কোভিড ১৯- জনমনে স্বাস্থ্যগত দুঃশ্চিন্তার সাথে রাজনৈতিক ক্ষোভ

Social Share

এম বি আখতার
উন্নয়নকর্মী ও বিশ্লেষক

বিগত তিন মাস থেকে দেশের জনগণ বৈশ্বিক মহামারির ছোবল থেকে বাঁচার জন্য উদ্বিগ্ন, হাজার হাজার মৃত্যু মিছিল দেখে আতঙ্কিত, স্বাস্থ্যসেবার বেহাল অবস্থা দেখে হতাশ। এই সময় প্রয়োজন ছিলো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামীলীগকে জনগনের সাথে থাকা, সাহস ও সেবা দেয়া। হয়তো বেশীর ভাগ দিচ্ছেন কিন্তু কয়েকজন আবার রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ত্রান চুরি করছেন, আমলাতান্ত্রিক সহায়তায় সরকারী কোষাগার এবং জনগনের পকেট লুটের মহাউৎসবে জড়িয়ে পড়েছেন যা সকল ভাল কাজকে ম্লান করে দিচ্ছে। সেই কারনে আজকে মুলধারা কিংবা সামাজিক গণমাধ্যমে মিঃ শাহেদের কোভিড ১৯ কে নিয়ে লুটপাটের চিত্র তো অবশ্যই জনগণকে বিচলিত করছে, আওয়ামীলীগের মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের কাছে তা আশা করে নাই। মিঃ শাহেদ গণমাধ্যমে থাকবেন কিছুদিন তারপর কেসিনো কান্ড কিংবা পাপিয়া কান্ডের মতো আবারও অতীত হয়ে যাবেন। এটাই স্বাভাবিক কারণ মানুষের স্মরণ শক্তি একটি বিষয়কে নিয়ে মাত্র ৩৩ সেকেন্ড বেশী থাকে না। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই সকল অনুপ্রবেশকারী, সুবিধাবাদীদের কর্মকান্ডর জন্য শুধুমাত্র কি তারাই দায়ী, নাকি যারা অনুপ্রবেশ করিয়েছে, পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, রাজনৈকিত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে তারাও দায়ী? আজকে সম্রাট নেই, পাপিয়া নেই কিংবা শাহেদ থাকবে না কিন্তু এই লুটেরার দল কি শেষ হয়ে যাবে? নতুন শাহেদ তৈরী হবে এটি নিশ্চিত। আজকে শাহেদকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কারণ আইনগত ব্যবস্থা তার বিরুদ্ধে গ্রহন করা হয়েছে অতএব আমরা জানি তিনি আর রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী নয়। অতএব তার বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে। অনুরোধ করছি, দেখার চেষ্টা করেন আপনার এলাকার এমপি, চেয়ারম্যান মেম্বার কিংবা দলের বিভিন্ন পর্যায়ের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের সাথে এরকম অনুপ্রবেশকারী, লুটেরা কতজন রয়েছে? প্রত্যন্ত চরাঞ্চল কিংবা গ্রামে গিয়েও এই ধরনের টাউটদের সন্ধান পাবেন যারা সরকারের খাদ্য কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার প্রকল্প গুলিতে দরিদ্র নারী পুরুষকে সেবা দেয়ার প্রবচন দিযে হাজার হাজার টাকা লুটে নিচ্ছে। তাদেও বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই, বললে সহায়তা তো পাওয়া যাবেই না উপরোন্ত বিভিন্ন ভাবে হয়রানীর শিকার হতে হবে। এধরনের টাউটরা যতোক্ষন সরকারী গ্যারকলে না পড়ছে ততোক্ষন তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলে না যেমন আজকে শাহেদের বিরুদ্ধে আমরা সকলেই সোচ্চার। শাহেদ মিয়া তো তারেক জিয়ার বন্ধু, ২০১১ সন থেকে আওয়ামী ঘারানায় যোগ দিয়ে লুটপাট করছে, রাজনৈতিক নেতাদের সাথে ছবি তুলছে কিন্তু কেউ কোন দিন একটি টু শব্দ করে নাই। আজকে তার ইতিহাস আমাদের সামনে আসছে, কিন্তু ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অক্লান্ত পরিশ্রমের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈকিত অর্জন সমুহ পঙ্গপালের দল খেযে ফেলেছে।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত সংগঠন, হাজার হাজার নেতাকর্মীর ত্যাগে উজ্জিবিত এবং শোষিত জনগনের কথা বলার মতো একটি রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ। এই সংগঠনে কিভাবে এতো বেশী সংখ্যক অশুভ শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটলো? এই প্রশ্নর উত্তর খুঁজতে গেলে অনেকে বলবেন ’অনেক দিন ক্ষমতায় থাকলে এমনটি হতে পারে’ কিংবা ’আওয়ামীলীগ কোন ক্যাডার ভিত্তিক সংগঠন নয় তাই সবাই এই সংগঠনের সাথে জড়িত হতে পারে’, অথবা আমাদের রাজনৈতিক শক্তিবৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে তাই জনবল বাড়াতে হবে। আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বলবে, এই দলটি জনগনের ভোটে সরকারে আসে নাই তাই তাদের এই অবস্থা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়তো জানে না, আওয়ামীলীগের তৃণমুলের শক্তি অনেক বেশী, তাদের মধ্যে অভিমান তৈরী হয়েছে তাই কথা বলে না। দেশের প্রায় ৪৪ ভাগ মানুষের সরাসরি সমর্থন রয়েছে এই দলের প্রতি, প্রায় ৭৫ ভাগ মানুষ জননেত্রি শেখ হাসিনার কাজ কর্মে অনেক বেশী আস্থাশীল। তাই ভোটের রাজনীতির সাথে এই দলের তুলনা চলে না। তারপরেও শাহেদ, সম্রাট কিংবা পাপিয়াদের জন্ম হয় কেন? এই বিশ্লেষনে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, আওয়ামীলীগে একধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরী হয়েছে। যারা ক্ষমতার বলয়ে রয়েছেন, এমপি কিংবা মন্ত্রী হয়েছেন তাদের ত্যাগকে অস্বীকার করছি না কিন্তু তাদের চারপাশে যারা রয়েছেন তাদের ৯৫ ভাগের এই দলের সাথে সংশ্লিষ্টতা হয়েছে ২০০৯ সনের পরে। যুক্তির খাতিরে বলতে পারি রাজনৈতিক মঞ্চ কোন সময় খালি থাকে না, যারা ত্যাগী নেতাকর্মী তারা যদি এগিয়ে না আসে তাহলে তো নতুন প্রজন্মর সম্পৃক্ততা বাড়বেই। কথাটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত, কিন্তু কিভাবে নতুনদের সংশ্লিষ্টতা হয়েছে, কোন আদর্শের ভিত্তিতে আওয়ামীলীগ কিংবা তার অংগ সংগঠনগুলিতে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয়েছে? রাজনৈতিক আদর্শর জন্য হলে হয়তো আজকে এতো বেশী অর্থনৈতিক, লুটপাটের ঘটনা, ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা সামনে আসতো না। অবশ্য এগুলি হয়েছে হালুয়া রুটির ভাগাভাগির পাওয়ার জন্য, নিজ দলের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য সন্ত্রাসী আর লুটেরাদের দিয়ে নিজ নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার জন্য। যদি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গুলি বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে সহজেই অনুমেয়।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, দিনাজপুর জেলায় ১৯৭৯ সনে ছাত্রলীগে যোগদানের মাধ্যমে এই আদর্শের সাথে সংশ্লিষ্টতা হয়েছিলো। এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে, শেখ শেখ শেখ মুজিব, লও লও লও সালাম, এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে, এই সকল স্লোগানে আবেগ ও দ্বিতীয় বিল্পবের কর্মসূচীর আদর্শে আকৃষ্ট হয়েছিলাম। সেই সময় রাস্তায় মিছিলে ১০-১২ জনের বেশী হয় নাই, পুলিশের অত্যাচার কিংবা সেই সময়ের ছাত্রদলের অত্যাচারের কথা বাদই দিলাম। কিন্তু প্রতিটি কলেজ নির্বাচনে পূর্ন প্যানেলে সমগ্র বাংলাদেশে জয়ী হয়েছিলাম। আমি নিজেও একটি কলেজের ভিপি হিসেবে পূর্ন প্যানেল নিয়ে ১৯৭৯ সনে জয়ী হয়েছিলাম। সেই সময়ের ভাবনা ছিলো না আওয়ামীলীগ খুব শীঘ্রই ক্ষমতায় আসবে, তবে গোপনে গোপনে মানুষ বলতো ’বাবারা তোমাদের সাহসকে শ্রদ্ধা করি, আমরাও চাই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হোক’। তখন মনে আশা জাগতো এই দলের সাথে জনগন আছে, যদি সুযোগ সৃষ্টি হয় তাহলে অবশ্যই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হবে। সেই সময় যাদের দেখেছি ছাত্রলীগ করতে, স্লোগান দিতে তাদের দুবেলা ঠিকা ভাবে খাবারের সংস্থান ছিলো না। বেশীর ভাগ ছিলো হতদরিদ্র পরিবারের কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবার ছিলো মুদি দোকান, সবজি দোকান, বাবুর্চি, কোর্টেও মুহুরী, পান দোকান কিংবা রিক্সা চালক। এই পরিবারের সন্তানদের লেখা পড়া শেষ হওয়ার পর স্বাভাবিক ভাবেই বাবা মায়ের ইচ্ছায়, মনের বিরুদ্ধে বাধ্য হয়েছে কর্মসংস্থানের সাথে জড়িত হতে। তবে অনেকেই আবার অনেক কষ্ট করেও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থেকেছে, চেষ্টা করেছে দলকে এগিয়ে নেয়ার, চেষ্টা করেছে অঙ্গসংগঠন গুলির সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার। কিন্তু আজকের রাজনৈতিক ভীড়ে তারা অনেকেই হারিয়ে গেছে কিংবা হারিয়ে যাচ্ছে।
১৯৯০ সনের পর সামরিক বা স্বৈরশাসনের অবসানের পর যখন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা ফিরতে শুরু করলো, জাতীয় সংসদের নির্বাচন শুরু হলো তখন আস্তে আস্তে অবসরপ্রাপ্ত সরকারী আমলা কিংবা সামরিক পদস্থ কর্মকর্তাগণ রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ শুরু করলেন। কারণ তাদের পরিচয়, পদবী, বংশপরিচয় ছিলো জনগনের সমর্থন আদায় করার অন্যতম গুনাগুন। এভাবেই আস্তে আস্তে দরিদ্র পরিবার গুলির সন্তানেরা পিছিয়ে পড়তে থাকে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক দলগুলির পুরাতন নেতৃত্বর বয়সের কারণে অথবা মৃত্যুজনিত কারনে দলে পিছিযে পড়লেও সেই জায়গা গুলি কিন্তু তৃণমুলের কর্মীদের পুরনের সুযোগ হয় নাই। কারণ ১৯৭৫ পরবর্তীকালে যখন রাজপথে হতদরিদ্র পরিবার গুলির সন্তানেরা রাজনৈতিক স্লোগানে মুখিয়ে রেখেছিলো তখন আওয়ামী পরিবারের সন্তানেরা দেশে কিংবা বিদেশে বড় বড় ডিগ্রী অর্জনে ব্যস্ত ছিলো। ফলে ২০০৮ সনের পর যখন নতুন প্রজন্ম আওয়ামী রাজনীতিতে আসতে শুরু করলো তখন জেলা ও উপজেলায় পরিবারতন্ত্রের পুনর্বাসনের রমরমা অবস্থা তৈরী হলো। নিজ জেলার বর্তমান এমপিদের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করেন নিশ্চয়ই দেখবেন অনেকেরই বাবার পরিচয়ে তাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে আগমন ও পদ পাওয়া, এমপি হওয়া।
এই নতুন প্রজন্মের নেতৃবৃন্দ কোন ভাবেই তৃণমুলের কর্মীদের আবেগ ও অনুভুমি বুঝতে পারেনা, অভিমান বুঝতে পারেন না। কারণ পুরাতন কিংবা তৃণমুল কর্মীর কাছে চাওয়া বা পাওয়ার চেয়ে দলের করুন অবস্থা নিয়ে অভিযোগ বেশী থাকে যার স্বদত্তোর দেয়ার মতো সাহস বা যোগ্যতা পারিবারিকভাবে চলে আসা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দর কাছে থাকে না। দেখা গেছে ৭০ কিংবা ৮০’র দশকে যে ছাত্রদল, ছাত্রসমাজের কর্মীদের মারপিটের কারণে কলেজে মিছিল করতে পারি নাই তারাই আজকে আওয়ামীলীগের বড় নেতা। সেই কষ্ট তো পুরাতন এবং তৃণমুলের কর্মীরা ব্যক্ত করবে এটিই স্বাভাবিক। অন্যদিকে তৃনমুলের কর্মীদের যেহেতু অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নেই তাই তাদের স্থানীয় এমনকি গ্রাম পর্যায়ের নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ হয় না। টাকা নাই তাই নেতা তাদের স্থানীয় নেতা হিসেবে বিবেচনা করেন না। এই সুযোগে নতুন নতুন মোসাহেবদের আগমণ, কারন তারা নেতাকে প্রশ্ন করে না, বরঞ্চ প্রশংসা করে। তোষামোদি করে তাই নেতার কাছে তাদের কদর বেশী। অনুপ্রবেশকারীরা যেহেতেু সুযোগ সন্ধানী তাই প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বেশী থাকে, নেতা খুশি হন কারন সেই অনুপ্রবেশকারী দলের জন্য খরচ করতে পারছেন, নতুন কর্মী সৃষ্টি করতে পারছেন। দল ক্ষমতায় থাকলে এধরনের কর্মীর অভাব হয় না সেটি যদি জিয়ার আমলা, এরশাদের আমল কিংবা তারেখ জিয়ার আমলকে দেখি তাহলে এটি দ্বিতীয়বার প্রমানের প্রয়োজন হবে না।
শেষ কথা, তৃণমুলের ত্যাগী অভিমানী কর্মীদের যদি যথাযথ মুল্যায়ন এবং সম্মানের প্রদর্শনের এখনই সময়। রাজনৈতিক মাঠে এখনও তাদের গ্রহনযোগ্যতা রয়েছে তাই তাদেও যদি সক্রিয় না করা যায় তাহলে এধরনের লুটপাট বন্ধ হবে না। পাশাপাশি বিএনপির মতো দলের মৌলবাদী রাজনৈতিক আদর্শে রূপান্তর হওয়া ও বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে আওয়ামীলীগ দল হিসেবে অনেক দিন হয়তো ক্ষমতায় থাকবে কিন্তু একসময় দল হিসেবে ইতিহাস হয়ে যাবে।