ঘুরে আসুন গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটি

30
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: চারিদিকে হ্রদ, এরই মাঝখানে পাহাড়ের গায়ে রাঙ্গামাটি শহর। বাংলার সব সৌন্দর্য এখানে এসে উছলে পড়েছে…। প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি রাঙ্গামাটি। এখানের সর্বত্র রয়েছে নয়নলোভা দৃশ্য। যেদিকে চোখ যায় মনে হয় : আমরা আসব বলেই কি ওরা সেজেগুঁজে আছে!
রাঙ্গামাটি হয়ে শুভলং কিংবা বরকলে গেলে দেখবেন নদীর দুইপাশে পাহাড় আর ঝরনা। নৌকায় বসে ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করা জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। ‘ঝুমুর ঝুমুর নুপূর বাজে ঐ পাহাড়ে…’ এরকম মনে হবে কখনও কখনও। দুই পাহাড়ের মাঝখানের আওয়াজ শুনে শুধু বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য দেখা যে কী আনন্দ তা রাঙ্গামাটিতে গিয়ে বুঝবেন। হ্রদের পর হ্রদ দেখে দূরে-বহুদূরে চলে যেতে ইচ্ছে হবে। সৌন্দর্যে সৌন্দর্যে আনন্দে চোখ আর মন এক হয়ে যাবে। কাছ থেকে পাহাড় দেখা, তখন উজাড়-করা সব সৌন্দর্য যেন হাতের মুঠোয় পেয়ে যাবেন। এক এক সময় মনে আনন্দের ফোয়ারা বইবে। ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই/ঐ পাহাড়ে ঝরনা আমি/চিতা বাঘ মিতা আমার গোখ্রো খেলার সাথী…’ এরকম গানের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবেন এখানে এসে। বাংলার সব সৌন্দর্য এখানে এসে খুঁজে পাবেন।
কর্ণফুলী হ্রদকে কাছ থেকে দেখতে গিয়ে চোখে পড়বে কত নাম-না-জানা পাখি। হ্রদে পাখিরা এসে রাঙ্গামাটির রূপকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তাই রাঙ্গামাটির রূপকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তাই রাঙ্গামাটিকে কাছে থেকে দেখে-দেখে স্বাপ্নের ভুবনে হারিয়ে যাবেন। মনে হবে পাহাড়-অরণ্য-হ্রদের শহর এই রাঙ্গামাটি।
রাঙ্গামাটিতে দেখার জায়গা অনেক। দু-তিন দিন কাটিয়েও মন ভরে না। ইচ্ছে হয় আরো আরো কয়েকটা দিন থেকে যাই। রাঙ্গামাটি দেখে বলবেন, এখানকার মতো এদেশে আর কোথাও এমন পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দর্শন তো মেলে না। এখানকার চারদিকে রয়েছে সোনালি আর রূপালির খেলা। যেদিকে যাবেন সেদিকেই আপনার মন কেড়ে নেবে এখানের সোনালি নৈসর্গিক সৌন্দর্য।
ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটি যাওয়ার জন্য সরাসরি পরিবহন রয়েছে। আবার চট্টগ্রাম নেমে বাস ধরে রাঙ্গামাটিতে যেতে পারেন। রাত্রিযাপন করার জন্য পর্যটনের মোটেল ছাড়াও প্রাইভেট কয়েকটি হোটেল রয়েছে এখানে। রাঙ্গামাটির পাহাড়, হ্রদ দেখে মন ভালো হয়ে যায়। এখানে একে তো চোখজুড়ানো নীল-সবুজের ছোঁয়াছুঁয়ি, তার ওপর কাপ্তাইয়ের সুদীর্ঘ শান্তির হ্রদ। এখানের হ্রদ বেড়ানোর জন্য নৌকো, স্পিডবোট রয়েছে। ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা ধরে নৌকো নিয়ে হ্রদে বেড়াতে ইচ্ছে হবে। তাহলে বুঝতে পারবেন হ্রদ কত যে সুন্দর, কত যে বিচিত্র এর রূপ।
ঝরনা রয়েছে এখানে অনেকগুলো। পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরছে ঝরনা। এখানে গিয়ে পানি স্পর্শ করুন, খুব ভালো লাগবে।
ঝুলন্ত সেতু দেখবেন পর্যটন কমপ্লেক্স এলাকায়। এটি পেরিয়ে এপার থেকে ওপারে কয়েকবার গিয়েও মন ভরবে না। বারবার যেতে ইচ্ছে হবে। ঝুলন্ত পুল পেরিয়ে একটু দক্ষিণে এলেই দেখবেন বসবার জন্য বেঞ্চ রয়েছে। এখানে একটি বিকেল কাটিয়ে দিন। তখন চারিদিকের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে আপনিও হয়তো গানের কতগুলো কথা ভাববেন। ‘কুঁচ বরণ কন্যারে তার মেঘবরণ কেশ/আমায় লয়ে যাওরে নদী সেই সে কন্যার দেশ/পরনে তার মেঘ-হম্বুর উদয়তারার শাড়ি…’ গানের এ কথাগুলো বারবার হৃদয়ে দোল খেয়ে যাবে।
রাঙ্গামাটির একটি সুন্দর দর্শনীয় স্থান রাজবন বিহার। এটি রাঙ্গামাটি শহরে ঢুকতে ঘাঘরাতে অবস্থিত। এখানে চারদিকেই টিলা-পাহাড়। দূরের টিলা-পাহাড়গুলো অবশ্য জঙ্গলে ঢাকা। বর্ষাকালে রাঙ্গামাটির হ্রদে যৌবনের ঢল নামে। রাজবন বৌদ্ধবিহার ঘুরে দেখতে পারেন। সংলগ্ন বৌদ্ধমন্দিরটি খুবই সুন্দর। চারিদিকে আরণ্যক পরিবেশে বিহার আর মন্দির দুটি অপরিসীম শান্তির জায়গা মনে হবে। ডিঙিতে চেপে কর্ণফুলী নদী পেরিয়ে আরেকটি টিলায় এসে এবার চাকমা রাজার বাড়ি দেখুন। এরপর আসুন টুকটুক ইকো ভিলেজে।
রাঙ্গামাটির উপজাতি-সংস্কৃতি জাদুঘরটি দেখে নিতে পারেন। উপজাতীয়দের আর্থ-সামাজিক জীবনের সুন্দর প্রতিফলন ঘটেছে এই জাদুঘরে। দূরের পাহাড়-অরণ্যঞ্চলে যাওয়ার সময় কিছুটা ভয়-ভয় লাগবে, তবুও আনন্দ আছে এখানের সৌন্দর্য উপভোগ করে। বারবার এই রাঙ্গামাটিকে নিসর্গের উদার সম্ভারে গরীয়সী মনে হবে।
চট্টগ্রামের ৭৭ কি. মি. পূর্বে এবং কাপ্তাইয়ের ২০ মাইল উত্তরে রাঙ্গামাটির অবস্থান। বনাঞ্চল কেটে ১৮৬০ সালে তৈরি করা হয়েছে রাঙ্গামাটি শহর। রাঙ্গামাটি শহরে ও আশপাশের অরণ্যে চাকমা, মগ, টিপরা, খুমি, মুরংসহ উপজাতীদের বাড়িঘর রয়েছে। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে পাহাড়ি আদিবাসীগণ নাচে, গানে, খেলাধুলায় ও খাদ্য উৎসবে অংশ নিয়ে কিছু উৎসব পালন করে।
রাঙ্গামাটি শহরের রাস্তা উঁচু-নিচু। তাই এখানে একটি রিকশাও নেই। এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়ার জন্য রয়েছে স্কুটার। গোটা শহর পাহাড়ের গায়ে গায়ে, আর এর চারদিকে রয়েছে হ্রদ। হ্রদের পূর্বতীরে পেডা টিং টিং-এ যেতে পারেন। এখানে বেড়াতে গিয়ে একেক সময় মনে হবে এ যেন এক অজানা দেশে এসেছি। বিচিত্র প্রজাতির পাখি দেখবেন এখানে। একঝাঁক বুনোহাঁসও দেখা যেতে পারে একসময়ে।
পাহাড়ের গায়ে হ্রদের তীরে বসে নৈসর্গিক দৃশ্য নয়ন ভরে দেখে নিন। পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত এই শহরের সৌন্দর্য দেখে পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে উপরে উঠতে মন চাইবে। ঝরনার কলকল ধ্বনি আপনার হৃদয়ের সব ক্লান্তি দূর করে দেবে। দূরের পাহাড় দেখে মনে হবে যেন মেঘ। মেঘ-পাহাড়ের দেশ রাঙ্গামাটির সৌন্দর্য দেখে বারবার মোহিত হয়ে পড়বেন। বেড়াতে বেড়াতে একসময় শুনবেন, এই জনপদের মৃত্তিকার রং রক্তিম বা রাঙা আকৃতির বলে মৃত্তিকার সঙ্গে আবহমানকালের আত্মিক সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখতে এই জায়গার নামকরণ করা হয় ‘রাঙ্গামাটি’। সত্যি, রাঙ্গামাটির সোনালি-রূপালি রূপ আপনার মন ও চোখ ভরিয়ে দেবে, তাই রাঙ্গামাটি ছেড়ে ফিরে আসতে মন চাইবে না…।


রাজা জান বখশ খানের রাজপ্রাসাদ, দীঘি ও মসজিদ, রাজা হরিশচন্দ্র রায়ের পাকা বাড়িও ঘুরে দেখুন।
রাঙ্গামাটি যাওয়ার পরিবহন : ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটি যাওয়ার জন্য রয়েছে ডলফিন, এস আলম এবং শ্যামলী পরিবহন। ইচ্ছে করলে হানিফ পরিবহন, গ্রিন লাইন, টোকিও লাইনের যে-কোনো একটি পরিবহনে চট্টগ্রাম গিয়ে এরপরে বাস ধরে রাঙ্গামাটিতে আসুন। চট্টগ্রাম থেকে রাঙ্গামাটি যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে।
অন্যান্য তথ্য : অবারিত সবুজ আর বিশাল পাহাড়ের প্রাচুর্যময় সম্পদের নাম রাঙ্গামাটি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর রাঙ্গা মৃত্তিকার এই জনপদ লোকবসতি তেমন একা ছিল না। খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর বদৌলতে এখানে ক্রমে ক্রমে জনবসতি শুরু হয়। রাঙ্গামাটি জেলার উত্তরে খাগড়াছড়ি জেলা, দক্ষিণে বান্দরবান জেলা, পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা অবস্থিত। রাঙ্গামাটি জেলার আয়তন প্রায় ৬,১১৬ বর্গকিলোমিার। কর্ণফুলী, শঙ্খ, কাচালং, রানখিয়াং নদী বয়ে গেছে এই জেলার অভ্যন্তর দিয়ে।
রাঙ্গামাটি জেলা মোট ১১টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। উপজেলাগুলো হলোÑ রাঙ্গামাটি সদর, বরকল, বাঘাইছড়ি, কাউখালী, জুরাইছড়ি, লংগদু, নানিয়ার চর, বিলইছড়ি, কাপ্তাই, রাজস্থলি আর চন্দ্রঘোনা। আকর্ষণীয় জায়গা হলোÑ সাজেক, কাসালং, মারিশ্যা, বড় হরিণা, রূপাখড়ি, খেদামার, সারে খয়ং, বুড়িঘাট, কমলপতি, বেতবুনিয়া, কাঁকরছড়ি, মোগবন, ছমছমিয়া, আইকাছড়া,ময়দং, বন্দুক ভাঙ্গা ভূসণ ছড়া।

কাসালং
রাঙ্গামাটির আরেক আকর্ষণীয় জায়গার নাম কাসালং। এখানে রয়েছে সারি াসরি বনন উপত্যকা, গিরিচূড়া, হ্রদ, ঝরনা। রাঙ্গামাটি রিজার্ভ বাজার থেকে ট্রলারে করে কাসালং যাওয়া যায়। যাওয়ার পথে দেখা যাবে হাতি-হাতিনীর পাহাড়। কাসালং রিজার্ভ ফরেস্টে বাস করে হাতি, ভল্লুক, শূকর, হরিণ, চিতাবাঘ, সজারু, গয়ালসহ চেনা-অচেনা অসংখ্য বন্যপ্রাণী। বম, মুরং, বনজোগী, খেয়াং উপজাতিরা এই কাসালং-এ বাস করে।
কাসালং-এর একটু পূর্বে সাজেক ভেলি। এখানে লুসাই পাহাড় সন্নিকটে অবস্থিত পাহাড়ি এলাকঅয় বাস করে লুসাই উপজাতিরা।

চোখ জুড়ানো পাহাড়িয়া বরকল
রাঙ্গামাটি থেকে ১৪ মাইল পূর্বে বরকল অবস্থিত। এখানে প্রধানত চাকমাদের বাস। নৈগসির্গক সৌন্দর্যের অপরূপ শোভা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বরকল। এখন উপজেলা শহর এই বরকল। পাহাড়, উপত্যকা, অরণ্য, ঝরনা খানের অন্যতম আকর্ষণ। প্রকৃতির লীলানিকেতন বরকল দেখে অভিভূত হবেন। স্মরণাতীতকাল থেকে এখানের ভৌগেলিক অবস্থান ও পরিবেশ বহির্বিশ্বের মানুষকে কাছে টেনেছে। যারা ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন তাদের কাছে দারুণ পছন্দের জায়গা বরকল। বরকালে পৌঁছানোর পর কমন কেড়ে নেয় এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য। মনে হয় একটুকরো স্বপ্ন। পাহাড়িয়া তরঙ্গভঙ্গ, গাঢ় নীল, ঘন সবুজ আর সুদীর্ঘ জলরাশি দেখে শুধু তাকিয়ে থাকা। বারেবারে দেখেও সৌন্দর্য দেখার সাধ পূরণ হয় না।
এখানের পাহাড়ে উঠে ঘুরে বেড়ানো সে তে দারুণ অভিজ্ঞতা, দারুণ রোমাঞ্চ। নৌকা ভাড়া করে কর্ণফুলী নদীতে বেড়ানোর সময়ে মনে এক আনন্দের শিহরণ জাগিয়ে দেবে। একেক সময় মনে হবে, বরকল সৌন্দর্যে ঝলমল করছে…। নয়নলোভা সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বেড়ানোর মুহূর্তগুলো আপনার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।
ঢাকা থেকে সরাসরি যেকোনো পরিবহনে রাঙ্গামাটি যাবেন। এই রাঙ্গামাটি থেকে লঞ্চে ও ইঞ্জিনচালিত বোটে যাবেন বরকালে। দেখবেন দুই কূলে পাহাড়, অরণ্য। দূরের কালো রঙের পাহাড়গুলো দেখে আরো মুগ্ধ হবেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা বরকলকে বললে হয়তো ভুল বলা হবে না। এ জন্য বরকলকে কেউ কেউ পাহাড়ের রানীও বলে থাকেন। এখানে পাহাড়ের পর পাহাড় চিরকালের আকর্ষণ। সঙ্গে পাহাড়ের বুকে ঢেউখোলানো সবুজ গাছগাছালি, ফলফলাদির বাগান, শাল-সেগুন গাছও রয়েছে। কত বিচিত্র বর্ণের বুনোগাছ আর বনফুলের ছড়াছড়ি। এখানে পাহাড় আর পাহাড়িয়া পথঘাট ঘুটে দেখার সময় চোখের সামনে পড়বে চেনা-অচেনা পাখির ঝাঁক। গাছপালার দিকে তাকিয়ে মনে হবে : আহা, গাছেরও তো আছে ররে বাহার! সবুজ প্রকৃতি আপনার দুচোখ স্নিগ্ধতায় ভরে দেবে। অরণ্য আর পাহাড় দেখেও দেখা শেষ হবে না। কখনোবা দূরের পাহাড়গুলো সাদা মনে হবে, কখনোবা কালো।
কর্ণফুলী নদীতে নৌকা নিয়ে বেড়াতে পারেন। নৌকোতে বসেও দেখবেন পাহাড় আর অরণ্য। এখানের নৌকোগুলো বেশ চমৎকার। সৌভাগ্য হলে নদীতে নৌকোয় বসে অরণ্যের ভল্লুক, হাতি, শূকর, হরিণ, বানর দেখতে পাবেন।
বরকলে বাস করে চাকমা, মগ, কুকী ও টিপরা উপজাতিরা। এদের পাড়াগুলো ঘুরে দেখার সময় অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চার করতে পারেন। জানা হবে দেখা হবে উপজাতিদের জীবনযাত্রা প্রণালী, কৃষিকার্য, খাদ্যদ্রব্য, পোশাক-পরিচ্ছেদ সম্পর্কে। এসব দেখে নতুন এক বৈচিত্র্য খুঁজে পাবেন। নিচ থেকে উপরের তাকান, শুধুই চোখে পড়বে পাহাড়ের গায়ে এক লাইনে সাজানো বাড়িঘর। পাহাড়ের নানা চূড়া সারাদিন দেখা যায় আকাশ পরিষ্কার থাকলে। এখানে দিনভর চলে আকােেশর রং বদলের খেলা।
সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা আরও বেশি আনন্দের। যে কোনো ঋতুতে বরকলের পথঘাট আর চকচকে নীল আকাশে ঝকঝকে বড় বড় পাহাড়ের শোভা উপভোগ করা যাবে। পাহাড়ের দেশ বরকল বেশিদূরে নয়। ঢাকা থেকে মাত্রা ৭ থেকে ৮ ঘণ্টায় এখানে পৌঁছানো যায়। তাই নয়নলোভ বরকলে একটিবারের জন্য হলেও যাবেন কিন্তু।
যেখানে থাকবেন : রাত যাপন করার জন্য বরকল প্রাইভেট হোটেল ও সরকারি গেস্টহাউস রয়েছে।
কাপ্তাই : বিখ্যাত হ্রদ আর অরণ্যঘেরা উচ্চ পাহাড় কাপ্তাইকে দিয়েছে মনমাতানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাইর দূরত্ব ৬৪ কি.মি.। বাংলাদেশের পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্রস্থল এই কাপ্তাইতে। কাপ্তাইতে যাওয়ার জন্য রয়েছে এস আলম পরিবহন।
চন্দ্রঘোনায় রয়েছে কাগজের কল। চট্টগ্রাম থেকে চন্দ্রঘোনারর দূরত্ব ৪৮ কি.মি.। চন্দ্রঘোনা থেকে ৬ মাইল পূর্বে কাপ্তাই লেক। এদেশের সর্ববৃহৎ লেক এটি।

ছবির দেশ বাঘাইছড়ি
পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি বাঘাইছড়িতে গিয়ে দেখবেন সারি সারি বন উপত্যাকার গিরিছড়া হ্রদ আর ঝরনা। যে কোনো ঋতুতে যে কোনো দিনে বাঘাইছড়ির নদীর তীরে দেখবেন বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। ওখানে গেলে উপজাতীয়দের জীবনযাত্রা নিজ চোখে দেখে আসতে পারবেন। এখানে পাহাড়ের পাদদেশে একটি বিকাল কাটিয়ে দিতে পারেন।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটি যাওয়ার জন্য সরাসরি বাস রয়েছে। পরদিন সকালে বাঘাইছড়ির দিকে রওনা করুন। বাঘাইছড়ি যাবে নদীপথে লঞ্চে। লঞ্চ ছাড়ে রাঙ্গামাটির রিজার্ভ বাজার থেকে। সময় লাগে প্রায় ৭ ঘণ্টা। পাহাড়ি নদী হয়ে লঞ্চ যখন বাঘাইছড়ির দিকে যাবে তখন আকাশের গায়ে পাহাড় হেলান দিয়ে রয়েছে এমন অপূর্বৃ দৃশ্য দেখে শুধুই তাকিয়ে থাকবেন। চোক আর মন আনন্দে ভরে যাবে। কখনওবা আপনার মন পুলকিত কিংবা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠবে। মনে হবে এখানের দৃশ্য বুঝি নায়িকা-গায়িকা কানন দেবীর গাওয়া সেই। ‘আকাশের হেলানব দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই/ওই পাহাড়ে ঝরনা আমি…’ গানেরই প্রতিচ্ছবি।
নদীতে বসে পাহাড়ের গায়ে দেখবেন বাড়িঘর। উপজাতি মেয়েরা নদীর তীর হয়ে যখন কলসি নিয়ে ঘাটে আসবে তখন যে শুধুই তাকিয়ে থাকবেন। পায়ে মল বাজার শব্দও কানে এসে বাজবে। তখন মনে হবে, আমরা আসব বলেই ওরা বুঝি মল বাজিয়ে পথ চলে কিংবা কলসি কাঁখে নদীতীরে আসে। যাওয়ার পথে হাতি-হাতিনীল পাহাড়ও দেখতে পাবেন।
যেখানে থাকবেন : বাঘাইছড়িতে সরকারি বিভিন্ন বিভাগের গেস্টহাউস ছাড়াও ডাকবাংলো আছে। থানা শহর বলে এনে গেস্টহাউসে থাকা নিরাপদ ও আরামদায়ক। বনবিভাগের বাংলোতে থাকতে চাইলে ঢাকার মহাখালীর বনবিভাগে আগেভাগে যোগাযোগ করে নিলে ভালো হয়।
যা যা দেখবেন : পড়ন্ত বিকালে বাঘাইছড়ির তীরবর্তী কাসালং নদীর তীরে ঘুরে বেড়ান। একই সঙ্গে নদীতে নৌবিহার করুন। ঘুরেফিরে চারদিকের বনাঞ্চল দেখুন। হয়তোবা চোখে পড়বে দুচারটি বন্যজন্তু। তিন থেকে চার ঘণ্টার জন্য নৌবিহারে ভাড়া লাগবে ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা।
বাঘাইছড়িতে ছোট বড় বেশকটি ঝরনা দেখতে পাবেন। মেঘলা রাতে জোরে বৃষ্টি ঝরলে যেমনি শোনায় ঠিক তেমনি শুনতে পাবেন ঝরনার কলকলধ্বনি শব্দ। পাহাড়ি পথ হয়ে যেদিকে পা বাড়াবেন মাদলের শব্দ হয়তো দুই কানে এসে ঠেকবে। তখন মনে পড়বে শচীন দেব বর্মণের গাওয়া সেই ‘নিটোল পায়ে রিনিক-ঝিনিক পায়েলখানি বাজে/মাদল বাজে সেই সংকেতে শ্যামা মেয়ে নাচে’ গানের কথাগুলো।
বাঘাইছড়ির পাহাড়িয়া সৌন্দর্যে এক এক সময় বিমোহিত হয়ে পড়বেন। এখানের বম, মুরাং, পাংগেনাই, বনজোগী আর খেয়াং উপজাতিদের সঙ্গে মেলামেশা করে ওদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ভালোভাবে জেনে নিন। বমদের ফুলনৃত্য, মুরংদের গো-হত্যা নৃত্যও দেখে নিতে পাবেন। বাঘাইছড়িতে বেড়ানের জন্য পায়ে হাঁটা ছাড়া বিকল্প কিছুই নেই। নদীতে বেড়ানোর জন্য নৌকা আছে। যেভাবেই বেড়ান না কেন, এখানকার সৌন্দর্য আপনার মন স্পর্শ করে দিয়ে যাবে।… বসে দেখবেন দুকূলের নয়নলোভা দৃশ্য। পরিষ্কার আবহাওয়ায় দেখা যায় দূরের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের রানী লুসাই পাহাড়কে। বাঘাইছড়ি যে কদিন থাকবেন, প্রতিদিনই এই জায়গাকে মনে হবে এ যেন একখানা ছবির দেশ।
হোটেলের খোঁজখবর : রাঙ্গামাটিতে রাত যাপন করার জন্য রয়েছে পর্যটনের মোটেল। এছাড়া হোটেল আনিকা, হোটেল জেরিন, মধুমতি, গোলডেন হিল, বনফুল, সুফিয়া, ডিগনেটি, শাপলা, সৈকত প্রভৃতি।