কোরবানীযোগ্য সুস্থ ও পছন্দের পশু ক্রয় করার উপায়

Social Share
লেখক: ডঃ মোঃ আওলাদ হোসেন।
ভেটেরিনারীয়ান, পরিবেশবিদ ও রাজনৈতিক কর্মী।

কুরবানী (আরবি: قربانى‎‎) , কুরবান অথবা আদ্বহা বা আযহা ( أضحية) কে ইসলামী আইন হিসাবে উল্লেখ করা হয়। কুরবানী শব্দটি হিব্রু ‘কোরবান’ আর সিরিয়াক ভাষার ‘কুরবানা’ শব্দ দুটির সংগে সম্পর্কিত যার আরবী অর্থ “কারো নিকটবর্তী হওয়া”। ইসলামি বিধান মতে, ‘কুরবানী হচ্ছে জিলহজ্জ্ব মাসের নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় নির্দিষ্ট পশু জবেহ করা। ‘

ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত আদম(আঃ) এর যমানা হতেই কোরবানীর সূচনা হয়। তবে আমরা যে তরিকায় কোরবানী করি তা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর আমল হইতে শুরু হয়। মহান আল্লাহ     তাআলা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে স্বপ্নযোগে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি কুরবানি করার নির্দেশ দেন। পবিত্র কোরআনে বর্নিত আছে, “হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর সন্তান হযরত ইসমাইল (আঃ) কে বললেন, হে বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি, তোমাকে যবাই করবো, এখন তোমার মত কি? সে (পুত্র) বললো, হে পিতা! নির্দেশ পালন করুন। আল্লাহ চাহে তো আমাকে ধৈর্য্যশীল পাবেন। অতঃপর উভয়েই অনুগত হলো, সে তাকে (পুত্র) শোয়াল। আল্লাহ পাক বললেন, হে ইব্রাহিম ! তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করলে। এভাবেই আমি পূণ্যবানদের পুরস্কৃত করি”। (সূরা ছোয়া-ফফাত, আয়াত: ১০২-১০৬।

মহান আল্লাহর সন্তুষ্ট হয়ে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) অতিপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল এর পরিবর্তে বেহেশত -এর একটি দুম্বা কোরবানী হলো। সেই থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর ত্যাগের কথা স্মরণে, আল্লাহ ভীতির অকাট্য পরিচয় দিয়ে তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী হালাল ও সুস্থ পশু কোরবানী করেন।

বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর এই দিনটি ‘ঈদ-উল- আযহা’নামে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পশু উৎসর্গের অনুষ্ঠান উদযাপন করা হয়।

এই আলোচনা হতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, কোরবানী্র পশুটি ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, হরিণ, গরু, মহিষ, উট যাই হোক না কেন, সেটি হতে হবে কোরবানীযোগ্য অর্থাৎ আদরের বা পছন্দের। কোরবানী পশুটি হতে পারে গৃহপালিত বা বাজার থেকে ক্রয় করা।

পবিত্র কোরানে বর্ণিত আছে, কোরবানির মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় শুধু তোমাদের নিষ্ঠাপূর্ণ আল্লাহ-সচেতনতা। এই লক্ষ্ই কোরবানির পশুগুলোকে তোমাদের অধীন করে দেয়া হয়েছে। (সূরা হজ, আয়াত ৩৭-৩৮)।

শাইখুল হিন্দ আল্লামা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী (রহ.) কোরবানীর পশুটি এক বছর আগেই ক্রয় করে লালন-পালন করতেন। প্রিয় হয়ে উঠার পর নিজ হাতে তিনি কোরবানী করতেন। সুতরাং যেই পশুই কোরবানী করি না কেন, কোরবানীর জন্য ব্যবহৃত পশুটির ওপর আমাদের মায়া থাকতে হবে এবং  কোরবানির পশু হতে হবে দোষত্রুটিমুক্ত। কোন পশুর মধ্যে নিম্মলিখিত ত্রুটি থাকলে সেটি কোরবানি দেওয়া যাবে না, যেমন- ১. দৃষ্টিশক্তি না থাকা, ২. শ্রবণশক্তি না থাকা, ৩. অত্যন্ত দুর্বল ও জীর্ণ-শীর্ণ হওয়া, ৪. এই পরিমাণ লেংড়া যে, জবাই করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে অক্ষম, ৫. লেজের বেশির ভাগ অংশ কাটা, ৬. জন্মগতভাবে কান না থাকা, ৭. কানের বেশির ভাগ কাটা, ৮. গোড়াসহ শিং উপড়ে যাওয়া, ৯. পাগল হওয়ার কারণে ঘাস-পানি ঠিকমতো না খাওয়া, ১০. বেশির ভাগ দাঁত না থাকা, ১১. রোগের কারণে স্তনের দুধ শুকিয়ে যাওয়া, ১২. ছাগলের দুটি দুধের যেকোনো একটি কাটা, ১৩. গরু বা মহিষের চারটি দুধের যেকোনো দুটি কাটা।

হাদিসে বর্নিত আছে, চার ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি জায়েজ হবে না। ১। অন্ধ—যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, ২। রোগাক্রান্ত—যার রোগ স্পষ্ট, ৩। পঙ্গু—যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট ও ৪। আহত—যার কোনো অঙ্গ ভেঙে গেছে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১৪৪)

যেসব ত্রুটি থাকলেও কোরবানি দেওয়া যাবে: ১. পশু পাগল, তবে ঘাস-পানি ঠিকমতো খায়; ২. লেজ বা কানের কিছু অংশ কাটা, তবে বেশির ভাগ অংশ আছে; ৩. জন্মগতভাবে শিং নেই, ৪. শিং আছে, তবে ভাঙা; ৫. কান আছে, তবে ছোট; ৬. পশুর একটি পা ভাঙা, তবে তিন পা দিয়ে সে চলতে পারে; ৭. পশুর গায়ে চর্মরোগ, ৮. কিছু দাঁত নেই, তবে বেশির ভাগ আছে। স্বভাবগত এক অণ্ডকোষবিশিষ্ট পশু; ৯. পশু বয়োবৃদ্ধ হওয়ার কারণে বাচ্চা জন্মদানে অক্ষম,  ১০. পুরুষাঙ্গ কেটে যাওয়ার কারণে সঙ্গমে অক্ষম।

তবে উত্তম হচ্ছে ত্রুটিমুক্ত পশু দিয়ে কোরবানি দেওয়া, ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারা কোরবানি দেওয়া অনুচিত।

কোরবানীযোগ্য কোন পশুর বয়স কত হতে হয়? ইসলামি বিধান অনুযায়ী সুস্থ এবং নির্দিষ্ট বয়সের পশু  কোরবানি দিতে হয়। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছর পূর্ণ হতে হবে, গরু-মহিষ দুই বছর পূর্ণ হতে হবে, উট পাঁচ বছর পূর্ণ হতে হবে (হিদায়া, খণ্ড-৪, পৃ. ১০৩)।

ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদির ক্ষেত্রে একটি পশু শুধু এক ব্যক্তিই কোরবানি দিতে পারবে। গরু, মহিষ, উট সর্বোচ্চ সাত ব্যক্তি মিলে কোরবানি দিতে পারবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একটি উট ও গরু-মহিষে সাত ব্যক্তি কোরবানির জন্য শরিক হতে পারে (মুসলিম, হাদিস : ১৩১৮)।

এখন প্রশ্ন, পশুর হাট থেকে সুস্থ, নির্দিষ্ট বয়সের কোরবানীযোগ্য ও পছন্দনীয় পশু কিভাবে ক্রয় করবেন? পছন্দের পশু ক্রয় করতে সর্বপ্রথম লক্ষণীয় পশুটি সুস্থ কি না? কয়েকটি লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলেই একটি   পশুর  সুস্থতা নির্ধারণ করা যায়। গরু বা মহিষের  শরীরের সাধারণ তাপমাত্রা ১০০-১০৩  ডিগ্রি ফারেনহাইট। মহিষ বা গরুর গায়ে জ্বর আছে কিনা নির্ধারণ করতে প্রথমেই খেয়াল করতে হবে, গরুর নাকের ছিদ্র দুইটির মধ্যখানে (মাজল) ভিজা কিনা এবং শরীরের লোম দাড়িয়ে আছে কি না? গায়ের লোম দাড়িয়ে থাকলে বা নাকের মধ্যখানে শুকনা হইলে বুঝতে হবে মহিষ বা গরুর গায়ে জ্বর আছে। এছাড়া গরু বা মহিষের কানের পাশে নিজ হাতের তালুর পিষ্ঠ দিয়ে স্পর্শ  করলে মহিষ বা গরুর শরীরের তাপ অনুভব করা যায়। এরপর লক্ষণীয় পশুটি স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করছে কি? নাক বা মুখ হতে কোন শ্লেষ্মা বা লালা ঝরছে কি?

স্বাভাবিক নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের গতি প্রতি মিনিটে ১০-৩০ বার, পেটের উঠানামা লক্ষ করলেই এটা নির্ধারণ করা যাবে। স্বাভাবিক নাড়ির হার (হার্টবিট) প্রতিমিনিটে ৪০-৮০ বার। চোয়ালের নীচে বা লেজের নীচে স্পর্শ করে এই সংখ্যা নির্ধারণ করা যেতে পারে। সুতরাং নিশ্বাস-প্রশ্বাসের গতি স্বাভাবিক থাকা, গরুর শরীরের তাপ স্বাভাবিক পেলে এবং খাদ্য স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করলে, নাক, মুখ হতে কোন শ্লেষ্মা বা লালা না ঝরলে বা চোখ দিয়ে পানি না ঝরলে,  শরীরের লোম দাড়িয়ে না থাকলে, হাটা চলাফেরা স্বাভাবিক থাকলে,মল মূত্রের পরিমান, আকার ও রং স্বাভাবিক থাকলে প্রাণীটি সুস্থ আছে বলে বুঝতে হবে।

কাজেই, কোরবানীর জন্য সুস্থ্য পশু কিনতে অযথা তাড়াহুড়া না করে উল্লিখিত লক্ষণ দেখে একটি সুস্থ্য পশু কিনে খাস নিয়তে কোরবানী করলে আল্লাহর কাছে সেটি কবুল হতে পারে।