কৈশোরের প্রেম

Social Share
(২য় পর্ব)
সেদিন ছিল জানুয়ারী মাসের বাইশ তারিখ রোজ সোমবার। গুরুদাসপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের  নবম শ্রেণির ছাত্র শামিম। সকাল সাড়ে ন’টা থেকে দশটা পর্যন্ত গেম টিচার ভবানীপদ রায়ের তত্ত্বাবধানে এক টানা দশটা পিটি সমাপ্ত করার পর জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া শেষে জাতীয় পতাকাকে সম্মান প্রদর্শন করে নিজ  ক্লাসে বসার সাথে সাথেই নিজাম উদ্দিন স্যার ক্লাসে ঢুকে রোল কল শুরু করলেন। শামিম ক্লাসে  মন খারাপ করে  বসে ছিল। কারণ পিটি করার সময় ভবানীপদ স্যারকে ফাঁকি দিতে গিয়ে শামিম ধরা পড়ে গিয়েছিল। ফলে স্যারের বেত্রাধাতে শামিমের হাত দু’টো ভীষণ ব্যাথা করছিল। তাই রোল কলের সময় রেসপন্স করতেও ভুলে গিয়েছিল সে। যদিও শামিম সম্পুর্ণভাবে নিজেই দোষী তবুও মনে মনে ভবানীপদ স্যারের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল তার। ভবানীপদ স্যার অত্যন্ত সময়নিষ্ঠতা, বিচক্ষণতা ও আন্তরিকতার সাথে ছাত্রছাত্রীদের তত্ত্বাবধান করতেন। এসেম্বলির সময় তাঁর হাতে সব সময় বেতের তৈরি একটি লাঠি থাকতো। তিনি ঘুরে ঘুরে সকল ছাত্রছাত্রীর শারীরিক কসরত  পর্যবেক্ষণ করতেন। তার চোখকে ফাঁকি দেয়া খুব কঠিন। শুধু ক্লাসেই নয়, ক্লাসের বাইরেও তিনি ছাত্র ছাত্রীদের গতিবিধি লক্ষ্য করতেন। তিনি অত্যন্ত পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। গেমস ক্লাস ছাড়াও তিনি নিয়মিত সকল শ্রেণির হিন্দুধর্মের ক্লাস নিতেন। ক্লাস, গেমস বা এসেম্বলির সময় ছাত্রছাত্রীদের বিন্দুমাত্র অমনোযোগিতা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারতেন না। তাই শামিমের ভাগ্যে এই বেত্রাঘাত। নিজাম উদ্দিন স্যার বাংলা ক্লাস শুরু করতে যাচ্ছিলেন। এমন সময়  প্রধান শিক্ষক এ এম আজিজুল হক স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। সঙ্গে লম্বা-ফর্সা- ভুঁড়িওয়ালা এক ভদ্রলোকও ঢুকলেন। তাদের পিছু পিছু বই খাতা হাতে অপূর্ব সুন্দরী এক মেয়ে ক্লাসে প্রবেশ করলো। ছাত্রছাত্রীরা সবাই এক সাথে দাঁড়িয়ে হেড স্যারকে সালাম দিল। তিনি প্রথমে ভদ্রলোকটিকে ছাত্রছাত্রীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, স্যার হচ্ছেন আমাদের উপজেলার এসি (ল্যান্ড)- বাংলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি)। তিনি এ উপজেলার সকল জমিজমার মালিক বা তত্ত্বাবধায়ক। তিনি উপজেলার একজন  অনেক বড় অফিসার। তাঁকে তোমরা সব সময় সম্মান দেবে। তাঁর মেয়ে শিফা আজ থেকে তোমাদের নতুন সহপাঠী। সে তোমাদের সঙ্গে পড়াশুনা করবে। তোমরা সবাই তাকে নিজ বন্ধু হিসেবে সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
নিজাম উদ্দিন স্যার শিফাকে মেয়েদের জন্য নির্ধারিত স্থানে বসতে বললেন। হেডস্যার শিফার বাবাকে নিয়ে অফিস রুমের দিকে চলে গেলেন। নিজাম উদ্দিন স্যার ক্লাস শুরু করলেন। শিফাকে দেখামাত্রই শামিমের মনটা যেন চাঙা হয়ে উঠলো। যাদুর মত হাতের সকল ব্যথা যেন দূর হয়ে গেল। সে অপলক চোখে বারবার তাকাচ্ছিল শিফার দিকে। শিফাকে বারবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল সে। তার হাস্যোজ্জ্বল গোলাপী মুখ আর বাম গালের উপর ছোট মেঘ-বিন্দুর মত ভেসে থাকা কালো তিল শামিমকে দারুণভাবে আকর্ষণ করছিল। শিফার ঈষৎ কোঁকড়ানো মাঝারি সাইজের চুল আর মরালীর মত গ্রীবার সাথে অপূর্ব সমন্বয়ে থাকা চিবুক, কাজলে আঁকা ডাগর দু’টো চোখের লাজুক চাহনি শামিমকে পাগল করে দিচ্ছিল। প্রথম দিন স্কুল ড্রেস ছাড়া ক্লাসে আসায় শিফার প্রকৃত সৌন্দর্য আপন মহিমায় ফুটে  উঠেছিল শামিমের চোখে। মাঝারি-লম্বা গড়নের ওপর শিফার বডির স্ট্রাকচার ছিল বড়ই আকর্ষণীয়। কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পনের প্রস্তুতি পর্বে শিফার ছবি শামিমের মনে চরম ভাবে দাগ কাটলো। সঙ্গে সঙ্গে শিফার প্রতি এক চিরস্থায়ী এক ভালোলাগার  অনুভূতি জন্ম নিল শামিমের হৃদয়ে। তাই ভেতরে ভেতরে শিফার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছে তীব্রভাবে অনুভব করছিল শামিম। যদিও ক্লাস চলাকালে শিফা শামিমসহ  অনেকেরই নাম-পরিচয় জানতে পরেছিল তবুও শিফার সঙ্গে একটু আলাদাভাবে পরিচিত হয়ে কথা বলার জন্য শামিমের মনের ভেতর ছটফট করছিল। শামিম অত্যন্ত সুদর্শন। সে উচ্চতায় পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি। তার শরীরের গড়ন অত্যন্ত মজবুত, গায়ের রঙ লাল টকটকে ফর্সা। তার চোখ, নাক, চুল থেকে শুরু করে সবকিছুই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তার মুখের হাসিতে যে কেউ এক দেখাতেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায়। একদম লাজুকও নয় আবার খুব বেশি চঞ্চলও নয় – মিশ্র স্বভাবের ছেলে শামিম। স্কুলের ছোট-বড় সবার সাথেই কম-বেশি খাতির রয়েছে তার। লেখাপড়াতেও বেশ ভালো। ক্লাসের হাতে গোনা তিন-চারজন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে সে একজন। পড়াশুনার প্রতি ভীষণ আগ্রহী সে। কিন্তু ক্লাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আজ কোন পড়াই তার মাথায় ঢুকেনি। সে ক্লাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল সময় শিফার দিকেই তাকিয়ে ছিল। ক্লাস শেষে সে সুকৌশলে কাউকে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে শিফার পিছু নিল। স্কুলের গেট পেরিয়ে মূল রাস্তা পার হলেই  অফহোয়াইট কালারের বিশাল ডুপ্লেক্স বিল্ডিং এ শিফাদের পরিবার  বসবাস করে। স্কুলের ভেতর থেকে এস এস গেটের ভেতর দিয়ে  খুব স্পষ্টভাবে তাদের বাসার সব কিছুই সুন্দরভাবে পর্যবেক্ষন করা যায়। স্কুল ছুটির পর এক এক করে সবাই বাসাতে ফিরে গেলেও শামিম বেশ কিছুক্ষণ দূর থেকে শিফাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলো। তার দৃষ্টি শুধু শিফাদের বাসার দোতালার জানালার দিকে। মাগরেবের আজান পড়ার পর্ব পর্যন্ত শামিম দাঁডিয়ে ছিল একই স্থানে। বাসায় ফিরেও বারবার শামিমের চোখের সামনে শিফার মুখচ্ছবি বারবার ভেসে উঠছিল। পড়ায় কিছুতেই মন বসলো না তার। রাতের ঘুমও ঠিক কমত  হলো না। প্রতিদিনের চেয়ে অনেক সকলে ঘুম ভেঙে গেল তার। নাস্তা করার পর বেশি দেরি না করে তার সাইকেল নিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়লো সে। সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে স্কুল কম্পাউন্ডে পৌঁছে গেল সে। প্রতিদিন সকাল সোয়া আটটা থেকে পৌনে দশটা পর্যন্ত  আব্দুস সাত্তার (এম. এস-সি) স্যার স্কুল কম্পাউন্ডেই ক্লাস নাইন ও টেনের হাতে গোনা দশ- বারজন ছাত্রছাত্রীকে নিজ উদ্যোগে প্রাইভেট পড়ান। স্কুলের ভাল ছাত্রছাত্রীরা যাতে এএসসি পরীক্ষাতে আরো ভালো রেজাল্ট করে স্কুলের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারে – এটাই তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আটটার আগে সাধারণত কোন ছাত্রছাত্রী স্কুলে আসে না। কিন্তু শামিম আজ আধ-ঘন্টা আগেই স্কুলে এসেছে শুধুমাত্র শিফার  আকর্ষণে। শামিম  প্রথমে তার পঙ্খীরাজরূপী  সাইকেলটি গ্যারেজে রাখলো। তারপর বইপত্রগুলো পড়ার রুমে রেখে সুবিধামত এক জায়গাতে দাঁড়ালো যেখান থেকে শিফাদের বাসা খুব ভালভাবে দেখা যায়। এরপর এক দৃষ্টে সে তাকিয়ে থাকলো শিফাদের বাসার দোতালার খোলা জানালার দিকে। তার চোখে কোন পলক নেই। তার সামনে পেছনে কে আসছে যাচ্ছে তার কোন খেয়াল নেই। এক এক  করে শামিমের সকল বনধু পড়ার রুমে ঢুকলেও স্যার না আসা পর্যন্ত শামিম সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো। এক ঝলক শিফার মিষ্টি মুখ দর্শনের প্রত্যাশায় শীতের সকালের মিষ্টি রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে শামিমের বেশ ভালই লাগছিল। সাত্তার স্যার ক্লাস রুমে ঢোকার পর শামিম তাঁর পিছু পিছু ক্লাসে ঢুকলো।স্যার উচ্চতর গণিতের ক্লাস শুরু করলেন। পড়াশুনায় কিছুতেই শামিমের মন বসছিল না। সে হোয়াইট ফেদার কলমের নিচের সমতল দিক টেবিলের সাথে মিলিয়ে ধরে কলমটাকে টেবিলে দাঁড় করিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল বারবার। কিন্তু সে প্রতিবারই ব্যর্থ হচ্ছিল। এক  সময় হঠাৎ কলমটা শামিমের হাত ফসকে ফ্লোরে পড়ে গেল সজোরে শব্দ করে। সাত্তার স্যার চরম বিরক্তির সাথে শামিমের দিকে তাকালেন কিন্তু কিছু বললেন না। এর পর থেকে শামিম পড়াশুনায় কিছুটা মনোযোগ দেবার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই সে পড়াশুনায় পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারল না। সারাটা সময় অত্যন্ত অস্বস্তিতে কাটলো তার। সাত্তার স্যারের কাছে পড়া শেষে প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ী এসেম্বলিতে দাঁড়ানোর সময় প্রথম শিফাকে দেখতে পেল শামিম। তার চোখ দু’টো যেন শান্তিতে ভরে উঠলো। শামিমের মনে অজানা এক আনন্দের অনুভূতি ঢেউ খেলতে থাকল। প্রতিদিনের মত যথারীতি ক্লাস শুরু হল। শামিমের চোখ  ঘুরে ফিরেই শিফার দিকে চলে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শামিমের  এ বিষয়টি অনেকেই লক্ষ্য করল। পরবর্তীতে  শিফাসহ তার অন্যান্য বান্ধবীরাও বুঝতে পারল। দু’চার দিন এভাবে সময় অতিবাহিত হওয়ায় পর একদিন ক্লাস শেষে  শামিম পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে সোজা গিয়ে শিফার বাসায় যাবার পথের ধারে অর্জুন গাছের নিচে গিয়ে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকলো। ক্লাস শেষে মেয়েরা সাধারণতঃ কমন রুমে ঢোকার পর কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথা বার্তা শেষ করে তারপর নিজ নিজ বাসার দিকে রওনা  দেয়। কিন্তু শিফা আজ তা করলো না । ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে সোজা তার বাসার দিকে রওনা হল। কিছুদূর এগিয়ে শামিমের কাছাকাছি আসতেই শিফা থমকে দাঁড়ালো। এরপর শামিমের দিকে চোখাচোখি হতেই  শামিম মৃদু হাসি দিয়ে কী যেন বলতে চাইল। কিন্তু তার মুখ আটকে গে। কোন কথা তার বলা হল না।  শিফা তার মনের অবস্থা দেখে স্বতস্ফুর্তভাবে হেসে ফেলল। তারপর গুটি গুটি পায়ে বাসার দিকে এগোতে থাকলো। কিছুদূর এগিয়ে কৌতুহলী হয়ে শিফা পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলো শামিম সেখানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়েছে। শিফার ফিরে তাকানো দেখে শামিমের মনের ভেতরটা  আনন্দে  উল্লসিত হয়ে উঠলো। অভূতপূর্ব এক প্রশান্তিতে তার মনের ভেতরে শীতল বাতাস বয়ে যেতে থাকলো।
(চলবে)