খালেদ মোশাররফ হত্যার নেপথ্যে কারা আর কেনইবা জেল হত্যাকান্ড

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

Social Share

আজ নভেম্বরের ২ তারিখ। আর  এক দিন পর ৩ এবং তার তিন দিন পর ৭ তারিখ। নভেম্বরের এই দুটি দিন, ৩ ও ৭ বাংলাদেশের জন্য অভিশপ্ত দুটি তারিখ। পঁচাত্তরের এই দিনে নেমে আসা অভিশাপ আজও সমগ্র বাংলাদেশকে ভূতের মতো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কারণ এই দিন দুটিতে সে সময়ে যা ঘটেছে তার সব কিছু এখনো উদঘাটিত হয়নি, সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি, অভিশাপ রচনাকারীদের বিচার হয়নি। উপরন্তু তার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডারদের হত্যার এই ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের একটি পক্ষ এখনো বিপ্লব দিবস হিসেবে পালন করে। কলঙ্ককে লালন-পালন করাতেই যেন তাদের তৃপ্তি। এটি এখন প্রতিষ্ঠিত, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় ও সূত্র ধরে ৩ ও ৭ নভেম্বরের ঘটনাগুলো ঘটে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার হওয়ায় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক কিছুই আমরা জানতে পেরেছি, যদিও এখনো আরও অনেক কিছু জানতে বাকি। কিন্তু ৩ নভেম্বর জেলখানায় চার জাতীয় নেতার হত্যাকান্ড এবং ৭ নভেম্বর সকালে জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা ও কর্নেল হায়দারকে কারা হত্যা করল, কেন করল এবং এর নেপথ্যে কারা ছিল তার সবকিছু এখনো ধোঁয়াশার মধ্যে রয়ে গেছে। এই ধোঁয়াশা দূর হলেই কথিত বিপ্লবের প্রবক্তাদের আসল রূপ উন্মোচিত হয়ে যাবে। অন্যদিকে খালেদ মোশাররফ ও সাফায়েত জামিল অনুগত অফিসার এবং সেনাদল নিয়ে ৩ নভেম্বর একটা যে পাল্টা উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং কেনই বা সেটি মাত্র ৪ দিনের মাথায় চরম ব্যর্থতায় পরিণত হলো তার সবকিছুই এখনো পরিপূর্ণ ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়ে গেছে। এটি নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি এবং অপপ্রচারও আছে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাঠামো ও বিন্যাস অনুসারে সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহ, উপ-সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং সিজিএস (চিফ অব জেনারেল স্টাফ), ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ-এই তিনজন বাহিনীর কমান্ড, কন্ট্রোল ও পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। এর মধ্যে জেনারেল সফিউল্লাহ ব্যর্থ হয়েছেন সেটি তিনি নিজেই স্বীকার করেন। দ্বিতীয়, উপ-সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সে কথা খুনিদের অন্যতম লে. কর্নেল আবদুর রশিদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, যার সমর্থনে আরও কিছু আভাস পাওয়া যায় প্রয়াত মেজর জেনারেল মঈনুল হুসেন চৌধুরীর লেখা, ‘দ্য সাইলেন্ট উইটনেস বাই এ জেনারেল’ গ্রন্থে।

তৃতীয়, সিজিএস খালেদ মোশাররফ বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের পক্ষে ছিলেন বা সমর্থন করেছেন বা পূর্ব থেকে জানতেন এমন কোনো তথ্য আজ পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায়নি। কিন্তু দেশের এত বড় ঘটনায় যেখানে সেনাবাহিনীর সদস্যরা জড়িত, সেখানে সিজিএস হিসেবে তার কোনো কার্যকর ভূমিকা একদম কিছু দেখা যায়নি। এ এক বিরাট রহস্য। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পরম্পরা এবং সেদিন ১৫ আগস্ট সারা দিনের বিরাজমান পরিস্থিতির যে বর্ণনা এখন পাওয়া যায় তাতে যৌক্তিকভাবেই বলা যায়, জেনারেল জিয়াকে বাদ দিয়ে প্রত্যুষে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে আক্রমণের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ আর সিজিএস খালেদ মোশাররফ ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডারের অফিসে একত্রিত হয়ে কমান্ডার সাফায়েত জামিলকে নিয়ে যদি জরুরি পাল্টা সামরিক ব্যবস্থা নিতেন তাহলে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচানো না গেলেও বিদ্রোহী হত্যাকারীদের দমন ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতো না। কারণ সেনাপ্রধান ও সিজিএসের হাতে ছিল আইনি কর্তৃত্ব, আর তারা ছিল আইন ভঙ্গকারী বিদ্রোহী। একই সঙ্গে দ্রুত উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলীর দ্বারা সরকার সচল ও অব্যাহত আছে এই ঘোষণা রেডিওতে দিতে পারলেই সব কিছু অন্যরকম হয়ে যেত। মোশতাক গংয়ের সবাই পালানোর পথ পেত না। কেউ কেউ এতে আরও রক্তপাতের অজুহাত তোলেন। রাষ্ট্রপতি, জাতির পিতাকে রক্ষা, রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য, রক্তপাতের অজুহাতে পিছিয়ে যাওয়ার উদাহরণ লজ্জাজনক, বিশ্বের কোথাও নেই। এ সম্পর্কে জেনারেল মঈনুল হুসেন চৌধুরী তার উল্লিখিত বইয়ের ৭৯ পৃষ্ঠায় যে মতামত ও বক্তব্য দিয়েছেন তার বাংলা দাঁড়ায় এরকম- ‘খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ ঘটে যাওয়া জরুরি অবস্থায় যেভাবে কাজ করে থাকে সেভাবে সেনাবাহিনীর সব শক্তি নিয়োগ করে বিদ্রোহ দমন করা ছিল সেনা আইনে অপরিহার্য কর্তব্য। না করাটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেনা আইন অনুসারে কোনো অজুহাতেই নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই। তারপর ১৫ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর, ৮১ দিন। জেনারেল সফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান ও সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে দিয়ে নতুন সেনাপ্রধান করা হয় জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। বাকিরা সবাই নিজ নিজ পদে বহাল থাকেন। এ সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন সেনাবাহিনীসহ সর্বত্রই বিভাজন আর অবিশ্বাস চরম আকার ধারণ করে। সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড বলতে কিছুই থাকে না। বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে বসে আত্মস্বীকৃত খুনি মেজররা সেনাবাহিনীর সব কর্মকা-ের নির্দেশনা দেন এবং নতুন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান সেভাবে সবকিছু করেন। ফলে সিজিএস খালেদ মোশাররফ ও ব্রিগেড কমান্ডার সাফায়েত জামিল খুবই বিব্রত এবং অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়েন। ২ নভেম্বর দিবাগত রাতে অর্থাৎ ৩ তারিখে মুক্তিযোদ্ধা অফিসার এবং সাফায়েত জামিলের অধনীস্থ সব বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা সামরিক অ্যাকশন বা অভ্যুত্থান শুরু হয়। সেনাপ্রধান জিয়াকে তার বাসায়ই গৃহবন্দী করা হয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে পেরে উঠবে না বুঝতে পেরে বঙ্গভবনের মেজররা একটা আপসরফা করতে চায়। ৩ নভেম্বর সারা দিন দুই পক্ষের দরকষাকষি আর হুমকি-পাল্টা হুমকির মধ্যে কেটে যায়। প্রায় ১৫-১৬ ঘণ্টা সময় পেয়ে ফারুক-রশিদসহ সবাই ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিশেষ বিমানের ব্যবস্থা করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। খালেদ মোশাররফ দলবল নিয়ে বঙ্গভবনে হাজির হয়। জেনারেল ওসমানী মাঝখানে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ক্ষোভ থেকে মোশতাককে রক্ষা করেন। আপসের প্রস্তাব ও খালেদ মোশাররফকে সেনাপ্রধান করার আলোচনা নিয়ে জেনারেল ওসমানী কৌশলে কালক্ষেপণের মাধ্যমে প্রচুর সময় নষ্ট করে দেন। কিন্তু অবশেষে জিয়ার পদত্যাগ এবং খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান হন। ইতিমধ্যে আরও অনেক বিপজ্জনক ঘটনা ঘটে যায়। ৪ নভেম্বর দুপুরের পরে জানাজানি হয় ৩ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মোশতাক ও কর্নেল ফারুকের হুকুমে জেলখানায় চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় একটা ঘোলাটে ও পাল্টা অভ্যুত্থান পরিস্থিতির একদম প্রারম্ভে। তাৎক্ষণিকভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে সুবেদার মোসলেহউদ্দিনের নেতৃত্বে এই হত্যাকান্ড  চালিত হয় তাতে স্পষ্টই বোঝা যায়, এটা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত এবং ঘাতক দলও ছিল সুনির্দিষ্ট। খালেদ মোশাররফ ও তার সহযোগীরা এই খবর পান ৩০ ঘণ্টা পর। জেনারেল মঈনুল হুসেন চৌধুরী তার উল্লিখিত বইয়ের ৯০ পৃষ্ঠায় মন্তব্য করেছেন, ‘৩ নভেম্বরের নতুন অভ্যুত্থানকারীরা ১৫ আগস্টের খুনিদের সঙ্গে অর্থহীন আলোচনা করে অত্যন্ত ত্রুশিয়াল সময় যেভাবে নষ্ট করেছেন তাতে মনে হয় অভ্যুত্থানকে সফল করার জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট কর্ম-পরিকল্পনা ছিল না।’ উল্টো ১৫ আগস্টের হত্যাকারীরা ঠিক বুঝেছিল চার জাতীয় নেতাকে শেষ করে দিলে নতুন অভ্যুত্থানকারীরা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতে পারে এমন কাউকে পাবে না এবং বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বাংলাদেশ আর কখনো মুক্তিযুদ্ধের মতাদর্শের রাষ্ট্র হতে পারবে না। সব কিছুই ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ব্লু-প্রিন্ট। প্রকৃত বাংলাদেশের কোনো নাগরিক এটা করতে পারে না। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর সেনানিবাস পরিণত হয় গুজবের নগরীতে। মিথ্যা প্রপাগান্ডার লিফলেটে সয়লাব হয়ে যায়। তাতে বলা হয়, খালেদ মোশাররফ ভারতের যোগসাজশে এই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, ভারতীয় সেনাবাহিনী চলে আসবে এবং আওয়ামী লীগের পুতুল সরকারকে আবার ক্ষমতায় বসাবে। মেজর জেনারেল মঈনুল হুসেন চৌধুরী তার বইয়ের ৯২-৯৩ পৃষ্ঠায় এ বিষয়ে নিজের মন্তব্য ও মতামত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। তাতে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানে জড়িত খালেদ মোশাররফ, সাফায়েত জামিলসহ সব অফিসারকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে  অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে চিনেন ও জানেন। এদের কেউ ভারতমুখী ছিলেন না, ভারতের কোনো সম্পর্ক এবং অভ্যুত্থানের পিছনে ভারতের কোনো সংযোগ ছিল না। আওয়ামী লীগের সঙ্গেও এদের কোনো সংযোগ ছিল না। খালেদ মোশাররফের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। জেনারেল মঈন আরও বলেছেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য ওইসব অপপ্রচার, মিথ্যাচার আর গুজব সেনাবাহিনীর র‌্যাংক ও ফাইলের মধ্যে বিশাল প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।’ অন্যদিকে আরও দুঃখজনক হলো, খালেদ মোশাররফ ও তার সহযোগীরা এসব মিথ্যাচার ও গুজবের পাল্টা হিসেবে কোনো ব্যবস্থাই নেননি। কিছুই করেননি। ফলে যা হওয়ার সেটাই হলো। এলো ৭ নভেম্বর। ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২টার পরে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সৈনিকরা সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। প্রথমেই তারা জিয়াকে মুক্ত করে তাকে দিয়েই সবকিছু করিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার মূল কারিগর কর্নেল তাহের জিয়ার কাঁধে বন্দুক রেখে বিপ্লবী এজেন্ডা বাস্তবায়িত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাহেরের হিসাবে ভুল ছিল। স্বল্প সময়ের মধ্যেই সবকিছু জেনারেল জিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। অন্যদিকে ৩ নভেম্বরের অধিনায়করা বঙ্গভবন থেকে আর সেনানিবাসে ফিরে আসেন না। খালেদ মোশাররফ তার দুই সহযোগী কর্নেল হুদা ও কর্নেল হায়দারকে নিয়ে শেরেবাংলানগরে ১০ ইস্ট বেঙ্গলে অবস্থান নেন। একাত্তরে যুদ্ধের মাঠে এই ১০ বেঙ্গল খালেদ মোশাররফ গঠন করেন এবং পুরো যুদ্ধের সময় তার সঙ্গেই ছিল। এই ইউনিটের সবাই ছিল খালেদ মোশাররফের অত্যন্ত অনুগত ও বিশ্বস্ত। অথচ এই ইউনিটের অফিসের ভিতরেই ৭ নভেম্বর সকালে নাশতারত অবস্থায় নিহত হলেন খালেদ মোশাররফসহ আরও দুজন সেক্টর ও সাব সেক্টর কমান্ডার। সামনে থেকে যারা গুলি চালিয়েছে, এদের এখন সবাই চিনেন। কিন্তু দুটি প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। জেনারেল জিয়া মুক্ত হলেন ভোর রাতে, তারপর সাত-আট ঘণ্টা কেটে গেল খালেদ মোশাররফের কোনো খবর তিনি নিলেন না, তা কি ভাবা যায়। চার দিন বন্দী করে রাখলেও জেনারেল জিয়ার গায়ে একটা টোকাও লাগতে দেননি, আর মুক্ত হওয়ার সাত-আট ঘণ্টা পর খালেদ মোশাররফ নির্মমভাবে নিহত হলেন, আর জিয়া কিছুই জানেন না। আসলে ১৫ আগস্টের সূত্র ধরে সবকিছু ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ব্লু-প্রিন্ট। ৩ ও ৬ নভেম্বর সেনানিবাসে ফাঁকা মাঠ পেয়ে কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার আড়ালেও সেটিকে অবলম্বন করে পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত সৈনিকদের কাজে লাগাতে আইএসআই প্রচন্ড তৎপর হয়ে ওঠে। তাতেই তারা সফল হয়। অন্যদিকে ১৫ আগস্টের ঘটনায় ভারতীয়রা একদিকে যেমন হতভম্ব, তেমনি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভীষণ অস্থিরতায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষমতা প্রায় যায় যায় অবস্থা। আমেরিকানরা পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে ওই সময়ে সেটাই ছিল স্বাভাবিক। ফলে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স বলতে কিছুই ছিল না। সুতরাং ফাঁকা মাঠ পেয়ে নীরব কৌশলে আইএসআই একাত্তরের চরম প্রতিশোধের জিঘাংসায় সব সেক্টর কমান্ডারকে শেষ করে দেওয়ার জাল ফেলে। খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহের এর কিছু অনুমান করতে পেরেছিলেন কিনা জানি না। আর জিয়াউর রহমান ক্ষমতার প্রলোভনে আইএসআইয়ের হাত ধরে সবকিছু করলেও শেষ পর্যন্ত নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি।

জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হায়দার, কর্নেল তাহের, জেনারেল মঞ্জুর এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেল জিয়া, পাঁচজন বীরউত্তম খেতাবধারী চৌকস ও সাহসী সেক্টর ও ফোর্স কমান্ডার একই ঘটনার সূত্রে ও পরম্পরায় নির্মমভাবে নিহত হলেন-যার শুরু হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। পরবর্তীতে বিএনপি দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলেও সিটিং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার বিচারের কোনো উদ্যোগই নিল না। তাতেই বোঝা যায়, ওই একই শক্তি, যারা খালেদ মোশাররফকে হত্যা করেছে তারাই জিয়ার নেপথ্য হত্যাকারী। সুতার টান এক জায়গা থেকেই দেওয়া হয়েছে, শুধু নাটকের দৃশ্য ও কাহিনি ভিন্ন।  ক্ষমতার রাজনীতির চরম নিষ্ঠুরতা এমনই যে, স্ত্রী, ছেলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে বসেও স্বামী ও পিতা হত্যার বিচার চায় না।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

[email protected]