গণতান্ত্রিক ভারতের নির্বাচন এবং এর তাত্পর্য

62
Social Share

ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক:

বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচটি রাজ্যের নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলো গত ২ মে। নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ভূমিকা, ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে চলা এবং ফলাফল প্রমাণ করে যে, ভারতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ শক্তিশালী রূপ নিয়েছে, যা বিশ্বের উন্নয়নশীল গণতন্ত্রকামী দেশগুলির জন্য অনুকরণীয় ও শিক্ষণীয়। আমরা জানি, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে এবং ১৯৫০ সালে ২৬ জানুয়ারি ভারতকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে ভারতকে ঐক্যবদ্ধ এবং প্রশাসনকে গণতন্ত্রায়ন করার ব্যাপারে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং তার প্রধান সহযোগী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ভীমরাও আম্বেদকর শাসনতন্ত্র প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৫২ সালে নির্বাচনে কংগ্রেস কেন্দ্র এবং সকল রাজ্যে ক্ষমতাসীন হয়। ভারতে কেরালায় ১৯৫৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্বে প্রথম অকংগ্রেসি সরকার গঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৭ সালে তামিলনাড়ুতে আঞ্চলিক দল ডিএমকে সরকার গঠন করে। দলবদল এবং ভাঙাগড়া চলতে থাকে। একদিকে যেমন ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে স্বকীয়তা গড়ে ওঠে, পাশাপাশি প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল এবং এর নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি ও পরিপক্বতার কারণে সব অঞ্চলের সব সমস্যা সমাধান করে ভারতীয় ঐক্য ও সংগতি জোরদার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করা হয়। কংগ্রেসের পাশাপাশি জনতা পার্টি, জনতা দল, ভারতীয় জনতা পার্টি জাতীয় পর্যায়ে সরকার গঠনের ভূমিকা রাখতে থাকে। সত্তর, আশি এবং নব্বইয়ের দশকে এসে জোট গঠনের প্রক্রিয়া পরিপূর্ণতা লাভ করে। ১৯৯৯ সালে বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ গঠিত হয়। আর পরবর্তীকালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে গঠিত হয় ইউপিএ, দুটি মহাজোটই ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে সমুন্নত রেখে কাজ করেছে। ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মহাত্মা গান্ধীকে জাতির পিতা মেনে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এই দুটি জোট এভং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরো শক্তিশালী করার ব্যাপারে ভূমিকা রাখছে। যার ফলে ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও আঞ্চলিকতা নিয়ে বিভেদ ও বিতর্ক চললেও ঐক্য ও সমন্বয় প্রাধান্য পাচ্ছে। যার ফলে সমস্যা সমাধানের দৃষ্টিভঙ্গি ও কাছাকাছি আসছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমাধান হচ্ছে।

ফেডারেল সরকারব্যবস্থা, নারীসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী সম-অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গণজাগরণে রূপ নেয়। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন একে পূর্ণতা দেয়। বিভিন্ন বিপ্লবী গ্রুপের কর্মকাণ্ড এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেতাজি সুভাষ বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন এবং যুদ্ধ ব্রিটিশবিরোধী জাগরণে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। এর ফলে কংগ্রেস কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত সুসংগঠিত রূপ নেয়। পাশাপাশি একদল সুশৃঙ্খল ত্যাগী নেতা ও কর্মিবাহিনী গড়ে ওঠে। যার ফলে কংগ্রেস একনাগাড়ে ৩০ বছর ক্ষমতাসীন ছিল।

অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে বিজেপি এগিয়ে যায়। ১৯৯৯ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ির নেতৃত্বে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ ক্ষমতাসীন হয়ে পাঁচ বছর শাসনকাজ পরিচালনা করে। বিশিষ্ট নেতা এল কে আদভানি তার প্রধান সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। তখন বিজেপি উত্তর, মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ও এনডিএ জোট সর্বভারতীয় রূপ নেয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের ফলে একদিকে বিভিন্ন রাজ্যে ভাষা ও সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে। অন্যদিকে সর্বভারতীয় সংস্কৃতি, চেতনা এবং ঐক্যবোধ জোরদার হয়েছে। ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘জয় হিন্দ’ আজ শুধু কংগ্রেসের নয়, বিজেপি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দলও ধারণ করে। ‘ভারত মাতা কি জয়’ শুধু বিজেপির স্লোগান নয়, কাশ্মীরের ফারুক আব্দুল্লাহ থেকে শুরু করে পাঞ্জাব, গুজরাট, বাংলা, অসম, মহারাষ্ট্র, কেরালা, তামিলনাড়ুসহ বিভিন্ন রাজ্যে ধ্বনিত হয়। সংবিধানের সর্বজনীনতা শুধু রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রতিফলন ঘটছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রায়ই বলছেন, ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস’—তার মানে হলো সবাইকে সাথে নিয়ে সবার বিশ্বাস অন্তর্ভুক্ত করে সবার বিকাশ ঘটাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেমন স্বামী বিবেকানন্দকে ধারণ করেন, পাশাপাশি অমিত শাহসহ বিজেপি নেতারা একদিকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু জন্মস্থান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন যান, পাশাপাশি স্বামী বিবেকানন্দের বাড়ি এবং ভবতারিণী মন্দিরে যান, যার মূল চেতনাকে হলো ‘যত মত তত পথ’—সব ধর্মমতই সত্য। সর্বধর্মের মূল চেতনার ধারণ করার সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি একদিকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়েও করলেও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর অনুষ্ঠানেও উপস্থিত থেকে সংহতি প্রকাশ করেন।

মমতা ব্যানার্জি ও তার দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রথম দিকে সুরক্ষা বিবেচনায় নিয়ে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের জন্য বিষয় কিছু ব্যবস্থা নেন। গত বছর হিন্দুধর্মাবলম্বী পুরোহিতদেরও ভাতার ব্যবস্থা করেন। এর সঙ্গে বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, শিখ, জৈন ধর্মের পুরোহিতদেরও এর আওতায় আনা হয়। তৃণমূলের সরকার বিগত এক দশকে বিনিয়োগ, কৃষি-শিল্প, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যবস্থা নিয়েছে ও অগ্রগতি অর্জন করেছে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন, নারী-ছাত্র-ছাত্রীও ধর্মীয় নেতাদের ভাতা আরো বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এছাড়া প্রতি বছর সাত লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান করে পাঁচ বছরে ৩৫ লক্ষ লোকের নিয়োগদানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্যসীমা নিচে ৫ শতাংশ নিয়ে আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার শিল্প, কৃষি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও সেবামূলক কাজের উন্নয়ন অগ্রগতি তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠিত হলে তা ডাবল ইঞ্জিন সরকার হিসেবে উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের মাধ্যমে রাজ্যকে গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানে নিয়ে যাবে। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ২১৩টি আসন, বিজেপি পেয়েছে ৭৭টি আসন, কংগ্রেস-বামদল-আইএসএফের সংযুক্ত মোর্চার বড় ধরনের বিপর্যয় হয়েছে। কংগ্রেস এমনকি শক্ত অবস্থানে থাকা মুর্শিদাবাদ মালদহ ও চব্বিশ পরগনায় হেরে গেছে, সেখানে বেশি আসন পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ঐ অঞ্চলে মুসলিমরা সংখ্যার দিক দিয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। পশ্চিম বাংলায় মুসলিম জনসংখ্যার হার ২৬.৬ শতাংশ, জানা গেছে ১৫ শতাংশ ভোট তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে, বিজেপি পেয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ আর মোর্চা পেয়েছে বাকি ৫ শতাংশ। ৭৫-৮২ শতাংশ ভোটার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। তৃণমূলের কংগ্রেস পেয়েছে ৪৮ শতাংশ ভোট, বিজেপি ৩৮ শতাংশ। এখানে উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূল পেয়েছিল ৪৪.৫ শতাংশ, বিজেপি ১০ শতাংশ সেদিক থেকে একদিকে যেমন তৃণমূলে বিজয় হয়েছে অন্যদিকে বিজেপি শক্তিশালী বিরোধী দলের অবস্থানে আছে। নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জির স্লোগান ছিল—জয় বাংলা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বক্তব্য শেষে জয় হিন্দ ও জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছেন আর বঙ্গবন্ধু ৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দিল্লিতে বক্তৃতা শেষে জয় বাংলা ও জয় হিন্দ বলেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিগত ২৬শে মার্চ ঢাকায় মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বক্তৃতার শেষে জয় বাংলা ও জয় হিন্দ উচ্চারণ করেছেন। আমরা গর্ব অনুভব করি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান এখন উপমহাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অসমের নির্বাচনে বিজেপি-অসম গণপরিষদ জোট এবারও বিজয় লাভ করেছে। তামিলনাড়ুতে দুই বার ক্ষমতা থাকা এআইএডিএমকে-বিজেপি জোট পরাজিত হয়েছে। এবং ডিএমকে-কংগ্রেস জোট জয় লাভ করেছে। কেরালায় ক্ষমতা দুটি জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ, বাম গণতান্ত্রিক জোট আবারও জয় লাভ করেছে—কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক জোট জয় লাভ করতে পারেনি। পন্ডিচেরিতে বিজেপি জোট জয়ী হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই করোনা অতিমারির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন হয়েছে। আর বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতেও প্রথমে বিহারে, তারপর এ বছরের শুরুতে বিভিন্ন দফায় পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার মানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ভারত এই পরিস্থিতিতেও কোনো ধরনের ছাড় দেয়নি। আমরা পশ্চিম বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়ে মমতা ব্যানার্জিকে অভিনন্দন জানাই। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগ সব দলের সমর্থন যেমনভাবে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত, যোগাযোগ-সংযোগ সস্প্রসারিত হয়েছে, তেমনিভাবে তিস্তাসহ অন্যান্য সমস্যার সমাধান হবে। পাশাপাশি গৌরবজনকভাবে বিজেপির শক্তিশালী বিরোধী দলের অবস্থানে থাকার জন্যও অভিনন্দন জানাচ্ছি। ভারতের সরকার, রাজনৈতিক দলসমূহকেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক চেতনাকে ধারণ করার জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি। ইতিমধ্যে, মমতা ব্যানার্জি শপথ নিয়েছেন। সেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সার্বজনীন এবং ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়—এটাই স্পষ্ট হয়েছে।

বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হয় গণতন্ত্র কার্যকর হচ্ছে না অথবা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারছে না। সেখানে ভারতে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এটা গণতন্ত্রের বিজয় এবং অনুকরণীয় ও শিক্ষণীয় বিষয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মমতা ব্যানার্জিকে অভিনন্দনবার্তায় বলেছেন, ‘…ভারত বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। বিশেষভাবে, পশ্চিমবঙ্গের জনগণের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়, হূদয়ের এবং আবহমান কালের…।’ আমরা আশা করব, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক গণতন্ত্র, প্রগতি ও শান্তির পক্ষে সহায়ক ভূমিকা হিসেবে কাজ করবে।

 লেখক :শিক্ষাবিদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও মুক্তিযোদ্ধা