গান্ধী নোয়াখালীতে থাকতে চেয়েছিলেন

441
গান্ধী
Social Share

ভারতের মুক্তির স্থপতি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী দেশটির স্বাধীনতার প্রথম দিবস ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের পরিবর্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পাকিস্তানে কাটাতে চেয়েছিলেন। তাঁর এ ইচ্ছা শুধু ধর্মের নামে বহুবিশ্বাসের দেশ ভারতকে খণ্ডিত করে বের হয়ে যাওয়া একটি দেশের প্রতি প্রতীকী বা সমর্থনসূচক শুভেচ্ছা ছিল না, বরং এটি ছিল তাঁর প্রতিবাদ। গান্ধী কোনোভাবেই ভারত বিভাগে বিশ্বাস করেননি এবং একটি স্বেচ্ছাচারী ছুরি দ্বারা সৃষ্ট নতুন, ‘কৃত্রিম’ সীমান্তকে তিনি বর্ণনা করেছেন মুহূর্তের উন্মাদনা হিসেবে। তাঁর তাৎক্ষণিক উৎকণ্ঠা ছিল বিভাজনের প্রধান শিকার পাকিস্তানে হিন্দু এবং ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ভাগ্য নিয়ে।

তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নোয়াখালীতে উপস্থিত থাকতে চেয়েছিলেন, যেখানে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় হিন্দুরা ভয়াবহ দুর্ভোগের শিকার হয়েছিল এবং তিনি এর পুনরাবৃত্তি রোধ করতে চেয়েছিলেন। গান্ধী তখনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন আশা গড়ে তোলার জন্য সংগ্রাম করছিলেন। তিন দশকের বেশি সময় উপমহাদেশে অব্যাহত সংগ্রামে গান্ধীর সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা ও ভারতের ঐক্য। স্বাধীনতা অর্জিত হয় কিন্তু ঐক্যের বিনিময়ে। ভারত ভেঙে যায় অত্যন্ত নাজুক ফাটল রেখা হিন্দু-মুসলিম বিভেদ বরাবর। গান্ধীর মতো আর কেউ ইসলামী পাকিস্তানের সম্প্রসারণবাদী ধারণার বিরুদ্ধে এতটা দৃঢ়তা ও সংগতিপূর্ণভাবে লড়াই করতে পারেনি এবং এত দৃঢ়তার সঙ্গে এ কৃত্রিম ভ্রান্তিকে চ্যালেঞ্জ করেনি। তিনি সম্প্রীতিতে বিশ্বাস ছিলেন। কীভাবে এ বিশ্বাস নির্মম অনৈক্যে পর্যবসিত হতে পারে? গান্ধীর হিন্দুত্বের অহংকার নিহিত ছিল ওই ধর্মের সহনশীল দর্শনের মধ্যে। তিনি অনুধাবন করতে পারেননি যে মুসলিম হিসেবে টিকে থাকার জন্য কী কারণে একজন মুসলিমের ভিন্ন একটি দেশে থাকা প্রয়োজন। বিশ্বাসের স্বাধীনতা ভারতীয় দর্শনের মূলনীতি, এটি এমন এক নীতি যা ঐক্যবদ্ধ ভারতের সাংবিধানিক অঙ্গীকারে পরিণত হবে। পাকিস্তানের ধর্মতাত্ত্বিক আদর্শের পক্ষে ভারতীয় মুসলিমদের জন্য নতুন কী অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব? ১৯৪৭ সালের গ্রীষ্মকালের মধ্যে গান্ধী উপলব্ধি করেন যে তাঁর গড়ে তোলা কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের বিশ্বাসের আধিপত্যবাদী অসহায়ত্ব এবং কিছু সতর্ক ব্রিটিশ কুশলীর মধ্যে সহিংসতায় তাঁর যুক্তি হেরে গেছে। কিন্তু তিনি তাঁর বিশ্বাস থেকে পিছু হটতে অস্বীকার করেন। রাজনীতির কাছে তিনি পরাজিত হন। ১৯৪৭ সালের ৩১ মে তিনি তাঁর আদর্শিক ভাই পাঠান নেতা সীমান্ত গান্ধী হিসেবে পরিচিত আবদুল গাফফার খানকে বলেন, তিনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ সফর এবং স্বাধীনতার পর পাকিস্তানে বসবাস করতে চেয়েছিলেন। [আমি এভাবে দেশের বিভাজনে বিশ্বাস করি না। আমি কারও অনুমতি নিতে যাচ্ছি না। তারা যদি তাদের প্রতিরোধে আমাকে হত্যাও করে আমি হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব। অর্থাৎ যদি পাকিস্তানের সৃষ্টি হয় তাহলে আমি সেখানে যেতে চাই, সফর করতে চাই এবং সেখানে থাকতে চাই। আমি দেখতে চাই যে তারা আমার কী করে।]

তিনি দেশবিভাগের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক তারিখ ঘোষণা করার পর ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই তিনি নয়াদিল্লিতে এক প্রার্থনা সমাবেশে বলেন, ‘আমি ১৫ আগস্ট আনন্দে অংশ নিতে পারব না। আমি আপনাদের ধোঁকা দিতে চাই না। ভারতের বিভাজন আপনাদের যত দুঃখ দিয়েছে তার চেয়ে বেশি দুঃখ দিয়েছে আমাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা আজ যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি তার মধ্যে রয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংঘাতের বীজ। অতএব কীভাবে আমাদের পক্ষে প্রদীপ জ্বালানো সম্ভব?’

সেই ‘ভবিষ্যৎ সংঘাতের’ হিংস্রতা শুরুতেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। দেশবিভাগের সঙ্গে আসে হত্যাযজ্ঞ এবং ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান এক মিশ্র যুদ্ধ শুরু করে, যে যুদ্ধে সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততাকে ছাড়িয়ে যায় বর্বরোচিত সন্ত্রাসবাদ। সাত দশকের বেশি সময় যাবৎ সেই ‘ভবিষ্যৎ সংঘাত’ আমাদের জানা ইতিহাসের দীর্ঘতম অব্যাহত যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

গান্ধী তাঁর সুসমন্বিত আদর্শের উত্তরাধিকার লাভ করেন তাঁর মা পুতলিবাইয়ের কাছ থেকে। তিনি ‘প্রণামী’ নামে পরিচিত এক হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, সেই বিশ্বাস অনুযায়ী যা প্রচার করা হতো তা অনুশীলন করা হতো এবং তা হচ্ছে সব ধর্মের আবির্ভাব একই অনন্ত অস্তিত্ব থেকে। এ বিশ্বাসের শাস্ত্রে মুসলিম কোরআনকে হিন্দু বেদের মতোই ঐশ্বরিক বিবেচনা করা হয়। পুতলিবাইয়ের সমন্বয়ের মূল্যবোধ পুত্রের ওপর চিরস্থায়ী, গভীর ও সারা জীবনের জন্য প্রভাব রেখেছিল।

গান্ধী তাঁর পিতার পেশাগত সততা ও মায়ের ধার্মিকতার প্রশংসা করতেন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমার মা আমার স্মৃতিতে যে অসাধারণ ছাপ রেখে গেছেন তা হচ্ছে নিষ্ঠার গুণাবলি। তিনি অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছিলেন।’ তাঁর বাবা ছিলেন দুর্নীতির ঊর্ধ্বে, তিনি তাঁর নিরপেক্ষতা ও রাজ্যের প্রতি আনুগত্যের কারণে খ্যাতির অধিকারী ছিলেন। ধর্মীয় দিক থেকে তিনি গোঁড়া ছিলেন না। বরং ‘… তিনি প্রায়ই মন্দিরে গমন ও অনেক হিন্দুর মতো ধর্মীয় আলোচনা শোনার মতো এক ধরনের ধর্মীয় সংস্কৃতি ধারণ করতেন।’

তাঁর ওপর মায়ের প্রভাব স্থায়ী হয়। গান্ধী স্মরণ করেছেন যে যদিও তাঁরা জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন, তাঁদের প্রণামী মন্দিরের পুরোহিত গীতা ও কোরআন দুটি গ্রন্থই পাঠ করতেন। একটি পাঠ করার পর আরেকটি পাঠ করতেন, যেহেতু ঈশ্বরের উদ্দেশেই প্রার্থনা করতে হবে, অতএব কোন গ্রন্থ পাঠ করা হবে তা কোনো ব্যাপার নয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে দেবচন্দ্র মহারাজ (১৫৮১-১৬৫৫) প্রণামী সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন যখন মুঘল সম্রাট আকবর সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠী ও প্রভুত্বকারী মুসলিম অভিজাতদের মধ্যে সৌহার্দ্যরে নতুন বন্ধন সৃষ্টির মতো রূপান্তরিত করণের নীতির মাধ্যমে মুঘল ভূখণ্ড সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। দেবচন্দ্রের আগমন ঘটেছিল অমরকোট থেকে, খুবই কাকতালীয় ব্যাপার হলো আকবরের পিতা হুমায়ুন যখন সিন্ধের মরুভূমিতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন তখন আকবর অমরকোটে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ব্রহ্মজ্ঞানের সন্ধানে দেবচন্দ্র পরিবার ছেড়ে চলে যান। তিনি জামনগরে স্থিত হয়ে তাঁর অনুসারীদের নামকরণ করেন ‘নিজানন্দ সম্প্রদায়’ বা আত্মজাগরণ সম্প্রদায় এবং ঐশ্বরিক জ্ঞান ‘তারতাম’-এর সাধনা করেন। ‘তারতাম’ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির মতবাদ এই কবিতাংশ থেকে পাওয়া যায় : ‘জো কাছু কাহিয়া বেদ মে, সো হি কাহিয়া কিতাব/দোনো বান্দে এক সাহিব কে, পর লরহট পায়া বিনা ভেদ,’ [বেদে যা বলা হয়েছে, কিতাবেও (কোরআন) তা বলা হয়েছে/দুটিই এক ঈশ্বরের সন্তান, তাহলে সত্য না জেনে বিবাদ কেন?]

দেবচন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিষ্য মহামতি প্রাণনাথজি (১৬১৮-৯৪) ওমান, ইরান ও ইরাক সফর করার পর প্রণামী ধর্মের বাণীগুলো ‘কুলজাম স্বরূপ’-এ সংকলিত করেন। এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বেদ, ভগবদ্গীতা, কোরআন, বাইবেল ও তাওরাতের বাণী। বিভিন্ন ধর্মের অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে প্রণামী সম্প্রদায় তাদের সদস্যদের জন্য মদ, মাংস ও তামাক নিষিদ্ধ করে। প্রণামী মন্দিরগুলোয় কোনো মূর্তি নেই। ভারতের প্রচলিত অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গান্ধীর মা একটি হিন্দু মন্দিরে পূজায় অংশগ্রহণ করতেন, জৈন সন্ন্যাসীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন ও তাদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে উপবাস পালন করতেন। গান্ধী তাঁর আত্মজীবনীতে স্মরণ করেছেন, ‘… কঠোর শপথ নিয়ে তিনি তা অবিচলিতভাবে পালন করতেন…। “চতুর্মাস” [চান্দ্রমাস অনুসারে আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দিন “শায়ানি একাদশী” পালন থেকে শুরু করে কার্তিকের শুক্লপক্ষের দিন “প্রবোধিনী একাদশী” পালনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত চার মাস; যা গ্রেগেরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত]-এর দিনগুলোয় দিনে মাত্র এক বেলা আহার করা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।’ কোনো কোনো দিন তিনি সূর্য না দেখে কোনো কিছু না খাওয়ার শপথ করতেন, এমনকি আকাশ মেঘলা থাকলে খাবার গ্রহণে বিরত থাকতেন। তাঁর উদ্বিগ্ন পুত্র বাইরে দাঁড়িয়ে আকাশে মেঘের ফাঁকে সূর্যের এক চিলতে আলো অনুসন্ধান করতেন, যাতে তিনি তাঁর মাকে উপবাস ভাঙার জন্য বলতে পারেন। উপবাসব্রত পালনের প্রতি গান্ধীর গভীর নিষ্ঠার উৎস বের করা সহজ, যা তিনি তাঁর মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন ধ্যান ও রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে।

গান্ধী যখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন তখন তাঁর প্রার্থনা সভাগুলো শুরু হতো প্রধান চারটি ধর্মগ্রন্থের বাণী উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। তিনি তাঁর আশ্রমের আন্তধর্মীয় প্রার্থনার তালিকায় ‘রব আল-আলামিন’ অর্থাৎ বিশ্বপ্রভুর প্রশংসাসূচক কোরআনের সূচনা অধ্যায় ‘সুরা ফাতিহা’ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। খ্যাতিমান মনোবিশ্লেষক এরিক এরিকসন মহাত্মায় পরিণত হওয়া বালকটির এক জীবনী রচনা করেছেন, যেটি বিতর্কিত হলেও অত্যন্ত চমৎকার। তিনি মন্তব্য করেছেন : ‘তাঁর মায়ের ধর্ম ছিল সেই ব্যাপকতা সম্পন্ন ও ব্যক্তিগত ধরনের, যা নারীরা তাদের সন্তানদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়; এ শিক্ষা ছেলেটিকে প্রস্তুত করেছিল কারও কথার অর্থ যা-ই হোক না কেন তা অস্বীকার করার জন্য; এমনকি তা যদি হিন্দু শাস্ত্রেও লেখা থাকে, যা তিনি তাঁর যৌবনে নতুন করে আবিষ্কার করেন পাশ্চাত্যের সাহিত্যপাঠের মাধ্যমে; অথবা খ্রিস্টানদের বাণীতেও থাকে, যা তিনি প্রাচ্যের ও আধুনিক ব্যাখ্যার সাহায্যে নতুন করে উপলব্ধির চেষ্টা করেন …।’

গান্ধী উল্লেখ করেছেন, ‘ধর্মবিশ্বাস শেখার ব্যাপারে কোনো শিশুর সহজাত প্রবণতা হচ্ছে আশপাশ, এখান-সেখান থেকে ধারণাগুলো আহরণ করা।’ তাঁর নার্স রম্ভা তাঁকে ভয় তাড়ানোর জন্য প্রভু রামের নাম জপতে বলেন এবং সারা দিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রতিদিন সকালে স্নানের পর ‘রাম রক্ষা’ শ্লোক জপ করার পরামর্শ দেন। গান্ধী বরং তাঁর চুলে ‘শিখা’ (বা গিঁট) বাঁধার মতো তাঁর গোত্রের দৃশ্যমান বাধ্যবাধকতাগুলো মানতে অধিক উপভোগ করতেন এবং ব্রাহ্মণদের মতো পইতা ধারণ করতে চাইতেন। পরিবারের উদার মন একটি ক্ষেত্রে সংকীর্ণ ছিল। গান্ধীকে তাঁর বাড়িতে ‘অস্পৃশ্য’ বালকের সঙ্গে সংস্পর্শ নিষেধ করা হয়েছিল, যে বালকটি পায়খানা পরিষ্কার করার জন্য আসত। এ বৈষম্য বালক গান্ধীর মনকে বিঘ্নিত করেছিল এবং প্রশ্নের উদয় হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে হিন্দুত্বে মৌলিক সংস্কার সাধনের আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। গান্ধী স্মরণ করেছেন যে তাঁর শয্যাশায়ী পিতার পার্সি ও মুসলিম বন্ধুরা তাঁকে দেখতে আসতেন এবং ধর্ম নিয়ে আলোচনা করতেন। কিশোর গান্ধী তাঁর অসুস্থ পিতাকে সেবা করার সময় তাদের কথা শুনতেন ও শিখতেন। লাধা মহারাজ নামে এক পুরোহিত এসে রামায়ণ থেকে ‘দোহা’ ও ‘চোপাই’ (চতুর্পদী কবিতা) আবৃত্তি করতেন, যা গান্ধীর মধ্যে প্রথম প্রেমের অনুপ্রেরণা জাগ্রত করে, যাকে তিনি পরবর্তীতে ‘সব পবিত্র গ্রন্থের মধ্যে মহান’ বলে বর্ণনা করেছেন। প্রভু রাম গান্ধীর আদর্শ বীরে পরিণত হয়, যদিও এটি ছিল গীতা, যা হিন্দুত্বের অতি গুরুত্বপূর্ণ মহাকাব্য মহাভারত, যে গ্রন্থ অধিক প্রভাব সৃষ্টিকারী বিবরণী। গান্ধী গীতাকে তাঁর ধর্মগ্রন্থ অথবা আধ্যাত্মিক অভিধান, কারও অভ্যন্তরীণ সত্তার আয়না ও ধ্রুবতারা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ গ্রন্থ ‘অদৃশ্য যুদ্ধ’ নৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেছে, যা দৈহিক সংঘাতের চেয়ে অনেক কঠিন। সাহসিকতা কোনো সহিংসতা ছিল না, বরং অহিংসাই সত্যিকার অর্থে সাহস। গীতার মূলনীতি হচ্ছে, সংশ্লিষ্টতা ছাড়া কর্ম, যা অহিংসার মধ্য দিয়েই অর্জন করা সম্ভব। সহিংসতার ভীতি অহিংসার জন্ম দিতে পারে না। ‘হিন্দ স্বরাজ’-এ তিনি লিখেছেন যে তিনি যদি শাস্তির ভয়ে চুরি করা বন্ধ করেন, তাহলে যে মুহূর্তে ভীতির অবসান ঘটবে তখন তিনি পুনরায় চুরিতে ফিরে আসবেন।

সংশ্লিষ্টতার অনুপস্থিতি অহমিকার বিলুপ্তির দিকে পরিচালিত করে। গান্ধী সবচেয়ে অস্থির ও অশান্ত পরিস্থিতিতে প্রশান্ত থাকার সামর্থ্য অর্জন করেন গীতা থেকে ‘স্থিতাপ্রজনা’ চর্চা করে। মহান সত্য সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণের জন্য মহাভারতের যুদ্ধ ছিল রূপক প্রতীকী কাহিনি, যা স্বাভাবিক অস্তিত্বে প্রয়োগ করা যেতে পারে; কারণ গান্ধীর জন্য ধর্ম কোনো ধর্ম ছিল না যতক্ষণ পর্যন্ত তা দৈনন্দিন জীবনের সংকট নিবারণে কাজে না লাগে। গীতা যথার্থই একটি পবিত্র গ্রন্থ, কারণ এটি ছিল প্রাত্যহিক অস্তিত্বের জন্য আবশ্যিক উপদেশের সমাহার। তাঁর নিজের জীবন তাঁর আত্মজীবনীর শিরোনামেই সঠিকভাবে ফুটে উঠেছে : সত্যের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষা এবং তাঁর কাছে সত্যই ছিল ধর্মের সমার্থক। তাঁর হিন্দুত্ব ছিল ‘অদ্বৈত দর্শনের’ (Advaita philosophy) বেদান্তের সবচেয়ে প্রভাবশালী মতবাদ, ভারতীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী আধ্যাত্মিক উপলব্ধি) চেতনায় নশ্বরতা থেকে চিরস্থায়িত্বের উপলব্ধি। তাঁর একান্ত ও প্রকাশ্য উভয় জীবনই ছিল সংগ্রামের সমন্বয় : প্রথমে বিশ্বাসের অভিব্যক্তির সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হওয়া এবং দ্বিতীয়ত বিদেশি শাসন থেকে ভারতকে পরিশুদ্ধ করা।

তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল উপনিষদের নীতি উৎসারিত : ‘দম’ (আত্মনিয়ন্ত্রণ), ‘তাপস’ (আত্মশৃঙ্খলা), ‘মৌন’ (নীরবতা), ‘দান’ (অংশগ্রহণ), ‘দয়া’ (উপকার করার ইচ্ছা) এবং ‘ব্রহ্মচর্য’ (কৌমার্য)। ড. এস রাধাকৃষ্ণণ তাঁর গ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্সিপাল অব উপনিষদস’-এ ব্যাখ্যা করেছেন, ‘দম’ অর্থ হচ্ছে আমাদের চাহিদাকে ন্যূনতম পর্যায়ে হ্রাস করা; মনের ক্রোধ ও লালসাকে বশীভূত করা। [ক্রোধম সামেনা জয়তি, কামাম সংকল্প-ভরজানাত/সত্য সমসেবানদ ধীরো নিধর্ম উচ্চেতম আরহাতি : ব্রাহ্ম পুরাণ ২৩৫, ৪০]। ড. রাধাকৃষ্ণণ বলেছেন, ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনের পথ হচ্ছে কৃচ্ছ্রতা, পবিত্রতা, নিঃসঙ্গতা ও নীরবতা।’ ‘তাপস’ (আত্মশৃঙ্খলা)-এর উদ্দেশ্য আধ্যাত্মিক যা অর্জিত হয় ত্যাগের প্রশান্তিতে না পৌঁছা পর্যন্ত সহজাত কামনা-বাসনার বিলুপ্তি ঘটিয়ে এবং বাইরের পৃথিবীর প্রতি আকর্ষণ থেকে মুক্ত হয়ে। ‘মৌনতা’ আত্মাকে ধ্যানের পথে চালিত করে এবং তোষামোদ বা পরনিন্দার মতো জিবের বাড়াবাড়িকে রহিত করে। ‘দান’ শুধু উদারতা নয়, এটি সম্পদের আহরণ থেকে মুক্তি। সিংহাসনে বসে কেউ ঈশ্বরকে সন্ধান করতে পারে না। ‘দয়া’ বা করুণা হচ্ছে আবেগ; ক্ষমাশীলতার মাধ্যমে শান্তি স্থাপন। ‘ব্রহ্মচর্য’ বা কৌমার্য হচ্ছে শক্তি ও সৌন্দর্য; যৌনকর্ম প্রয়োজন শুধু একটি আত্মার উপস্থিতির প্রয়োজনে আরেকটি দেহ সৃষ্টির জন্য বীজ বপনের উদ্দেশ্যে; যৌনকর্মের আধিক্যে শরীর ও মস্তিষ্ক ধ্বংস হয়। গান্ধী প্রতিটি নীতির অনুশীলন করতেন, এমনকি তাঁকে ভুল বোঝা সত্ত্বেও; বিশেষ করে জীবনের শেষ দিকে উপনীত হয়ে তিনি যখন ব্রহ্মচর্য সাধনার ওপর জোর দেন তাঁর সাধনা বন্ধুদের মর্মাহত, ভক্তদের আতঙ্কিত, অনুসারীদের হতবাক ও প্রতিপক্ষকে বিস্মিত করে। তিনি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা পুরোপুরি পরিহার করেছিলেন। তিনি চূড়ান্ত প্রশান্তির অনুসন্ধান করছিলেন : কারও প্রতি ঈর্ষা নয়, কোনো কিছুর মালিকানা অর্জন নয়, কাউকে ভয় করার নয় এবং কোনো কিছুর জন্য আকাক্সক্ষা পোষণ নয়। সংশ্লিষ্টতাহীনতা পৃথিবীর প্রতি মোহ ত্যাগ করার চেয়ে অনেক বড় কিছু : এটি ছিল মহান এক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নিজেকে সংশ্লিষ্ট করা। এমনকি স্ববিরোধিতা যখন তাঁর খ্যাতিকে কালিমালিপ্ত করার হুমকির মধ্যে ফেলেছিল তখনো নৈতিক শক্তি তাঁর নিষ্ঠা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে অক্ষুণ্ন রেখেছিল।

গান্ধী অন্যান্য বিশ্বাসের পরিপূর্ণ উপাদানগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়াকে প্রাধান্য দেন। যেমন ইসলামে আল্লাহকে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘রব আল-আলামিন’ অথবা সমগ্র বিশ্বের আল্লাহ এবং ‘রব আল-মুসলিমিন’ বা ‘মুসলমানদের আল্লাহ’ হিসেবে নয়। আমরা কীভাবে সেই অনন্ত অস্তিত্বের প্রার্থনা করব তা আমাদের সিদ্ধান্ত, যা আমাদের অবশ্যই কোনো ভীতি বা বাধা ছাড়া চর্চা করতে হবে। তাঁর প্রার্থনা সমাবেশগুলোয় যে বিষয়ের ওপরই মনোযোগ আকর্ষণ করা জরুরি বলে তিনি মনে করতেন, সে বিষয়ের ওপর তিনি সাধারণত ১৫ মিনিটের জন্য বক্তব্য দিতেন। ১৯৪৭ সালের ৩০ মে তিনি নয়াদিল্লিতে বলেন, ‘আমি হিন্দু হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি। এ ঘটনাকে কেউ বদলে দিতে পারে না। কিন্তু আমি একই সঙ্গে একজন মুসলিম, কারণ আমি একজন ভালো হিন্দু। একইভাবে আমি একজন পার্সি ও খ্রিস্টান। সব ধর্মে একজন মাত্র ঈশ্বরের উল্লেখ করা হয়েছে। সব ধর্মগ্রন্থে একই কথা বলা হয়েছে।’

গান্ধী, যিনি তাঁর বিশ্বাসে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ ও অনুপ্রেরণা লাভ করেন, যারা পৃথিবীকে মহান ধর্মগুলো দিয়েছেন তারা নিঃস্বার্থ ছিলেন এবং তিনি যখন প্রথম টমাস কার্লাইলের ‘হিরোস অ্যান্ড হিরো ওরশিপ’ (Heroes and Hero Worship)-এ ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা নবী মুহাম্মদের (সা.) কৃচ্ছ্রতা ও আত্মশৃঙ্খলা সম্পর্কে পাঠ করে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল হিন্দু ও মুসলমানদের সম্পর্ক; কোরআন থেকে তিনি সম্প্রীতির সন্ধান করেন, দ্বন্দ্ব নয়।…

গান্ধী সব সময় অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তাঁর যুক্তির যথার্থতা প্রমাণ করতে প্রস্তুত ছিলেন। যেমন যখন তাঁকে যুদ্ধ ও ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয় তখন দিনি ১৯৪৬ সালে বিহারে মুসলমান ও বাংলায় নোয়াখালীতে হিন্দুদের রক্ষার জন্য সেখানে তাঁর অবস্থানের কথা স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, ‘কোনো বিহারি মুসলিম আমাকে এ কথা বলেনি যে যেহেতু আমি একজন অবিশ্বাসী সেজন্য তারা আমাকে হত্যা করবে। অথবা নোয়াখালীতে মৌলবিরাও আমাকে এমন কোনো কথা বলেনি। বরং তারা ঢোলকের বাদ্যের সঙ্গে ‘রামধুন’ (রামের সংগীত) পরিবেশনের অনুমতি দিয়েছেন। কোরআন যা বলেছে তার মর্মার্থ হলো কাফিররা আল্লাহর কাছে দায়ী থাকবে। কিন্তু আল্লাহ প্রত্যেকের কাছে, এমনকি একজন মুসলিমের কাছেও একটি ব্যাখ্যা দাবি করবেন এবং তিনি তোমার কথার জন্য নয়, বরং তোমার কাজের জন্য প্রশ্ন করবেন। কিন্তু যারা কলুষ দেখতে আবিষ্কার করতে চায় তারা সর্বত্র তা-ই দেখবে। কিন্তু এমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই যা ভালো ও মন্দ মিশ্রিত নয়। আমাদের “মনুস্মৃতি” অস্পৃশ্যদের কানে গলিত সিসা ঢালার কথা বলেছে কেন! কিন্তু আমি বলব যে সেটি আমাদের হিন্দু শাস্ত্রের সত্যিকার শিক্ষা নয়। তুলসীদাস তাঁর বক্তব্যে সব শাস্ত্রের নির্যাস দিয়েছেন যে দয়াশীলতা সব ধর্মের মূল। কাউকে হত্যা করার শিক্ষা কোনো ধর্মই আমাদের দেয়নি।’

১৯৪৭ সালের ৩০ মে যা অনিবার্যভাবে ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল তখনো তিনি ক্রমবর্ধমান একক আহ্বান অব্যাহত রেখেছিলেন- ‘আমাদের সবাইকে যদি মৃত্যুবরণ করতে হয় অথবা সমগ্র দেশ যদি ভস্মীভূত হয় তবু আমাদের অবশ্যই স্পষ্ট করতে হবে যে পাকিস্তানকে কোনো শক্তি বলেই স্বীকার করে নেওয়া যেতে পারে না।’

নৃতত্ত্ববিদ প্রফেসর নির্মল বোস স্মরণ করেছেন যে ১৯৪৬ সালের ২৫ নভেম্বর তিনি বাঙালি মুসলিম, যারা নোয়াখালীতে একটি হিন্দু মন্দিরে হামলা করেছিল তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘নবী (মুহাম্মদ) একসময় মুসলমানদের উপদেশ দিয়েছেন ইহুদিদের প্রার্থনাস্থলকে তাদের নিজেদের প্রার্থনাস্থলের মতো পবিত্র বিবেচনা ও একইভাবে রক্ষা করার জন্য।’ গান্ধীর জন্য হিন্দুত্ব ছিল ধারণ করার সুন্দরতম জীবনপদ্ধতি; হিন্দুধর্ম যে দুঃখজনক ও প্রায় ক্ষেত্রে অর্থহীন রীতিপ্রথা আহরণ করেছে সেগুলো মানুষের আরোপিত। তিনি হিন্দুধর্মে যে সংস্কার সাধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন তা সতীপ্রথার প্রতি ঘৃণা পোষণ করে এ প্রথা নিষিদ্ধ করার জন্য একজন ইংলিশ প্রভুর দাবির মতো ঘৃণাপ্রসূত ছিল না। বরং একজন নিষ্ঠাবান হিন্দু হিসেবে, যার কাছে এহেন আচরণ ছিল নৈতিকতার আদর্শ থেকে লজ্জাজনক বিচ্যুতি, যে আদর্শের ভিত্তি স্থির করেছে উপনিষদ। তাঁর কাছে সামাজিক অসদাচরণ ছিল এক ধরনের দূষণ, হিন্দুবাদের প্রকৃত সত্য থেকে বিচ্ছিন্নতা, ঈশ্বরের বিশ্বজনীন ক্ষমতার বিরুদ্ধে ঘৃণ্য মানবিক ইচ্ছার প্রতি সমর্থন ঘোষণা।

(এম জে আকবরের ‘গান্ধী’স হিন্দুইজম : দ্য স্ট্রাগল অ্যাগেইনস্ট জিন্নাহ’স ইসলাম’ থেকে)