ঘুরে আনুন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খাগড়াছড়ি

24
Social Share

লিয়াকত হোসেন খান: পাহাড়ে বেড়াতে যাবার মধ্যে একটা অন্যরকম রোমাঞ্চ রয়েছে। পাহাড়-অরণ্য প্রায় ঘিরে রয়েছে খাগড়াছড়িতে। এখানে চারদিকে সবুজের সমারোহ। গাছে গাছে পাতায় পাতায় আলোছায়ার অসংখ্য গলিঘুঁজি। নিচে তারই জটিল নকশা। বর্ষা আর শরতে এখানে প্রকৃতি নবসাজে সজ্জিত হয়ে ওঠে। সর্বত্রই মনমাতানো রূপ। পাহাড়-অরণ্য ঘুরে দেখার সময় চোখে পড়বে এখানে গাছের ডালে বাসা বেঁধেছে জানা-অজানা বহুরকমের পাখি। তাদের কিচিরমিচিরে সারাদিন মুখরিত হয়ে থাকে খাগড়াছড়ির পাহাড়-অরণ্য। এখানে একবার গেলে পাহাড়, অরণ্য, ঝরনার কথা মন থেকে সরে যায় না।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর দুর্গম পাহাড় ঘেরা খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা। সর্বত্রই নৈসর্গিক দৃশ্য। এখানে গিয়ে যেদিকে তাকাবেন, মনে হবে কোনো নিপুণ শিল্পী যেন তাঁর তুলির স্পর্শে এ শহরের ছবি এঁকেছেন। জেলা প্রধান কার্যালয়টি অসংখ্য খাগড়াগাছে পরিপূর্ণ চেঙ্গি নদীর তারে আর ছড়ার তীরে ছিল। এই খাগড়াগাছের নাম থেকে খাগড়া আর ছড়ার থেকে ছড়ি যুক্ত হয়ে খাগড়াছড়ি নামকরণ হয়েছে।
খাগড়াছড়ি জেলার উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি জেলা, পূর্বে রাঙ্গামাটি জেলা এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। খাগড়াছড়ি জেলার অভ্যন্তর থেকে বয়ে গেছে চেঙ্গি আর কর্ণফুলী নদী। নদীতে নৌকা নিয়ে নৌবিহার করা যায়। নৌকায় বসে দু-কূলের পাহাড়-অরণ্য দেখায় আলাদা আনন্দ রয়েছে।
ঢাকা থেকে সড়কপথে ফেনী, রামগড় হয়ে খাগড়াছড়ি যাওয়া যায়। ৬ ঘণ্টার মতো সময় লাগে জেলাশহর খাগড়াছড়িতে পৌঁছতে। এখানে নেমে প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হবেন। পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত এই শহরের সৌন্দর্য দেখে পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে উপরে উঠতে মন চাইবে। রাত যাপন করার জন্য খাগড়াছড়িতে বেশ কয়েকটি হোটেলও রয়েছে।
খাগড়াছড়ি শহর পাহাড়ের গায়ে। এখানে চারদিক জুড়ে পাহাড়-অরণ্য। যেদিকে তাকাবেন মনে হবে সবই ভারি মনোরম। সর্বত্রই নির্জন অরণ্য। টিপরা, চাকমা, মগ, কুকী, নেপালী উপজাতি রয়েছে খাগড়াছড়িতে। এখানে সুনীল সবুজ পাহাড়ের শীর্ষে উঠে দাঁড়ালে দেখা যাবে সুদূরের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য ও উল্লাসে ভরপুর গোটা খাগড়াছড়ি।
পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের অট্টহাসিতে ভরপুর খাগড়াছড়ি। এখানে দেখবেন পাহাড়ের গায়ে গায়ে উপজাতিদের বাড়িঘর। আবহাওয়া ভালো থাকলে দেখা যায় আসাম উপত্যকার লুসাই পাহাড়। খাগড়াছড়িতে যদি প্রথম যান তাহলে মনে করবেন, এ যেন কোনো এক পাশ্চাত্য দেশের শহর।
ঝরনা আছে খাগড়াছড়ির পাহাড়-অরণ্যে। ঝরণার কলকল ধ্বনি আপনার হৃদয়ের সব ক্লান্তি দূর করে দেবে। দূরের পাহাড় দেখে মনে হবে যেন মেঘ।
চট্টগ্রাম শহরের অক্সিজেনের মোড় থেকে খাগড়াছড়ি যাওয়ার বাস রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি সড়কপথে দূরত্ব ১১২ কিলোমিটার। হাটহাজারি রোড ধরে বাস এঁকেবেঁকে চৌধুরীহাট, মির্জাপুর, কাঠির হাট, বিবির হাট, ফটিকছড়ি, মানিকছড়ি, হাতিমুড়া, জেলিয়াপাড়া, মাটিরাঙ্গা, আলুটিলা পেরিয়ে খাগড়াছড়ি গিয়ে পৌঁছায়। মাটিরাঙ্গা থেকে খাগড়াছড়ির দূরত্ব ১৯ কিলোমিটার এবং পুরো পথটিই অসংখ্য টিলা আর পাহাড়ের বাধাকে অতিক্রম করে তৈরি করা হয়েছে। মাটির রং এখানে গৈরিক। মাটিরাঙ্গা থেকে ১২ কিলোমিটার পরে আলুটিলা। আলুটিলার পরেই রাস্তা চালু হয়ে মেনে গেছে এক বিস্তৃত সমতলভূমিতে। এরই ওপরে খাগড়াছড়ি জনপদ।
খাগড়াছড়ি শহরে প্রবেশ করার মুখেই রয়েছে দীর্ঘ এক প্রাচীন লোহার ব্রিজ। সেতুটি তৈরি হয়েছে চেঙ্গি নদীর ওপর। ব্রিজে ওঠার আগে পর্যটন মেটেল খাগড়াছড়ি।
এখানের উপজাতিরা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী উপজাতিরা এখনও জুম চাষ করে এবং বাস করে বাঁশের তৈরি মাচাং ঘরে। ভাত, মাছ, পশুপাখির মাংস, শুঁটকি আর ব্যাঙ এদের প্রধান খাদ্য। নিজেদের বাড়িতে তৈরি পানীয় হানজি এবং জংরা এদের যে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে অবাধে ব্যবহৃত হয়।
খাগড়াছড়ির চাকমাদের প্রধান উৎসব হল ‘বিজু’। এই একদিনের উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় চৈত্রমাসের পেশদিনে। এদের বাঁশনৃত্য দেখার মতো।
খাগড়াছড়ির উল্লেখযোগ্য জায়গা হল পাংখাইয়া পাড়া, কলোডেরা, মিলনপুর, এবং মধুপুর বাজার। মধুপুর বাজার এলাকাটি মারমা উপজাতি অধ্যুষিত। এখানে প্রতিদিন হাট বাসে। ক্রেতা এবং বিক্রেতা সবার চেহারাতেই হালকা মঙ্গোলীয় প্রভাব।
খাগড়াছড়িতে নিউজিল্যান্ড নামে একটা এলাকা আছে। খাগড়াছড়ি শহরের বাইরে এক বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে বলা হয় নিউজিল্যান্ড। এখানে বিস্তৃত আবাদি জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কয়েকটি টিলা আর কিছু তালগাছ।
রাঙামাটি থেকেও খাগড়াছড়ি সরাসরি বাসে আসা যায়। এই পাহাড়ি পথটি একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা তেমনই বিপদসংকুল।
খাগড়াছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে ধর্মপুরের আর্য বনবিহার বৌদ্ধমন্দিরের দূরত্ব ৩ কিলোমিটার। এখানে মন্দির এবং মঠ গড়ে উঠেছে একটি টিলাকে কেন্দ্র করে। বড় আকারের মূর্তি ছাড়াও বুদ্ধদেবের একটি প্রতিকৃতিও পূজিত হচ্ছে এখানে। এই প্রতিকৃতিতে কু-লী পাকানো এক বিশাল নাগ বক্ষে ধারণ করে ফণা বিস্তার করে আগলে রেখেছে।
খাগড়াছড়ির আলুটিলার অবস্থান জঙ্গলাকীর্ণ এক পাহাড়ি বাঁকে। টিকিট কিনে এখানে ঢুকতে হয়। দীর্ঘ প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতে হলে মশাল জ্বালাতে হবে।
উপজাতীয় এলাকায় গেলে উপজাতিদের দেখতে পাবেন। নাচ-গান এখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। দেখবেন এখানের পুরুষরা একচিলতে কাপড় পরে, ইচ্ছে করলে গায়ে জামা দেয় নচেৎ না। মেয়েরা একচিলতে কাপড় পরে। গায়ে ব্লাউজ দেয়। দেখবেন, পাহাড়ের গায়ে ঘর বানিয়ে বাস করে উপজাতিরা। বেশিরভাগ ঘর বাঁশ দ্বারা তৈরি। ঘরের ছাউনি উলুখড় দিয়ে তৈরি।
জুম চাষ করে এদের বেশিরভাগ লোক সংসার চালায়। মাঘ-ফাল্গুন মাসে পাহাড়ের ঢালে সুবিধামতো স্থান নির্বাচন করে। তারপর বাঁশ, ছোট ছোট গাছ আর বড় বড় গাছের ডাল কেটে রোদে শুকায়। বৈশাখের শুরুতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে এগুলো।
বৈশাখের শেষে ধান, তুলা, ডাল, তরমুজসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ রোপণ করে। ভাদ্র মাসের শুরু থেকে ফসল তোলার কাজ শুরু হয়। পাহাড় ঘুরে ঘুরে দেখার সময় উপজাতিদের ফসল তুলতেও দেখবেন। আরও ঘুরে দেখুন দেড় হাজার ফুট পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মাইমছরি দেবতার পুকুর, রিছং ঝরনা, প্রাচীন বৌদ্ধবিহার।
খাগড়াছড়ির বনাঞ্চলে দেখবেন সেগুন, গর্জন, জারুল, গামারী, চাপালিশ, তেলসুর, কড়ই এবং আরো নানান জাতের গাছ। এগুলো সংগ্রহ করে এনে অনেকে বাড়ি নির্মাণের কাজে ব্যবহার করে আসছে বংশপরম্পরায়। ধান, সরিষা, তুলা, আদা, হলুদ এখানে প্রচুর পরিমাণে জন্মে। প্রধান ফল হল-আনারস, কাঁঠাল আর কলা। বারো মাস পাওয়া যায় নানান জাতের কলা। খেতে সুস্বাদু, দামেও সস্তা।

খাগড়াছড়ি থেকে মানিকছড়িতে যাবেন সড়কপথে বাসে। মংদের প্রধান কেন্দ্রস্থল হল এই মানিকছড়ি। মং রাজার বাস এখানেই। মানিকছড়িতে রয়েছে একটি ছড়ি অর্থাৎ নালা। শুনবেন, একদা এখানে প্রচুর মানিক পাওয়া গিয়েছিল বলে পরবর্তীতে এর নাম হয় মানিকছড়ি। এখানের রাজবাড়িটি ঘুরে ঘুরে দেখুন। হাতির দাঁত দ্বারা তৈরি একটি খাট দেখবেন রাজবাড়িতে। আরো রয়েছে পাহাড়ি এলাকার আকর্ষণীয় দৃশ্য। উৎসবের সময় উপজাতি পুরুষ, মহিলারা কর দেয়ার জন্য পাহাড়ি পথ ধরে আসে রাজদরবারে। নাচ-গানসহ কত কীসব আনন্দ ফূর্তি। আপনার হৃদয় কেড়ে নেবে নৃত্যগীত।
খাগড়াছড়ি থেকে গুইমারা যাবেন সড়কপথে বাসে। গুইমারার অরণ্য, বিল, পাহাড় দেখার মতো। এখানে সর্বত্রই নৈসর্গিক দৃশ্য। এখানের বনাঞ্চলে বাস করে বাঘ, হরিণ, শূকর, ভল্লুক, হাতিসহ বিভিন্ন জাতের বন্যপ্রাণী।
খাগড়াছড়ির যেদিকে যাবেন সেদিকেই পাহাড়, ঝরনা, অরণ্য এসব দেখে দেখে মুগ্ধ হওয়া। আর এজন্যই খাগড়াছড়ি ছেড়ে আসতে মন চাইবে না। পাহাড়, অরণ্যের দৃশ্য দেখার কথা তাই বহুদিন মনে থাকবে। খাগড়াছড়ি গেলে ঠিক এমনটিই হয়।
রামগড় : খাগড়াছড়ি থেকে সড়কপথে রামগড় আসুন। রামগড়ে আবাসিক হোটেল রয়েছে। রামগড় বাজারের সংলগ্নে ফেনী নদী। ওপারে ত্রিপুরা রাজ্য। টিপরা, চাকমা, মগ, কুকী, নেপালী উপজাতি রয়েছে রামগড়ে। রামগড় একসময় মহকুমা শহর ছিল। এখন উপজেলা। ১৯২০ সালে বাঘাইছড়ি, মহালছড়ি, দীঘিনালা ও রামগড় নিয়ে গঠিত হয় বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার দ্বিতীয় মহকুমা এই রামগড়। ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি রামগড় মহকুমা সদর দফতর রামগড় থেকে খাগড়াছড়িতে স্থানান্তরিত হয়।
দীঘিনালা : পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত দীঘিনালা শহর খুবই আকর্ষণীয়। এখানে যাবেন সড়কপথে বাসে কিংবা জিপগাড়িতে। খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা যেতে ৩০ মিনিট সময় লাগে। রাত যাপন করার জন্য আবাসিক হোটেল রয়েছে। এখানে দেখবেন পাহাড়, অরণ্য ও ঝরনা।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য জায়গা : খাগড়াছড়ির লোগাং, পানছড়ি, তবলছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি, মহালছড়ি, মাইজছড়ি, ভাইবোনছড়া, বেলছড়ি, ছোট তামেরং প্রভৃতি জায়গাও আকর্ষণীয়। এর যেদিকে যাবেন শুধুই নয়নলোভা দৃশ্য। বড় বৌদ্ধমূর্তি খ্যাত পানছড়ির শান্তিপুর অরণ্য কুটিরেও যাবেন। খাগড়াছড়ি থেকে বাসে পানছড়ি যেতে ৪০ মিনিট সময় লাগবে। খাগড়াছড়ি জেলা মোট ৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। উপজেলাগুলো হল খাগড়াছড়ি সদর, মহালছড়ি, মানিকছড়ি, পানছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি, দীঘিনালা, মাটিরাঙা ও রামগড়। এ জেলার আয়তন প্রায় ২,৭০০ বর্গকিলোমিটার।


খাগড়াছড়িতে যেখানে থাকবেন : রাত যাপন করার জন্য খাগড়াছড়ির প্রধান বাজারে রয়েছে হোটেল মাসুদ। এখানে ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকার মধ্যে রুম রয়েছে। আদালত রোডে চৌধুরী বোর্ডিং, খাগড়াছড়ি বাজারে সম্প্রীতি হোটেল এবং কোর্ট রোডে রয়েছে শিল্পী বোর্ডিং। হোটেল থ্রি-স্টার নারায়ণ রোডে অবস্থিত। এছাড়া পর্যটনের মোটেলও রয়েছে।
যেভাবে যাবেন : খাগড়াছড়ি যাওয়ার জন্য এস আলম পরিবহন, শান্তি এবং সৌদিয়া পরিবহনকে বেছে নিতে পারেন। বাস ছাড়ে কমলাপুর থেকে। ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির দূরত্ব ২৬৬ কিলোমিটার।