ঘুরে আসুন গারো পাহাড়ের পাদদেশের নয়নলোভা শেরপুর

32
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত শেরপুর। এর উত্তরে রয়েছে বন-বনানী, পাহাড় আর অরণ্য। নয়নলোভা সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায় শেরপুরে গেলে। এখানের শ্রীবর্দী, ঝিনাইগাতি, নালিতাবাড়ি, গড়জরিপা এবং নলকার যেখানে যান না কেন, শুধু তাকিয়ে থাকা। এক সময় প্রকৃতির সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে পড়বেন। গাজী বংশের শেষ জমিদার শের আলীর নামে ‘শেরপুর’ নাম হয়েছে। গড়জরিপা এ সময়ে শেরপুরের একটি গ্রাম। একসময়ে এই গড়জরিপা ছিল শেরপুর অঞ্চলের শাসনকেন্দ্রÑরাজধানী। তখন বলা হতো গড়দলিফা। গড়দলিফা সম্পর্কে একটি প্রবাদ আছে। হুমায়ূন শাহ আমীর হোসেন সৈন্যসামন্ত এবং কুলিসহ গড়দলিফার প্রবেশ করে দেখেন জরিপ নামক একজন দরবেশ অর্ধাঙ্গ মাটিতে পুঁতে অবস্থান করছেন। তিনি তাঁর কাছে উপস্থিত হলে দরবেশ বললেন : কিছুতেই এ স্থান ত্যাগ করব না। শর্ত দিলেন ” এ স্থান ত্যাগ করলে এ স্থানে একটি গড় নির্মাণ করে আমার নামানুসারে যেন তা রাখা হয়। পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারে গড়জরিপা হয়।


হুমায়ূন শাহ চতুর্দশ শতাব্দীতে গড়জরিপার পথচারীদের জানমাল পাহাড়িয়া দস্যু-তস্করের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একটি বিরাট দুর্গ নির্মাণ করেন। এগারো শত একর জমির উপর এই দুর্গ নির্মাণ হয়েছিল। আজ তা হারিয়ে গেছে। এখন দেখবেন শুধুই শস্যক্ষেত। সর্বত্রই যেন সবুজ-শ্যামল রূপ। শুনবেন কত-না পাখির ডাক।
গড়জরিপার পানদুয়ারীর কাছেই হুমায়ূন শাহ আমীর হোসেনের কবর অবস্থিত। এটি ঘুরে দেখবার পরে কাদির পীরের দরগাহ দেখুন। এই দরগাতে একটি প্রাচীন মসজিদ আছে। গড়জরিপার বারদুয়ারী মসজিদ একটি প্রাচীন প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন। এর কারুকার্য দেখে শুধু তাকিয়ে থাকবেন।
মেরপুরের আরেক আকর্ষণ গাজীর খামার। গাজীর খামারে শেরআলী গাজীর খামারবাড়ি ছিল, তাই এলাকার নাম গাজীর খামার বলে প্রচলিত। শেরআলী গাজী পীড়াগ্রস্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর কবরস্থানটি গাজীর মাজার বা গাজীর দরগা বলে পরিচিত। মজার দেখার পরে লম্বা পুকুরটির কাছে আসুন। এর চারদিকে এখন গাছপালা। একেক সময় নির্জন মনে হয় এখানে এলে। বিংবদন্তি আছে, লোকেরা শিরনি দিতে এসে পাকাঘাটে গেলেই পানির ভেতর থেকে স্বর্ণের ডেগ, হাঁড়ি, পাতিল ও চামচ ঘাটে আসতে দেখত। সেগুলোতে রান্না করা হতো। শিরনি দেয়া শেষে হলেই সেগুলো ঘাটে নিয়ে পরিষ্কার করে পানিতে রাখলেই আস্তে আস্তে পানিতে ডুবে যেত।
এবার ঘুরে দেখুন প্রাচীন কারুকার্যে খচিত নয়ানি জমিদারের কীর্তি। শহরের পশ্চিমে গিয়ে হযরত শাহ কামাল (রহ.)-এর মাজার দেখুন। এখানের পৌরসভা ভবন, নাট্যশালাও বেশ আকর্ষণীয়। এখানের ঘাগরা লস্কর, সন্ধ্যা, কুড়া ও গাজনী এখনও প্রাচীন স্মৃতি বহন করছে। এককালে ঘাগরা পরিহিতা বিদেশী মেয়েলোকেরা এখানে বসবাস করতেন বলে এই এলাকার নাম ঘাগরা হয়েছে।
শেরপুরের নালিতাবাড়ি ও ঝিনাইগাতি আকর্ষণীয় জায়গা নালিতা বা নাইলতা শব্দ থেকেই নালিতাবাড়ি শব্দটির উদ্ভব। শস্যভা-ার বলে খ্যাত নালিতাবাড়িতে দেখনে শাল-গজারির ছড়াছড়ি। এখানের বাঁশ-বেতের প্রাচুর্য বনজসম্পদের ভা-ারকে করেছে সমৃদ্ধশালী।
শেরপুরের উত্তরে ঝিনাইগাতি। এ অঞ্চল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। ঝিনাইগাতির সংলগ্নেই গারো পাহাড়। এ এলাকা বনজসম্পদে ভরপুর। গজনীতে ‘অবকাশ’ নামে একটি পর্যটনকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছৈ। এখানে রাত কাটাতে পারেন।
শেরপুর অঞ্চলে ইংরেজ ও জমিদারদের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রয়েছে অনেক বিপ্লব ও বিদ্রোহের কাহিনী। তন্মধ্যে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহ, হাজং বিদ্রোহের কথা উল্লেখযোগ্য। টিপু শাহ একসময়ে এখানে প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করেন। টিপু শাহকে অনেকে টিপু পাগল বলতেন। তাঁর অলৌকিক শক্তি সম্পর্কে কিংবদন্তি রয়েছে। ১৮৫৯ সালে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন এবং এক রাজনীতে মারা যান। টিপু মাহের বংশধরগণ আজও শেরপুর অঞ্চলে বসবাস করছেন।
শেরপুরের যেদিকে যাবেন খুঁজে পাবেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এখানের হিজল, তমাল আর মাল-গজারির প্রচ্ছন্ন ছায়ায় ঘুরে বেড়াতে মন চাইবে। নকলা আর শ্রীবর্দীতেও যাবেন। নকলাকে বলা হয় ধানের গোলা। ব্রহ্মপুত্র, বানেশ্বর, কড়িয়া, কালা গাং, দশানি নদ-নদী-বিধৌত নকলা জনপদে গিয়ে দেখবেন শুধুই ফসলের ক্ষেত। সবকিছুই এখানকার নয়নলোভা, তাই শেরপুরের মোহে মুগ্ধ হয়ে পড়বেন।
শেরপুরের সর্বত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য খ্যাত। পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাও ব্যাপক। তাই শেরপুরের নালিতাবাড়ি ও ঝিনাইগাতিতে হোটেল মোটেল স্থাপিত হলে ভ্রমণকারীদের সংখ্যা বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে এখানে সিরামিক ও কাচ ফ্যাক্টরি গড়ে তোলাও সম্ভব। শেরপুর বেড়ানোর স্মৃতি কখনো মন থেে সরে যাবে না, খুবই আকর্ষণীয় বলে শেরপুরের কথা বারবার মনে পড়বে।
একনজরে শেরপুর জেলা : এখানের গারো পাহাড়ের পাদদেশে ঝিনাইগাতি উপজেলাধীন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‘গজনী অবকাশ’ পর্যটনকেন্দ্র ও আকর্ষণীয় পিকনিক স্পট। গড়জরিপার ঐতিহাসিক দুর্গপ্রাচীন ও বারদুয়ারি মসজিদ দেখার মতো। শেরপুরের গাজীর খামার গ্রামে শেরআলী গাজীর মাজার। শহরের সামান্য পশ্চিমে শাহ কামালের মাজার। নালিতাবাড়ির সন্ন্যাসীভিটাও দেখার মতো। শেরপুরের আদি নাম ‘দশকাহনীয়া বাজু’। প্রাচীনকালে এই অঞ্চল ছির কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত। কোচ-ারাজার রাজধানী ছিল গড়জরিপায়। গড়জরিপা গ্রামে এখনও দলিপ সামন্তের রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। ১৯২১ সালের খেলাফত আন্দোলন, ১৯৩০ সালের অসহযোগ আন্দোলন এবং পরবর্তীতে বর্গাচাষিদের তেভাজা আন্দোলনে এ অঞ্চলেরর স্বাধীনচেতা মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব বাংলার ইতহাসকে উজ্জ্বল করেছে।১৯৪৩ সালে শেরপুরের নালিতাবাড়িতে তিনদিনব্যাপী ঐতিহাসিক ষষ্ঠ প্রাদেশিক কৃষক-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের পর কৃষক-বিদ্রোহ আরো জঙ্গিরূপ ধারণ করে। এসব বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন শেরপুরের বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা রবি নিয়োগী ও তার স্ত্রী জ্যোৎস্না নিয়োগী, নালিতাবাড়ির জলধর চন্দ্র পাল ও শচী রায়। বিদ্রোহিরা এলাকায় গণবাহিনী গড়ে তোরৈন এবং নালিতাবাড়ির পাহাড়ে অস্ত্রাগার তৈরি করেন।
শেরপুর একটি অতি প্রাচীন শহর বলে সমাদৃত। ১৮৮৫ সালের দিকে শেরপুরে ডাক এবং টেলিগ্রাফের ব্যবস্থা করা হয়।
বিভিন্ন তথ্য : বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে অরণ্যবাহী ব্রহ্মপুত্র আর পাহাড়ি নদী ভোগাই, চেল্লখালী, সোমেশ্বরী বিধৌত সমৃদ্ধ জনপদ শেরপুর। এর উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে জামালপুর জেলা, এরই পশ্চিমে যমুনা নদী প্রবাহমান। শেরপুর জেলা ৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিতÑ শেরপুর, সদর, নকলা, নালিতাবাড়ি, ঝিনাইগাতি, শ্রীবর্দী। এই জেলার আয়তন প্রায় ১,৩৬৪ বর্গকিলোমিটার। উল্লেখযোগ্য জায়গা হলোÑ গজনী, গৌরীপুর, নলকুরা, ধনসাইলশ, কংসা, রানী শিমুল, তাঁতিহাট, কালিকাকুরা, রামচন্দ্রকুরা, পোরগাঁও, রূপনারায়ণ।
শেরপুর পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নয়ানি জমিদার হরচন্দ্র চৌধুরী। তিনি সংস্কৃত, বাংলা, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় সুপ-িত ছিলেন। এখানের সর্বপ্রথম অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট রায় বাহাদুর প্যারিমোহন চৌধুরী। প্রথম মনুসেফ প্রতাপ নারায়ণ চৌধুরী।
এখানে দর্শনীয় স্থান হলোÑ দরবেশ জরিপ শাহের মাজার, বারদুয়ারী মসজিদ, কাদির পীরের দরগাহ, শের আলী গাজীল মাজার, নয়ানি জমিদারবাড়ি, ঘাঘরলস্কার বাড়ি, পৌনে তিন আনি জমিদারবাড়ি।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে শেরপুর যাওয়ার জন্য সড়কপথে বাস রয়েছে। বাস ছাড়ে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে। সময় লাগে ৫ ঘণ্টা।
যেখানে থাকবেন : রাত যাপন করার জন্য শেরপুরে রয়েছে কাকলি গেস্টহাউজ, সম্পদ হোটেল, হোটেল আরাফাত, রাহাত গেস্টহাউজ, তাজমহল রেস্টহাউজ, বর্ণালী গেস্টহাউজ।