ঘুরে আসুন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন রংপুর তাজহাট জমিদার বাড়ি

57
Social Share

রংপুর মহানগরীর পূর্ব দক্ষিণে অবস্থিত তাজহাট জমিদার বাড়ি। মূল মহানগরী থেকে তাজহাটের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। ইতিহাস আর ঐতিহ্যে ঘেরা তাজহাটে রয়েছে প্রাচীন সব নিদর্শন আর পোড়া মাটির ফলক। রয়েছে তত্কালীন রাজা জমিদারদের ব্যবহূত তলোয়ার, বল্লমসহ সম্মুখ যুদ্ধে ব্যবহৃত নানা সরঞ্জামাদি। জাদুঘরে আছে প্রাচীন দ্রুপদী মূর্তি।

জানা গেছে, জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা মান্না লাল রায় পাঞ্জাব থেকে রংপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। রংপুরের মাহিগঞ্জে তিনিই প্রথম স্বর্ণের তৈরি আকর্ষণীয় তাজ বা রত্নখচিত মুকুট তৈরি ও ক্রয়-বিক্রয়ের প্রচলন শুরু করেন। ধারণা করা হয়, এ ঘটনা থেকেই এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় তাজহাট। মতান্তরে ১৯০৮ সালে জমিদার বংশের রাজা কুমার গোপাল লাল রায় জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেন। জমিদার বাড়ির বাহ্যিক আকর্ষণ সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত প্রাসাদ। পূর্বমুখী দোতলা প্রাসাদটির দৈর্ঘ্য ৭৬.২০ মিটার। সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি প্রাসাদটি ১৫.২৪ মিটার প্রশস্ত। প্রাসাদের কেন্দ্রীয় সিঁড়িটি ওপরের তলা পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রাসাদের মাঝামাঝি আছে একটি বড় গম্বুজ। পূর্বে প্রাসাদের সিঁড়ির উভয় পাশে দোতলা পর্যন্ত ইটালীয় মার্বেল পাথরের দ্রুপদী রোমান দেবদেবীর মূর্তি দ্বারা সজ্জিত ছিল। বর্তমানে সেসব দ্রুপদী মূর্তি প্রাসাদের ভেতরের জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে এবং সিঁড়ির উভয় পাশে নতুনভাবে সংস্কার করা হয়েছে।

প্রাসাদের সম্মুখ ভাগে দ-প্রান্ত বিশিষ্ট আটকানো বারান্দা এবং মধ্যভাগে ৯.১৪ মিটারের একটি বারান্দা আছে। বারান্দাগুলোর ওপরে আছে চারটি স্তম্ভ, যার ওপরে রয়েছে দুটি ত্রিকোনাকৃতি কক্ষ। ওপর থেকে দেখলে প্রাসাদটিকে অনেকটা ইংরেজি বর্ণ ‘ইউ’র মতো দেখায়। প্রাসাদটির নিচতলায় রয়েছে দরবার হল ঘর। প্রাসাদের ভেতরের পুরো ভাগে আছে ৩ মিটার প্রশস্ত বারান্দা। এছাড়াও ওপরের তলায় ওঠার জন্য দুটি কাঠের তৈরি সিঁড়িও আছে। এ প্রাসাদে ছোট বড় মোট ২২টি কক্ষ আছে। এছাড়াও জাদুঘরে রয়েছে বিংশ শতাব্দীর পুরোনো সংস্কৃত ভাষায় লেখা কিছু পাণ্ডুলিপি। আরো রয়েছে, তত্কালীন সময়ের পিতল ও কাঁসার তৈরি জিনিসপত্র। আছে জমিদার বংশের রাজা রতন লাল, গিরিধারী লাল, উপেন্দ্রলাল এবং মহারাজা গোপাল রায়ের ঐতিহাসিক কাহিনির পাণ্ডুলিপি। পাহারাদারদের মতো দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছ, পুকুর এবং নানা ধরনের ফুলের বাগান প্রাসাদের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রাসাদটি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রাসাদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করলে সে সময় থেকে প্রাসাদটি রক্ষণের কাজ শুরু হয়। ২০০২ সালে প্রাসাদের কিছু অংশে জাদুঘর তৈরির প্রস্তাবনা পাশ হয় এবং ২০০৫ সালে তা বাস্তবায়ন করা হয়।

রংপুর কারমাইকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ইতিহাসবিদ জাকির হোসেন বলেন, ‘তাজহাট জমিদার বাড়ি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন।’ ইতিহাসবিদ ডাক্তার মতিউর রহমান বসনিয়া বলেন, ‘প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে পুকুর, বাগান, প্রাসাদ পর্যন্ত জমিদার বাড়ির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন আবহ আর ইতিহাসের ছোঁয়া।’

তাজহাট জমিদার বাড়ির কাস্টডিয়ান হাসিবুল হাসান সুমি বলেন, ‘প্রত্নঅধিদপ্তরের অধীনে তাজহাট জমিদার বাড়ি। বর্তমানে ১৩ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি। সোমবার আধাবেলা খোলা থাকে।’ তিনি আরো বলেন, ‘শিশু-কিশোর ও তরুণরা ইতিহাস জানতে এখানে আসতে পারেন।’ রংপুরের জেলা প্রশাসক মো. আসিব আহসান বলেন, ‘তাজহাট জমিদার বাড়ি প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের অধীনে আছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে এটাকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। তাহলে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে এটি ইতিহাসের স্মারক হিসেবে অম্লান হয়ে থাকবে।’