গাজায় এবার কী লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে ইসরায়েল?

63
Social Share

গাজায় গত সোমবার থেকে যে ভয়াবহ মাত্রায় বিমান হামলা ইসরায়েল করছে তার নজির বিরল।

গাজার বিবিসির একজন সংবাদদাতা বলছেন, বহু ইসরায়েলি হামলার প্রত্যক্ষদর্শী তিনি, কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর হামলা আগে কখনও দেখেননি। রুশদি আবুলাউফ টুইট করেছেন, “গাজার সর্বত্র বিস্ফোরণ হচ্ছে। কোথায় বোমা পড়ল যোগাযোগ করে তার খোঁজ নেওয়া আর সম্ভব হচ্ছে না।”

ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর দেওয়া হিসাবেই শনিবার পর্যন্ত গাজার ৬৫০টি টার্গেটে বিমান হামলা হয়েছে। অর্থাৎ সোমবার থেকে গড়ে প্রতিদিন একশ’ থেকে দেড়শ’ বার ইসরায়েলি যুদ্ধ বিমান গাজায় উড়ে গিয়ে বোমা ফেলছে। সেইসাথে চলছে সীমান্ত থেকে দূরপাল্লার কামানের গোলা।

গাজায় স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দুইশ’র কাছ্কাছি, যার মধ্যে ৫২টি শিশু। ফলে, গাজার মত অত্যন্ত ঘনবসতি একটি এলাকায় নির্বিচারে বোমা হামলা নিয়ে জাতিসংঘসহ বহু দেশ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

কিন্তু এখনও এসব নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই ইসরায়েলের। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখনও বলছেন, “যতদিন প্রয়োজন গাজায় বিমান হামলা চলবে। এমনকি গাজায় স্থলবাহিনী ঢোকানোর সম্ভাবনাও নাকচ করছে না ইসরায়েল।

প্রশ্ন হচ্ছে, ঠিক কোন প্রয়োজনের কথা বলছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী? গাজায় এ দফার এই সামরিক অভিযান থেকে কোন উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইছে ইসরায়েল?

ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা জেরুজালেম ইন্সটিটিউট অব স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড সিকিউরিটি‘র (জেআইএসএস) গবেষক ড. জনাথন স্পায়ার বলেন, হামাসের ছোড়া রকেটের জবাব দিচ্ছে ইসরায়েল এবং এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে যাতে হামাস ভবিষ্যতে এমন সাহস না দেখায়।

“আমি মনে করি ইসরায়েল হামাসের রকেট নিক্ষেপের জবাবই দিচ্ছে। হামাসকে এমন একটি বার্তা দিতে চাইছে যে ভবিষ্যতে যেন এমন সাহস তারা না দেখায়। এছাড়া, গোপন জটিল কোনো উদ্দেশ্য ইসরায়েলের আছে বলে মনে হয় না।”

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দেওয়া হিসাবে হামাস গত সাতদিনে গাজা থেকে তেল আবিবসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে প্রায় তিন হাজারের মত রকেট নিক্ষেপ  করেছে, যার আঘাতে মারা গেছে দশজন।

রবিবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা গাজায় হামাসের শীর্ষ নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে টার্গেট করে এবং তার বাড়িতে বোমা হামলা চালানো হয়। দাবি করা হয়েছে গত ক’দিনে হামাসের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কজন নেতা মারা গেছেন।

ইসরায়েল কি তাহলে গাজা থেকে হামাসকে উৎখাত করতে চাইছে?

ড. স্পায়ার বলেন, তিনি মনে করেন না এই দফায় ইসরায়েলের তেমন কোনো লক্ষ্য রয়েছে। সামরিকভাবে সেটা হয়তো ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব, কিন্তু তার জন্য যে মূল্য দিতে হতে পারে ইসরায়েল তার জন্য প্রস্তুত নয়।

তিনি বলেন, “প্রথম কথা, হামাসকে গাজা থেকে সরাতে ইসরায়েলকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাপক মাত্রায় স্থল অভিযান চালাতে হতে পারে। তার অর্থ বহু প্রাণহানির আশঙ্কা, ইসরায়েলি নাগরিকের প্রাণহানি ইসরায়েলে খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয়, রাজনীতিকরা সেই ঝুঁকি নিতে চান না।

তাছাড়া, ড. স্পায়ার বলেন, হামাসকে সরিয়ে দিলে গাজায় নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে তা নিয়ে ইসরায়েল উদ্বিগ্ন। ইসরায়েল নিজে আবারও গাজার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিতে কোনাভাবেই চায় না।

অনেক পর্যবেক্ষকই বিশ্বাস করেন, হামাসকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া ইসরায়েলের রাজনৈতিক স্বার্থেরও পরিপন্থী, কারণ হামাসের কারণেই ফিলিস্তিনিরা রাজনৈতিকভাবে এবং ভৌগলিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত রয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে ইসরায়েলকে সুবিধা দিচ্ছে।

ইসরায়েলের ‘ঘাস চাঁছা’ কৌশল

ইসরায়েলের প্রখ্যাত রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক অধ্যাপক এফরাইম ইনবার মনে করেন ইসরায়েল এই বাস্তবতা মেনে নিয়েছে যে হামাস বা লেবাননের শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ’র মত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে নিশ্চিহ্ন করা হয়তো সম্ভব নয়, এবং সে কারণে ইসরায়েল এসব গোষ্ঠীর ব্যাপারে, তার ভাষায়, ‘মোয়িং দি গ্রাস‘ অর্থাৎ “ঘাস চেঁছে রাখার” কৌশল অনুসরণ করছে।

২০০২ সালে ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় ইন্তিফাদা, ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহ’র সাথে যুদ্ধ এবং ২০০৬ এবং ২০০৮ সালে গাজায় হামাসের সাথে লড়াইয়ের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে ২০১৩ সালে তার এক গবেষণাপত্রে অধ্যপক ইনবার লেখেন – “ইসরায়েল মেনে নিয়েছে এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে তাদের লড়াই হবে দীর্ঘ এবং জটিল। সামরিক শক্তি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ এবং নিশ্চিত বিজয় সম্ভব নয়। ফলে মাঝেমধ্যে তীব্র শক্তি প্রয়োগ করে এসব শত্রুদের শক্তি কিছুটা খর্ব করার কৌশল তারা নিয়েছে যাতে কিছুদিনের জন্য তারা ঠাণ্ডা থাকবে, ইসরায়েলের ওপর হামলা করতে ভয় পাবে এবং সীমান্ত কিছুদিন ঠাণ্ডা থাকবে।”

ড স্পায়ারও মনে করেন, ইসরায়েল এবারও হামাসের ব্যাপারে সেই নীতিই অনুসরণ করছে এবং কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো এ দফার অভিযান বন্ধ হবে। “ইতিমধ্যেই যুদ্ধবিরতি নিয়ে মধ্যস্থতার কথা উঠছে। আমেরিকা বলছে, মিশর বলছে। আমার মনে হয় আর খুব বেশিদিন এই অভিযান চলবে না।”

তিনি মনে করেন, ইসরায়েলি সরকার ও সেনাবাহিনী বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের দাবি করবে।

“এরই মধ্যে তারা সেই দাবি তুলতে শুরু করেছে। সেনাবাহিনী বলছে গাজায় হামাসের টানেল নেটওয়ার্কের ব্যাপক ক্ষতি করা সম্ভব হয়েছে। হামাসের গোয়েন্দা তৎপরতার কেন্দ্র ছিল যে ভবনটি সেটি ধ্বংস করে দেওযা হয়েছে… আগামী ৭২ ঘণ্টায় আমরা আরও এমন বেশ কিছু সাফল্যের দাবি শুনবো।”

তবে, তিনি মনে করেন, প্রকৃতপক্ষে হামাসের শক্তি কতটুক কমবে, হামাস কতদিন রকেট ছোঁড়া থেকে নিবৃত থাকেবে তা বলা সম্ভব নয়।

“আসল লড়াইয়ের পর শুরু হবে সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যার লড়াই। আপনি হামাসের পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা শুনবেন। তারা বলবে ইসরায়েল কিছুই করতে পারেনি।”

ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামাসের প্রভাব

গাজায় দিনের পর দিন বোমাবর্ষণ এবং বেসামরিক লোকজনের প্রাণহানি নিয়ে মুসলিম বিশ্বের ক্ষোভ এবং অস্বস্তি বাড়ছে।

সৌদি আরবের জেদ্দায় রবিবার ইসলামি ঐক্য জোট বা ওআইসির একটি জরুরি বৈঠক হচ্ছে। আল আকসা মসজিদ চত্বরে ইসরায়েলি পুলিশের হামলা এবং তারপর গাজায় প্রাণহানির জেরে ‘আব্রাহাম চুক্তি’ নামে পরিচিত যে শান্তিচুক্তি কয়েকটি আরব দেশের সাথে ইসরায়েলের হয়েছে সেটি চাপের মধ্যে পড়বে বলে মনে করেন বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্রাঙ্ক গার্ডনার। মধ্যপ্রাচ্যের আরও অনেক বিশ্লেষকই সেই সম্ভাবনার কথা বলেছেন।

তবে ড. জনাথন স্পায়ার মনে করেন, আব্রাহাম চুক্তি ধসে পড়বে সে সম্ভাবনা তিনি এখনই দেখছেন না কারণ, তার মতে, “ওই চুক্তির সাথে আরব ওই দেশগুলোর নিজেদের অনেক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে।”

তিনি মনে করেন, ইসরায়েলের এখন প্রধান উদ্বেগ জাফা, আকর এবং লোদের মত আরব অধ্যুষিত বিভিন্ন শহরে চলা দাঙ্গা, যে ঘটনাকে গৃহযুদ্ধের হুমকি বলে বর্ণনা করেছেন ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট।

ড. স্পায়ার বলেন, “এই দফার এই সংঘাতে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল হামাস এই প্রথম ইসরায়েলের ভেতর আরব জনগোষ্ঠীকে খেপিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এটি এবার হামাসের বড় একটি কৌশলগত অর্জন এবং ইসরায়েলের বড় মাথাব্যথার কারণ।”

তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করতেই ইসরায়েল হয়তো এখন যত দ্রুত সম্ভব গাজায় অভিযান বন্ধের তাড়না অনুভব করছে।

বিবিসি বাংলা