স্মৃতি: গ্রামের পরিবেশে ঘুরে আসা

81
Social Share

ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপাড়ে চর পক্ষীমারি আমার দাদার বাড়ি।ভাবী বলল নদীর উপর ব্রিজ হয়েছে চল যাই ঘুরে আসি। সঙ্গে সঙ্গে রাজী।পিচ ঢালা পথ বেয়ে গাড়ী চলছে ভেতরে ভেতরে আমি ভীষণ উৎফুল্ল , চাপা উত্তেজনা।

ব্রিজের নীচে নদীর জায়গায় রাস্তা । নদীটা শুকিয়ে মরে কাঠ হয়ে গেছে । আমার শেষ স্মৃতিতেও নৌকায় চড়ে নদী পার হওয়া আর পুরো সময়টা জুড়ে স্বচ্ছ পানিতে হাত ভিজিয়ে অস্তিত্ব অনুভব করা। বৈঠার সলাথ সলাথ আওয়াজের সাথে দূর দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া।

আমতলীর সামনের বড় আমগাছটা নেই। এই আমগাছের সামনে থেকেই আগে বাসে চরতে হত। সেখানে সাইনবোর্ডে লেখা চর পক্ষীমারী। এবড়ো থেবড়ো রাস্তার বদলে পাকা রাস্তা। কত শত বার আমি এই পথ দিয়ে হেঁটে কখনোবা দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি গেছি।পথে পরিচিত সবাই জিজ্ঞেস করতো কেমন আছ ?

না আজ কেউ জিজ্ঞেস করলো না। গ্রামটা বদলে গেছে। পথের ধারের গাছগুলোও আজ নেই। চিনতে না পেরে বাড়ি থেকে সামনে এগিয়ে বললাম গাড়ী থামাও। এখানেই তো আমার বাড়ি হওয়ার কথা ছিল। গুনে গুনে হিসেব কষে ঠিক তিনটি বাড়ির পেছনে আমার বাড়ি। কিন্তু একি এতো বড় দহল(বাড়ির বাইরের মাঠ) কই গেলো ? দহলের পাশে আড়া’র (জঙ্গল) মাঝ দিয়ে যে সরু পথ সেই পথে কত না জংলী ফুল ফুটে থাকতো। সোনালু (স্বর্ণালি) ফুলে ফুলে পুরো রাস্তা হলুদে ছেয়ে থাকতো। আড়া র পথ পেরিয়ে সামনে মরিচের টাল(ফসলের ক্ষেত)।

একপাশের ছনের গোয়াল ঘর আর গরুর ভুসি খাওয়ার চাড়িটিও নেই।

উঠোনে লম্বা ঘোমটা পরা আমার জেঠিমা এক পাশে উনুনে এলোকেশী পিঠা ভাজছে আর আমি চাতক পাখীর মত তাকিয়ে আছি। পাশের ঘরের সিরিতে লম্বা চুল ছেড়ে শিরি ফুপু বসে।আর ওর পিঠাপিঠি দুই ছেলে জোর করে মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছে।আরেক ঘরের বারান্দায় বসে সাদা শাড়ি পরা আমার নুন্নু (দাদী) শব্দ করে পা ন ছেঁচছে। আমি পিঠা খাওয়ার পর একটু ছেঁচা পানও মুখে পুড়বো ।

জেঠিমার ঘরের দেওয়ালে টাঙ্গানো সূচি শিল্পে লিখা ”জাতের মেয়ে কালোও ভালো নদীর জল ঘোলাও ভালো”, আরেকটি সবুজ টিয়া পাখীর নীচে লিখা ”যাও পাখী বল তাঁরে সে যেন ভুলে না মোরে।”

উঠোনের অপর প্রান্তে বিশাল কুয়া থেকে পানি তুলে বেদানা আপা গায়ে ঝপ ঝপ পানি ঢালছে আর কসকো সাবান মাখছে । আমার থেকে প্রায় ১০ বছরের বড় বেদানা আপার গায়ের রঙ পরিষ্কার।আমি ওর দেখাদেখি বার বার সাবান মাখি ও’ দুবার সাবান দিয়েছে আমি চারবার লাগাই। আমার ওর মত ফর্সা হওয়া প্রয়োজন।

একটুপর শব্দ করে কাশি দিয়ে দিয়ে আমার রাশভারী একহারা গড়নের ৬ ফিট লম্বা জ্যাঠা বাড়িতে ঢুকে। কেমন আছ কেনি (মেয়েদেরকে আদর করে কেনি আর ছেলেদেরকে কেনা ডাকা হয়) আমায় কোলে নিয়ে আদর করে, এক টাকা ২ টাকার নোট হাতে গুঁজে দেয়।আমি লজ্জায় কুঁকড়ে যাই,কিন্তু শক্ত মুঠোয় টাকা জরিয়ে রাখি।

রাতে হ্যারিকেনের আবছা আলোয় দেখি বিশাল তাগড়া জোয়ান মেঘা এসেছে। মেঘা জ্যাঠার লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান। দহলে(বাহির বাড়ি অর্থাৎ বাড়ির সামনের মাঠে) লাঠি আর কাস্তে হাতে শত শত কাছা দিয়ে লুঙ্গী পরা যুবক। আমরা চরের মানুষ চরের মানুষদের লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে জমাজমি রক্ষা করা নিত্ত নৈমত্তিক ঘটনা। পরে জেঠিমা কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে কুড়ানির সাথে মেঘার বিয়ে দিয়েছিলেন ।

হাঁয় ! না এলেই বুঝি ভালো ছিল । কোথায় আমার আদরের জ্যাঠা, জেঠী, নুন্নু (দাদী) ???
পেছন বাড়িতে ওদের কবরে যাওয়ার সাহস হল না আর। অযত্ন অবহেলায় জেঠিমার নতুন(৫০ বছরের পুরনো) ঘরের ছবিটা তুললাম কোনমতে।

জীবন থেকে কবে যে ”কেনি” ডাকটা হারিয়ে গেছে জানতে পারিনি। গাড়ীতে বসে নিজের সাথে হিসেব মিলালাম প্রায় ২৫ বছর পর আমার বাড়ি ফেরা। দাদী, জেঠি আম্মা, জ্যাঠার মৃত্যুর পর চর পক্ষিমারির বাড়ি যাওয়া আমার কাছে অর্থহীন মনে হত।

পুরনো স্মৃতি কখনো মন থেকে সরাবো না আমি।নতুন যে গেছি তা মন থেকে মুছে ফেলেছি সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু আবারও যাবো দাদী, জ্যাঠা, জেঠিমার স্পর্শ খুঁজতে। নতুন দেওয়ালের ফোঁকর গলিয়ে পুরনো সব স্মৃতি খুঁজে নিতে।

খুজিস্তা নূর ই নাহারিন

(ফেজবুক থেকে সংগ্রহীত)