কোভিড ভ্যাকসিন: চীনের সিনোফার্মের টিকা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা যেসব কারণে

38
Social Share

চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিনোফার্ম থেকে দেড় কোটি টিকা কেনা নিয়ে নতুন জটিলতায় পড়েছে বাংলাদেশ।

গোপনীয়তার চুক্তি লঙ্ঘন করায় আগের দামে বাংলাদেশ এই টিকা কিনতে পারবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, উপহারের ছয় লাখ টিকা বাংলাদেশে পাবে। তবে সেটা কবে আসবে এখনো সেই তারিখ জানা যায়নি।

”তবে চীন থেকে তিন দফায় যে দেড় কোটি টিকা আনার কথা ছিল, তা নিয়ে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেই বিষয়ে এখন কূটনৈতিক পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। তবে এখনো তাতে কোন অগ্রগতি হয়নি।” নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেন এই কর্মকর্তা।

তবে রোববার বাংলাদেশর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেন, ”সিনোফার্ম থেকে পাঁচ লাখ ডোজ টিকা এসেছে, আরও ছয় লাখ ডোজ টিকা তারা দেবে। এছাড়া সিনোফার্মের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা চলছে, চুক্তি হবে। সেখানে আমরা আরও দেড় কোটি ডোজ টিকা কিনতে সক্ষম হবো।”

ডাঃ মোহাম্মদ রোবেদ আমিন বলেন, টিকা সংগ্রহের জন্য তাদের সকল প্রকার চেষ্টা বিদ্যমান রয়েছে। রাশিয়া থেকে ভ্যাকসিন আনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

বাংলাদেশে এখন অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড টিকা দেয়া হচ্ছে
ছবির ক্যাপশান,বাংলাদেশে এখন অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড টিকা দেয়া হচ্ছে

রোববার চীনের আরেকটি টিকা সিনোভ্যাকের করোনাভ্যাকের ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশের ওষুধ পরিদপ্তর।

চীন থেকে দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিনোফার্মার তৈরি পাঁচ লাখ টিকা গত ১২ই মে উপহার হিসাবে পেয়েছে বাংলাদেশ। উপহার হিসাবে আরও ছয় লাখ টিকা আসার কথা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পাওয়া এই টিকাটি করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ৭০ শতাংশ সফল বলে ট্রায়ালে দেখা গেছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন যে, চীন থেকে বাংলাদেশ দেড় কোটি টিকা কিনবে। মাসে ৫০ লাখ করে টিকা আসবে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদের সভায় ওই টিকা কেনার সিদ্ধান্তের পর সংবাদ সম্মেলনে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত ২৭ মে সাংবাদিকদের জানান যে, প্রতিটি টিকার ডোজ বাংলাদেশ ১০ ডলার মূল্যে কিনতে যাচ্ছে।

তবে সামাজিক মাধ্যমে এই তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল যে, টিকার দাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ওই কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসাবে বদলি করার পর চীনের টিকার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের কোন কর্মকর্তাই আর কথা বলতে রাজি নন।

তবে গত শুক্রবার বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরকে দেয়া সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, “তারা ১৪ ডলার করে টিকা দিয়েছে শ্রীলঙ্কাকে, ১৭ ডলার করে বিক্রি করেছে ইন্দোনেশিয়াকে, এখন ওই সমস্ত দেশ এটা জানার পর ওদের ওপর চাপ দিচ্ছে চাপ দিচ্ছে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য। ফলে তারা আমাদের ওপর খুব বিরক্ত হয়েছে। আমরা বলেছি, আমরা তো এটা ইচ্ছা করে করিনি। আমরা তাদের একটা চিঠি দিয়েছি, তবে এখনো কোন রিপ্লাই পাই নাই।”

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন শুক্রবার চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরকে বলেছেন, চীনের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে আমরা দুঃখপ্রকাশ করেছি। কিন্তু এতে আমাদের অবস্থানটা খুব বাজে অবস্থা হয়েছে। আমরা আগামীতে সেই পয়সায় জিনিস কিনতে পারবো না। এখন তারা অন্যদেশে যেভাবে বিক্রি করে, সেই পয়সায়, ডাবল-ট্রিপল দাম পড়বে। ”

তবে শনিবার তিনি ওই চ্যানেলকে বলেন, ”তারা একটু দুঃখিত হয়েছে। আমরা বলেছি যে, আমাদের ভুল হয়ে গেছে। এটা মিটমাট হয়ে গেছে। চীনের সাথে বন্ধুত্বের কারণে আমরা ভালো প্রাইস পেয়েছি।”

কিন্তু এখন কি আলোচনা হয়েছে, তার বিস্তারিত তিনি জানাননি।

ভিডিওর ক্যাপশান,টিকা নিতে আগ্রহী হলে যেসব বিষয় আপনার জানা থাকা জরুরি

তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চীনের দূতাবাসে পাঠানো চিঠির কোন উত্তর তারা এখনো পাননি। চীন থেকে টিকা আনার বিষয়ে আলোচনায় নতুন কোন অগ্রগতিও হয়নি।

এদিকে চীনের উপ-রাষ্ট্রদূত হুয়ালং ইয়ান নিজের ফেসবুক পাতায় একটি স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ”সিনোফার্ম বা বাংলাদেশের মধ্যে আজ (গতকাল পাঁচই জুন) পর্যন্ত কোন চুক্তি হয়নি। এটা আসলে চীনের সরকারের সঙ্গে নয়,বরং সিনোফার্মের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি বাণিজ্য আলোচনায় হয়েছে। আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, আমাদের বাংলাদেশি ভাই ও বোনেরা তাদের আকাঙ্ক্ষিত টিকা দ্রুত পাবেন।”

তবে কবে নাগাদ সেই টিকা বাংলাদেশে আসতে পারে, সে বিষয়ে কোন দপ্তরের কোন কর্মকর্তাই কোন তথ্য জানাতে পারছেন না।

সিনোফার্মের টিকা সম্পর্কে যা জানা যায়

চায়না ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রুপ (সিএনবিজি) বা সিনোফার্ম এই টিকাটি তৈরি করেছে। এটি চীনের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান।

গত ৩০শে ডিসেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে যে, তাদের তিন দফা পরীক্ষায় টিকাটি ৭৯ শতাংশ সাফল্য পেয়েছে। তবে টিকাটি ব্যবহার করা সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ৮৬ শতাংশ সাফল্য দেখতে পেয়েছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশেষ কর্মসূচীর আওতায় চীনের ১০ লাখ মানুষকে এই টিকা দেয়া হয়েছে। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই এটি অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে।

তৃতীয় দফার ট্রায়াল শেষ হওয়ার আগেই এ বছরের জানুয়ারিতে টিকাটি গণহারে ব্যবহারের অনুমোদন দেয় চীন।

ডিসেম্বরের শুরুর দিকে একজন স্বেচ্ছাসেবী অসুস্থ হয়ে পড়ায় সিনোফার্মের টিকা স্থগিত করেছি পেরু, তবে পরবর্তীতে তা তুলে নেয়া হয়।

এই টিকাটি দুই থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যায়। অন্যান্য টিকার মতো এটিরও দুইটি ডোজ নিতে হবে।