কৈশোরের প্রেম

Social Share

আজ সকাল থেকেই শামিমের মনটা বেশ বিক্ষিপ্ত ছিল। অফিসের কোন কাজেই মন বসছিল না তার। কাউকে কিছু না জানিয়েই সে হঠাৎ অফিস থেকে বের হয়ে পড়ল। ড্রাইভার গাড়ির গেট খুলতেই সে গাড়িতে যাবে না বলে জানিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি গ্যারেজে রেখে চলে যেতে বলল।অফিসের গেট থেকে বের হয়ে আনমনে হাঁটছিল শামিম। দিনের আলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো তখনো জ্বলে ওঠেনি। রাস্তার মানুষজন, যানবাহন – সবকিছু চলছে যেন ঊর্ধ্বশ্বাসে। শ্যামলী রিং রোডের বামপাশ দিয়ে ধীর পদক্ষেপে চলছিল শামীম। পরবর্তী গন্তব্য কোথায় এখনো স্থির করতে পারেনি। জীবনের অনেকটা সময়ই ভুল পথে চলেছে সে। আজ তার হারাবার কিছু নেই। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাওয়া, অফিস শেষে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফেরা ও রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া – এটাই তার নিত্যদিনের কাজ। ক’দিন থেকেই কী যেন এক অদ্ভুত চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করছিল। ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি তার মাথা কুঁড়ে খাচ্ছিল। আজ সকাল থেকেই মনটা বেশি খারাপ লাগছিল শামিমের। কোথাও যেতে এমন কি বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিতেও মন চাচ্ছিল না। ধীরে ধীরে শ্যামলী ওভার ব্রিজ ক্রস করে মিরপুর রোডের অপর পাশে নেমে এলো শামিম। ফুটপাত ধরে সামনের দিকে এগোচ্ছিল। কিছুটা যেতেই দ্রুতগামী এক পাজেরো স্পোর্টস গাড়ি তার কাছাকাছি আসতেই অকারণে সজোরে ব্রেক করলো। গাড়ির চাকার প্রচন্ড ঘর্ষণের শব্দে চমকে উঠলো শামিম। গতি জড়তা থেকে স্থিতি জড়তায় পৌঁছানোর মাঝখানে তাল সামলাতে না পেরে গাড়ি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে থেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির গেট খুলে নেমে এলো হাল্কা গোলাপী রঙের শাড়ি ও কালো সান গ্লাস পরিহিত এক অপূর্ব সুন্দরী যুবতী। তার আঁচল ধরে নেমে দাঁড়ালো চার বছর বয়সী এক ফুটফুটে মেয়ে। ছোট মেয়েটিকে চিনতে না পারলেও যুবতীকে চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল হলো না শামিমের। তার গালের বাম পার্শ্বে প্রায় অর্ধ সেন্টিমিটার ব্যাসের বৃত্তাকার দর্শনীয় তিলটি শামিমের খুব পরিচিত। এছাড়া কিছুটা সামনে এগিয়ে আসতেই তার শাড়ির ভাঁজ থেকে ভেসে আসা চেনা গন্ধে শামিম নিশ্চিত হল সে শিফা ছাড়া আর কেউ নয়। শামিমের দেহের প্রতিটি লোম শিউরে উঠলো। শামিমের লাজুক আচরণের পরিবর্তন আজও ঘটেনি। শিফা শামিমের খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। শামিম নীরবে চোখ মেলে শিফার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। প্রায় অর্ধ যুগ আগের শিফা আর আজকের শিফার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। সময়ের সাথে সাথে শিফার পালিয়ে বেড়ানোর স্বভাবের পরিতবর্তে গায়ে পড়ে কথা বলতে আসার আগ্রহ দেখে শামিম অনেকটাই অবাক হলো। শিফা আবেগ তাড়িত কন্ঠে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, শামিম, আমাকে চিনতে পারলে না! আমি শিফ!
শামিম একইভাবে শিফার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকলো। সে যেন অর্ধ যুগের দেখা আজ একসাথে সম্মিলিত করে দেখছে শিফাকে। এ যেন অনন্তকালের চাহনি- চোখের ভাষায় মনের কথা বলা। শিফা হয়তো বুঝতে পারলো শামিমের মনের ভাষা। এবার সে তার মেয়েকে সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল, এটা আমার মেয়ে।
শামিম মৃদু হেসে শান্তার গালে হাত বুলিয়ে আদর করলো।
– বাহ্! খুব লক্ষ্মী মেয়ে তো! হোয়াট ইজ ইয়র নেম?
মেয়েটি ইংরেজি ভঙ্গিতে বলল, শান্টা।
– হাউ আর ইউ?
– ফাইন। ইউ?
– আই এম ফাইন অলসো।
এবার শিফা শামিমকে উদ্দেশ্য করে বলল, তুমি কেমন আছ? তোমার বৌ-বাচ্চারা কেমন আছে?
শিফার মিষ্টি মুখের হাসি আর ডাগর চোখের চাহনিতে ভিন্ন এক ইঙ্গিত লক্ষ্য করলো শামিম। চার বছর এক সাথে চলে শামিম শিফাকে কিছুটা হলেও বুঝতে শিখেছে। যদিও এখনো তাকে জানার আরো অনেকটাই বাকি রয়েছে। শিফার কথায় শামিম একটু আওয়াজ তুলেই হাসলো। সে হাসি জয়ের না পরাজয়ের তা স্বার্থপরের মত কিছুই বুঝতে চেষ্টা করলো না শিফা।
শিফা আবাক হয়ে আবার প্রশ্ন করলো, তুমি হাসছো যে!
– তুমি আমাকে দেখে বুঝতে পারছো না কেমন আছি! বেশ তো আছি! আর বৌ- বাচ্চার কথা বলছো? তা এখনো কপালে জোটেনি।
শিফা অবাক চোখে তাকালো শামিমের দিকে। তার সে চাহনি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। শিফার চোখে উদ্বিঘ্নতার ছায়া মিলিয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যেই। পক্ষান্তরে তার মুখে ফুটে উঠলো প্রচ্ছন্ন খুশির ঝলক। এ সময়েই হঠাৎ রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো জ্বলে উঠলো। শিফা তার চোখের সানগ্লাস খুলে হাতে নিল। দ্রুতগামী এক বাতাসে শিফার সোনালি-বাদামী চুলগুলো উড়তে থাকলো। উন্মুক্ত চোখে সোডিয়াম বাতি আর গোধুলি বেলার অপূর্ব আলোতে শিফাকে আরো সুন্দর দেখাচ্ছিল। ছয় বছর পরও শিফার রূপের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। বরং তাকে আরো বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। শামিম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকলো শিফাকে।
শিফা হাসতে হাসতে দৃঢ়তার সাথে বলল, এতদিন পর তোমাকে যখন পেলাম তখন আর ছাড়ছি না।
শামিম কিছুটা বিদ্রুপের সাথে বলল, যখন ধরে রাখবার সুযোগ ছিল তখনই যখন পারলে না এখন তুমি কিভাবে পারবে? যাক সে কথা। এতদিন তুমি কোথায় ছিলে?
– সে অনেক কথা। আমি নিরিবিলিতে সব বলব তোমাকে। আগামীকাল বিকেলে বা সন্ধ্যায় তুমি আমাকে সময় দিতে পারবে?
শামিম কয়েক মুহূর্ত ভাবলো। মনের মধ্যে বহু প্রশ্ন ঘোরাঘুরি করছিল তার। ভাবনার সাথে বাস্তবতার কোন মিল খুঁজে পাচ্ছিল না সে। শামিম কোনদিনই শিফার আহবানকে উপেক্ষা করতে পারেনি। তাই আজো তার পক্ষে সেটা সম্ভব হলো না। শামিম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, কোথায়?
– তোমার কোন আপত্তি না থাকলে আমরা কোন রেস্টুরেন্টে বসতে পারি। সেখনেই ডিনার সেরে ফেলতে চাই।
– বেশ।
– তাহলে তোমার ভিজিটিং কার্ড দাও। আমি বিকাল পাঁচটার মধ্যে তোমার কাছে চলে আসব।
শামিম তার কার্ড হোল্ডার থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে শিফার হাতে দিল। শিফা কার্ডের আগাগোড়া চোখ বুলিয়ে খুশি হয়ে বলল, বাহ্‌! তোমার অফিস তো শ্যামলীতেই। এখানে তোমার সেল নাম্বারও আছে। আমি এ নাম্বারে তোমার সাথে যোগাযোগ করে নেব।
শামিম হ্যাঁ-না কোন কথা বলল না। শুধু একইভাবে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো শিফার দিকে। কিন্তু শিফার কোন অনুভূতি বুঝতে পারলো না সে। শিফার ব্যস্ততা যেন বেড়ে গেল। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমাকে একটা অনুষ্ঠানে এটেন্ড করতে হবে। আসি। বাই।
শিফা তার ডান হাত বাড়িয়ে দিল। শামিম ধীরে ধীরে তার হাত এগিয়ে শিফার সাথে হ্যান্ডশেক করলো। অর্ধ যুগ পর শিফার নারী হাতের স্পর্শ শামিমের সমস্ত শরীরে ভাললাগার এক স্নিগ্ধ অনুভূতি ছড়িয়ে দিল। শিফা গাড়িতে উঠে হাত নেড়ে বিদায় জানালো শামিমকে। গাড়ি এগিয়ে যেতেই শামিমের সমস্ত শরীরে কেমন যেন এক তোলপাড় শুরু হলো। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে একই পথে শিফার গতিপথের বিপরীত দিকে পা বাড়ালো। ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় তার বাসায় পৌঁছালো। শূন্য বাসা ধূ-ধূ মরুভূমির মত মনে হচ্ছিল। পাঁচতলা বিল্ডিং এর ছাদের ওপর দু’রুমের ছোট্ট একটা বাসাতে বেশ কিছুদিন ধরে একাকী ভাড়া থাকে শামিম। বাসা সম্পুর্ণ অগোছালো। কারণ এ বাসাতে অধিকাংশ দিনেই শুধুমাত্র রাতের ঘুম ছাড়া বাকিটা সময় বাইরেই কাটে শামিমের। কোন কোন দিন সে বাসাতেও ফেরে না। হয়তো অফিস বা অন্য কোন বন্ধুর বাসায় রাতটা কাটিয়ে দেয়। অধিকাংশ দিনের তিন বেলাতেই বাইরের খাবার খেয়ে বাসায় ফেরে শামিম। কখনো কখনো নিজেই সে তার বাসার গ্যাসের চুলায় রান্না করে খায়। তার বাসায় কোন জিনিসের অভাব নেই। অভাব শুধু একজন প্রকৃত জীবন সঙ্গীর। শামিম ঘরে ঢুকেই ধপাস করে সোফায় বসে এসি অন করলো। কিছুক্ষণ চোখ বুজে মাথা উঁচু করে বসে থাকলো। এরপর রিমোট কন্ট্রোলে টিভির সুইচ অন করলো। এক নাগাড়ে কয়েক মুহূর্ত টিভির চ্যানেল ঘুরালো। কোন কিছুই দেখতে ইচ্ছে হলোনা তার। হঠাৎ সোফা থেকে উঠে ছাদে কিছুক্ষণ পায়চারি করলো। সন্ধ্যার আকাশের তারাদের ভিড়ে কি যেন খুঁজতে চাইলো। হয়তো সে কিছুই খুঁজে পেল না। কিছুক্ষ ঙ ব্যর্থ চেষ্টার পর রুমে ফিরে এলো সে। এক এক করে জামা-জুতো ছুড়ে ফেলল ফ্লোরে। খাটের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে দু’পা মাটিতে ঝুলিয়ে মাথার নিচে হাত দিয়ে চোখ বুজতেই কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষণে ঘটে যাওয়া আবেগময় স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলো।(চলবে)

– সুব্রত পাল