাড়িও দেখার মতো। দেলদুয়ার জমিদারবাড়িতে বিয়ে হয়েছিল বেগম রোকেয়ার বড়বোন করিমুন নেসার।
টাঙ্গাইলের কৃতী সন্তান হলেন প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খান, জাদুঘর পিসি সরকার, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, রণদাপ্রদাস সাহা, ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, বায়েজিদ খান পন্নী।