খালেদার মুক্তি ইস্যুতে বিএনপিতে দুই ধারা

অনেকটা হঠাৎ করেই বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসা নিয়ে শুরু হয়েছে নানামুখী তৎপরতা। তৎপর হয়ে উঠেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও চিকিৎসকরা। তবে এই ইস্যুতে বিএনপির ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসছে পরস্পরবিরোধী মত। একদিকে বিএনপির সংসদ সদস্যরা ছুটছেন সরকারের কাছে, অন্যদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কোনো কোনো নেতা চলছেন অন্য পথে। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই আবদার করছেন, আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ যেন জামিন আবেদনের বিরোধিতা না করে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, বিএনপির সংসদ সদস্যদের তৎপরতার নির্দেশনা ছিল লন্ডনে বসবাসরত দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। তাঁর নির্দেশনায় দলীয় এমপিরা খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির নেতারা এক জায়গায় দাবি করছেন আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি, আরেক জায়গায় সরকার পক্ষকে বিরোধিতা না জানানোর অনুরোধ করছেন। এমন অনুরোধের অর্থ হচ্ছে প্রকারান্তরে সরকারের কাছে অনুকম্পা চাওয়া। বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের কেউ চান দেশেই খালেদা জিয়ার চিকিৎসা আবার কেউ চান তাঁকে বিদেশে নিতে।

অবশ্য এর আগে খালেদা জিয়ার জামিন ইস্যুতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্যের সঙ্গে সরকারের এক উপদেষ্টার বৈঠকও ভেস্তে যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের কাছে বিভিন্ন সময়ে বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি তুলে ধরেন এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেন। কূটনীতিকরা খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন হলেও তাঁর মুক্তির বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।

বিএনপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মুক্তিযোদ্ধা ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আদালতে প্রতিপক্ষের আইনজীবী তো জামিনের আপত্তি করবেনই। সেই আপত্তি আইনি প্রক্রিয়ায় নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে হবে। বিচারককে সঠিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে। সেটা না করে প্রতিপক্ষের বা সরকারপক্ষ থেকে জামিনের বিরোধিতা না করার আহ্বান এক ধরনের অনুকম্পা কামনা বা দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি বেগম জিয়াকে সারা দেশে আন্দোলনের মাধ্যমেই মুক্ত করে আনতে হবে। তাঁকে নিঃসঙ্গ অবস্থা থেকে মুক্ত করে স্বজন বা স্বাভাবিক পরিবেশে আনলেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।’

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা যতবার দেখা করতে গিয়েছি, ম্যাডাম জামিনের বিষয়টি ছাড়া কোনো কথা বলেননি। জামিনের পর তিনি চিকিৎসা করাবেন। তাঁর মুক্তির জন্য আমরা বিভাগীয় সমাবেশ, মানববন্ধন করছি। আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আইনি প্রক্রিয়া চলবে। পাশাপাশি আমরা রাজপথে কর্মসূচি দিচ্ছি। ভবিষ্যতেও আরো বড় ধরনের কর্মসূচি দেব।’

তবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে মামলা তা রাজনৈতিক। সুতরাং তাঁর মুক্তির বিষয়েও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া দেশের কোনো আদালতে জামিন পাওয়া সম্ভব নয়।’ আইনজীবী সমিতির সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘খালেদা জিয়া প্যারোলে (শর্তসাপেক্ষে সাময়িক মুক্তি) যাবেন কি না, সরকার প্যারোল দেবে কি না—এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। আমরা আইনজীবী হিসেবে বলতে পারি, খালেদা জিয়া খুবই অসুস্থ। তাঁর চিকিৎসার জন্য মুক্তি প্রয়োজন। আমরা চাই আইনগতভাবে খালেদা জিয়ার মুক্তি হোক। কিন্তু সরকারের বাধার কারণে আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার জামিন কঠিন হবে। এ কারণেই বলছি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে খালেদা জিয়াকে মুক্তির সিদ্ধান্ত হলে তখন প্যারোল বা জামিনে মুক্তিতে কোনো বাধা থাকবে না।

অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেছেন, ‘প্যারোলে নয়, আদালতের জামিন আদেশে খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। আমরা খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন করব। আশা করি, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিরোধিতা করা হবে না।’ গতকাল দুপুর ১২টায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন জয়নুল।

প্রায় একই সময় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের এক সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘কারও অনুকম্পায় খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন না। তিনি অবশ্যই তাঁর যে হক, ন্যায্য অধিকার, জামিন পাওয়ার অধিকার, সেই অধিকারেই মুক্ত হবেন। বেআইনি, মিথ্যা মামলা দিয়ে আর যাই হোক, খালেদা জিয়াকে আটকে রাখা যাবে না। জনগণ অবশ্যই আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁকে বের করে নিয়ে আসবে।’

এদিকে বিএনপির সাত সংসদ সদস্যের গত দুই দিনের সাক্ষাতের পেছনে সরকারের হাত আছে কি না বা তাঁরা সমঝোতার কোনো বার্তা নিয়ে গিয়েছিলেন কি না তা নিয়েও রয়েছে জল্পনাকল্পনা। তবে সাত সংসদ সদস্যের পাঁচজনই জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো সমঝোতার বার্তা নিয়ে যাননি। সংসদ সদস্যরা দুটি বিষয় পরিষ্কার করেছেন। তাঁদের মতে, খালেদা জিয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জামিনের বাইরে অন্য কোনো পন্থায় মুক্তি পেতে চান না এবং তাঁরা যে দৌড়ঝাঁপ করছেন সেটি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই করছেন। দ্বিতীয়ত, খালেদা জিয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জামিনে সবচেয়ে বড় বাধা সরকার। এই পদক্ষেপে কিছুটা হলেও সরকারকেও চাপে রাখা যাবে। এই দুই প্রক্রিয়ায় কাজ না হলে বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে রাজপথের আন্দোলনকেই তাঁরা বেছে নেবেন।

বগুড়া-৬ আসনের এমপি জি এম সিরাজ বলেন, ‘পার্টির বর্তমান প্রধান তারেক রহমানের নির্দেশেই আমরা সেখানে গিয়েছি। রাজনৈতিক বিবেচনায় হলেও সরকারের কাছে আবেদন করেছি যেন নেত্রীর জামিনে বিরোধিতা করা না হয়। কারণ জামিনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা সরকার।’

এদিকে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম বলেন, ‘আমাদের নেত্রীর শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছে। এখন তাঁর মুক্তির কোনো বিকল্প নেই। আমরা চাই তাঁকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে চিকিৎসা এবং তাঁর স্বজনদের কাছে যেতে দেওয়া হোক। তবেই তিনি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠবেন। নেত্রী প্যারোলে রাজি নন, তবু কিভাবে তাঁকে বাইরে পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায় সেটা সরকারকেই দেখতে হবে।’

এদিকে খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার দাবিতে গতকাল ড্যাব স্মারকলিপি দিয়েছে বিএসএমএমইউয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়ার কাছে। ড্যাবের বিএসএমএমইউ শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. শেখ ফরহাদের সই করা স্মারকলিপিতে বলা হয়, খালেদা জিয়া প্রায় ২০ মাস ধরে কারান্তরীণ আছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, রিউমাটয়েড, আর্থ্রাইটিস, দন্তরোগসহ অন্যান্য রোগে ভুগছেন। গত ১ এপ্রিল থেকে তিনি বিএসএমএমইউয়ের ৬২১ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন আছেন। এরই মধ্যে তিনি দাঁতের ও মুখের ঘায়ের চিকিৎসার জন্য দন্ত বিভাগে গিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি অন্যের সহযোগিতা ছাড়া ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারছেন না।’